বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার চা টা আর বৃহস্পতিবার রাতটা সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে আয়েসের। কারণ, একটাই। সপ্তাহে সবেধন নীলমণি ছুটিখানা যখন শুক্রবার, এর আগের দিন আমাদের মতো জরুরি সেবামূলক পেশাজীবীদের কাছে তাই চাঁদরাত।
তেমন একটা চাঁদরাতে একটা পাঠ-প্রতিক্রিয়া না ভাগ করে কি থাকা যায়?
পড়ে ফেললাম প্রবাদপ্রতিম ভারতীয় চিত্রপরিচালক মৃণাল সেনের আত্মকথা তৃতীয় ভুবন। এর আগে তাঁর চ্যাপলিন বইটি পড়েছিলাম। লেখনশৈলীর সাথে পরিচয় তখনই। জানতাম, আত্মকথাটি সুপাঠ্য হবে, আন্দাজ ভুল নয়৷
চলচ্চিত্র আর সাহিত্য সবসময়ই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাহিত্যের সেরা কিছু সৃষ্টি যেমন চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে তেমনি চলচ্চিত্র নিয়েও লেখা হয়েছে অসাধারণ সব বই৷ চলচ্চিত্রকার-সুসাহিত্যিক একজন তো সবসময় উদাহরণ দেয়ার জন্য হাতের কাছেই রয়েছেন, সত্যজিৎ।
মৃণাল সেনের আত্মকাহিনীটি পড়তে গিয়েই আসলে এসব ভাবনা মাথায় আসল কারণ তিনিও অবসরে প্রচুর বই পড়তেন, প্রচুর গল্পকে সিনেমায় রূপান্তরিত করেছেন আর লিখে গেছেন দারুণ কিছু প্রবন্ধ, আলোচনা ইত্যাদি।
তাঁর পারিবারিক জীবনটা ছিল খুব মধুর। স্ত্রী গীতা সেনের সাথে আমৃত্যু অসম্ভব সুন্দর সম্পর্ক বজায় ছিল। ছেলে কুণাল এবং পুত্রবধূ নিশার সাথেও ছিল খুব দারুণ সম্পর্ক। সব মিলিয়ে সুন্দর একটা পারিবারিক জীবন কাটিয়ে গেছেন তিনি।
প্রথম চলচ্চিত্র রাতভোর, যেখানে অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। যদিও মৃণালের মতে ছবিটি কিছু হয়নি। পরবর্তীতে অনেক চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, দূরদর্শন চিত্র, নাটক পরিচালনা করেছেন, অসংখ্য মহৎ চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে গেছেন বিশ্বচলচ্চিত্রপ্রেমীদের৷
কান, ভেনিস, বার্লিনসহ বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতার সাথে রয়েছে গোদার, তারকভস্কি, অ্যান্ডারসন প্রমুখ মহান চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার গল্প।
আবার সত্যজিৎ, ঋত্বিক এর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল তাও বলেছেন অকপটে। তাঁর কাছে ঋত্বিকের অযান্ত্রিক ছিল সবচেয়ে প্রিয়, সত্যজিৎ এর সব কাজের চাইতেও! এই কথা পড়ে কঠোর সত্যজিৎপ্রেমী হিসেবে একটু মনঃক্ষুণ্ন যে হইনি, তা না৷ পরবর্তীতে আবারো সত্যজিৎ প্রসঙ্গ যখন এসেছে, লেখক এর মূল্যায়নে ধারণাটা বদলে গিয়েছে৷
আসলে সাহিত্য, চলচ্চিত্র এই দুই জগতে যাঁরা শীর্ষে তাঁদের মহৎ গুণের অভাব থাকে না। আর দুই শিল্পমাধ্যমেই সমান পদচারণা দরকার একজন সঠিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য। বারবার অনুধাবন করি তা, নানান সুসাহিত্য পাঠের মাধ্যমে, অনবদ্য কিছু চলচ্চিত্র দেখার মাধ্যমে৷ মৃণালের আকালের সন্ধানে আর ইন্টারভিউ ও পড়ে সেই তালিকায়!