বাংলা চলচ্চিত্রের ক্রমবর্ধমানতার পথে তার সম্বন্ধে লিখিত আলােচনা বা চর্চা ও ইতিহাস সংরক্ষণের কাজে যাঁরা নিয়ােজিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে শ্রীকালীশ মুখােপাধ্যায় ও তাঁর রূপ-মঞ্চ পত্রিকার এক অগ্রণী ভূমিকা ছিল।.. দীর্ঘদিন এই চলচ্চিত্রশিল্পের ক্রমানুসারী বিবর্তনের সঙ্গে 'রূপ-মঞ্চ এবং তার সম্পাদক অন্তরঙ্গভাবে জড়িয়ে ছিলেন বলেই সম্ভবত তার অনিবার্য স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে কালীশ মুখােপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রের এক ইতিহাস রচনায় প্রবৃত্ত হন। ১৮৯৭-কে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্মলগ্ন হিসাবে ধরে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার বছরকে একটি যুগলক্ষণে চিহ্নিত করে শ্রীমুখােপাধ্যায় এক গুরুভার গ্রন্থ রচনা করেন।... ভবিষ্যত গবেষক যখন বাংলা সিনেমার উৎস এবং উৎসারিত প্রবাহের ইতিহাস সন্ধানে নিয়ােজিত হবেন তখন বাংলা সিনেমার আরম্ভের আগে যে আরম্ভসেই সলতে পাকানাের সময়কে এই অনতিবিন্যস্ত আকরগ্রন্থের থেকে উদ্ধার করে নিতে পারবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে। এই বিশ্বাস থেকেই আমি এই গ্রন্থের পুনঃপ্রচারের আয়ােজনকে স্বাগত জানাচ্ছি।
সর্বভারতে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন স্টিফেনসন নামক এক ইংরেজ ভদ্রলোক। সময়কালটা তখন ১৮৯৭। প্রদর্শন করতেন কলকাতায়। স্টিফেনসনের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কয়েকমাস পর হীরালাল সেন নিজের মতো করে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু করেন। তিনি শুরু করেন ঠিক ১৮৯৮ সালে। স্টার থিয়েটারে স্টিফেনসনের চলচ্চিত্র দেখে চিত্রপ্রেমিক হীরালাল সেন চমৎকৃত হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহেবের কাছে যান চলচ্চিত্রের কলকব্জা বুঝে নিতে। স্বাভাবিকভাবেই সাহেব তাঁকে নাকচ করে দেন। ঠিক একই সময়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের পাদ্রি ফাদার লাঁফো তাঁর শিক্ষার্থীদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়ার জন্য কলকব্জা সংগ্রহ করেন। হীরালাল সেনকে তিনিই সহায়তা করেন। বাঙলা চলচ্চিত্রশিল্পের জনক হীরালাল সেন। তাঁকে ভারতবর্ষের প্রথম চলচ্চিত্রনির্মাতা বলা যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের জনক দাদা সাহেব ফালকে বম্বেতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিনেমা নির্মাণ করেন ১৯১২ সালে। আর হীরালাল সেন বঙ্গদেশে নির্মাণ করেন ১৯০৩ সালে। তিনি বিভিন্ন মঞ্চ সাফল্য নাটকের নির্বাচিত দৃশ্যের চিত্রাবলী গ্রহন করেছিলেন। সেগুলির মধ্যে রয়েছে—বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম, আলিবাবা, ভ্রমর, সরলা, বুদ্ধদেব প্রভৃতি। এগুলো ছাড়াও বহু খণ্ড খণ্ড চিত্রগ্রহণ করে তিনি বিদেশী চিত্রের পাশাপাশি বাঙলা চলচ্চিত্র হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শন করতেন।
এ হল বাঙলা চলচ্চিত্রশিল্পের প্রথম যুগের গল্প। গত বছর মুক্তি পাওয়া হীরালালের বায়োপিক যাঁরা দেখেছেন তাঁরা মোটামুটি এই ঘটনাগুলো জানেন। বাঙলা চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস গ্রন্থটি আস্ত একটি এনসাইক্লোপিডিয়া। ১৮৯৭ সালে সেই যে স্টিফেনসন সাহেব চিত্র প্রদর্শন শুরু করলেন, সেই ঘটনা থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মানে পঞ্চাশ বছরে যত বাঙলা চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে প্রায় সবগুলোর একটা ডাটাবেজ তৈরি করেছেন শ্রী কালীশ মুখোপাধ্যায়। আমাদের প্রিয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে লেখা ভূমিকা দিয়ে গ্রন্থটি শুরু হয়েছে। তাঁর ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পারি, শ্রী কালীশ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পত্রিকা ‘রূপমঞ্চ’ ছিল তাঁদের ছাত্রাবস্থায় থাকা সময়ে বাঙলা, আন্তর্জাতিক ও সর্বভারতীয় চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানবার এক অগ্রণী অনুষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন রূপমঞ্চ পত্রিকার সম্পাদক থাকার দরুন মুখার্জি মহাশয় ছিলেন বাঙলা চলচ্চিত্রশিল্পের বিবর্তনের এক ঘনিষ্ঠ সাক্ষী। ফলে তিনি এই শিল্পের ইতিহাস রচনায় প্রবৃত্ত হন।
তিনি শুরু করেছেন একদম ইউরোপে ফটোগ্রাফি আবিষ্কারের সময়কাল থেকে। ফটোগ্রাফি থেকে চলচ্চিত্র, সেই ১৮৭২ সালে জেমস এডওয়ার্ড মে সর্বপ্রথম ধাবমান অশ্বের চিত্রগ্রহণ করে চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাকে সুগম করে তোলেন, এরপর ১৮৮৪ সালে ফ্রিজগ্রিনের চলচ্চিত্র ক্যামেরা আবিষ্কার, পরের বছর মে, ব্রিজ, আন্সসুজ প্রভৃতি গবেষকের পাখি, পশু ও মানুষের চলাচলের সার্থকভাবে চিত্রগ্রহণ, ১৮৮৭ সালে এডিসনের ফনোগ্রাফ আবিষ্কার (আমি কিছুদিন এডিসনের কোম্পানির সেই সময়ে নির্মাণ করা চলচ্চিত্রগুলো দেখছিলাম, কি এক আশ্চর্য মানুষ ছিলেন এই এডিসন!), এডিসনের পর লুমিয়ের ব্রাদার্স ১৮৯৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর প্যারিসে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন আর এরপর থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে যাত্রা শুরু হয় চলচ্চিত্রশিল্পের।
দীর্ঘদিন কালীশ মুখার্জির গ্রন্থটি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। ২০১২ সালে গ্রন্থটির পত্র ভারতী সংস্করণ বের হয়। চলচ্চিত্রভাবুকদের এই গ্রন্থ অন্তত একবার উল্টে পাল্টে দেখা উচিৎ।