#Book_Mortem 130
#ইস্রাইলের_উত্থান_পতন
আরো একটা নন-ফিকশন বই পড়ে ফেললাম। নন ফিকশনের রিভিউ লিখাটা বরাবরই আমার কাছে বেশ কষ্টসাধ্য কাজ বলে মনে হয়। কেনো না এই বইগুলোতে কন্টেন্ট হিসাবে যা থাকে তা হলো স্রেফ তথ্য, আর সেই তথ্যই যদি রিভিউতে আমি লিখে দেই তাহলে মানুষ বইটা পড়বে কেনো? তবুও মুল ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেই রিভিউটা সাজানোর চেষ্টা করবো। আগ্রহীরা অতি অবশ্যই বইটা পড়ে নিবেন যেভাবেই হোক।
পবিত্র ভূমি সিরিজের আগের বই ইহুদী জাতির ইতিহাস থেকে আমরা বনী ইসরাইল বংশ কিভাবে মিশর হতে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে তাদের প্রমিজড ল্যান্ডে ফিরে যায় তা জানতে পারি বিভিন্ন ধর্মীয় উৎস থেকে। এই বইতে এর পরের সময়টুকুর একেবারে নিখাঁদ ইতিহাসটুকু তুলে ধরা হয়েছে। এখন আমি বলতেই পারি যে ইহুদীদের সম্পর্কে অন্তত কারো সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করার মতো জ্ঞানটুকু আমার হয়েছে। যার কৃতিত্ব লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ ভাইয়ের।
প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর ধরে টিকে থাকা ইহু*দী জাতি সম্ভবত পৃথিবীরই সবচেয়ে প্রাচীন জাতি। এই সাড়ে ৪ হাজার বছরে পৃথিবী অনেক অনেক কিছুই দেখেছে, অনেক কিছু ঘটেছে, অনেক পরাক্রমশালী এসেছেন, জয় করেছেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে বিদায়ও নিয়েছেন। কিন্তু টিকে রয়েছে বনী ইসরাইলের বংশধরেরা। তাও যে সে টিকে থাকা নয়, রীতিমতো যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে, উপুর্যুপরি নির্যাতন আর গনহত্যার শিকার হয়েও তারা আজও টিকে আছে তাদের ধর্মের প্রতি সেই একই অবিচল বিশ্বাস ধরে রেখে। বর্তমান ফিলি/স্তিনে ঘটে চলা তাদের নৃশংসতা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো না। তবে এক সময়ে তারাও যে অনেক ভয়াবহতা সহ্য করেছে সেটাও তো অস্বীকার করবার মতো নয়। প্রাচীন মিশরীয় ফারাও হতে শুরু করে, গ্রীক সভ্যতায়, রোমান সম্রাজ্যে, খ্রিস্টান চার্চের ইনকুইজিশনে, এবং সর্বশেষ হিটলারের হলোকাস্টে এই একটা জাতিই নিয়ম করে মার খেয়ে গিয়েছে। যে যখনই ক্ষমতায় এসেছে সেইই চেয়েছে সবার আগে এই জাতিকে বশে আনতে। কেনো তাদের উপর এতো অত্যাচার? একমাত্র একেঈশ্বরে বিশ্বাসী হবার কারনেই কি? আপাত দৃষ্টিতে এই দুই বইয়ের ঘটনাবলী পড়ে আমার অন্তত সেটাই মনে হয়েছে।
আগের বইয়েই আমরা জানতে পারি ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুকাদনেজারের আমলে ধ্বংস হয়ে পবিত্র বাইতুল মুকাদ্দাস তথা ফার্স্ট টেম্পল অফ সলোমন আর সকল ইহু*দীদেরকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাবিলনে। পরবর্তীতে পারস্যের রাজা সাইরাস ব্যাবিলন থেকে ইহু*দীদেরকে মুক্তি দান করেন এবং তারা ফিরে এসে আবার নতুন করে তৈরী ঠিক আগের জায়গায় তৈরী করে সেকেন্ড টেম্পল অফ সলোমন। এই বইয়ের ঘটনাবলী এসেছি ঠিক এই সময়ের পর থেকেই।
দিগ্বিজয়ী আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর তার জেনারেলদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় কে পৃথিবীর কোন এলাকা দখলে নিবে সেটা নিয়ে। এই কাড়াকাড়ির এক পর্যায়ে জেনারেল টলেমি দখল করে নেন জুদাহ প্রদেশ (যাহা কেনান, যাহা জুদাহ, যাহা এহুদিয়া - তাহাই জেরুজালেম )। কিন্তু সেটা সহ্য হলো না আলেক্সান্ডারেরই আরেক জেনারেল সেলুকাসের। অতঃপর দুই পক্ষের কয়েক ধাপের যুদ্ধের পর সেলুসিদ সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হলো। সেলুসিদ সম্রাজ্যের আমলে শুরুর দিকে ইহু*দীদের প্রতি সদয় থাকলেও, এক সময় ঠিকি তাদের উপর নির্দয় হতে শুরু করেন সেলুসিদ সম্রাট অ্যান্টিয়কাস। মাঝের অনেক ঘটনাবলীর পর রাজা অ্যান্টিয়কাস ইহু*দী ধর্মের সাথে গ্রীক সংস্কৃতি ঢুকিয়ে হেলোনিজম চালু করতে চাইলেন। কিন্তু ধর্মপ্রাণ ইহু*দীরা সেটা মানবে কেনো? শুরু হলো আন্দোলন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে রাজা বাধ্য হলেন ইহু*দীদেরকে তাদের ধর্ম ফিরিয়ে দিতে।
এদিকে ইহু*দীদের নিজেদের মাঝে ভেদাভেদ বৃদ্ধি পেয়ে তারা বিভিন্ন দল আর উপদলে বিভক্ত হতে থাকলো। তাওরাতের বানীতে আর বিশ্বাস রাখতে পারলো না অনেকেই। অনেক ঘটনার পর হাসমোনীয় সম্রাজ্যের আওতাভুক্ত হয় জুদাহ রাজ্যের ইহু*দীরা। কিন্তু আবারও তাদের রানীর মৃত্যুতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে দুই ভাগ হয়ে যায় রাজ পরিবার। দুই ভাই মিলে সমাধান চাইতে যান তখনকার সিরিয়া জয়ী রোমান নেতা পম্পের কাছে। তিনি সমাধান করেন বাইতুল মুকাদ্দাসে ১২ হাজার ইহু*দীকে কচুকাটা করার মাধ্যমে। যদিও এর মাঝে কিছু ঘটনা আছে, সেটা জানতে হলে পাঠক না হয় বইটাই পড়ে নিলেন! তবে জুদাহ দখল করলেও পম্পে কিন্তু সেখানে থাকলেন না, তিমি ইহু*দী রাজা দ্বিতীয় হিরক্যানাসকে প্রধান ইমাম পদে রেখে ফিরে যান সিরিয়ায়। তবে হিরক্যানাসকে শাসক পদ দেয়া হলো না। তার কারনে জুদাহ কাগজে কলমে স্বাধীন থাকলেও, সিরিয়াকে কর দিতে হতো।
নানা ঘটনার পর (বইয়ে আছে বিস্তারিত) জুদাহ রাজ্যের রাজা হলেন হেরোদ দ্য গ্রেট, ইনিই সেই রাজা যার শাসনামলে জন্ম হয় যীশু তথা ঈসা (আঃ) এর। রোমান সম্রাজ্যের কড়া শাসনে হেরোদ ধীরে ধীরে তাদের প্রতি অনুগত হয়ে পড়েন। এতোটাই যে তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে একটি ঈগলের মূর্তিও স্থাপন করে ফেলেন! যেহেতু ইহু*দী ধর্মেও মূর্তি পূজা নিষিদ্ধ, তাই ধর্মপ্রাণ ইহু*দীরা আন্দোলন করেন মূর্তির বিরুদ্ধে। ফলাফল হিসাবে মৃত্যুদন্ড পেতে হয় আন্দোলনকারীদের।
যীশু খ্রিস্টের জন্মের আগের দুই নবী জাকারিয়া (আঃ) এবং ইয়াহিয়া (আঃ) এর ঘটনা এসেছে পরবর্তী অধ্যায়ে। ইয়াহিয়া (আঃ) কে পবিত্র কোরআনে নবী হিসাবে উল্লেখ করা হলেও, খ্রিস্টানদের কাছে তিনি পরিচিত জন দ্য ব্যাপটিস্ট নামে! দুই নবীর মৃত্যু নিয়ে সাজানো এই অধ্যায়টা বেশ ইন্টারেস্টিং।
জন্ম নিলেন যিশু খ্রিস্ট। স্বয়ং ইহু*দীদের পবিত্র গ্রন্থেই উল্লেখ আছে যে তাদের খারাপ সময় কাটিয়ে দেয়ার জন্য একজন মাসিহ আসবেন আর আসবেন একজন নবী। নবীকে নিয়ে ইহুদীদের তেমন একটা মাথা ব্যাথা ছিলো না কখনোই। তবে ভবিষ্যৎবানী অনুসারে মাসিহকে নিয়ে তাদের অনেক প্রত্যাশা ছিলো। তাহলে তারা যীশু খ্রিস্টকে সেই মাসিহ হিসাবে মেনে নিলো না কেনো? কারন ইহু*দীদের এই ভবিষ্যৎবাণী জানার কারনে ওই সময়ে অনেক ভন্ড মাসিহ এর আগমন ঘটে। অসংখ্য ভন্ড মাসিহর ভীড়ে কে যে আসল মাসিহ তা ইহু*দীরা নিজেরাই বুঝতে পারছিলো না। এছাড়া মাসিহ হওয়ার বেশকিছু শর্তেরও উল্লেখ ছিলো, যার মধ্যে ৪টা মূল শর্তের একটাও যীশু পূরণ করতে পারেননি। উপরন্তু অন্যান্য ভন্ড মাসিহ এর মতো যীশুকেও শূলে চড়ানো হয় ইহু*দী ধর্মগুরুদের ষড়যন্ত্রে রোমান বাহিনীর সাহায্যে। শর্তগুলো অবশ্য আমাদের কোরআন এবং বাইবেলেও উল্লেখ আছে। ইহু*দীদের কথা হলো যে মাসিহ কিছু করার আগেই মরে গেলো, সে কখনো আমাদের আসল মাসিহ হতে পারে না। এদিকে মুসলিম এবং খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যীশু তথা ঈসা (আঃ) আবারও ফিরে আসবেন দুনিয়ায় এবং তখন তিনি এই শর্তগুলো পূরণ করবেন। মজার ব্যাপার হলো খ্রিস্টানদের সাথে আমাদের মুসলিমদের এই একটা দিকেই মিল। বাকী বেশীরভাগ মিল আসলে ইহু*দীদের সাথেই!! ইহু*দীরা অবশ্য যীশুর জন্ম নিয়ে অনেক কুৎসিত গল্পকথা নিজেদের মধ্যে সাজিয়ে রেখেছে। অনেক কিছু জানার আছে এই অধ্যায়ে।
চলে আসি আবার ইতিহাসের পাতায়। রোমানরা ইহু*দীদের সংখ্যা জানার জন্য একটা আদমশুমারী করতে চেয়েছিলো��� কিন্তু ইহু*দী আইনে তখন আদমশুমারী নিষিদ্ধ। এই একটা কারন ধরেই শুরু হয় রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। উৎপত্তি ঘটে Zealots তথা ধর্মান্ধদের। বিভিন্ন করুণ ঘটনার পর রোমানরা ঘোষনা দিলো এখন থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস সহ সকল ইহু*দী উপাসনালয়ে রোমানদের দেবতার মূর্তি স্থাপন করতে হবে। এর মাঝেই চলতে থাকে ক্ষমতার পালাবদল। কেউ ইহু*দীদের প্রতি সদয়, তো কেউ বা আবার ব্যাপক নৃশংস। ইহু*দীরাও কম যায় না, রোমানদের খবরদারি তারা কোনোভাবেই মেনে নিবে না। এমতাবস্থায় অনেক ঘটনার (যথারীতি বইয়ে আছে) প্রেক্ষাপটে ইহু*দীরা মহা বিদ্রোহ ঘোষনা করলো রোমানদের বিরুদ্ধে। রোমান সম্রাট টাইটাস ৭০ সাল নাগাদ এসে এই বিদ্রোহ দমন করলেন বায়তুল মোকাদ্দাস তথা সেকেন্ড টেম্পল ধ্বংসের মাধ্যমে। সাথে মারা যায় প্রায় ১১ লক্ষ ইহু*দী! অদ্ভুত একটা ব্যাপার যে, সাড়ে ৬শ বছর আগের যে দিনে নেবুকাদনেজার ফার্স্ট টেম্পল ধ্বংস করেছিলেন, ঠিক একই দিনে রোমানরা ধ্বংস করে দেয় সেকেন্ড টেম্পল। আজও ইহুদীরা অপেক্ষায় আছে তাদের মাসিহ আসবেন আর তৈরী করবেন থার্ড টেম্পল। আর পুরো পৃথিবী থাকবে একজন শাসকের অধীনে, পৃথিবী হবে অনাবিল শান্তির আর এরপরই হবে কেয়ামত তথা আর্মাগেডন। একই কথা অবশ্য আমরা মুসলিমরাও মানি। শুধু মাসিহ কে, সেটা নিয়েই যতো ভেদাভেদ!
এই তো এরপর ইহু*দীরা জেরুজালেম ছেড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় বিভিন্ন জায়গায়। রোমান শাসনের আওতায় বন্দী ইহু*দীরা নির্মম জীবন যাপন করতে থাকে। হেন অত্যাচার নেই যা তাদের উপর করা হয় না। তবে এই সময়টায় ইহু*দী সমাজকে জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে নিয়ে যায় সেই সাড়ে ৬শ বছর আগে নেবুকাদনেজারের বন্দী হিসাবে ব্যাবিলনে যাওয়া ইহু*দীরা। ততদিনে তারা সেখানে একটা সমাজ ব্যবস্থা গঠন করে ফেলেছে।এক পর্যায়ে রোমান সম্রাজ্যের সরকারি ধর্ম হয়ে দাঁড়ালো খ্রিস্ট ধর্ম। কিভাবে এটা হয়েছিলো তা বইয়ে না থাকলেও ইতিহাসটুকু আমি জানি, এবং সেটা বেশ বেশ চমকপ্রদই বটে। ইহু*দীরা পড়ে গেলো আরো বড় চাপের মুখে।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ (সাঃ) এর হাত ধরে পৃথিবীতে এলো শান্তির ধর্ম ইসলাম। আক্ষরিক অর্থেই শান্তি ছড়িয়ে দিলো তাদের সম্রাজ্যে। ইহু*দী ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো সময় কাটালো তারা এই ইসলামী শাসন ব্যবস্থার সময়ে। পরিস্থিতি এতোই অনুকূলে ছিলো যে এমনকি ব্যাবিলনের ইহু*দীরাও ধীরে ধীরে আসতে শুরু করলো মুসলিম সম্রাজ্যে। পৃথিবীতে এলো নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান।
অনেক ঘটনার পর প্রায় ৯০০-৯৬৯ সালের মধ্যে রাশিয়া, ইউক্রেন, ক্রিমিয়া অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত শক্তিশালী খাজার গোত্র নিজেদের স্বাধীনতা হারায় স্কাভিকদের কাছে। এই সময়ে দুই ইহু*দী ডাক্তার এবং দার্শনিক খাজার শাসক গোষ্ঠীকে ইহু*দী ধর্মকে ধর্মান্তরিত করেন। এতোটুকু ইহু*দী ইতিহাসই স্বীকার করে। সমস্যা হলো ভাষাগত সামঞ্জস্যের কারনে কয়েকজন ইহু*দীই এক পর্যায়ে প্রশ্ন তুলেন যে বর্তমান ইহু*দীর বড় অংশই আসলে এই ধর্মান্তরিত খাজারদের বংশের ইহু*দী। কিন্তু অতি দ্রুতই এই ধারণাকে মাটিচাপা দেয়া হয়। কেনো না ইহু*দী ধর্ম মোতাবেক এই ধর্ম পৈতৃক সূত্রে পেতে হয়, ধর্মান্তরিত হয়ে ইহু*দী হওয়ার কোনো নিয়মই নেই তাদের! কেউ হলেও তারা মূল বনী ইসরাইল বংশের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর যদি সেটা না হয় তাহলে বর্তমানে পবিত্র ভূমির যে দাবী নিয়ে তারা এখন ফিলি/স্তিনে এই অত্যাচার চালাচ্ছে সেটাও চালানোর অধিকার তাদের থাকবে না। অতএব গায়েব করে দেয়া হলো এই তত্ত্বকে।
অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে লেখা। শর্টকাটে বলতে গেলে ইতিহাসে এরপরেও ইহু*দীদের আরো দুইবার নৃশংসতার শিকার হতে হয়। ১০০০ সালের কিছু আগে যখন স্পেনে মুসলিম উমাইয়া সম্রাজ্যের অধীনে নিজেদের জ্ঞান বিজ্ঞানের ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে পৌছায় ইহু*দীরা, সেই সময়েই এক বর্বর মুসলিমের আক্রমণের শিকার হয় স্পেন। তবে ইহু*দীরা তেমন কোনো সমস্যা ছাড়াই আবার উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু ১০৮৬ সাল নাগাদ খ্রিস্টানরা আবারও দখল করে নেয় আন্দালুসিয়া। শুরু হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস সময়, ক্রুসেড। জোড় করে ধর্মান্তরিত করা হয় সকল ধর্মের মানুষদেরকে। ১০৯৫ সালে প্রথম ক্রুসেডে ধর্মান্তরিত হতে না চাওয়ায় পোপের নির্দেশে হত্যা করা হয় ৭০০ ইহু*দীকে। বিভিন্ন গুজবের প্রেক্ষিতে নিয়মিতই নির্যাতন আর হত্যা করা হতে থাকে ইহু*দীদেরকে প্রায় দুইশ বছর ধরে। চাপিয়ে দেয়া হয় নির্দিষ্ট পোশাক পড়া হতে শুরু করে অনেক রকমের নিয়ম নীতি। এমনকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া প্লেগের জন্যও দায়ী করা হয় ইহু*দীদেরকে। ইউরোপ জুড়ে নিতান্তই মানবেতর জীবন যাপন করতে শুরু করে তারা।
মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে স্পেনে ক্ষমতায় রাজা রানী হিসাবে আসে রক্তপিপাসু স্বামী স্ত্রী ফার্দিনান্দ এবং ইসাবেলা। প্রায় ৭০০ বছর ধরে সুখে শান্তিতে সহাবস্থানে থাকা মুসলিম আর ইহু*দী দুই ধর্মের মানুষের উপরেই নেমে নিদারুণ অত্যাচার আর নির্যাতন। জোড় করে ধর্মান্তরিত করা হলেও এরা গোপনে নিজের ধর্ম পালন করে, এই অভিযোগ তুলে লাখ লাখ ইহু*দী মুসলিমকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। এই ইনকুইজেশনের সময়ে এমনকি পালিয়েও যেতে দেয়া হয় না এই দুই ধর্মের লোকদেরকে। পালাতে হলে নিজেদের কয়েক পুরুষ ধরে জমানো সকল সহায় সম্পত্তি ছেড়ে যেতে হবে খ্রিস্টানদের জন্য। সরকারি হিসাবে সংখ্যাটা কম দেখানো হলেও, ধারণা করা হয় প্রায় ৩০ হাজার ইহু*দীকে জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। মুসলিমদের সংখ্যাটা জানা না গেলেও, ওই সময়ে বসবাস করা ৫-৬ লাখের মতো মুসলিমের কোনো হিসাব পাওয়া যায় না।
দলে দলে সব ছেড়ে নিঃস্ব অবস্থায় পালিয়ে আসে ইহু*দীরা অটোমান সম্রাজ্যের অধিকৃত দেশগুলোতে। আবারও মাথা তুলে দাঁড়ায় তারা। ভালো মন্দ মিলিয়ে কাটিয়ে দেয় আরো প্রায় সাড়ে ৪শ বছর। কিন্তু বিধিবাম শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে জার্মানির পক্ষে অবস্থান নেয় ইহু*দীরা। আমার মনে হয় বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইরনি এটাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে জার্মানির পাশে ছিলো ইহু*দিরা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেই জার্মানদের হাতেই মারা যায় প্রায় ৬০ লক্ষ ইহু*দী। মূলত এই ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরেই ইহু*দীরা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়, অনেক হয়েছে। এবার সময় হয়েছে ঈশ্বরের দেয়া আমাদের প্রমিজড ল্যান্ডে ফেরত যাওয়ার। আর সেটারই ফলাফল আজকের ইস/রাইল-ফিলি/স্তিন ইস্যু। যতোই ধর্মীয় দোহাই দেন না কেনো আপনি কখনোই প্রায় ২ হাজার বছর পর এসে একটা জায়গার বাসিন্দাদেরকে বলতে পারেন না যে এটা আমার পূর্বপুরুষদের জায়গা, তাই এই জায়গা আমাদেরকে দিতে হবে। ফিলি/স্তিনে যদি এখন মুসলিমের জায়গায় হিন্দু বা অন্য কোনো ধর্মের লোকও থাকতো, তবুও আমার মনোভাব এটাই হতো।
লম্বা কাহিনী লিখে ফেললাম। তবে সবগুলো ব্যাপারকে জানতে এবং বুঝতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে এই বইটি। একচুয়েলি এই সিরিজের দুইটা বইই পড়ার জন্য হাইলি রেকমেন্ড করবো আমি সবাইকে। এখন চারপাশে নাস্তিকতার ছড়াছড়ি হলেও, আজকের পৃথিবীটা পুরোটাই আসলে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মীয়বোধের উপর। আর সেই ধর্মকে সবচেয়ে কট্ররভাবে নিজেদের মাঝে লালন করে আসছে ইহু*দীরাই। দুইটা বই পড়ে আমি যা যা উপলব্ধি করেছি সেগুলা নিয়ে আলাদা একটা পোস্ট দিবো যদি সময় পাই বা কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেন তো!
ব্যক্তিগত রেটিং: এসব বইয়ের রেটিং হয় না আসলে। যা যা জানার আগ্রহ ছিলো তার মোটামুটি সবই লেখক জানিয়ে দিয়েছেন চমৎকারভাবে। হাজার বছরের ইতিহাসকে তুলে এনেছেন মাত্র ৭০০ পাতার মধ্যে। এমনকি এই বইটার শেষে হিব্রু ভাষা শেখারও একটা ছোটখাটো টিউটোরিয়াল দিয়ে রেখেছেন তিনি। একট���মাত্র আফসোস। ইহু*দীদের নিয়ে এতোকিছু জানলেও, জানতে পারলাম না তারা কিভাবে স্রষ্টার উপাসনা করে? তাদের ঈদুল ফিসাখ বা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবগুলোই বা তারা কিভাবে পালন করে। এটা জানানো উচিত ছিলো বলে মনে করি।
প্রোডাকশন: অত্যধিক চমৎকার প্রোডাকশন। বইয়ে অসংখ্য ছবি দেয়া হয়েছে রেফারেন্স হিসাবে। যেটার কারনে আরো ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে পারছিলাম ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে।
🪤 লেখক: আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ
🪤 প্রচ্ছদ: আদনান আহমেদ রিজন
🪤 প্রকাশনী: ছায়াবীথি
🪤 পৃষ্টা সংখ্যা: ৩৫০
🪤 মূদ্রিত মূল্য: ৬৫০ টাকা