What do you think?


অশ্রুমঙ্গল
96 pages, Hardcover
First published January 1, 2002
About the author
Afsar Amed
37 books9 followersআফসার আমেদের জন্ম হাওড়া জেলার কড়িয়া গ্রামে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রথমদিকে আফসার মূলত কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করলেও পরবর্তীকালে গদ্যরচনা শুরু করেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস ‘ঘর গেরস্তি’। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ‘প্রতিক্ষণ’ শিরোনামের একটি সাহিত্য সাময়িকীতে কয়েক বছর কাজ করেছেন। এছাড়া কাজ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে।
আফসার আমেদ রচিত বই ‘বিবির মিথ্যা তালাক ও তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিসসা’ আসামের বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মৃণাল সেন পরিচালিত ‘আমার ভুবন’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল তাঁর ‘ধানজ্যোৎস্না’ উপন্যাস অবলম্বনে। ‘রাত কটা হলো?’ শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তাঁর ‘হত্যার প্রমোদ জানি’ শিরোনামের উপন্যাস অবলম্বনে।
আফসার আমেদ অন্যান্য ভাষার বইও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। উর্দু উপন্যাস ‘দো গজ জমিন’ বাংলায় ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’ শিরোনামে অনুবাদ করেন। এছাড়া হরি মোতোয়ানি রচিত সিন্ধি ভাষার একটি গ্রন্থ ‘আশ্রয়’ শিরোনামে বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
১৯৯৮ সালে আফসার আমেদ সোমেন চন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। ‘দো গজ জমিন’ অনুবাদের জন্য বঙ্গানুবাদ শাখায় ২০০০ সালে পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০৯ সালে পেয়েছিলেন বঙ্কিম পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।
আফসার আমেদ রচিত বই ‘বিবির মিথ্যা তালাক ও তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিসসা’ আসামের বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মৃণাল সেন পরিচালিত ‘আমার ভুবন’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল তাঁর ‘ধানজ্যোৎস্না’ উপন্যাস অবলম্বনে। ‘রাত কটা হলো?’ শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তাঁর ‘হত্যার প্রমোদ জানি’ শিরোনামের উপন্যাস অবলম্বনে।
আফসার আমেদ অন্যান্য ভাষার বইও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। উর্দু উপন্যাস ‘দো গজ জমিন’ বাংলায় ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’ শিরোনামে অনুবাদ করেন। এছাড়া হরি মোতোয়ানি রচিত সিন্ধি ভাষার একটি গ্রন্থ ‘আশ্রয়’ শিরোনামে বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
১৯৯৮ সালে আফসার আমেদ সোমেন চন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। ‘দো গজ জমিন’ অনুবাদের জন্য বঙ্গানুবাদ শাখায় ২০০০ সালে পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০৯ সালে পেয়েছিলেন বঙ্কিম পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
February 28, 2024
আফসার আমেদ এর আগে কখনও পড়িনি। কিন্তু আফসার আমেদকেই যেন আমি সবসময় পড়তে চেয়েছিলাম। কারন আফসার আমেদরা লেখেন আমাদের জন্য, আমরা যারা একটি গল্পের জন্য অপেক্ষা করি। যে গল্প আমাদের মনের মধ্যে থেকে যাবে যুগের পর যুগ, আমরা একে কখনও ভুলবো না।
সাত মাস আগে মতিন মাস্টারের বাড়িতে টেলিফোন আসলে কুসুমপুর গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে যায়। গ্রামের মানুষ এখন দশটাকার বিনিময়ে দূরদুরান্তের প্রিয়জনদের সাথে প্রতি রবিবার করে কথা বলতে পারে। গ্রামের বউ -ঝি আর মায়েরা খবর পেলে রবিবার সন্ধ্যা করে মতিন মাস্টারের বাড়ি টেলিফোনে কথা বলতে যায়। এই উপলক্ষে তারা নিজেদের সাজায় নতুন শাড়ি-চুড়ি আর টিপে। এভাবে করে যেন গ্রামের মেয়েরা সবাই টেলিফোন আসাকে কেন্দ্র করে আরও সুন্দর হয়ে উঠে। ফোনে পরবাসী ছেলে, স্বামী বা আত্মীয়র সাথে কথা বলতে বলতে অশ্রুপাত করে গ্রামের মেয়েরা। কেউ কাঁদে নিজের দুঃখে, কেউ বা কাঁদে অন্যকে কাঁদতে দেখে। “অশ্রুমঙ্গল” নাম সার্থকতা পায় তাদের কান্নায়।
ফোন আসে বদরন, লালমন আর হাফেজার। বইয়ের বাকি অধ্যায় গুলোর কাহিনি আবর্তিত হয় এই তিনজনের গল্প নিয়ে। বদরন তার বয়স্ক স্বামী হাসমতের ঘর করতে চায় না, তবু প্রবাসী ছেলে ফয়জুলের ফোন ধরতে তাকে কুসুমপুর গ্রামে আসতে হয়। ফোন আসে লালমনের স্বামীর, ছোট জা মনোয়ারার সাথে যে ফোন ধরতে আসে। ফোন করে না মনোয়ারার স্বামী। কিন্তু এই অবসরে লালমন আর মনোয়ারা একে অন্যের শরীরে খুঁজে নেয় ভালোবাসার মানুষের আদর। অন্যের বাড়ি বাড়ি চেয়েচিন্তে খেয়ে বাঁচে হাফেজারও শখ তার একবার ফোন আসুক। হাফেজার স্বামী তাকে নিতে চায় না, তবে নাদেরের সাথে পুরনো প্রেমের স্মৃতি তাকে কাতর করে। এভাবে একটি টেলিফোনকে ঘিরে রচিত হয় এইসব মানুষের গল্প।
আফসার আমেদের গদ্য একেবারে মসৃণভাবে এগিয়ে চলে, তবে কথা বলার ধরনে কিছু একটা থাকে যাতে মনে হয় তিনি তৈরী করে চলেছেন বেশ আলাদা একটা জগৎ। তার জগতের মানুষেরা কথা বলে একটা বিশেষ সুরে, বিশেষ ধরনে তাই কথপোকথন গুলো একটু আলাদা লাগে। আমার মনে হয় এই রকম স্বকীয় ভঙ্গী, লেখার একটা আলাদা জগতে পাঠককে নিয়ে যেতে পারা একজন কথাসাহিত্যিকের অনেক বড় একটা গুন। আফসার আমেদ এই ব্যাপারে পুরোপুরি সফল।
আফসার আমেদের আরও লেখা পড়ব এই আশায় রইলাম। অন্যদেরও পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম।
সাত মাস আগে মতিন মাস্টারের বাড়িতে টেলিফোন আসলে কুসুমপুর গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে যায়। গ্রামের মানুষ এখন দশটাকার বিনিময়ে দূরদুরান্তের প্রিয়জনদের সাথে প্রতি রবিবার করে কথা বলতে পারে। গ্রামের বউ -ঝি আর মায়েরা খবর পেলে রবিবার সন্ধ্যা করে মতিন মাস্টারের বাড়ি টেলিফোনে কথা বলতে যায়। এই উপলক্ষে তারা নিজেদের সাজায় নতুন শাড়ি-চুড়ি আর টিপে। এভাবে করে যেন গ্রামের মেয়েরা সবাই টেলিফোন আসাকে কেন্দ্র করে আরও সুন্দর হয়ে উঠে। ফোনে পরবাসী ছেলে, স্বামী বা আত্মীয়র সাথে কথা বলতে বলতে অশ্রুপাত করে গ্রামের মেয়েরা। কেউ কাঁদে নিজের দুঃখে, কেউ বা কাঁদে অন্যকে কাঁদতে দেখে। “অশ্রুমঙ্গল” নাম সার্থকতা পায় তাদের কান্নায়।
ফোন আসে বদরন, লালমন আর হাফেজার। বইয়ের বাকি অধ্যায় গুলোর কাহিনি আবর্তিত হয় এই তিনজনের গল্প নিয়ে। বদরন তার বয়স্ক স্বামী হাসমতের ঘর করতে চায় না, তবু প্রবাসী ছেলে ফয়জুলের ফোন ধরতে তাকে কুসুমপুর গ্রামে আসতে হয়। ফোন আসে লালমনের স্বামীর, ছোট জা মনোয়ারার সাথে যে ফোন ধরতে আসে। ফোন করে না মনোয়ারার স্বামী। কিন্তু এই অবসরে লালমন আর মনোয়ারা একে অন্যের শরীরে খুঁজে নেয় ভালোবাসার মানুষের আদর। অন্যের বাড়ি বাড়ি চেয়েচিন্তে খেয়ে বাঁচে হাফেজারও শখ তার একবার ফোন আসুক। হাফেজার স্বামী তাকে নিতে চায় না, তবে নাদেরের সাথে পুরনো প্রেমের স্মৃতি তাকে কাতর করে। এভাবে একটি টেলিফোনকে ঘিরে রচিত হয় এইসব মানুষের গল্প।
আফসার আমেদের গদ্য একেবারে মসৃণভাবে এগিয়ে চলে, তবে কথা বলার ধরনে কিছু একটা থাকে যাতে মনে হয় তিনি তৈরী করে চলেছেন বেশ আলাদা একটা জগৎ। তার জগতের মানুষেরা কথা বলে একটা বিশেষ সুরে, বিশেষ ধরনে তাই কথপোকথন গুলো একটু আলাদা লাগে। আমার মনে হয় এই রকম স্বকীয় ভঙ্গী, লেখার একটা আলাদা জগতে পাঠককে নিয়ে যেতে পারা একজন কথাসাহিত্যিকের অনেক বড় একটা গুন। আফসার আমেদ এই ব্যাপারে পুরোপুরি সফল।
আফসার আমেদের আরও লেখা পড়ব এই আশায় রইলাম। অন্যদেরও পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম।
March 21, 2024
কুসুমপুর গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ থাকে গ্রামের বাইরে।মতিন মাস্টারের বাড়িতে টেলিফোন আসার সুবাদে সবাই গ্রামে থাকা তাদের স্ত্রী পরিজনদের কাছে ফোন দিতে থাকে। ধীরে ধীরে এই ফোন দেওয়া পরিণত হয় গ্রামের একটি দৈনন্দিন উৎসবে। সবাই সেজেগুজে লাইন ধরে যায় ফোনে কথা বলতে। এই সূত্রেই কাহিনিতে প্রবেশ করে স্বামীকে রেখে চলে যাওয়া বদরন, দুই জা লালমন ও মনোয়ারা আর স্বামী পরিত্যক্তা হাফেজা।এরা যথেষ্টই স্বাধীনচেতা, অনেকেই স্বনির্ভর। হাস্যকৌতুকের বাতাবরণে লেখক গ্রাম, পরিবর্তনের ছোঁয়া, নারীদের ভূমিকার পরিবর্তনসহ অনেক বিষয় নিয়ে এসেছেন। এই গল্পের গোপন সূত্র ধরে রেখেছে শিরোনামটি। দৃঢ় ও পুরুষদের প্রায় সময়ই পাত্তা না দেওয়া নারীদের গল্পের নাম কেন "অশ্রুমঙ্গল" তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আফসার আমেদের বিশেষত্ব ও আমাদের সমাজের চিরাচরিত অবস্থা। বইটা পড়ে আমি প্রবল একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম বছর দুয়েক আগে। এতো সহজ অথচ নির্দয়ভাবে নারীদের অবস্থা তুলে ধরা যেতে পারে কে ভেবেছিলো!
May 11, 2024
একটা সময় ছিল। গ্রামের মায়েরা চাচীরা, যারা ঐ দিন আনে দিন খায় সংসারে, কিংবা যারা একদিন আনে অনেকদিন খায় এমন সংসারের, তারা সবারই একটা দুটো করে তোলা (আলমারিতে তুলে রাখা) শাড়ি থাকতো। অনেকদিন পর যখন বাপের বাড়ি বা কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে যেত তখন ঐ তুলে রাখা শাড়ি পরতো। সেই শাড়িতে একটা অন্যরকম গন্ধ থাকতো। এই এক শাড়ি পরে কতবার যে তারা বাপের বাড়িতে বেড়াতে যেত তার কোনো হিসেব নেই। আবার যারা একেবারেই অভাবী, যাদের তুলে রাখা কোনো শাড়ি থাকতো না তারাও বাপের বাড়িতে যাওয়ার সময় পড়শি কোন জা কিংবা অন্য কারও কাছ থেকে শাড়ি-চুড়ি ধার করে নিয়ে বেরিয়ে আসতো।
কুসুমপুর গ্রামে যখন টেলিফোন আসলো, সেই টেলিফোনে দূর দূরান্তে থাকা স্বজনদের সাথে কথা বলতে মতিন মাস্টারের বাড়িতে যাওয়ার জন্য গ্রামের বধূদের পাট করে তুলে রাখা শাড়ি পরার গল্প পড়ে আমার মনে পড়ে গেল নব্বইয়ের দশকের শেষে আমাদের গ্রামের মা চাচীদের বাপের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সেইসব দিনগুলোর কথা। এখন কত বদলে গেছে সবকিছু!
অশ্রুমঙ্গলে আফসার আমেদ বলেছেন কুসুমপুর গ্রামের চারজন নারীর কথা। বদরন, লালমন, মনোয়ারা আর হাফেজা। দূর-দূরান্তে থাকা পুরুষ সঙ্গীদের নিয়ে নারী মনের নানা যন্ত্রণা অকপটে বলেছেন লেখক। প্রেম, মায়া, প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্খা, নারীর সাথে নারীর ঘনিষ্ঠতা, বিচ্ছেদ ব্যাকুলতা সব উঠে এসেছে আফসার আমাদীয় ঢঙে।
কিন্তু এই বইয়ে আমাকে অবাক করে দিয়েছে বয়স্ক পুরষ চরিত্র হাসমত। সমাজে, সাহিত্যে, নাটক, সিনেমায় কোনো পুরুষ যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে তার স্ত্রীকে প্রথম পক্ষের সন্তানের নতুন মা বলে ডাকে অনেক সময়। কিন্তু এই প্রথম "নতুন বাবা" হিসেবে কাউকে পেলাম। দ্বিতীয় বৌ যখন তার সন্তানকে ফেলে রেখে নতুন প্রেমিকের সাথে চলে যায় তখন তার শিশু সন্তানের মায়ায় পড়ে "লতুন বাপ" হয়ে কি অদ্ভুত এক পিতা-সন্তানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে হাসমত আর লালটুর!
এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের সম্পর্কটা বোধহয় হাফেজা আর নাদেরের। স্বামী পরিত্যক্ত পাগলপ্রায় জরাজীর্ণ হাফেজা হঠাৎ বদলে যায় পুরানো প্রেমিকের দর্শন পেয়ে। প্রেমিকাকে অন্ধকারে কাছে পেয়ে যখন একটু হাত ধরতে চায় নাদের তখন হাফেজা বলে-
" হাত ধরো না, পাপ হবে। আমাকে শুধু দেখ, আমি তোমাকে দেখি।"
আহা! আমার মনে পড়ে গেল অ্যাভাটারের সেই লাভ সিনটার কথা "I see you, I see you"
প্রিয় মানুষটা, ভালোবাসার মানুষটাকে আবারও একান্ত আপন করে পাওয়ার সুযোগ পেয়েও তাতে সাড়া না দিয়ে বাকি জীবন শুধু সামনে থেকে দেখার জন্যই কুসুমপুরে থেকে যাওয়ার সংকল্প করে হাফেজা। কিন্তু আবারও 'ট্যানট্যানানা' টেলিফোন বেজে ওঠে মতিন মাস্টারের বাড়িতে। তারপর?
এর আগে আফসার আমেদের দ্বিতীয় বিবি ও বশীকরণ কিসসা পড়েছি, ঐ দুই কাহিনীকে ছাপিয়ে গেছে অশ্রুমঙ্গল।
কুসুমপুর গ্রামে যখন টেলিফোন আসলো, সেই টেলিফোনে দূর দূরান্তে থাকা স্বজনদের সাথে কথা বলতে মতিন মাস্টারের বাড়িতে যাওয়ার জন্য গ্রামের বধূদের পাট করে তুলে রাখা শাড়ি পরার গল্প পড়ে আমার মনে পড়ে গেল নব্বইয়ের দশকের শেষে আমাদের গ্রামের মা চাচীদের বাপের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সেইসব দিনগুলোর কথা। এখন কত বদলে গেছে সবকিছু!
অশ্রুমঙ্গলে আফসার আমেদ বলেছেন কুসুমপুর গ্রামের চারজন নারীর কথা। বদরন, লালমন, মনোয়ারা আর হাফেজা। দূর-দূরান্তে থাকা পুরুষ সঙ্গীদের নিয়ে নারী মনের নানা যন্ত্রণা অকপটে বলেছেন লেখক। প্রেম, মায়া, প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্খা, নারীর সাথে নারীর ঘনিষ্ঠতা, বিচ্ছেদ ব্যাকুলতা সব উঠে এসেছে আফসার আমাদীয় ঢঙে।
কিন্তু এই বইয়ে আমাকে অবাক করে দিয়েছে বয়স্ক পুরষ চরিত্র হাসমত। সমাজে, সাহিত্যে, নাটক, সিনেমায় কোনো পুরুষ যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে তার স্ত্রীকে প্রথম পক্ষের সন্তানের নতুন মা বলে ডাকে অনেক সময়। কিন্তু এই প্রথম "নতুন বাবা" হিসেবে কাউকে পেলাম। দ্বিতীয় বৌ যখন তার সন্তানকে ফেলে রেখে নতুন প্রেমিকের সাথে চলে যায় তখন তার শিশু সন্তানের মায়ায় পড়ে "লতুন বাপ" হয়ে কি অদ্ভুত এক পিতা-সন্তানের সম্পর্ক গড়ে ওঠে হাসমত আর লালটুর!
এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের সম্পর্কটা বোধহয় হাফেজা আর নাদেরের। স্বামী পরিত্যক্ত পাগলপ্রায় জরাজীর্ণ হাফেজা হঠাৎ বদলে যায় পুরানো প্রেমিকের দর্শন পেয়ে। প্রেমিকাকে অন্ধকারে কাছে পেয়ে যখন একটু হাত ধরতে চায় নাদের তখন হাফেজা বলে-
" হাত ধরো না, পাপ হবে। আমাকে শুধু দেখ, আমি তোমাকে দেখি।"
আহা! আমার মনে পড়ে গেল অ্যাভাটারের সেই লাভ সিনটার কথা "I see you, I see you"
প্রিয় মানুষটা, ভালোবাসার মানুষটাকে আবারও একান্ত আপন করে পাওয়ার সুযোগ পেয়েও তাতে সাড়া না দিয়ে বাকি জীবন শুধু সামনে থেকে দেখার জন্যই কুসুমপুরে থেকে যাওয়ার সংকল্প করে হাফেজা। কিন্তু আবারও 'ট্যানট্যানানা' টেলিফোন বেজে ওঠে মতিন মাস্টারের বাড়িতে। তারপর?
এর আগে আফসার আমেদের দ্বিতীয় বিবি ও বশীকরণ কিসসা পড়েছি, ঐ দুই কাহিনীকে ছাপিয়ে গেছে অশ্রুমঙ্গল।
November 1, 2025
প্রথম কয়েক পাতা পড়েই মুগ্ধ বিষ্ময়ে আবিষ্কার করলাম আর্ট অফ রাইটিং কাকে বলে। এত ছোট ছোট ডিটেইলিং এত স্নেহ নিয়ে লেখা এ উপন্যাসটা, প্রতিটা বাক্য পড়ে মনটা ভরে যায়।
গল্পটা কুসুমপুর গ্রামকে ঘিরে। আরও স্পেসিফিকভাবে বললে কুসুমপুর গ্রামের মতিন মাস্টারের টেলিফোনটাকে ঘিরে। গল্পটা ৮০-৯০ সনের সেই সময়টার- যখন গ্রামে, মহল্লা, মফস্বলে একটিমাত্র অবস্থাসম্পন্ন ঘরে থাকতো ল্যান্ডলাইন টেলিফোন। সেই টেলিফোনে ফোন আসতো ওই এলাকার সব মানুষের। সুখে দুঃখে, আপদে বিপদে এই টেলিফোনকে ঘিরেও আত্মীয়তার নিবিড় বন্ধনে জড়াতো অপরিচিত কিছু পরিবার।
আপনারা পেয়েছেন কিনা জানিনা, আমি পেয়েছি। আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে একটি সরকারি কলোনিতে। সেখানে এমনিতেই সবাই সবাইকে চিনতো। পুরো এলাকা যেন ছিল একটা বড় পরিবার। আমাদের নিচ তালার ঘরে এসেছিল এলাকার প্রথম টেলিফোন। সেই বাসায় ফোন এলেই ওই বাসার ভাইয়া দৌড়ে চলে আসতো ফোন এসেছে জানাতে। বা বারান্দা দিয়ে ডাকাডাকি করতো। আমরাও দৌড়ে চলে যেতাম ফোন ধরতে। প্রচ্ছন্ন একটা আনন্দ যে ছিল এই ব্যাপারটায়, এটা বোধকরি সামনাসামনি না দেখলে বোঝা কঠিন।
তো এই গল্পেও একটি টেলিফোন আছে, সেই টেলিফোনে সারা গ্রামের সবার ফোন আসে। মতিন মাস্টার কিছু টাকা কামাই করেন হয়তো এই ফোনকল করিয়ে, কিন্তু টাকার চাইতে তিনি পুরো গ্রামের সব পরিবারের অংশ হবার লোভে ঘরে ঘরে ছুটে বেড়ান, শিডিউল করে দেন কার কবে কখন ফোন আসবে। গ্রামের মানুষেরা সবাই এসে ভিড় জমায়, বিশেষতঃ রবিবার। তাহলে গল্পটা কি শুধুএইই?
এখন যাদের ফোন আসে, তাদের কারও কারও জীবনটাও তো দেখা চাই, সেইসব নারীদের জীবন কেমন-যাদের কাছের মানুষ দূরে থুইয়া থাকে... একটি ফোনালাপের তৃষ্ণা যাদের, সেসব নারীদের জীবনটা কেমন ধরফরাইয়া যায়, কি করে এত শূন্যতা এ মনে রাখে যে তারা সেই গল্পটাই করেছেন লেখক আমের আহমেদ। বদরন-লালমন-হাফেজা ভিড়ের মাঝে যাদের নাম উচ্চারিত হয় ফোন আসবে বলে, তাদের গল্প এটা। তাদের জীবনযাত্রার ধরণ কিভাবে বদলে গেল সেই গল্প এটা। কি করে কুসুমপুরের বউ-ঝি মায়েরা একটা টেলিফোনের জন্য এত সুন্দর করে সাজগোজ শিখে গেল সেই গল্প এটা। দূরালাপনের অপর প্রান্ত শুনে কিভাবে আঁখিপাতে অশ্রুবিসর্জন ঘটে সেইসব মানুষের গল্প এটা।
অশ্রুমঙ্গল এটা।
আমের আহমেদের বাক্যগুলো ছোটছোট। কখনো সখনো এক দুই পৃষ্ঠা চলে যায় শুধু দুইজনের কথোপকথনে বা সংলাপে। সংক্ষিপ্ত সংলাপ, কাব্যের মতো, কিন্তু গভীর একটা গল্প তাতে বলা হয়ে যায়। একটা গল্পকে, এত সাদামাটা একটা বিষয়কে একজন লেখক যখন এমন দৃষ্টিকোণে লেখেন- যে পড়ে চমকে হয়ে যেতে হয় এই ভেবে যে, এভাবে কিভাবে ভাবলেন তিনি, আরে এ তো আমারই কথা- তখন বইপড়ার উপর প্রেমটা আবার ফিরে আসে, লেখকদের ভালোবাসতে মন চায়। মনে হয় এমন লেখাই তো আমি পড়তে চাই। এমন গল্পই তো আমি শুনতে চাই।
উপন্যাসটি খুব ছোট। তবু বদরন, লালমন, হাফেজা দের নিয়ে আপনার মনে মায়া ধরবে। লালটু নামের আদুরে ন্যাওটা একটা শিশুকে কোলে নিয়ে জাপটে ধরে আদর করতে ইচ্ছা করবে। কাছের মানুষদের ভিড়ে মিশে যেতে ইচ্ছে করবে, কাওকে কাওকে ছুঁয়ে দেখতেও ইচ্ছে করবে, মায়ের গায়ে ঠেস দিয়ে মায়ের ঘ্রাণ পেতে ইচ্ছে করবে-
লালটুর মতোন।
মনে হতে চাইবে, হয়তো বহু দূর বসে কেউ আমায় মনে করছে, প্রতীক্ষা করছে এমনই কোনো বৃষ্টিস্নাত দিনে। দূর থেকে মতিন মাস্টারের টেলিফোনটাও হয়তো কানে বেজে উঠবে,
ট্যান ট্যানা না...
৪.৫/৫
গল্পটা কুসুমপুর গ্রামকে ঘিরে। আরও স্পেসিফিকভাবে বললে কুসুমপুর গ্রামের মতিন মাস্টারের টেলিফোনটাকে ঘিরে। গল্পটা ৮০-৯০ সনের সেই সময়টার- যখন গ্রামে, মহল্লা, মফস্বলে একটিমাত্র অবস্থাসম্পন্ন ঘরে থাকতো ল্যান্ডলাইন টেলিফোন। সেই টেলিফোনে ফোন আসতো ওই এলাকার সব মানুষের। সুখে দুঃখে, আপদে বিপদে এই টেলিফোনকে ঘিরেও আত্মীয়তার নিবিড় বন্ধনে জড়াতো অপরিচিত কিছু পরিবার।
আপনারা পেয়েছেন কিনা জানিনা, আমি পেয়েছি। আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে একটি সরকারি কলোনিতে। সেখানে এমনিতেই সবাই সবাইকে চিনতো। পুরো এলাকা যেন ছিল একটা বড় পরিবার। আমাদের নিচ তালার ঘরে এসেছিল এলাকার প্রথম টেলিফোন। সেই বাসায় ফোন এলেই ওই বাসার ভাইয়া দৌড়ে চলে আসতো ফোন এসেছে জানাতে। বা বারান্দা দিয়ে ডাকাডাকি করতো। আমরাও দৌড়ে চলে যেতাম ফোন ধরতে। প্রচ্ছন্ন একটা আনন্দ যে ছিল এই ব্যাপারটায়, এটা বোধকরি সামনাসামনি না দেখলে বোঝা কঠিন।
তো এই গল্পেও একটি টেলিফোন আছে, সেই টেলিফোনে সারা গ্রামের সবার ফোন আসে। মতিন মাস্টার কিছু টাকা কামাই করেন হয়তো এই ফোনকল করিয়ে, কিন্তু টাকার চাইতে তিনি পুরো গ্রামের সব পরিবারের অংশ হবার লোভে ঘরে ঘরে ছুটে বেড়ান, শিডিউল করে দেন কার কবে কখন ফোন আসবে। গ্রামের মানুষেরা সবাই এসে ভিড় জমায়, বিশেষতঃ রবিবার। তাহলে গল্পটা কি শুধুএইই?
এখন যাদের ফোন আসে, তাদের কারও কারও জীবনটাও তো দেখা চাই, সেইসব নারীদের জীবন কেমন-যাদের কাছের মানুষ দূরে থুইয়া থাকে... একটি ফোনালাপের তৃষ্ণা যাদের, সেসব নারীদের জীবনটা কেমন ধরফরাইয়া যায়, কি করে এত শূন্যতা এ মনে রাখে যে তারা সেই গল্পটাই করেছেন লেখক আমের আহমেদ। বদরন-লালমন-হাফেজা ভিড়ের মাঝে যাদের নাম উচ্চারিত হয় ফোন আসবে বলে, তাদের গল্প এটা। তাদের জীবনযাত্রার ধরণ কিভাবে বদলে গেল সেই গল্প এটা। কি করে কুসুমপুরের বউ-ঝি মায়েরা একটা টেলিফোনের জন্য এত সুন্দর করে সাজগোজ শিখে গেল সেই গল্প এটা। দূরালাপনের অপর প্রান্ত শুনে কিভাবে আঁখিপাতে অশ্রুবিসর্জন ঘটে সেইসব মানুষের গল্প এটা।
অশ্রুমঙ্গল এটা।
আমের আহমেদের বাক্যগুলো ছোটছোট। কখনো সখনো এক দুই পৃষ্ঠা চলে যায় শুধু দুইজনের কথোপকথনে বা সংলাপে। সংক্ষিপ্ত সংলাপ, কাব্যের মতো, কিন্তু গভীর একটা গল্প তাতে বলা হয়ে যায়। একটা গল্পকে, এত সাদামাটা একটা বিষয়কে একজন লেখক যখন এমন দৃষ্টিকোণে লেখেন- যে পড়ে চমকে হয়ে যেতে হয় এই ভেবে যে, এভাবে কিভাবে ভাবলেন তিনি, আরে এ তো আমারই কথা- তখন বইপড়ার উপর প্রেমটা আবার ফিরে আসে, লেখকদের ভালোবাসতে মন চায়। মনে হয় এমন লেখাই তো আমি পড়তে চাই। এমন গল্পই তো আমি শুনতে চাই।
উপন্যাসটি খুব ছোট। তবু বদরন, লালমন, হাফেজা দের নিয়ে আপনার মনে মায়া ধরবে। লালটু নামের আদুরে ন্যাওটা একটা শিশুকে কোলে নিয়ে জাপটে ধরে আদর করতে ইচ্ছা করবে। কাছের মানুষদের ভিড়ে মিশে যেতে ইচ্ছে করবে, কাওকে কাওকে ছুঁয়ে দেখতেও ইচ্ছে করবে, মায়ের গায়ে ঠেস দিয়ে মায়ের ঘ্রাণ পেতে ইচ্ছে করবে-
লালটুর মতোন।
মনে হতে চাইবে, হয়তো বহু দূর বসে কেউ আমায় মনে করছে, প্রতীক্ষা করছে এমনই কোনো বৃষ্টিস্নাত দিনে। দূর থেকে মতিন মাস্টারের টেলিফোনটাও হয়তো কানে বেজে উঠবে,
ট্যান ট্যানা না...
৪.৫/৫
May 21, 2024
আমি কুমিল্লার মানুষ। আমাদের অঞ্চলের পুরুষেরা দেশে-বিদেশে অনেক বেশি মাইগ্রেট করে৷ তাই গ্রামে সাধারণত নারীর আধিক্যই বেশি। সেই নারীরা বছরজুড়ে অপেক্ষায় থাকে। কারণ ঈদ ছাড়া পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিরা বাড়ি ফেরে না। যারা দেশের বাইরে থাকে তারা তো ফিরে পাচ-সাত বছর পর পর। এই মাঝের সময়টা জুড়ে থাকে শুধু অপেক্ষা। এই দৃশ্য দেখেই আমার বেড়ে উঠা।
আমার অঞ্চলের কথা তুললাম কারণ আফসার আমেদ ঠিক এমনই একটা গল্প উপস্থাপন করেছেন। যেখানে পুরুষেরা উপার্জনের জন্য বাইরে আর সহধর্মিণীরা গ্রামে তাদের অপেক্ষায়। গল্পের প্রেক্ষাপট অবশ্য এই শতকের শুরুর দিককার যখন কেবল টেলিফোনে কথা বলার প্রচলন শুরু হয়েছে। টেলিফোন কেনার সাধ্য তো সবার নেই তাই যার বাড়িতে টেলিফোন আছে সেখানেই সবার যাওয়া আসা। টেলিফোনে কথা বলতে যাওয়া তিন নারীর গল্প নিয়েই এই উপন্যাসিকা।
যে বইয়ের নামের মধ্যেই অশ্রু আছে তার গোটা জুড়ে যে বেদনা থাকবে তা অনুমিতই। তবে একেকজনের অশ্রুর কারণ ভিন্ন। প্রত্যেকটা গল্প সেই অশ্রুর পেছনের কারণ বলে। ভালোবাসা, দ্বিধা, যৌনতা এবং অবশ্যই অপেক্ষা মিলেমিশে এক দারুণ সৃষ্টি অশ্রুমঙ্গল। আফসার আমেদের সরল-তরল লিখা উপভোগ্যও বটে।
আমার অঞ্চলের কথা তুললাম কারণ আফসার আমেদ ঠিক এমনই একটা গল্প উপস্থাপন করেছেন। যেখানে পুরুষেরা উপার্জনের জন্য বাইরে আর সহধর্মিণীরা গ্রামে তাদের অপেক্ষায়। গল্পের প্রেক্ষাপট অবশ্য এই শতকের শুরুর দিককার যখন কেবল টেলিফোনে কথা বলার প্রচলন শুরু হয়েছে। টেলিফোন কেনার সাধ্য তো সবার নেই তাই যার বাড়িতে টেলিফোন আছে সেখানেই সবার যাওয়া আসা। টেলিফোনে কথা বলতে যাওয়া তিন নারীর গল্প নিয়েই এই উপন্যাসিকা।
যে বইয়ের নামের মধ্যেই অশ্রু আছে তার গোটা জুড়ে যে বেদনা থাকবে তা অনুমিতই। তবে একেকজনের অশ্রুর কারণ ভিন্ন। প্রত্যেকটা গল্প সেই অশ্রুর পেছনের কারণ বলে। ভালোবাসা, দ্বিধা, যৌনতা এবং অবশ্যই অপেক্ষা মিলেমিশে এক দারুণ সৃষ্টি অশ্রুমঙ্গল। আফসার আমেদের সরল-তরল লিখা উপভোগ্যও বটে।
March 23, 2024
সে’ই কবেকার কথা, কোন এক অসাড় সুরহীন জগতে আগমনী গানের মতো সামান্য একটি যন্ত্র এসে বদলে দিয়েছিল, ঐ জগতের সমস্ত বাস্তবতা। আজ যখন সে’ই যন্ত্রে ওঠে বীণার সুর, যখন সুরে সুরেই নেমে আসে সন্ধ্যা তখনও ভাবি, সে’ইসব আশ্চর্য দিন কী উত্তেজনাকরই না ছিল! আমাদের সকলেরই এমন কতো জগৎ থাকে, বদলে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্খা নিয়ে সে জগৎ ক্রমেই বদলাতে চায় রূপ। আফসার আমেদ কিংবা অশ্রুমঙ্গল উপন্যাসেও এমন এক জগতের কথাই মূলত বলা হয়েছে, সামান্য একটি টেলিফোনের আগমন, যে জগতের বাস্তবতা এলোমেলো করে দিয়েছিল এক লহমায়।
গ্রামটির নাম কুসুমপুর। টেলিফোন এলো মতিন মাস্টারের ঘরে। বাড়িতে নেই ছেলেপুলে। লোকজনের আগমন তাই মাস্টার ও মাস্টারপত্মীর কাছে মনে হয় আনন্দের উপলক্ষ্য হয়েই আসে। টেলিফোনের বরাতে গ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে মাস্টারের বাড়ি। ফোন আসে। মূলত মেয়েদের। কারো স্বামী থাকে অন্য শহরে, কারও থাকে সন্তান। দলে দলে তাই মহিলারাই এসে পিঁপড়ের মতো জড়ো হয় মাস্টারের বাড়ির চারপাশে। গল্প যতো এগিয়ে যায়, ততই আমরাও বুঝতে পারি, মাস্টার নয়, এ গল্পের প্রোটাগনিস্ট মূলত এই মহিলারাই।
এই মহিলাদের মনস্তাত্বিক জগতকে সহজ করে দিতেই যেন আফসার আমেদ বারবার আলো ফেলেছেন সোশিও ইকোনমিক অ্যাসপেক্টের দিকে। সেটা কেমন? বুঝতে হলে তাকাতে হয় লালমন, মনোয়ারার দিকে। অর্থাভাবে কিংবা অর্থের যোগান দিতে দীর্ঘদিন যাঁদের কেটে গেছে অপেক্ষায়, যাঁদের হৃদয়ে ছিল প্রেম কিন্তু কাটেনি যাঁদের কখনওই কোন সংশয় .. তারা মূলত ফোনে কথা বলতে বলতেই ধরা দিয়েছিল একে অন্যের ফাঁদে। এইসব গল্প লেখক লিখেছেন খুব সাবলীলভাবে.. যেন এসব সহসাই ঘটে আমাদের চারপাশে।
আফসার আমেদের প্রোটাগনিস্টরা একইসাথে সেলফিশ ও প্রবল মমতাময়ী। ছেলের ফোন আসবে বলে, জয়নালের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়া বদরনকে তাই ফিরতে হয় বুড়ো স্বামীর ঘরে। তার এই ফিরে আসায় অপমান নয় শুধু, বিসর্জনের দুঃখও যেন ফিরে আসে বারবার। হাফেজার গল্পও ভিন্ন কিছু নয়। ভিন্ন নয় প্রোটাগনিস্টদের দুঃখ ও বিষাদের ইতিহাস।
আফসার আমেদের ভাষা তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মতো সরল তবে উচ্চাভিলাষী। স্টোরিটেলিং আগ্রহজাগানিয়া। ক্লান্তি নয় বরং লেখক নতুন কোন রহস্য আবিষ্কারের বীজ ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন উপন্যাসের পাতায় পাতায়। সামান্য একটি টেলিফোন অসাধারণ হয়ে ফিরে আসার মাঝে কয়েকটি জীবনকে দিয়ে তৈরি করতে পেরেছেন অদ্ভুত এক মালা, যে মালা গলায় অলংকার হিসেবে পরলে, যে কোন নারী, যে কোন পুরুষ নিজেকে দেখতে পাবেন কুসুমপুর গ্রামের একটি চরিত্র হিসেবে.. যার দিবস কাটে এক ফোনকল আসবার অপেক্ষায় কিংবা ৫ মিনিটের কথা বলা শেষে থেকে যাওয়া ঘোরে..
April 3, 2022
'অশ্রুমঙ্গল' শুরু হয় কুসুমপুর গ্রামে টেলিফোন আসা এবং এতে সে গ্রামের মানুষের জীবনযাপনের ধরণ বদলে যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে। যার সঙ্গে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। গ্রামে বা বাড়িতে প্রথম টেলিফোন বা মোবাইলফোন আসার এবং তাতে প্রথম প্রথম কথা বলার উত্তেজনা-শিহরণ জাগানিয়া স্মৃতি কমবেশি সবারই তো আছে। 'অশ্রুমঙ্গল' আখ্যানটি বদরনের, লালমন-মনোয়ারার, এবং হাফেজার। মূলত এ চার নারীর দুঃখ গাঁথা এ উপন্যাসটি। আফসার আমেদ এখানে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন যে বুড়ো হাসমতকে ছেড়ে জয়নালের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েও শুধুমাত্র ছেলের ফোন ধরার জন্য পুনরায় হাসমতের ঘরে ফিরে আসাকে স্বাভাবিক লাগে। স্বাভাবিক মনে হয় স্বামীবিরহে থাকা দুই জা লালমন ও মনোয়ারার মধ্যে 'অন্যরকম' এক সম্পর্ক গড়ে ওঠাকে। উপন্যাসের ইতি টানা হয় হাফেজার গল্প দিয়ে, যেটা মর্মস্পর্শী।
আফসার আমেদ জাদুবাস্তবতা ঘরানার লেখক, এটি দেখেই বছরখানেক আগে একসঙ্গে তাঁর চারটা বই কিনেছিলাম। প্রথমে পড়া 'অলৌকিক দিনরাত'-এর শেষটা মনঃপূত না হলেও লেখনী আর উপন্যাসের দুই-তৃতীয়াংশ ভালো লেগেছিল। এবার 'অশ্রুমঙ্গল' সবদিক থেকেই বেশ ভালো লাগল। নাম না দেখে শুধু লেখা পড়েই যে লেখকদের চেনা যায় আফসার আমেদ তেমন একজন লেখক। এ উপন্যাসের কথোপকথনে লেখক দারুণ স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকের কাছে তা যদিওবা মেকি মনে হতে পারে। কিন্তু আমার বেশ লেগেছে। 'অশ্রুমঙ্গল' উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার উপকরণ কম, তবু লেখক বর্ণনাভঙ্গি আর কথোপকথনের মাধ্যমে জাদুবাস্তবতার আবহ সৃষ্টিতে ঠিকই সক্ষম হয়েছেন।
আফসার আমেদ জাদুবাস্তবতা ঘরানার লেখক, এটি দেখেই বছরখানেক আগে একসঙ্গে তাঁর চারটা বই কিনেছিলাম। প্রথমে পড়া 'অলৌকিক দিনরাত'-এর শেষটা মনঃপূত না হলেও লেখনী আর উপন্যাসের দুই-তৃতীয়াংশ ভালো লেগেছিল। এবার 'অশ্রুমঙ্গল' সবদিক থেকেই বেশ ভালো লাগল। নাম না দেখে শুধু লেখা পড়েই যে লেখকদের চেনা যায় আফসার আমেদ তেমন একজন লেখক। এ উপন্যাসের কথোপকথনে লেখক দারুণ স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকের কাছে তা যদিওবা মেকি মনে হতে পারে। কিন্তু আমার বেশ লেগেছে। 'অশ্রুমঙ্গল' উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার উপকরণ কম, তবু লেখক বর্ণনাভঙ্গি আর কথোপকথনের মাধ্যমে জাদুবাস্তবতার আবহ সৃষ্টিতে ঠিকই সক্ষম হয়েছেন।
March 26, 2025
উপন্যাসের শুরুটা খুবই সুন্দর। কুসুমপুর গ্রামে স্কুলমাস্টারের বাড়িতে একটা টেলিফোন আসে। টেলিফোনের জন্যে সারা গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন খুবই সুন্দর করে এঁকেছেন লেখক। নিয়ম করে মূল্যের বিনিময়ে গ্রামের মেয়েরা সেজেগুজে আসে প্রবাসী স্বামীদের সাথে টেলিফোনে কথা বলতে। একটা টেলিফোনকে অবলম্বন করে দিন বদলের রূপকথার গল্প বলে যান লেখক।
এরপর আমরা দেখি গ্রামের কিছু চিরায়ত অসঙ্গতি। বয়স্ক স্বামীকে ফেলে প্রেমিকের ঘর করতে যাওয়া এক নারী, স্বামীর সংসারে ঠাঁই না পেয়ে পুরোনো প্রেমিকের সংসর্গে যাবার মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্বে থাকা এক নারী, আর দুই জা'য়ের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। সামাজিকতা ছাপিয়ে লেখক আমাদের এমন এক কুসুমপুর গ্রামের গল্প বলেন, যেখানে অনুভূতিরা প্রাধান্য পায়, প্রাধান্য পায় সেকেলে গ্রামীণ ব্যবস্থায় নতুন দিনের আগমনী গান।
অশ্রুমঙ্গল পড়া শুরু করেছিলাম অনেক আগে। মাঝে একটু ইরিটেটিং লাগা শুরু করেছিল দেখে খ্যামা দিয়েছিলাম। আজ মন খারাপের দিনে শেষ করলাম। যে জন্যে পড়া থামিয়েছিলাম, সেটা এখন অবান্তর লাগছে। হারুন ভাই কে ধন্যবাদ ঘাড় ধরে এটা পড়ানোর জন্যে।
এরপর আমরা দেখি গ্রামের কিছু চিরায়ত অসঙ্গতি। বয়স্ক স্বামীকে ফেলে প্রেমিকের ঘর করতে যাওয়া এক নারী, স্বামীর সংসারে ঠাঁই না পেয়ে পুরোনো প্রেমিকের সংসর্গে যাবার মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্বে থাকা এক নারী, আর দুই জা'য়ের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। সামাজিকতা ছাপিয়ে লেখক আমাদের এমন এক কুসুমপুর গ্রামের গল্প বলেন, যেখানে অনুভূতিরা প্রাধান্য পায়, প্রাধান্য পায় সেকেলে গ্রামীণ ব্যবস্থায় নতুন দিনের আগমনী গান।
অশ্রুমঙ্গল পড়া শুরু করেছিলাম অনেক আগে। মাঝে একটু ইরিটেটিং লাগা শুরু করেছিল দেখে খ্যামা দিয়েছিলাম। আজ মন খারাপের দিনে শেষ করলাম। যে জন্যে পড়া থামিয়েছিলাম, সেটা এখন অবান্তর লাগছে। হারুন ভাই কে ধন্যবাদ ঘাড় ধরে এটা পড়ানোর জন্যে।
July 12, 2019
কুসুমপুর গ্রামের মতিন মাস্টারের বাড়ি টেলিফোন লেগেছে। সেই টেলিফোনের কারণে সাড়া পড়ে গেছে গ্রামে। কারও প্রয়োজনে মতিন মাস্টারের বাড়ি ফোন করতে যেতে হয়। তবে ফোন করে খুব কমই, ফোন আসে বেশি। কেননা এ গ্রামের পুরুষেরা কাজ করে দূর দূর শহরে। সেখান থেকে তারা ফোন করে স্ত্রীকে, মা-কে। আগে থেকে তারা ফোন করে মতিন মাস্টারকে জানিয়ে রাখে। মতিন সে হিসেবে সবাইকে খবর দেয়। মতিন হয়ে ওঠে গ্রামের একজন মানী মানুষ, প্রিয় মানুষ।
ফোন আসে মূলত মেয়েদের। কেননা তাদের স্বামীরা ফোন করে। তারা ফোন ধরে কথা বলে। প্রথমে তারা জানতো না কি করে ফোন ধরতে হয়। পরে শিখে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এই এক টেলিফোনের জন্য একেকদিন মতিন মাস্টারের বাড়িতে মেয়ে মহলের জটলা। যেন উৎসব লাগে। তারা একটু সেজেও আসে। সবচেয়ে ভালো শাড়িটা পরে। একটু প্রসাধন করে।
বদরনের বিয়ে হয়েছে এক বুড়োর সাথে। দ্বিতীয় বিয়ে তার। ছেলে নিয়ে উঠেছিল বুড়োর সংসারে। কিন্তু যুবতীর মন টিকবে কেন? তাই সে বুড়োর ঘর ছেড়ে জয়নালের সাথে শহরে বাস করে। কিন্তু বড় ছেলের ফোন আসে বলে তাকে ফিরতে হয় বুড়োর ঘরে। ছেলে ফয়জুল দেশে ফেরে না। ফোন ধরে তাই বদরন কেবল কাঁদে। রাত হলে ঘুম আসে না। কাঁদতে থাকে।
ওদিকে দুই ‘জা’ লালমন আর মনোয়ারার স্বামীরা ঘরে ফেরে না বহুদিন। কেবল ফোন করে মাঝে মাঝে। আসতে বলতে বলে ঈদে আসবে। সে যে বহু দেরি। লালমন আর মনোয়ারা সুখ দুঃখের কথা বলে নিজেদের মাঝে। স্বামীহীন সংসারে তারা নিজেদের বড় আপন হয়ে ওঠে। একজনের ভয়ে আরেকজন সাহস দেয়। কাছকাছি আসতে আসতে কোন এক রাতে তারা একজন অন্যজনকে নিজের পুরুষ বানিয়ে নিয়ে শরীরের ভার ছেড়ে দেয় অন্যজনের হাতে।
হাফেজাকে নেয় না তার স্বামী। ছেলে নিয়ে একা তার বাস। চেয়েচিন্তে খায়। নাদের নামে যুবকের সাথে ছিল প্রণয়। কিন্তু দুই পরিবারের রেষারেষিতে তাদের বিয়ে হলো না। কুসুমপুরে যখন সকলের ফোন আসে, হাফেজারও ইচ্ছে তার ফোন আসুক। তাই স্বামীকে চিঠি লেখে যেন সে ফোন করে।
Innovation changes culture. একেকটা দুর্দান্ত উদ্ভাবন, মানুষের বেঁচে থাকার সংজ্ঞাটাই বদলে দেয়। কুসুমপুর গ্রামে টেলিফোন আসাতেও তাই হয়েছিল। তারা যেন মুহূর্তে যুক্ত হয়েছিল পৃথিবীর সাথে। গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিল তাদের। তাদের সেই বদলে যাওয়ার গল্প বলেছেন আফসার আমেদ। সে বদলে যাওয়ার সাথে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ দুঃখের কথা বলেছেন তিনি।
বদরন, লালমন, মনোয়ারা, হাফেজার জীবনের গল্পগুলো কেমন যেন বিষাদময়। বদরন তার সংসারে খুশি নয়। লালমন মনোয়ারার সংসার আছে, কিন্তু স্বামী দূরে। তারা ভরসা করতে চায় যাকে, তারা কাছে নেই। কেবল ঐ টেলিফোন মাঝে মাঝে গলার স্বর মনে করিয়ে দেয়। তাই ফোন ধরে কথা বলতে বলতে তারা কাঁদে। হাফেজা যখন নতুন করে নিজেকে সম্মানে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়, তখন তার স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। হাফেজা দুঃখে কাঁদে, আনন্দে কাঁদে।
আফসার আমেদের ‘অশ্রুমঙ্গল’ এক অদ্ভুত বই। এখানে একটা সময়ের কথা বলা হয়েছে। সে সময়ের অনুষঙ্গ হয়েছিল টেলিফোন, প্রযুক্তি। অ্যাজ আমরা যারা সেলুলার ফোনে অভ্যস্ত, আমরা বুঝবো না ঐ পাঁচ মিনিট বদরন, লালমনদের জন্য কতোটা আকাঙ্ক্ষিত ছিল। কখনও নারীর মতো রেখে ঢেকে, কখনও নিজের মতো করে আফসার আমেদ টেলিফোনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি নারীর দুঃখ গাঁথা, তাদের অশ্রু গড়ানোর গল্প বলেছেন। অদ্ভুত বর্ণনাভঙ্গি আর কথোপকথনে তৈরি করেছেন জাদুবাস্তবতা। তাই ‘অশ্রুমঙ্গল’ কেবল উপন্যাস নয়, এক আবেশের নাম।
ফোন আসে মূলত মেয়েদের। কেননা তাদের স্বামীরা ফোন করে। তারা ফোন ধরে কথা বলে। প্রথমে তারা জানতো না কি করে ফোন ধরতে হয়। পরে শিখে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এই এক টেলিফোনের জন্য একেকদিন মতিন মাস্টারের বাড়িতে মেয়ে মহলের জটলা। যেন উৎসব লাগে। তারা একটু সেজেও আসে। সবচেয়ে ভালো শাড়িটা পরে। একটু প্রসাধন করে।
বদরনের বিয়ে হয়েছে এক বুড়োর সাথে। দ্বিতীয় বিয়ে তার। ছেলে নিয়ে উঠেছিল বুড়োর সংসারে। কিন্তু যুবতীর মন টিকবে কেন? তাই সে বুড়োর ঘর ছেড়ে জয়নালের সাথে শহরে বাস করে। কিন্তু বড় ছেলের ফোন আসে বলে তাকে ফিরতে হয় বুড়োর ঘরে। ছেলে ফয়জুল দেশে ফেরে না। ফোন ধরে তাই বদরন কেবল কাঁদে। রাত হলে ঘুম আসে না। কাঁদতে থাকে।
ওদিকে দুই ‘জা’ লালমন আর মনোয়ারার স্বামীরা ঘরে ফেরে না বহুদিন। কেবল ফোন করে মাঝে মাঝে। আসতে বলতে বলে ঈদে আসবে। সে যে বহু দেরি। লালমন আর মনোয়ারা সুখ দুঃখের কথা বলে নিজেদের মাঝে। স্বামীহীন সংসারে তারা নিজেদের বড় আপন হয়ে ওঠে। একজনের ভয়ে আরেকজন সাহস দেয়। কাছকাছি আসতে আসতে কোন এক রাতে তারা একজন অন্যজনকে নিজের পুরুষ বানিয়ে নিয়ে শরীরের ভার ছেড়ে দেয় অন্যজনের হাতে।
হাফেজাকে নেয় না তার স্বামী। ছেলে নিয়ে একা তার বাস। চেয়েচিন্তে খায়। নাদের নামে যুবকের সাথে ছিল প্রণয়। কিন্তু দুই পরিবারের রেষারেষিতে তাদের বিয়ে হলো না। কুসুমপুরে যখন সকলের ফোন আসে, হাফেজারও ইচ্ছে তার ফোন আসুক। তাই স্বামীকে চিঠি লেখে যেন সে ফোন করে।
Innovation changes culture. একেকটা দুর্দান্ত উদ্ভাবন, মানুষের বেঁচে থাকার সংজ্ঞাটাই বদলে দেয়। কুসুমপুর গ্রামে টেলিফোন আসাতেও তাই হয়েছিল। তারা যেন মুহূর্তে যুক্ত হয়েছিল পৃথিবীর সাথে। গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছিল তাদের। তাদের সেই বদলে যাওয়ার গল্প বলেছেন আফসার আমেদ। সে বদলে যাওয়ার সাথে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ দুঃখের কথা বলেছেন তিনি।
বদরন, লালমন, মনোয়ারা, হাফেজার জীবনের গল্পগুলো কেমন যেন বিষাদময়। বদরন তার সংসারে খুশি নয়। লালমন মনোয়ারার সংসার আছে, কিন্তু স্বামী দূরে। তারা ভরসা করতে চায় যাকে, তারা কাছে নেই। কেবল ঐ টেলিফোন মাঝে মাঝে গলার স্বর মনে করিয়ে দেয়। তাই ফোন ধরে কথা বলতে বলতে তারা কাঁদে। হাফেজা যখন নতুন করে নিজেকে সম্মানে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়, তখন তার স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। হাফেজা দুঃখে কাঁদে, আনন্দে কাঁদে।
আফসার আমেদের ‘অশ্রুমঙ্গল’ এক অদ্ভুত বই। এখানে একটা সময়ের কথা বলা হয়েছে। সে সময়ের অনুষঙ্গ হয়েছিল টেলিফোন, প্রযুক্তি। অ্যাজ আমরা যারা সেলুলার ফোনে অভ্যস্ত, আমরা বুঝবো না ঐ পাঁচ মিনিট বদরন, লালমনদের জন্য কতোটা আকাঙ্ক্ষিত ছিল। কখনও নারীর মতো রেখে ঢেকে, কখনও নিজের মতো করে আফসার আমেদ টেলিফোনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি নারীর দুঃখ গাঁথা, তাদের অশ্রু গড়ানোর গল্প বলেছেন। অদ্ভুত বর্ণনাভঙ্গি আর কথোপকথনে তৈরি করেছেন জাদুবাস্তবতা। তাই ‘অশ্রুমঙ্গল’ কেবল উপন্যাস নয়, এক আবেশের নাম।
January 3, 2026
কুসুমপুর গ্রামে টেলিফোন আসার মধ্য দিয়ে যেন এক পরিবর্তনের ছোঁয়া এসে গেল৷ গ্রামের বউ-ঝি সেজেগুজে, অধির আগ্রহ নিয়ে ফোনে কথা বলতে যায়। এর মধ্যে গ্রামের মানুষদের জীবনে ঘটে যেতে থাকা নানা ঘটনা, যেখানে মূলত নারীদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, আমাদের সামনে হাজির করে সমাজে নারীদের এমন এক অবস্থাকে—চাইলেও যাকে অস্বীকার করা সম্ভব হয় না।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews











