শতকের পর শতক ধরে চলে আসা মঠ বা মন্দিরগুলির অনেকগুলিই , ভক্তদের দানে প্রভূত ভূ-সম্পত্তির এবং অর্থের মালিক। এবং, সেই অর্থই বিগত কয়েকটি দশক ধরে অনর্থের কারণ হয়েছে আখাড়ার অভ্যন্তরে। সাধারণভাবে,এই আধুনিক সময়ে আখাড়াকে ঘিরে যে দ্বন্দ্ব , আখাড়ার “গদি- রক্ষার্থে “ মোহান্ত এবং হতে- চাওয়া মোহান্তদের মধ্যে যে ষড়যন্ত্র- খুন- রক্তপাত- রাজনীতি, রাজনৈতিক দলগুলোর এই “মধুভান্ড” ঘিরে অশালীন বাহুবলী আস্ফালন, মঠগুলির মোহান্তদের দ্বারা খুল্লাম-খুল্লা অপরাধীকরণ, ক্ষেত্রবিশেষে আইনের পাঞ্জা থেকে বাঁচাতে সাধুর ভেকধারী অপরাধীদের মঠের ভিতরে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া – আমাদের আদি শংকারাচার্যের ত্যাগ- তিতিক্ষা- সাধনার আদর্শকে ভুলিয়ে দিয়েছে, কলুষিত করেছে আখাড়ার গুরু- শিষ্যের উজ্জ্বল পরম্পরাকে । তাই, এই গ্রন্থের প্রথম অংশে যেমন উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আখাড়া সাধুদের ধর্মপ্রচারক, ব্যবসায়ী বা মহাজনী এবং অস্ত্রধারী সেনানী হিসেবে গৌরবজনক অতীত ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বইয়ের দ্বিতীয় অর্ধে রয়েছে সাধু- মহন্তদের রাজনীতি- ধর্ম- রিপুর ত্রিশূলে বিদ্ধ কলুষিত সাধুজীবন এবং দুই যুযুধান পক্ষের মধ্যে ষড়যন্ত্র- রাজনীতি- মোহান্তের গদি দখল ঘিরে রুদ্ধশ্বাস কিছু লড়াইয়ের বর্ণনা, তাদের ভন্ডামির মুখোশ খুলে দেওয়া কিছু কেস স্টাডি । যেহেতু, সাধু অনুষঙ্গে অযোধ্যা ও হনুমানগড়ি অবধারিতভাবে আসবে, ১৯৪৯ সালে বাবরি মসজিদে রামলালা মূর্তি রাখার ষড়যন্ত্রও বইটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করেছে।
এভাবেই, প্রায় ১২০০ বছরের স্রোতস্বিনী ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলি এই গ্রন্থে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক।
সাধনার আলোর যে জ্যোতি কোনো এক কালে ছায়ায় মুখ লুকিয়েছিল, সোমনাথ সেনগুপ্তের ‘দশনামী’ সেই আলো ও ছায়ার সংমিশ্রণে রচিত এক গবেষণামূলক মহাকাব্য।
আধ্যাত্মিকতা, রাজনৈতিকতা, অধঃপতন, শাস্ত্র এবং সাধুর মুখোশ—সবকিছুর এক জটিল বয়ন এই বই। এটি কেবল ইতিহাস নয়, বরং এক নৈঃশব্দ্যের অধ্যায় যেখানে সাধনা ও সংসারের দ্বন্দ্বে বারবার আলো আর অন্ধকারের অদ্ভুত খেলা চলে। কিন্তু এই গ্রন্থের প্রাণভোমরা মূলত এক ঐতিহাসিক সম্প্রদায়: দশনামী সন্ন্যাসী সম্প্রদায়—যাদের আদি পথিকৃৎ সেই যুগপুরুষ, যিনি বলেন, "অহং ব্রম্মাস্মি"—আমি ব্রহ্ম, আমি চেতনা; তিনি আদি শঙ্করাচার্য।
"ব্রহ্ম সত্যম্ জগত্ মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ"—এই উপনিষদীয় দর্শনের ভিত্তিতেই দশনামী সন্ন্যাসীরা জীবন উৎসর্গ করতেন। এই চেতনার ভিত্তিতেই গঠিত হয় আদি শঙ্করাচার্যের চার মঠ, যার দ্বারা ভারতবর্ষের আত্মিক মানচিত্রে চারটি দিকচিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়—পুরী, দ্বারকা, বদ্রীনাথ ও শ্রিঙ্গগিরি। সেই প্রতিটি মঠ একটি আধ্যাত্মিক প্রবাহপথ, যেখানে সন্ন্যাসীরা দীক্ষা নিয়ে গ্রহণ করেন দশটি নাম—যা কেবল আখ্যা নয়, দর্শনের রূপ, সাধনার ধ্বনি।
দীক্ষাপ্রাপ্ত দশনামী সন্ন্যাসীরা তাঁদের নামের মধ্যে ধারণ করেন নিজ নিজ সাধনপথের আদর্শ:
গিরি (তপস্যার পাহাড়),
পুরী (নগরজীবনের দিশারি),
ভারতী (বাক ও জ্ঞানের সাধক),
তীর্থ (পবিত্রতা ও ঋতুকালের বাহক),
বন (নিয়ম ও নির্জনতায় জীবন),
অরণ্য (একাকীত্বে বিলীন সাধনা),
সরস্বতী (শব্দ ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী),
আশ্রম (শিক্ষা ও সংরক্ষণের পরম্পরা),
পর্বত (অপরিবর্তনীয় স্থিতপ্রজ্ঞা), ও
সাগর (সমুদ্রে মিশে যাওয়া আত্মার প্রতীক)।
প্রত্যেকটি নাম এক একটি শ্লোকের মতো, যার উচ্চারণেই জাগে দর্শনের ধ্বনি।
"নমঃ শিবায় চ নমঃ শঙ্করায় চ"—এই নমস্কার তাদের প্রতি, যারা ত্যাগ করেছেন ভোগের বৃত্ত।
সোমনাথ সেনগুপ্ত এই আধ্যাত্মিক সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে তার উত্তাল ও নিঃশব্দ উভয় তরঙ্গের পরিচয় দেন। ‘দশনামী’ গ্রন্থের এক অনন্য দিক হল বাংলা অঞ্চলে এই সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের বিস্তারকে অনুসন্ধান করা। সপ্তদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত তারা ছড়িয়ে পড়ে গুপ্তিপাড়া, বৈদ্যবাটি, তারকেশ্বর, মেদিনীপুর ও হুগলি অঞ্চলে। মার্কিন ধর্মতত্ত্ববিদ ব্রায়ান হ্যাচার-এর গবেষণায় উঠে আসে বাংলার এই আখড়াগুলির প্রত্নতাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট।
১৭৭৮ সালে মোহন্ত পূরণ গিরিকে ওয়ারেন হেস্টিংস ভোটবাগানের জমি দান করেছিলেন—এই ঐতিহাসিক তথ্য যেমন উপনিবেশিকতার অনন্য কাহিনি বলে, তেমনি প্রশ্ন তোলে, কেমন ছিল সেই সাধুর প্রভাব, যার জন্য এক ব্রিটিশ গভর্নর জমি দেন? তারকেশ্বর হয়ে ওঠে বাংলার দশনামী আন্দোলনের কেন্দ্র, যা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিরোধের এক তীক্ষ্ণ অস্ত্রও বটে।
কিন্তু ইতিহাসে আলো যতই উজ্জ্বল, ছায়াও ততই গাঢ় হয়। বইয়ের দ্বিতীয়ার্ধ যেন এক বিষাদসঙ্গীত—যেখানে পাঠক প্রত্যক্ষ করেন কীভাবে আধ্যাত্মিক গরিমা ক্রমে রূপ নেয় গদির লড়াইয়ে। মোহন্তরা হয়ে ওঠেন আখড়াভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্তা। ত্যাগী সন্ন্যাসীর মুখোশে ঢুকে পড়ে অস্ত্রধারী গুণ্ডা, জমিদার, অপরাধী। ধর্ম তখন নিজেই হয় রক্তমাখা অস্ত্র।
"ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ"—ধর্ম রক্ষা করে তাকে রক্ষা করলে। কিন্তু যে ধর্মের অন্তরে অনুপ্রবেশ করে স্বার্থ, লোভ আর দম্ভ—তাকে আর রক্ষা করে কে?
বিশেষভাবে আলোচিত হয় অযোধ্যা ও হনুমানগড়ির সংঘর্ষ এবং ১৯৪৯ সালে বাবরি মসজিদে রামলালার মূর্তি স্থাপনের পেছনে মোহান্তদের ভূমিকা। এই অংশগুলো কেবল ঐতিহাসিক নয়, বর্তমানে ধর্ম ও রাজনীতির জটিল সম্পর্ক বোঝার জন্য এক জ্বলন্ত আখ্যান।
"নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত স্বরূপং"—এই বেদান্তীয় সংজ্ঞা আত্মার। কিন্তু 'দশনামী' বইতে দেখা যায় সেই নিত্য-শুদ্ধ আত্মার আদর্শ স্থান নেয় মোহান্তদের আর্থ-রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ। সেই গুরুশিষ্য সম্পর্ক, যেখানে গুরুই ছিলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর একসঙ্গে— "गुरुर्ब्रह्मा गुरुर्विष्णुः गुरुर्देवो মহेश्वरः ।" — সেই সম্পর্ক সেখানে পরিণত হয় শুধু প্রশাসনিক সম্পর্ক, গুরু হয়ে ওঠেন ক্ষমতার প্রতীক।
সোমনাথ সেনগুপ্ত বিচারকের আসনে বসেন না। তিনি ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে দলিল, ভাষ্য ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। পাঠকের হাতে ছেড়ে দেন নৈতিক সিদ্ধান্তের ভার।
তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু তা প্রতিটি অনুচ্ছেদের মধ্যে বহন করে এক গভীর চিন্তার স্রোত। কিছু বানান-ভুল ও একটি তথ্যগত ত্রুটি থাকলেও, বইটির ভাষার ঋজুতা ও সাহিত্যিক গুণ পাঠককে আলোড়িত করে। ইতিহাস এখানে যেন একটি জীবন্ত চরিত্র—ঘটনাগুলির মধ্য দিয়ে চলতে থাকা নীরব সাক্ষ্যদাতা।
"সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম"—সত্য, জ্ঞান ও অনন্তই ব্রহ্ম। এই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা থেকে শুরু হয় ‘দশনামী’। কিন্তু শেষ হয় প্রশ্নচিহ্নে—আজকের ধর্ম কি সত্যিই সেই অনন্ত জ্ঞানের অন্বেষা?
এই বই কেবল শঙ্করাচার্যের আদর্শেই আবদ্ধ নয়; লেখক এখানে রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈত, ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব, আখড়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্রের বিবর্তন—সবকিছুর বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন গুরুশিষ্য পরম্পরা কিভাবে ক্ষয়ে গিয়ে হয়ে ওঠে ক্ষমতার কাঠামো।
আজকের ভারতে ধর্ম, রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণে এক দ্বিধাগ্রস্ত সময় চলছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ‘দশনামী’ কেবল অতীতচর্চা নয়—এ এক সতর্ক বার্তা। লেখক দেখান, কীভাবে ত্যাগের আদর্শ যখন ক্ষমতা ও পণ্যের মোহে ঢেকে যায়, তখন ধর্ম আর আত্মার নয়, বরং স্বার্থের ক্রীড়াক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
"যঃ পশ্যতি স পশ্যতি" — যিনি সত্যকে দেখতে পান, তিনিই প্রকৃত দর্শক। (গীতা ১৩.২৯)
এই বই পড়ে মনে হয়—এটি শুধু দশনামীদের গল্প নয়, বরং আমাদের সমাজের আধ্যাত্মিকতার পতনের পূর্বাভাস। সোমনাথ সেনগুপ্তের ‘দশনামী’ এক অনন্য কাজ করেছে।
এটি কেবল ইতিহাসের বয়ান নয়, বরং দার্শনিক আত্মসন্ধানের রূপকথা, এবং সেই রূপকথার পতনের বিশ্লেষণ। শঙ্করাচার্যের তত্ত্ব, আখড়ার গঠন, নামের তাৎপর্য, বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও রাজনীতির ছায়া—সবকিছু মিলিয়ে এই বই পাঠকের সামনে খুলে দেয় এক বিপুল বৌদ্ধিক ও নৈতিক অভিজ্ঞতা।
এটি শুধু পাঠ্য নয়—চর্চ্য। এটি শুধু অতীত নয়—বর্তমানের আয়না। এটি শুধু দশনামীদের রূপকথা নয়—আমাদের আত্মার মুখোমুখি হওয়ার সাহস।
শ্রী সোমনাথ সেনগুপ্ত মহাশয়ের লেখা এই বইটি আমাদের পরিচয় করায় দশনামী সম্প্রদায়ের হৃদয়স্থলীর সঙ্গে। তাঁদের আন্তরিক শাসন ব্যবস্থা, তাঁদের সমাজ এবং নিয়মের সঙ্গে। যদি বলি এই বই থেকে দশনামীর উত্থান এবং পতনের সাথেও আমাদের পরিচয় হয়, তাহলেও কিছু ভুল হবে না।
সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর দল যখন অর্থ এবং ক্ষমতার স্বাদ পায়, যখন অপরাধ���রা হয়ে ওঠে ভেকধারী সন্ন্যাসী, তখনই বোধহয় শুরু হয় সর্বনাশের। এই বইতে লেখক কোনও বিচার করেননি। ভাল- মন্দ সব লিখে বিচারের ভার পাঠকের ওপর ছেড়েছেন। ইতিহাস থেকে রাজনীতি, অতীত থেকে বর্তমান, আধ্যাত্ম থেকে মাৎসর্য্য, দশনামীর বিবর্তন বড় সুন্দর করে লিখেছেন লেখক।
তথ্য সমৃদ্ধ কিন্ত কোনও অংশে তথ্য বোঝিল না করে কী করে একটি মনোগ্রাহী লেখা লিখতে পারা যায়, তার চরমতম উদাহরণ হতে পারে দশনামী।
কিন্ত কোনও কিছুই বোধহয় সর্বাঙ্গ সুন্দর হয় না। বেশ কয়েকটি ভুল বানান চোখে পড়ল এবং চোখে লাগল। একটি বিরাট বড় ভুল তথ্যও চোখে পড়ল। এত গবেষণা করে লেখা হয়েছে যে বই, তাতে এমন ভুল অনেকটা দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চোনার মতন। আশা করব ভবিষ্যতে লেখক সেই ভুলটা শুধরে নেবেন।