রায়হান রাইনের জন্ম ৮ মার্চ ১৯৭১, সিরাজগঞ্জে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর। এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক। গল্প লেখার শুরু ছাত্রাবস্থায়, নিসর্গ ছোটকাগজে, ১৯৯৬ সালে। তাঁর ‘আগুন ও ছায়া’ উপন্যাসটি ১৪২০ বঙ্গাব্দে ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়।
পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা কল্পনা করতে পারে, যারা গল্প বানাতে পারে। গল্প আমাদের একাত্ম করে একে অন্যের সাথে। মানুষমাত্রই কিছু গল্পের সমষ্টি। বিশ্বসভ্যতা গড়ে তোলার পেছনে গল্পের বড় একটি অবদান আছে। উপমহাদেশীয় গল্পের ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। জাতক, কথাসরিৎসাগর, হিতোপদেশ, বেতাল পঞ্চবিংশতিতে ছড়িয়ে আছে এমন সব প্রজ্ঞার গল্প যা সাধারণ চোখ দেখতে পায় না। সন্ন্যাসী, বৌদ্ধসাধক থেকে শুরু করে সুফিসাধকরাও নিগূঢ় জ্ঞান সাধারণ্যের বোধগম্য করার জন্য আশ্রয় নিতেন গল্পের। কারণ গল্পের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে সবচেয়ে সহজে প্রকাশ করা যায়। "কথাপুষ্প" বইতে রায়হান রাইন প্রাচীন গভীর জ্ঞানের কিছু গল্প একত্রিত করে নিজের ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। এ গল্পগুচ্ছ আমাদের চারপাশের জগতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে ও আত্মিক প্রশান্তি লাভে সাহায্য করতে পারে। পড়ার পর মনে হচ্ছে, প্রাচীন এই গল্পগুলোর উপযোগিতা বর্তমানে আরো বেশি।
(বইতে থাকা পছন্দের কিছু গল্প নিচে যুক্ত করে দিলাম-
১.তারা মাছ
এক কিশোর সমুদ্রসৈকত ধরে হাঁটছে আর বালুতে পড়ে থাকা তারা মাছ কুড়িয়ে পানিতে ফেলছে। এসব মাছ জোয়ারের সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় বালুর ভেতর আটকা পড়েছিল। বৃদ্ধ বড়শিওয়ালা কিশোরকে জিজ্ঞেস করেন, 'কী কুড়াও?’ “তারা মাছ কুড়াই।' ‘তাহলে পানিতে ফেলছ কেন?? ‘নাহলে ওগুলো মরে যাবে। কিশোর ব্যস্ত হাতে আরও কিছু তারা মাছ কুড়িয়ে সমুদ্রে ফেলে দেয়। বৃদ্ধ মরিয়া হয়ে আবারও বলেন, কিন্তু দেখো, বিশাল এই সৈকতের বালুতে কত তারা মাছ পড়ে আছে! কয়েকটাকে বাঁচিয়ে কী আর এমন লাভ হবে?? কিশোর এবার তার হাতের তারা মাছটা দেখিয়ে বলে, 'কী লাভ হবে তা ওকে জিজ্ঞেস করেন। ওর জন্য তফাতটা জীবন ও মৃত্যুর।'
২.লক্ষ্য ও উপায়
কলকাতা থেকে এক ধর্মতত্ত্ববিদ এসেছেন। সাধু তার সঙ্গে আলোচনা করছিলেন মানুষ ভজনা নিয়ে। ধর্মতত্ত্ববিদ বললেন, ‘পরমেশ্বরই কি আমাদের লক্ষ্য নয়?? সাধু বললেন, 'মানুষই লক্ষ্য।' “কিন্তু চরম সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই তো আমরা লড়ছি।' সাধু দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘এটা মানুষকে নৃশংস করে তোলে।' ধর্মতত্ত্ববিদ চলে গেলে শিষ্যরা সাধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা আপনি কেন বললেন?? সাধু বললেন, 'মানুষ না হয়ে চূড়ান্ত সত্য যদি অন্য কিছু হয়, তাহলে সেই সত্যের নামে মানুষ হত্যা বৈধ হয়ে যায়।'
৩.এই মর্ত্যের রাজত্ব
এক বয়স্ক সাধু রাজদরবারে আমন্ত্রণ পেলেন । সাক্ষাতের সময় রাজা সাধুকে বললেন, 'কৃচ্ছ্র সাধনকারীদের আমি ঈর্ষা করি।আপনারা এত অল্পে তুষ্ট থাকেন!’ ‘আমিও আপনাকে ঈর্ষা করি। আপনি এত অল্পে তুষ্ট থাকেন। রাজা রেগে গিয়ে বললেন, 'কী বলছেন, এই প্রাসাদ দেখে কি মনে হচ্ছে যে, আমি অল্পে তুষ্ট? আর এত বড় একটা দেশ, এর সবকিছুই তো আমার।' ‘সে জন্যই তো বলছি। আমি থাকি পাহাড়-অরণ্য কিংবা বেলাভূমিতে। নিজের ভেতর অনুভব করি গোটা মহাবিশ্বকে। এত বড় মহাজগৎকে একান্ত নিজের ভাবতে পারি। অথচ আপনার আছে কেবল একটি দেশ।'
৪.মনোদর্পণ
তরুণ ভিক্ষু সুরবজ্র নিজের বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে শ্লাঘা বোধ করেন। তিনি সুযোগ পেলেই ভিক্ষু কমলসম্ভবের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন এবং নিজের জ্ঞান গরিমা জাহির করেন। একদিন সুরবজ্র কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই কমলসম্ভবকে আক্রমণ করে বসলেন, ‘সবাই আপনাকে একজন বোধিসত্ত্ব ভাবে, কিন্তু আপনি তা নন । আপনার মাথাভর্তি গোবর, আপনি আবর্জনার স্তূপের মতো সারা দিন অলসভাবে পড়ে থাকেন।' কমলসম্ভব লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন। তিনি উদাসীনভাবে তাকালেন সুরবজ্রের দিকে এবং বললেন, “প্রিয় সুরবজ্র, আমি কিন্তু তোমার মধ্যে স্বয়ং বুদ্ধকেই দেখতে পাই।' সুরবজ্র চতুর হাসিসমেত বিদায় নিলেন। বাড়ি ফিরে সুরবজ্র যাকেই পেল তার কাছেই বলতে থাকল, 'আজ কমলসম্ভবকে ধসিয়ে দিয়েছি।' সুরবজ্রের বোন উত্তমা জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?' 'আজ কমলসম্ভবকে হারিয়ে দিয়েছি।' সুরবজ্র তার বোনকে ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বললেন। সব শুনে উত্তমা বললেন, 'না, ভ্রাতা। তুমিই বরং তার কাছে বাজেভাবে হেরেছ।' 'কেন?' ‘কারণ, তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন তোমার স্বরূপটা কেমন। তুমি কি জানো না যে, বাইরে তুমি যা দেখো, তা তোমার মনেরই ছবি। বোধিসত্ত্ব কমলসম্ভব যে তোমার মধ্যে বুদ্ধকে দেখেছেন, তার কারণ তিনি নিজে একজন বুদ্ধ । তুমি তাকে আবর্জনার স্তূপরূপে দেখেছ কারণ তোমার মনের মধ্যে ময়লার স্তূপ আছে। সুরবজ্র নির্বাক হয়ে গেলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়ান রায়হান রাইন। পড়াতে গেলে পড়তে হয় - এ তো ধ্রুবসত্য। নিজে হয়তো পড়তে গিয়েই সাক্ষাৎ পেয়েছেন অমূল্য কিছু গ্রন্থের। সেখান থেকে বাছাইকৃত কিছু রত্ন সংকলন করেছেন পাঠকের জন্য। ভীষণ সুন্দর একটা বই। এখানে ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়ে জীবনের বড় বড় জটিলতার সমাধান পাওয়া যাবে। মিলবে আত্মার খোরাক।
ইংরেজিতে এমন বই বেশুমার। কিন্তু বাংলায় বড্ড কম। সেখানে রায়হান রাইনের এই গ্রন্থ নিঃসন্দেহে চমৎকার সংযোজন। বারবার পড়ার মতো বই। প্রতিদিন পড়ার মতো বই 'কথাপুষ্প'।
গল্পগুলো খুব সুন্দর। দর্শন, জ্ঞান, প্রজ্ঞা সহ নানান ধরণের গুণাবলীকে গল্পের মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিছু গল্প অনেক আগে থেকেই চলে আসা। ছোট বেলায় অনেকে হয়তো ঘুম যাওয়ার আগে বাড়ির বড়দের কাছ থেকে কিচ্ছা বা নানান ধরণের গল্প শুনে বড় হয়েছি। সেই গল্পগুলোর আড়ালেও লুকিয়ে থাকতো বিভিন্ন ম্যাসেজ। বড়রা গল্পগুলো বলার পর সমাপ্তিতে এসে ভেঙে ডিকোড করে দিতেন সেইসব গল্পে আড়ালের নীতিকথা গুলো। এই বইয়ের গল্পগুলো ও তেমনই। প্রায় সবকটার আড়ালে কোন না কোন তাৎপর্য লুকিয়ে আছে।
জেন গল্প যাদের থরোলি পড়া, তারা এই বইয়ের গল্পগুলো খুব সহজেই রিলেট করতে পারবেন। এই বই সম্পর্কে এক বাক্যে বলা যায়, অল্পকথায় বলা বড় গল্প। ফিলোসফি, সূফীবাদ, আত্মার সন্ধান, নৈতিক মূল্যবোধ, তৃতীয় নয়ন দিয়ে পৃথিবী দেখাই এই বইয়ের গল্পগুলোর মূল উপজীব্য। গল্পগুলো পড়তে পড়তে পাঠক হয়তো আবিষ্কার করবে একটি আকাশ, যে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ক্রমাগত ঝরে পড়ছে প্রজ্ঞা। রায়হান রাইনের গল্প বলার ঢং ঘরোয়া, ফলে আসরের মধ্যে বসে গল্প শোনার অনুভূতিও হতে পারে পাঠকের।
যুক্তি তর্কের মাধ্যমে শিশুদেরকে কোনো কিছু বোঝানো খুবই দুরূহ একটি কাজ। কিন্তু এই দুরূহ কাজটিকেই সহজ করে তোলে ঈশপের গল্প, জেনগল্প, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এবং বীরবলের গল্পের মতো গল্পগুলো। এইসব গল্পে সহজ সরল ভাষায় দেখা মেলে গভীর প্রজ্ঞার যা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ সাধনের পাশাপাশি চরিত্র গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এইরকম ২১০ টা ছোট গল্প উঠে এসেছে রায়হান রাইনের কথাপুষ্প বইটিতে। সেখান থেকে আমার খুবই প্রিয় কয়েকটি ছোট গল্প তুলে ধরলাম:
📌 তারামাছঃ এক কিশোর সমুদ্রসৈকত ধরে হাঁটছে আর বালুতে পড়ে থাকা তারা মাছ কুড়িয়ে পানিতে ফেলছে। এসব মাছ জোয়ারের সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় বালুর ভেতর আটকা পড়েছিল ।
বৃদ্ধ বড়শিওয়ালা কিশোরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী কুড়াও?’ ‘তারা মাছ কুড়াই।' 'তাহলে পানিতে ফেলছ কেন?' নাহলে ওগুলো মরে যাবে।'
কিশোর ব্যস্ত হাতে আরও কিছু তারা মাছ কুড়িয়ে সমুদ্রে ফেলে দেয়। মরিয়া হয়ে আবারও বলেন, “কিন্তু দেখো, বিশাল এই সৈকতের বালুতে কত তারা মাছ পড়ে আছে! কয়েকটাকে বাঁচিয়ে কী আর এমন লাভ হবে?'
কিশোর এবার তার হাতের তারা মাছটা দেখিয়ে বলে, “কী লাভ হবে তা ওকে জিজ্ঞেস করেন। ওর জন্য তফাতটা জীবন ও মৃত্যুর।'
📌 অন্ধ মেয়েটিঃ অন্ধ মেয়েটি তার প্রেমিককে বলে, অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে কোনো দিন মুক্ত হতে পারলেই কেবল বিয়ে করব তোমাকে। না হলে নয়।
একদিন কারও দান করা দুটো চোখ পেয়ে যায় সে। ব্যান্ডেজ খোলার পর সবকিছু দেখতে পায়। আলো-ঝলমলে জগত তাকে অভিভূত করে।
ছেলেটি বলে, 'এবার কি তুমি বিয়ে করবে আমাকে?'
মেয়েটি কখনোই যা ভাবিনি, ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দেখল, সে অন্ধ। মেয়েটি জানে অন্ধত্ব কী ভয়াবহ অভিশাপ। সে ছেলেটাকে বিয়ে করতে রাজি হলো না।
ছেলেটি ভীষণ দুঃখ পেল। একদিন মেয়েটিকে এক চিঠিতে লিখল, 'তোমার চোখ দুটোর যত্ন নিয়ো। ওগুলো তুমি পাওয়ার আগে আমারই ছিল।'
খরা একইভাবে চলতে থাকলে মসজিদের ইমাম সাহেব বৃষ্টির জন্য প্রার্থনার ঘোষণা দিলেন।
সেদিন ঈদগা মাঠে প্রচুর লোকসমাগম হলো। ইমাম সাহেব প্রার্থনার আগে কথা বলছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন ১০-১১ বছরের এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে সামনের কাতারে। তার চোখে-মুখে উত্তেজনা। সে একটা রঙিন ছাতা সঙ্গে এনেছে, যেটাকে সে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছে সামনে। ছোট্ট ছেলেটির নিষ্পাপতা এবং আস্থা দেখে ইমাম সাহেব অভিভূত হলেন। এই সমাবেশে অন্য কেউই বৃষ্টির প্রস্তুতি হিসেবে সঙ্গে ছাতা আনেনি।
ইমাম সাহেব ভাবলেন, সবাই বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতেই এসেছে। কেবল ছোট্ট ছেলেটি এই আশা নিয়ে এসেছে যে স্রষ্টা সেই প্রার্থনায় সাড়া দেবেন।
ছোটগল্প অথচ অর্থ বিশাল। গুনে দেখলাম এমন ছোট ছোট ২২২টি গল্প রয়েছে বইতে। আমি ১০টি গল্প বই থেকে তুলে দিলাম।
১. খিটখিটে বুড়ো
বুড়ো খুব বিষন্ন আর খিটখিটে। বয়স বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে আরও বেশি বদমেজাজি আর রুক্ষ হয়ে উঠেছে। সবাই তাকে এড়িয়ে চলে, যেন মনমরা বুড়োর সঙ্গে মিশলে তারাও দুর্ভাগ্যের কবলে পড়বে।
হঠাৎ একদিন বুড়োর মুখে হাসি দেখা গেল। মুখে বিরক্তির চিহ্ন একেবারেই নেই। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও করছে না। উল্টো মুখে দেখা যাচ্ছে গভীর প্রশান্তির চাপ।
গ্রামবাসী জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি হয়েছে?’
বুড়ো তার হাসিমুখ আরও উজ্জ্বল করে বলল, বিশেষ কিছু না। আশি বছর পূর্ণ হলো। সুখের দেখা মিলল না। তাই ভাবলাম, সুখী হওয়ার চেষ্টা একেবারেই করব না আর। এই চেষ্টা বৃথা। এখন হাল ছেড়ে দিয়ে দেখছি, কি হয়।
২. . লক্ষ্য
রাস্তার ধারে অধ্যাপকের বাড়ি। রাস্তা দিয়ে যখনই কোনো গাড়ি যায়, অধ্যাপকের কুকুর তার পিছু নেয়। কিন্তু কখনোই কোনো গাড়িকে অতিক্রম করতে পারে না।
এক প্রতিবেশী অধ্যাপককো বললেন, ‘আপনার কি ধারণা কুকুর কোনোদিন কোনো গাড়িকে অতিক্রম করতে পারবে?’
অধ্যাপক বললেন, ‘সেটা নিয়ে আমি একদমই ভাবছি না। আমি বরং ভাবছি, কুকুরটা যদি কোনো দিন সত্যিই সেটা পারে, তাহলে সে কী করবে?’
৩. এই মর্ত্যের রাজত্ব
এক বয়স্ক সাধু রাজদরবারে আমন্ত্রণ পেলেন।
সাক্ষাতের সময় রাজা সাধুকে বললেন, ‘কৃচ্ছ্র সাধনকারীদের আমি ঈর্ষা করি। আপনারা এত অল্পে তুষ্ট থাকেন।
রাজা রেগে গিয়ে বললেন, ‘কি বলছেন, এই প্রাসাদ দেখে কি মনে হচ্ছে যে, আমি অল্পে তুষ্ট? আর এত বড় একটা দেশ, এর সবকিছুই তো আমার।’
‘সেজন্যই তো বলছি। আমি থাকি পাহাড়-অরণ্য কিংবা বেলাভূমিতে। নিজের ভেতর অনুভব করি গোটা মহাবিশ্বকে। এত বড় মহাজগৎকে একান্ত নিজের ভাবতে পারি। অথচ আপনার আছে কেবল একটি দেশ।’
৪. শিষ্যত্ব
এক তরুণ সাধুর আশ্রমে গিয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে চাইল।
সাধু বললেন, ‘আমার সঙ্গে থাকতে পারো। কিন্তু আমাকে অনুসরণ কোরো না।’
‘তাহলে কাকে অনুসরণ করব?’
‘কাউকেই না। যখনই কাউকে অনুসরণ করবে, তখনই সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে।’
৫. . জ্ঞানপ্রদীপ
সাধু মৃত্যুশয্যায়। তিনি চোখ খুলে তার প্রিয় শিষ্যকে দেখতে চাইলেন।
শিষ্যটি তার পাশে এসে বসল। সাধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার মৃত্যু আসন্ন। আমার অনুপস্থিতিতে কী করবে ভেবেছ?’
শিষ্য বলল, ‘আপনিই আমাদের জ্ঞানপ্রদীপ। আপনার আলোয় আমরা পথ চিনে নেব।’
সাধু আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের চোখ এতটাই ধাঁধিয়ে দিয়েছি যে নিজের ভেতরকার আলো দেখতে পাচ্ছ না?’
৬. মানুষ হওয়া
সাধু তার শিষ্যদের নিয়ে আশ্রমের কুটির মেরামত করছেন।
এক ব্যবসায়ী রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গুরুজি, একটা প্রশ্ন আছে। আমি কী করে আপনার মতো মহৎ মানুষ হতে পারব?’
সাধু জবাব দিলেন, ‘মহৎ হওয়ার কী দরকার? আগে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেন।’
৭. ত্যাগের মূল্য
খরস্রোতা নদীতে পড়ে ডুবে যাচ্ছিল এক কিশোর। তাকে বাঁচাতে মধ্যবয়স্ক এক লোক নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
লোকটা নিজের জীবন বিপন্ন করে সেই কিশোরকে তুলে আনলেন নদী থেকে।
‘ধন্যবাদ। আপনি আমার জীবন বাঁচালেন,’ বলল কিশোর।
লোকটা মৃদু হেসে বললেন, ‘তোমর জীবন বাঁচিয়ে মূল্যবান কিছু করেছি কিনা, তা তোমারই ওপর নির্ভর করছে।’
৮. সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী
সবাই মনে করে এথেন্সবাসীর মধ্যে সক্রেটিসই সবার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। কিন্তু সক্রেটিস তা মনে করেন না
তিনি ডলফির মন্দিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে সবার চেয়ে বেশি জ্ঞানী?’
‘তুমি।’
দৈববাণী শোনা গেল।
‘কিন্তু এটা অসম্ভব। কারণ আমি জানি যে, আমি কিছুই জানি না।’
‘এই কারণেই এথেন্সে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী আর কেউ নেই।’
৯. দ্রোহী
এক লোক প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে তুলল। তার এই মিশনের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত হলো এবং তারা একত্রে একটা সংগঠন গড়ে তুলে প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করল।
কিন্তু বছর না ঘুরতেই ক্রমশ সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলল এবং একে একে সবাই সংগঠন ছেড়ে চলে গেল। শেষে লোকটা একা হয়ে পড়ল।
তবু সেই লোক একটা পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে রাস্তার পাশে।
এক পথচারী জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার কি ধারণা জগৎটাকে আপনি পাল্টাতে পারবেন?’
লোকটা জবাব দেয়, ‘না। তবে জগৎটাও আমাকে পাল্টাতে পারবে না।’
১০. হারানো সুই
এক সন্ধ্যাবেলা রাবেয়া আল-বসরি তার কুটিরের বাইরে রাস্তার উপর কিছু খুঁজছিলেন। প্রতিবেশীরা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হারিয়েছ? কী খুঁজছ?’ ‘আমরা একটা সুই হারিয়ে গেছে’ রাবেয়া বললেন।
প্রতিবেশীরা রাবেয়ার সঙ্গে রাস্তায় সুই খুঁজতে লাগল। কিন্তু কেউই পেল না।
এক প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কোথায় সুই হারিয়েছ?’
রাবেয়া বললেন, ‘আমাকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করাই ভালো। আসলে সুইটা আমি ঘরেই হারিয়েছি।’
এ কথা শুনে সবাই হাসল। একজন সন্দেহবাদী বলে বসল, ‘তুমি তো আস্ত একটা পাগল, সুই হারিয়েছ ঘরে, তাহলে রাস্তায় খুঁজছ কেন?’
‘কারণটা খুবই সোজা, ঘরে আলো নেই। বাইরে সামান্য আলো দেখে এখানেই খুঁজছি।’
সবাই আবারও হেসে উঠল। তখন রাবেয়া বললেন, ‘শোনো। তোমরা ঠিক এ কাজটাই করো। আমি কেবল দৃষ্টান্ত দেওয়ার জন্য এটা করেছি। তোমরা সবাই নিজেদের সুখ খুঁজে বেড়াও বাইরে। @ কিন্তু আসলে কি সেটা বাইরেই আছে?’
একটু থেমে রাবেয়া আবার বলতে থাকলেন, ‘আমরা আমাদের সুখ বাইরে খুঁজি কারণ আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় সেভাবেই তৈরি। আমাদের চোখ বাইরে দেখে, কান বাইরে শোনে, আমরা স্পর্শ করি বাইরের বস্তু, একইভাবে আমরা বাইরের বস্তুরই স্বাদ-গন্ধ নিই। কাজেই আমরা ভেবে বসি, খোঁজার কাজটা বাইরের সারতে হবে। কিন্তু ভেবে দেখি না, যা খুঁজছি তা কি বাইরেই হারিয়েছি। আগে আমিও আমার সুখকে বাইরেই খুঁজতাম। তখন জানতাম না অন্তরীন্দ্রিয় কী বস্তু। এটাও যে অন্বেষণের উপকরণ, তা জানতামই না। কিন্তু যেদিন অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে খুঁজতে শুরু করলাম, আমি বিস্মিত হলাম। বুঝলাম, আমি আমার সুখকে নিজের ভেতরেই হারিয়েছি। তাই সেটাকে খুঁজে পেতে হবে নিজেরই ভেতর।’ ..........................................................................
কয়েক লাইনের ছোট ছোট গল্পের সংকলন। তবে ঠিক কল্পনা আশ্রিত কিংবা দৈনন্দিন জীবনের রঙচঙে গল্প নয়। বইতে বরং ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়া গল্পের আধিপত্য বেশি। ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোতে চমৎকার উপলব্ধি জাগাতে বইয়ের গল্পগুলোর ভূমিকা বেশ।
২.৫/৫ আমি bitter কিসিমের cynical ঘরনার মানুষ। এতো পজিটিবিটি সইজ্জো হয় না। নীতিকথার বাকবাকুম, "এ থেকে আমরা কী শিখলাম" টাইপ গল্প পছন্দ করলে বইটা খুব একটা খারাপ লাগব না।
ছোট ছোট গল্পগুলো কী চমৎকার, অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। দেখার চোখ করে দেয় আরও বিশাল। একেবারে শিক্ষনীয় হিসেবে এই বই পড়তে বলবো না। নিজেকে জানা, বোঝা, যাচাই করা যায় একে দিয়ে।
১ম গল্প . "একবার এক বুড়ো লোক সমুদ্রসৈকতে হাঁটার সময় দেখে একটা কিশোর জোয়ারে ভেসে আসা তারা মাছগুলোকে তুলে তুলে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে। লোকটি গিয়ে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, "কী করো?" ছেলেটি উত্তর দিল, "তারা মাছগুলোকে সমুদ্রে ফেলে দিই।" বুড়ো লোকটি জিজ্ঞেস করল, "ফেলে কী লাভ?" " তা না হলে ওরা তো শুকনোর উপর মরে যাবে!" ছেলেটি জবাব দেয়। লোকটি তখন ছেলেটিকে থামিয়ে বলে, "কিন্তু দেখো, বিশাল এই সৈকতে কত অজস্র তারা মাছ পড়ে আছে। এই কয়েকটাকে বাঁচিয়ে কী লাভ হবে বলো?" ছেলেটি তখন হাতের তারা মাছটিকে দেখিয়ে বলে, "কী লাভ হবে তো ওকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। ওর জন্যে তফাতটা তো জীবন আর মরণের, তাই না?" . ২য় গল্প... . "একবার এক সাধু তার শিষ্যকে নিজের ভেতরকার যুদ্ধ সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছিলেন, "বুঝলে বাছা, এ হল দুই নেকড়ের লড়াই। খারাপ নেকড়েটা হল ক্রোধ, হতাশা, ঘৃণা, ঈর্ষা, লোভ, অহংকার ইত্যাদির প্রতিনিধিত্ব করে। আর ভালো নেকড়টে হল আনন্দ, শান্তি, প্রেম, আত্মত্যাগ, আশা, শ্রদ্ধা, পরোপকার, দয়া ইত্যাদির প্রতিনিধিত্ব করে।" শিষ্য তখন জিজ্ঞেস করল, "তো, গুরু এই দুই নেকড়ের মধ্যে জয়ী হবে কোনটা?" সাধু হেসে বলেন, "যাকে তুমি খেতে দেব সেই জিতবে!" . মূলত এইরকম ছোট ছোট কিন্তু গভীর প্রজ্ঞাসম্পন্ন বোধের গল্পসংকলন এই বই। গল্পগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে নেয়া। অনেক গল্পই আছে যা আমাদের চেনা, যেমন চেঙ্গিস খানের যুদ্ধজয়ের একটা গল্প এখানে হয়ে গেছে চাণ্যকের গল্প হিসেবে, ডায়োজেনিসের গল্প হয়ে গেছে সাধুর গল্প। এইভাবে অনেক গল্পই মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। বইটার মজার দিক হল, বইটা বারবার ফিরে ফিরে পড়ার মতো।