ভুল সময়ে সঠিক বই জীবনে এলে কী করেন আপনি? চেয়ার টেনে দেন? বসতে বলেন? নাকি প্যানিক বশে মুখের ওপর দরজা টেনে দেন? একে কী আদৌ প্যানিক বলা চলে? নাকি আফসোসের ছাদনাতলায়, হাঁটু মুড়ে গুম মেরে যাওয়াতেই আসল শান্তি? আমার অবস্থাটা এই মুহুর্তে কতকটা এমনই শোচনীয়। 'বৃশ্চিকচক্র'-এর দোহাই। দর্শনা বোসের কসম। পিয়া সরকার দ্য উওম্যান ইউ আর!
সেই কবে, প্যান্ডেমিক নামক পলাশীর আমলে, 'বিসাশন' পড়ে ওনার কলমের টানে মুগ্ধ হওয়া। আজ এই অ্যাত্ত বছর বাদে, লেখিকা আমার এক রাতের কাঁচা ঘুম প্রায় টেনে হিঁচড়ে ছিনিয়ে নিলেন গায়ের জোড়ে। আর আমি...এই অপগণ্ড আমি...ফ্যালফ্যাল করে বসে থেকে, ট্রেনের রিডিং লাইটের চরম অপব্যবহার করে স্রেফ গোগ্রাসে গিলে নিলাম দর্শনার যাবতীয় ট্র্যাজেডি!
সত্যি বলছি। তিন কি চার, পাঁচ, সাত, দশ.. অনেকগুলো সত্যি! বাড়িয়ে বলে আমার কী লাভ? আমি গাধা হতে পারি (নইলে এমন সিরিয়াস বই নিয়ে কেউ ট্রেনে ওঠে?) কিন্তু গ্যাসওয়ালা নই। ফাঁপা কাঠামোয় হাওয়া মেরে আমার মুনাফা কোথায়? আমি স্রেফ মাথায় রাখি মুগ্ধতার মারণ ছবি। লেয়ার্ড টেনশন। বাস্তবধর্মী চরিত্রচিত্রণ। সাথে লেখিকার কনফিডেন্ট গদ্যে, দর্শনার ফ্যাকাশে উপলব্ধি ও স্বাধীন পুলিশি স্বেচ্ছাচার। প্রসিডিউরলের প্রাপ্তবয়স্ক কারাগারে, সমাজ নামক এক সাময়িক নাট্যমঞ্চের ট্র্যাজেডি-সম বিকৃতি!
অগত্যা, রাতবিরেতে প্রায় চারশো পাতার বৃহৎ বইখানি শেষ করে, টু-টায়ারের জানালা দিয়ে ঠাঁয় তাকিয়ে থেকে, জোনাকিদের সাথে রংমিলান্তি খেলতে চাওয়াটা ভীষন রকমের স্বাভাবিক। ওতে কোনো মার্কামারা ভুল নেই। ভুল যদি থেকেই থাকে তবে সেটা আমার লেখার ধরণে। যা সময়ের অভাবে লঘু আঁচে রান্না করা শেষপাতের ডেজার্ট সমান। এর ভিত্তিতে কোনো গুরুতর ডিসিশন নেবেন না আবার। দায়িত্বটা পূর্ণতই আপনার নিজের। বাংলা ভাষায় রচিত আধুনিক অপরাধ-সাহিত্য নিয়ে অল্প কৌতুহলী হলেও, বইটা পড়া আপনার কর্তব্য সমান।
হ্যা, মানছি, প্রথম কাহিনী 'বৃশ্চিক' দ্বিতীয়টির তুলনায় যৎসামান্য দুর্বল। তা সে গল্পটির স্বল্প দৈর্ঘ্যই বলুন বা রহস্যভেদের কষ্টকল্পিত পরিণতি। লেখাটি স্রেফ কোনো জেনেরিক গোয়েন্দা গল্পের হিসেবে, নম্বর খোয়াবে অবশ্যই। তবে ক্যারেক্টার ড্রামা? ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং? সংলাপ? এখানেই যে লেখিকা আমাদের মাথায় সম্মোহনের গোলাপ জল ছিটিয়ে দেন। আমরা, বোকা পাঠকেরা, চাইলেও উঠে আসতে ভুলে যাই। অন্ধকারে দেওয়াল হাতড়াই কেবল। লাইটের সুইচ বা দরজার অভাবে বসে থাকি ঠাঁয়। নাকে ভেসে আসে, হোল্ডিং সেলের পরিযায়ী আঁশটে ঘ্রাণ...
কবিতা নয়। লেখিকার কল্পিত জগৎ জুড়ে কেবল রক্তের দাগ। সহস্র কত টেনশনের সিঁড়িতে ত্রিমাত্রিক ট্রমার অ্যাসিডিক বৃষ্টিপাত। যা প্রজন্মগত। আক্ষরিক। ও যারপরনাই বাস্তব। স্রেফ দর্শনার খাতিরে। মেয়েটির মানসিক দ্বন্দ্বের তুমুল তাড়নায় ক্ষমা করা যায় ন্যারেটিভ দুর্বলতা। ভুলে থাকা যায় প্লট-হোলের জোৎস্নাময় ঝাকুনি।
আর না করে উপায়টাই বা কী?
বইয়ের দ্বিতীয় তথা সেরা উপন্যাস, 'বৃশ্চিকচক্র' অবধি পৌঁছতে হলে, অল্প-বিস্তর হোঁচট খাওয়াটা যাকে বলে ডিজার্ভড রাইট অফ প্যাসেজ। লেখাটি, আমার মতে, বাংলা ভাষায় রচিত এযাবৎ সমস্ত প্রসিডিউরালদের ভিড়ে, অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণও বটে। লেখিকার কলম এই দ্বিতীয় প্রান্তে আরও ধীর। আরও স্থির ও কনফিডেন্ট। তীক্ষ্ণ যত্নের কাঁধে সংযমের প্রাপ্তবয়স্ক সহাবস্থান। হিন্টারল্যান্ড রাজনীতি। মাওবাদী ইতিহাস। কেজো পুলিশী লেগ-ওয়ার্ক। সমাজ-বিরোধী বাস্তবতা। রিচুয়াল হত্যা। সেরিব্রাল ককটেল। আমলাতন্ত্রের ক্লান্তিময় হাই-ফাইভ। ইত্যাদি। ইত্যাদি।
এই এত কিছুর বিনিময়ে, লেখিকা আপনার কাছে কেবল একটা জিনিসই চাইবেন। ধৈর্য। এক চিমটে ধৈর্য। দিতে পারবেন, আশা করি। না দিলে, দিনশেষে, আপনারই ক্ষতি। স্রেফ তাড়াহুড়োর তাগিদে, এমন একটি সুগঠিত, বাস্তবানুগ পৃথিবীর দোরগোড়া হতে খালি হাতে ফিরে আসতে হবে। বিশ্রী হবে একেবারে।
পারবেন না বলুন? স্রেফ অল্প একটু ধৈর্য। ব্যাস! দেখবেন কী নিপুণ হাতে, লেগো সেটের ধূসর টুকরোগুলো নিয়ে মানচিত্র সাজিয়েছেন লেখিকা। কী সহজে, গোয়েন্দা কাহিনীর ট্র্যাডিশনাল পাল্পি হৃদয়টিকে হাতে রেখে, সিনেমার সেপিয়া ফোকাসে, একটি কালো, কষ্ট-সর্বস্ব ট্র্যাজেডি গড়ে তুলেছেন পিয়া সরকার...
অগত্যা, শুরুতে যা বলেছিলাম, শেষেও তা। দ্য উওম্যান ইউ আর! লেখিকা। দর্শনা। দুজনেই। দ্য উওমেন ইউ বোথ আর!
(৪.২৫/৫ || মে, ২০২৫)