সংস্কৃত সাহিত্যে শুকসপ্ততির ধ্রুপদী গুরুত্ব তেমন হয়তো নেই, কিন্তু ব্রাহ্মণ চিন্তামণি ভট্টের নামে প্রচারিত এই আখ্যান সংকলনটি দ্বাদশ শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত সমানভাবে লোকপ্রিয়। আখ্যান-শৈলীর চমৎকারিত্ব শুকসপ্ততিকে অন্য মাত্রায় উত্তীর্ণ করেছে। সংকলিত সত্তরটি গল্পের মূলে আছে এক শুকপাখি। এই পাখিটিই গল্পগুলির কথক। আবার তার ভূমিকা শুধু নিষ্ক্রিয় কথকের নয়। গল্পে বর্ণিত সমাজ-সংসারে সে নিজেই একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও সমাজের বৈধপথে থাকবার উপদেশ ছাড়া শুকসপ্ততির সবটাই অবৈধ শৃঙ্গার-লিপ্সুতার জর্জর উপাখ্যান। কিন্তু গল্পগুলির মূল উদ্দেশ্য কামুকতা দেখানো নয়। বরং আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় এই দেখে, যে-দেশে কৌমার-যৌবন-জরাতেও স্ত্রীলোকের কোনও স্বাতন্ত্র নেই সেখানে এই আখ্যানগুলির সৃষ্টি হল কীভাবে? এ এক অদ্ভুত বাস্তব, এক অদ্ভুত বৈপরীত্য এবং এক অদ্ভুত কৌশল—মদন। বিনোদনের দীর্ঘকাল অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রীর সম্ভাব্য চরিত্রহানি রোধ করার জন্য স্খলিত চরিত্রা রমণীদের গল্প শোনানো হচ্ছে বটে, তবু এই স্খলন পাঠকের মনে দাগ কাটে না। বরং গল্পের চতুরতা ও হাস্যরসাত্মক পরিণতি পাঠককে কৌতুকাবিষ্ট করে। কামনাপূর্তির গল্পগুলিকে তখন আর নিন্দনীয় মনে হয় না, উপরোন্তু আবার পড়ার আগ্রহ জাগে। সুপ্রাচীন এই গল্পগুচ্ছের চিরন্তনত্ব এখানেই।
Nrisingha Prasad Bhaduri (Bengali: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি Nr̥sinha Prasād Bhāduṛi; born 23 November 1950) is an Indologist and a specialist of Indian epics and Puranas. He is also a writer.
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর জন্ম ২৩ নভেম্বর, ১৯৫০ অধুনা বাংলাদেশের পাবনায়। কৈশোর থেকে কলকাতায়। মেধাবী ছাত্র, সারা জীবনই স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা। অনার্স পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পেয়েছেন গঙ্গামণি পদক এবং জাতীয় মেধাবৃত্তি।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে এম-এ। স্বর্গত মহামহোপাধ্যায় কালীপদ তর্কাচার্য এবং সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্যের কাছে একান্তে পাঠ নেওয়ার সুযোগ পান। নবদ্বীপ বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৮১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন কলকাতার গুরুদাস কলেজে। বর্তমানে মহাভারত-পুরাণকোষ সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যাপৃত। ১৯৮৭ সালে প্রখ্যাত অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান। বিষয়— কৃষ্ণ-সংক্রান্ত নাটক। দেশি-বিদেশি নানা পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দেশ’ ও ‘বর্তমান’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক। প্রিয় বিষয়— বৈষ্ণবদর্শন এবং সাহিত্য। বৌদ্ধদর্শন এবং সাহিত্যও মুগ্ধ করে বিশেষভাবে। বাল্যকাল কেটেছে ধর্মীয় সংকীর্ণতার গণ্ডিতে, পরবর্তী জীবনে সংস্কৃত সাহিত্যই উন্মোচিত করেছে মুক্তচিন্তার পথ।
খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই বইয়ের সত্তরটি গল্প, জনৈক চিন্তামনি ভট্ট-কে রচয়িতা হিসেবে রেখে, সংকলিত হয়েছিল। নানা আকারে, নানা অনুবাদ এবং তারও অনুবাদের মধ্য দিয়ে গল্পগুলো সময়ের বিরাট নদীতে সাঁতার কেটে আজকের পাঠকের কাছে এসে পৌঁছেছে। যুগ-যুগ ধরে প্রচলিত লোককথা বা আখ্যানকে 'কথা'-র আকারে সংকলনের ঐতিহ্য এ-দেশে আছেই। সেভাবেই "গল্পের মধ্যে গল্প" আকারে সংকলিত হয়েছিল এরা। স্বচ্ছন্দ ও সরস অনুবাদে সেই রচনার এই বিশেষ সংস্করণটিকে পড়ে একটাই কথা মনে হল। এ এক আশ্চর্য বই! কেন? সেটা বলার আগে মূল কাহিনিটি লিখি। চন্দ্রপুর নামক নগরে মদনবিনোদ নামের এক বণিক বাণিজ্যের জন্য দেশান্তরী হল। তার স্ত্রী প্রভাবতী বাড়িতে একা থাকতে-থাকতে মনমরা হয়ে পড়েছিল। তার ক'জন বন্ধু তাকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গ উপভোগ করে একাকিত্বের গ্লানি দূর করার পরামর্শ দিল। প্রস্তাবটা প্রভাবতী'র বিলক্ষণ পছন্দ হল। প্রতি সন্ধ্যায় সে বেরোনোর উদ্যোগ নিত। তখন বাড়ির শুকপাখিটি তাকে রীতিমতো উৎসাহ দিয়ে বলত, "পরপুরুষের সঙ্গসুখ অবশ্যই উপভোগ করা যায়। তবে তার জন্য অমুকের মতো বুদ্ধি থাকা দরকার। না হলে...!" এই 'অমুক'-টি কে এবং সে কী ধরনের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল— সেই নিয়ে গল্প হত সেই রাতে। বাধ্য হয়ে প্রভাবতী আর সেই রাতে রতিসুখসারে যেতে পারত না। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হত পরের রাতেও। এই প্রক্রিয়া ততদিন চলেছিল যতদিন না মদনবণিক বাড়ি ফেরে এবং "দে লিভড হ্যাপিলি এভার আফটার!" সংস্কৃত-অনুরাগী পাঠক যাতে নিজেদের মতো করে এই রচনার মাধুর্য উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য মূল সংস্কৃত টেক্সটটিও এখানে বাংলা হরফে মুদ্রিত হয়েছে। এক-একটি গল্পের সংস্কৃত রূপটি আগে দিয়ে পরে তার অনুবাদটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ-সবের জন্য বইটা পড়ে আশ্চর্য হইনি। তার জন্য দায়ী এর বিষয়বস্তু। এতে আপাতভাবে নীতিকথা এবং নানা ধরনের উপদেশের মধ্যেও যৌনসুখে নারীর অধিকারের কথাটি একেবারে দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন ভঙ্গিতে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, উপস্থিত বুদ্ধি এবং রূপ বা যৌবনকে ব্যবহার করে পরকীয়া করেও কীভাবে নারী (ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষও) সসম্মানে ও সানন্দে থাকতে পারে— তার ভূরি-ভূরি দৃষ্টান্ত, মায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এই বইয়ে। তারপরেও এই বইকে এ-দেশে উপভোগ করা হয়েছে গত হাজার বছর ধরে! এরপরেও আশ্চর্য না হয়ে উপায় আছে? টীকাসমৃদ্ধ 'প্রারম্ভিক' অংশে নৃসিংহপ্রসাদ বইটি তথা তার অনুবাদের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তারই সঙ্গে তিনি বইটিকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বিশ্লেষণ করে সমকালীন সমাজ, অর্থনীতি, জীবনচর্যা, এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাস ও নানারকম ভয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। বইয়ের সবক'টি গল্প পরকীয়া ও রতি-বিষয়ক নয়। লোভ, ক্রোধ প্রভৃতি রিপুর নানা প্রকাশও তাদের মধ্যে ঘটেছে। সেগুলোর মধ্য দিয়েও উপস্থিত বুদ্ধির জয় দেখানো হয়েছে। সেই গল্পগুলোতেও "বল তো, এই অবস্থায় অমুক কী বলল/করল?" প্রশ্ন শুকের মুখে শোনা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই বইয়ের সঙ্গে 'বত্রিশ সিংহাসন' এবং 'বেতাল পঞ্চবিংশতি'-র তুলনাও উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে ভারতীয় সমাজের এমন এক বর্ণাঢ্য এবং রীতিমতো 'শরীরী' ছবি ফুটিয়ে তোলে এই বইটি, যা ইতিহাস বই পড়ে হওয়া ধারণার সঙ্গে একেবারেই মেলে না। গল্পময় ভারতের সেই ছবিটি দেখার জন্য তথা নারীর নিজদেহের ওপর অধিকার উদ্যাপনের কথা পড়ার জন্যই এই বইটি পড়া উচিত। তার আলোচ্য সংস্করণটি যেহেতু টীকা ও অনুবাদে অত্যুৎকৃষ্ট, তাই পাঠকেরা সেটিকে বরণ করবেন— এই আশায় রইলাম।