কোডনেম : বারবারোসা, রাশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে আর তার পরের দশ দিনের ‘কম জানা’ এবং প্রায় অজানা ঘটনার গল্প। গল্পের সাথে ইতিহাস চলে, আর চলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামরিক চরিত্র। যুদ্ধের সিক্রেট পরিকল্পনা, সেই ছকের বাস্তবায়ন; চাল আর পাল্টা চালে– সত্য, মিথ্যা, অর্ধ সত্য সব একসাথে মিশে যায়। স্তালিন-হিটলার ছাড়াও, আরও বহু চেনা-অচেনা নাম আর মুখের অন্তহীন মিছিল। গল্পের পাতায় সিক্রেট-আর্কাইভ, গুপ্তচর, জঙ্গি বিমান, এবং অবশ্যই প্যাঞ্জার আর অতি অবশ্যই ব্লিৎসক্রিগ। গল্প, কিন্তু সত্যি। জার্মান যুদ্ধ মেশিন আর লালফৌজ– দুই পক্ষের তুল্যমূল্য লড়াই। ঘটনাক্রম কখনো যেন থ্রিলার, কখনো সাসপেন্স, কখনো ষড়যন্ত্রের প্যাকেজ।
ইংরেজি ও অপরাপর ভাষায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে এবং আজতক চলছে। অথচ বাংলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বইয়ের বড্ড অভাব। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের অসামান্য কীর্তি 'দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস'কে বাদ দিলে বাংলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে পড়ার মতো লেখা অত্যন্ত কম। এখানেই শোভন চক্রবর্তীর সাফল্য। তিনি পড়াশোনা করে লেখার চেষ্টা করেছেন দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো সামরিক অভিযান 'অপারেশন বারবারোসা' শুরুর আগের কাহিনি ও অভিযানের পহেলা দশ দিন নিয়ে।
পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধের দুই প্রধান ব্যক্তি স্ট্যালিন ও হিটলার। তাদের বেড়ে ওঠা ও কর্তৃত্ববাদী মনকে বোঝার ও পাঠককে বোঝানোর প্রচেষ্টা করেছেন শোভন চক্রবর্তী। যা যথেষ্ট প্রশংসনীয়। বিশেষ করে, জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির পর স্ট্যালিন এক ধরনের আত্মতৃপ্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, একসময় হিটলার মস্কো আক্রমণ করবেই। তবে তা এই চুক্তির মাধ্যমে অন্তত ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া গেছে। ফলে তিনি তার লাল ফৌজকে প্রস্তুত করার কিছুটা সময় পেলেন। এই চিন্তা থেকেই হিটলারের সোভিয়েট ইউনিয়নে হামলার বিষয়ে অনেকগুলো গোয়েন্দা তথ্য পেলেও তিনি তাতে কান দেননি। বরং তথ্যদাতাদের বকাঝকা করেছেন। অন্যদিকে, স্বৈরাচার স্ট্যালিন সেনাবাহিনীর ওপরের কর্মকর্তাদের অনেককেই সন্দেহের বশে খুন করেছিলেন। গণহারে কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করে শ্রম শিবিরে হিজরত করতে পাঠিয়েছিলেন। তাই হিটলারের মনে হয়েছিল, দুর্বল লাল ফৌজকে নিকেশ করার এই হলো মোক্ষম সুযোগ।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানি আচমকা আক্রমণ তথা ব্লিৎসক্রিগের মাধ্যমে দেশের পর দেশ ফতে করে নেয়। তাদের এই যুদ্ধজয়ের অন্যতম কারিগর প্যাঞ্জার নামে ট্যাংক। এই ট্যাংকগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য দ্রুত গতি ও প্রত্যেকটি ট্যাংকের সঙ্গে থাকা রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা। ফলে প্যাঞ্জার ট্যাংকগুলো পারস্পরিক যোগাযোগের ভিত্তিতে সহজে ও সুপরিকল্পিতভাবে শত্রুকে আক্রমণ করতে পারে। আর, সোভিয়েট ইউনিয়ন তখনো তাদের টি-৩৪ ট্যাংক মাঠে নামাতে পারেনি। তাদের পুরোনো ট্যাংকগুলোতে কোনো রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। একেবারেই আ্যনালগ পদ্ধতির ট্যাংকগুলো কোনোক্রমেই জার্মান প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। তাই প্রথমদিকে জার্মানির হাতে মার খেয়ে ভূখণ্ডের পর ভূখণ্ড হারিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
যুদ্ধের প্রথমে বার্লিনের হাতে মস্কোর নাস্তানাবুদ হওয়ার অন্যতম কারণ স্ট্যালিন স্বয়ং। তিনিই ছিলেন লাল ফৌজের মালিক ও একমাত্র আদেশদাতা। তার নির্দেশ ছিল না, জার্মানি ফৌজ হামলা করলে করণীয় সম্পর্কে। কারণ তিনি বিশ্বাসই করতেন পারছিলেন না যে, হিটলার রাশিয়ার হামলা করার হিম্মত দেখাবে।
বাংলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো কাজ করা প্রায় অসম্ভব। তবে শোভন চক্রবর্তী ভালো লিখেছেন। পুঁথি প্রকাশনীর চার শ পাতার বইটির প্রথম দুই শ পাতা একবসায় পড়ার মতো। পরের অংশ কিছুটা গতি হারিয়েছে। বর্ণনাগুলো একঘেয়ে মনে হচ্ছিল। তা-ও সবমিলিয়ে, 'অপারেশন বারবারোসা' পড়ার মতো বই।
I think this book is actually a gem because I don't think that there has been such an informative non-fiction book on World War 2 written in Bengali language.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে আমরা যতটুকু জানি, সেটা মূলত হলিউডের চোখ দিয়ে দেখা একটা যুদ্ধ। ব্যান্ড অফ ব্রাদার্স, দ্য প্যাসিফিক, সেভিং প্রাইভেট রায়ান। ফ্রান্সের নরম্যান্দি উপকূল, ওমাহা বিচের সেই রক্তাক্ত ডি-ডে। পশ্চিমা পর্দায় এই ফ্রন্টটাকেই বারবার মহাকাব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু যে ফ্রন্টে জার্মানির আসল শক্তিক্ষয় হয়েছিল, যেখানে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাত ঘটেছিল, সেই ইস্টার্ন ফ্রন্ট রয়ে গেছে পর্দার আড়ালে। এই অনাচারটা বহুদিন ধরে বহু পাঠককে পীড়া দিয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের লেখক শোভন চক্রবর্তী সেই শূন্যতা পূরণ করতেই কলম ধরেছেন।
অপারেশন বার্বারোসা মানব ইতিহাসের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান। ৩৮ লাখেরও বেশি অ্যাক্সিস সৈন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চিম সীমান্ত বরাবর প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার জুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আর প্রথম পর্যায়েই উভয় পক্ষ মিলিয়ে ৮০ লাখেরও বেশি হতাহত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, জার্মানির মোট সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ৮২ শতাংশই ঘটেছিল এই ইস্টার্ন ফ্রন্টে। সংখ্যাগুলো পড়ে মাথা ঘুরে যায়। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সোভিয়েত লাল ফৌজ চল্লিশ লক্ষ হতাহতের শিকার হয়েছিল, যার মধ্যে ত্রিশ লক্ষ সৈন্য জার্মান বন্দি শিবিরে ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধের প্রথম ছয় সপ্তাহেই প্রতিদিন গড়ে ৪৬,০০০ সোভিয়েত সৈন্য হতাহত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত বেসামরিক মৃতের সংখ্যা ছিল অকল্পনীয়, ১ কোটি ৫০ লাখ। এই সংখ্যাগুলো কোনো পরিসংখ্যান না, এগুলো একটা জাতির মৃত্যুচিৎকার।
অপারেশন বার্বারোসার প্রথম পর্যায় ছিল অলৌকিক গতির। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই লাল ফৌজ ২৫ লাখ হতাহতের ভার বহন করছিল। স্তালিন সীমান্তে জার্মান সৈন্য মোতায়েন দেখেও বিশ্বাস করতে রাজি হননি যে হিটলার আক্রমণ করবে, এবং কোনো রকম প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি নিতে মানা করেছিলেন, পাছে জার্মানি উসকানি পেয়ে যায়। ফলে সোভিয়েতরা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছিল। শোভন চক্রবর্তীর কোডনেম বার্বারোসা এই ভয়াবহ শুরুর গল্পটাই বলে, কিন্তু শুকনো ইতিহাসের ভাষায় নয়।
বইটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইচই পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে, ৪০০ পৃষ্ঠার হার্ডবাউন্ড এই বইয়ে তেইশটি অধ্যায় রয়েছে। লেখক পরিকল্পনা করেছেন পাঁচ খণ্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইস্টার্ন ফ্রন্টের পূর্ণ চিত্র এঁকে যাবেন। এই বইয়ের আখ্যান ইস্টার্ন ফ্রন্টের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের সময় এবং যুদ্ধের প্রথম দশ দিনের কম জানা ও প্রায় অজানা ঘটনার উপর দাঁড়িয়ে আছে। গল্পের পাতায় মিশে আছে সিক্রেট আর্কাইভ, গুপ্তচর, জঙ্গি বিমান, প্যাঞ্জার আর ব্লিৎসক্রিগের কাহিনি। ঘটনাক্রম কখনো থ্রিলার, কখনো সাসপেন্স, কখনো ষড়যন্ত্রের প্যাকেজে রূপ নেয়।
বইয়ের গোটা আখ্যানজুড়ে যুদ্ধের পাশাপাশি স্তালিন আর হিটলারের অন্তরঙ্গতম মনস্তত্ত্ব ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে। বাঙালি পাঠক চিরাচরিতভাবে যেভাবে এই দুই স্বৈরশাসককে জেনেছেন, সেভাবে নয়, একটু ভিন্ন আলোয়। জার্মান বাহিনীর অত্যন্ত গোছালো তড়িৎ আক্রমণ একদিকে, আর অন্যদিকে সোভিয়েত কর্নেলদের সেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কমান্ড আসে না, নির্দেশ আসে না, আসে শুধু জার্মান প্যাঞ্জারের গর্জন। কিয়েভের কাছে একটি মহাবেষ্টনীতে চারটি সম্পূর্ণ সোভিয়েত সেনাবাহিনী আটকে পড়েছিল, প্রায় সাত লাখ সোভিয়েত সৈন্য বন্দি হয়েছিল মাত্র একটি যুদ্ধে। এই তথ্যগুলো জানলেই বোঝা যায় সেই প্রথম দিনগুলো কেমন দুর্বিষহ ছিল।
লেখক হিসেবে শোভন চক্রবর্তীর সবচেয়ে বড় গুণ, তিনি ইত���হাসকে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বের করে এনে রক্তমাংসের গল্প বানিয়ে ফেলতে পারেন। বইয়ের বর্ণনায় সোভিয়েত অ্যাঙ্গেলটা একটু বেশি থাকলেও সেটা বিরক্তিকর নয়, বরং সেটাই এই বইয়ের মৌলিকতা। কারণ ইস্টার্ন ফ্রন্টের গল্প সচরাচর যেটুকু লেখা হয়েছে সেটা জার্মান চোখ দিয়ে দেখা। সোভিয়েত সৈনিকের ভেতর থেকে যুদ্ধটা দেখা, ভয়টা অনুভব করা, সেই অনুভূতি আলাদা।
ইস্টার্ন ফ্রন্টে যত প্রাণ গেছে, সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাকি সব ফ্রন্ট মিলিয়েও এই সংখ্যার ধারেকাছে নেই। তবুও এই ফ্রন্ট নিয়ে বাংলায় প্রায় কিছুই লেখা হয়নি। শোভন চক্রবর্তী সেই শূন্যস্থান পূরণ করছেন ধীরে ধীরে, যত্ন নিয়ে। প্রথম পার্ট শেষ করে এখন দ্বিতীয় পার্ট বার্লিন থেকে মস্কো হাতে তুলে নিতে হবে। পাঁচ খণ্ড শেষ হলে বাংলা ভাষায় ইস্টার্ন ফ্রন্টের একটা পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্য তৈরি হয়ে যাবে, এটা বলা যায় নিশ্চিন্তে।