'তখন গল্পের তরে' নূতন যুগের গল্প। একবিংশ শতকের গল্প। এতোকাল বাংলা কথাসাহিত্য জগৎটাকে পুরুষের চোখে দেখেছে। এবার নারীর চোখে দেখার পালা। এ নারী অবগুণ্ঠিত নন। নন কুণ্ঠিত।রিফাত আনজুম পিয়া অবলীলায় জীবনের সব দিক নিয়ে বলে চলেন কথা। বর্ণনা করেন তাঁর সময়ের প্রকৃতি। মানবীর চাওয়াপাওয়া। বৃদ্ধা ও বৃদ্ধ, তরুণী ও তরুণ, ডিভোর্সী ও প্রতিবন্ধী-- বিচিত্র চরিত্র এঁকেছেন তিনি সহজ মুন্সিয়ানায়। স্বতস্ফূর্ত তাঁর রচনার ভঙ্গি। ভাণভণিতা নেই। নিরাভরণ ভাষা৷ জীবন থেকে তুলে নেয়া ভাষা, অভিব্যক্তি। যেন এমন যে কেউ লিখতে পারেন গল্পগুলি। যে সহজকে আসলে আঁকা কঠিন। গল্পগুলি উপন্যাসোপম। ছোটগল্পের কাঠামো থেকে বের হয়ে উপন্যাস হয়ে উঠতে চাইছে।--ইচক দুয়েন্দে।
বইপাগল বাবা কন্যার জন্য যে খেলাঘর বানিয়েছিলেন তার পুরোটাই বইয়ে গড়া। সেই খেলাঘরের দরজা-জানালা দিয়ে দুনিয়া দেখতে দেখতে খেলাচ্ছলে লেখা শুরু। ২০০৫ ও ২০০৬ সালে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পড়াকালে ঐতিহ্য গোল্লাছুট-প্রথম আলো গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় ২য় ও ৩য় পুরস্কার পাওয়ার পর বেড়ে যায় লেখালেখির আগ্রহ, সাথে বড়দের সস্নেহ প্রশ্রয় আর বন্ধুদের উৎসাহ। ২০০৮-এ ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে ১ম পুরস্কার প্রাপ্তির পর লেখালেখিকেই জীবনের আশ্রয় করবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু আর্থিক-সামাজিক নিরাপত্তার খাতিরে শেষমেশ লেখালেখি আর জীবনের মূল স্রোতধারা হয়ে ওঠেনি। যদিও সাহিত্যে বেঁচেছেন সবসময়। তখন গল্পের তরে লেখকের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।
কোনো নিরীক্ষা নেই, বাড়তি কোনো চাতুর্য নেই। "তখন গল্পের তরে"র গল্পগুলো শুধুই গল্প। গল্পের নারীরা আমাদের খুব পরিচিত। তাদের আমরা প্রতিদিন দেখছি। তাদের স্বভাব, চেহারা, জীবনযাপনের ধরন সবই আমাদের খুব চেনা। প্রায় সব গল্পই শুরু হয় কোনো নারীর আটপৌরে বা নিত্যকার জীবনের বর্ণনা দিয়ে। পরিচিত জায়গা থেকে ঘটনা শুরু করে লেখিকা ধীরে ধীরে আমাদের এমন একটা জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে পৌঁছে আমরা হতবাক ও স্তম্ভিত হয়ে যাই। এভাবে তো ভেবে দেখি নি! অথচ ভাবার দরকার ছিলো। এভাবে তো চেয়ে দেখি নি! অথচ দেখার দরকার ছিলো। রিফাত আনজুম পিয়া গল্পের শিল্পগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে নিজের দর্শন ও ভাবনা সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেছেন। কোথাও উচ্চকিত বাক্য নেই, দেখানোর আড়ম্বর নেই; নিরুচ্চার ভঙ্গিতে, অকপটে গভীর গল্প বলে গেছেন লেখিকা। এখানেই তার কৃতিত্ব। "তখন গল্পের তরে" আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, আমাদের চিরাচরিত চিন্তায় শক্তভাবে আঘাত হানে। বন্ধুবর অরূপকে ধার করে বলতে পারি, "তখন গল্পের তরে" ভণিতাহীন সৎ সাহিত্য। সততার জোরেই এর গল্পগুলো টিকে থাকবে। নতুন চিন্তা ও নতুন স্বরের অধিকারী রিফাত আনজুম পিয়ার পরবর্তী বইয়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকবো।
কবিতা বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের সত্যিকারের গর্ব করার মতো জিনিস যদি কিছু থাকে তা হল ছোটগল্প। সেই রবীন্দ্রনাথ আর প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু। তারপর বিভূতিভূষণ পরশুরাম সতীনাথ তারাশঙ্কর মানিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রেমেন্দ্র মিত্র জগদীশ গুপ্ত গৌরকিশোর ঘোষ মতি নন্দী কমলকুমার হাসান আজিজুল হক জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী আশাপূর্ণা মহাশ্বেতা সত্যজিৎ রায় রমাপদ চৌধুরী বিমল কর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস হুমায়ূন আহমেদ শ্যামল গাঙ্গুলি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ইত্যাদি দিকপালদের (দিকপাল আরো অনেক আছেন অবশ্যই, এখানে শুধু আমার প্রিয়দের নামোল্লেখ করলাম) সৃষ্ট অজস্র মণিমুক্তো পেরিয়ে এসে আজকে বেশ জোরগলাতেই বলা যায় : ছোটগল্পের মতো এরকম বহুমুখী সমৃদ্ধ শাখা কি বাংলা সাহিত্যে আর কিছু আছে?
কিন্তু গত শতকের নব্বই দশকের পরে কী যে হলো, যেমনটা বোধহয় হলো বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই, বাংলার আঞ্চলিক নিজস্বতা এবং স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে আন্তর্জাতিকতার গড্ডলিকা-স্রোতে ভেসে গেলেন বেশিরভাগ সাহিত্যিক ("গড্ডল" শব্দের অর্থ ভেড়া। ভেড়ারা তাদের দলের একজন যেদিকে যায়, পিছে পিছে বাকি সবাই সেদিকেই যায়)। শীর্ষেন্দু সুচিত্রা দেবেশ স্বপ্নময়দের মতো কয়েকজন টিমটিম করে জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন খাঁটি বাংলা ছোটগল্পের চিরাচরিত ধারাটি ; কিন্তু নতুন শতাব্দীতে প্রবেশ করে "চিরাচরিত" কিংবা "ধ্রুপদী" শব্দগুলো গালিগালাজে পরিণত হল। আরো আরো আরো বেশি আধুনিকতার খোঁজে নেমে পড়লাম আমরা সবাই। লেখক পাঠক প্রকাশক সম্পাদক সমালোচক— সব্বাই! সরলরৈখিক ছাপোষা প্লটের দিন ফুরাইলো। বাংলা ভাষার দিশি আম্রবৃক্ষশাখে ঝুলতে লাগলো লাতিন আমেরিকার "পোস্ট-মডার্ন" ফল কিংবা পূর্ব ইয়োরোপের বিপ্লবী সুগন্ধে ভরপুর exotic ফল কিংবা জাপানি "বিজার" ফল কিংবা...
বিপদে পড়লো আমার মতো নির্বোধ নিপাট নিরীহ পাঠকরা। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গল্পে আমরা নিরিবিলি প্লট খুঁজতে লাগলাম। একটা সোজাসাপটা এবং সাদামাটা (এই শব্দ দুটোও বর্তমানে গালিগালাজে পরিণত হয়েছে) গল্প খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু চারিদিকে দেখি শুধু ফর্মের নতুন নতুন কায়দা নিয়ে কচলাকচলি। ভাষার প্রচলিত আদবকে হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে নতুন রূপের সন্ধান চলছে। হৃদয় নয়, লেখকরা চাইলেন পাঠকের মস্তিষ্ককে উজ্জীবিত করতে। যে লেখা সহজেই পড়ে ফেলা যায়, যে লেখা পড়তে হলে মগজের কোষকে যোগব্যায়াম করতে হয়না, সেগুলো এলেবেলে সাহিত্য। হুমায়ূন আহমেদ কিংবা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মতো সাবলীল (এটাও গালিগালাজ) গদ্যকাররা "বাজারি লেখক" খেতাব অর্জন করলেন।
এরই মধ্যে দেখতে দেখতে চোখের সামনে উপস্থিত হলো নতুন উপদ্রব। বাংলা সাহিত্যের দুকূল ছাপিয়ে বইতে লাগলো ভূত-প্রেত তন্ত্র-মন্ত্র সাই-ফাই স্পেকুলেটিভ-ডিস্টোপিয়ান— আরো কীসব অত নামও জানিনা ছাই! অগত্যা, আমি "আধুনিক" লেখাপত্তর পড়া বন্ধ করলাম। ফিরে গেলাম আমার চিরপরিচিত আটপৌরে (গালিগালাজ) বাংলা সাহিত্যের পুরোনো জগতে। যেখানে চরিত্ররা সবাই মানুষ, প্রেক্ষাপট আমাদের পরিচিত বাস্তব (গালিগালাজ) পৃথিবী, বিষয়বস্তু প্রাসঙ্গিক। চারিপাশে সবাই যখন আধুনিক (এবং আন্তর্জাতিক) হয়ে উঠতে লাগলো, আমি একটা আশাপূর্ণা দেবীর ঘরোয়া (গালিগালাজ) গল্প, কিংবা একটা গজেন্দ্র মিত্রের গ্রাম্য (গালিগালাজ) গল্প, কিংবা বিমল করের নাগরিক (এই শব্দটা এখনও গালিগালাজ হয়নি) গল্প পড়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে লাগলাম। অনেক চেষ্টা করেও বন্ধুরা আমাকে "আজকালকার সাহিত্য" পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে পারলো না। কেউ ভাবলো আমার নাক উঁচু, কেউ ভাবলো পাঠক হিসেবে আমার "কোয়ালিটি" নিচু। আসল ব্যাপারটা খুব কম মানুষই বুঝলো।
যে-বইটি নিয়ে আলোচনা করবো বলে এই বিস্তারিত শিবের গাজনটি গেয়ে শোনালাম, সেই বইয়ের শিরোনামটি নেওয়া হয়েছে একটি বিখ্যাত বাংলা কবিতা থেকে। এই কবিতাটির রচয়িতা আমাদের দেখিয়েছিলেন, আঞ্চলিকতার লক্ষণ এবং স্থানিক বিষয়বস্তুকে পরিত্যাগ না করেও কীভাবে আধুনিকতার চূড়ান্ত চর্চা করা সম্ভব। কবিতাটির নাম "বনলতা সেন"। কবির নাম জীবনানন্দ দাশ। আলোচ্য বইটির ব্লার্বে কিছু ভুল কথা লেখা রয়েছে। গল্পগুলোকে বলা হয়েছে "নতুন যুগের গল্প", "একবিংশ শতকের গল্প"। বলা হয়েছে গল্পগুলো "পুরুষের চোখে" নয়, "নারীর চোখে" দেখা হয়েছে। ইত্যাদি।
কিন্তু বইটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, আসলে তো গল্পগুলো চিরায়ত! ধ্রুপদী বাংলা ছোটগল্পের সুগন্ধে ভরপুর! আসলে তো গল্পগুলো আলাদাভাবে নারীর কিংবা পুরুষের নয়। এগুলো মানুষের গল্প! নারীচরিত্রগুলোকে পাল্টে দিয়ে পুরুষচরিত্র হিসেবে দেখালেও হিসেবের বিশেষ হেরফের হতো না। এমন সহজিয়া সাবলীল গদ্যভাষা, প্লটের এমন সুবিন্যস্ত গঠন, আটপৌরে ঘরোয়া প্রেক্ষাপটের ছায়ায় ঢাকা, বাস্তব মানুষের বাস্তব ঘরদুয়ার, অন্দর বাহির, মনের গহীন জটিলতা, মানুষের দৈনন্দিন মাপা-হাসি এবং চাপা-কান্নার এরকম সাবেকি প্রকাশ— বহু বহুদিন পরে আমার দৃষ্টিগোচর হলো! মুগ্ধ হয়েছি রিফাত আনজুম পিয়া-র ছোটগল্পগুলি পড়ে। বোদ্ধা পাঠকদের মগজের পুষ্টিসাধন হবে কিনা জানিনা, তবে লেখকের গল্পবলার মুন্সিয়ানা যে আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে, এ কথা আমি হলপ করে বলতে পারি।
এই বই আমার কিছুতেই পড়া হতোনা, বন্ধু আঞ্জুমান লায়লা নওশিনকে যদি জিজ্ঞেস না করতাম যে, ২০২২ সালে তার পড়া সবচেয়ে প্রিয় বই কোনটা। সে আমাকে বইয়ের নাম বলেই চুপ থাকেনি, বইটা কিনে সটান পাঠিয়ে দিয়েছে আমার বাড়িতে। তখন ভেবেছিলাম এ হয়তো নেহাতই তার সহৃদয় বন্ধুকৃত্য। বইটা পড়ার পরে এখন বুঝতে পারি, আমিও হয়তো এই একই কাজ করতাম। পরিচিত পাঠক, যাঁরা আমার মতো "সরল সোজা" গল্প পড়তে পছন্দ করেন, তাদের হাতে বইটা তুলে দিয়ে বলতাম, বইটা প্লিজ পড়ুন। লেখকের প্রথম বই, এখনও তেমন পরিচিতি অর্জন করেননি, কিন্তু তবুও পড়ুন। নওশিনের মতোই বইয়ের ভিতরে দৃঢ় অক্ষরে লিখে দিতাম : "পৃথিবীটা বইপড়ুয়াদের হোক!" এবং তার মতোই বারবার তাড়া দিতাম : বইটা পড়েছেন? পড়েছেন বইটা? এখনও পড���া শুরু করেননি? শুরু করেননি এখনও? সেকি!
শেষ হয়েও রয়ে যায় গল্পগুলোর শীতাতপ রেশ, চরিত্রদের উপস্থিতি ঘুরতে থাকে মাথার ভেতর। মনে পড়ে যায় "বনলতা সেন" কবিতাটির অন্তিম কয়েকটা লাইন :
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে ; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল ; পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল ; সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন ; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার...
সাতটি গল্প নিয়ে সাজানো এই সংকলনটি রিফাত আনজুম পিয়ার প্রথম বই। নতুন লেখকদের ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ প্রবণতা যেমন থাকে, তেমনি "এটা অমুকের প্রথম বই" বলে একটু লিবারেল করে বিচারের টেন্ডেন্সিও আমাদের মধ্যে এসে যায়। তবে খুব কঠিন সমালোচনার দৃষ্টি দিয়ে দেখলেও আমার মনে হয় না রিফাতের বইটাকে কম নম্বর দেয়া সম্ভব।
"মেয়াদ ফুরানো নাম" গল্পটা নাহিদা খানমের। গল্পটা পড়ার পর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। নাহিদা খানমের জায়গায় নিজে আমার আম্মাকেই যেন দেখতে পেলাম। আম্মাও তো কখনও কখনও বলেছেন "একবার তাজমহল দেখতে গেলে হয়", আম্মাই তো একসময় আমারই পুরনো স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন। মনটা হুহু করে উঠল। গল্পটা মুখে মুখে মাকে শোনালাম, ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছিল। শেষ কবে বই পড়ে এতোটা মন খারাপ হয়েছে মনে নেই। "আমার অচিন আমি" গল্পটা শুরুতে খুব প্রেডিক্টেবল লাগে - এইতো আর্টিস্টের সাথে দেখা হওয়া, ভোলাভালা সতী-সাবিত্রীর এখন প্রেম হবে, শারীরিক সম্পর্ক হবে, আর্টিস্ট দাগা দিয়ে চলে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু না, রিফাতের গল্পটা কেমন যেন মোড় নিলো সম্পূর্ক ভিন্ন একটা দিকে - শরীরী স্বাধীনতার সোচ্চার দাবীতে সে মুখরিত হল না, বরং আটপৌরে এক নারীর নিজেকে আবিষ্কারের পথে যেতে দেখলাম আমরা। "যে দিন গেছে" গল্পটারও টিপিক্যাল কিছু উপাদান আছে কিন্তু ততক্ষণে বুঝে গেছি গল্পগুলোকে বাইরে থেকে খুব সাদামাটা লাগলেও অতটা সরল এরা নয়। আমার মনে হয় আমাদের অনুভূতির এমন একটা স্তর নিয়ে কাজ দেখিয়েছে যে শুধু বন্ধুত্বের বা অবন্ধুত্বের গল্পের গন্ডীতে "যে দিন গেছে"কে আর ফেলা যায় না। "মায়া রহিয়া গেলো" সুন্দর, কিন্তু খুব ইউনিক বলব না হয়ত। সবচেয়ে আশ্চর্য বোধহয় হয়েছি "আনবিয়ারেবল মিনিংলেস অব বিয়িং" গল্পে। অদ্ভূত একটা অস্বস্তি তৈরী হয়েছে মনে এই গল্পটা পড়ার সময়। আমার সত্যি বলতে একটু কম ভালো (তারমানে কিন্তু মোটেই খারাপ নয়, জাস্ট অন্যগুলোর চেয়ে কম পছন্দ) লেগেছে যে দুইটা গল্প তা হল "বৃত্তস্থ ত্রিভুজ" আর "ট্রানজিট লাউঞ্জ"। এ গল্পগুলোতে মনে হল রিফাতের এফোর্টলেস হওয়ার ব্যাপারটা একটু কম খেয়াল করলাম। যেমন- "বৃত্তস্থ ত্রিভুজ" গল্পের বিষয়বস্তু খুবই অভিনব, তবে এর চরিত্ররা যেন একটু জোরজোর করা, মেইড আপ সংলাপ দিচ্ছে। আবার না বললেই নয়, একই গল্পের শেষটায় খাতার কোনায় গোলাপ আঁকার যে বর্ণনাটা আছে ওই জায়গাটুকু আমার কী যে ভালো লেগেছে!"ট্রানজিট লাউঞ্জ" এর শুরুটা খুব ভালো ছিলো, শেষটায় কেমন যেন অন্য গল্পের সেই এক্সিলেন্স পেলাম না।
প্রতিটা গল্পের ভাষা খুব ঝরঝরে, উপমার ব্যবহার অনেক সুন্দর, গল্পের মানুষগুলোর জীবনও ঠিক যেন আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোর মতো। আর তাদের ক্রাইসিস গুলোও ঠিক আমাদেরই মতো, কিন্তু পিয়ার গল্পে তারা অনেক অনেক বেশি স্পষ্ট।
পরীক্ষার পড়ার জন্য সময় বের করাই এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। এজন্যে বইমেলা থেকে কেনা হাতেগোনা কিছু কিংবা কিন্ডলে ভরে রাখা অগণিত বইয়েরা আমার দিকে অসহায় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকলেও করার থাকে না তেমন কিছু। তবু যে প্রায় মাসখানেক সময় লাগিয়ে এই ছোট্ট বইটা পড়ে ফেললাম, তারপর মনে হলো কিছু কথা লেখা দরকার।
স্বীকার করে নেই, বইটা কেনার পেছনে একটা কারণ হচ্ছে পিয়া আপা আমার কলেজের সিনিয়র। কিন্তু পরিচিত বৃত্তে তিনি নিশ্চয়ই একা নন যার বই বেরিয়েছে! কয়দিন আগে বন্ধু জোয়া জিজ্ঞেস করেছিল, পরিচিত কারো বই প্রকাশিত হলে নতুন লেখককে সাপোর্ট করার জন্য কেনা ম্যান্ডেটরি কিনা। সংক্ষেপে বলেছিলাম, জরুরি নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি শুধু সেই বই-ই পয়সা খরচ করে কিনতে রাজি, যে বই আমি পড়তে চাই।
এই বইটা আমি আসলেই পড়তে চেয়েছিলাম, কারণ আপার লেখালিখি সম্পর্কে ধারণা আমার ছিল। হতাশ হবো না, জানতাম। তবে বর্তমান অবসরবিহীন জীবনেও লিখতে বসে যাবো, এতখানি আশা হয়ত করিনি।
সচরাচর ছোটোগল্প আমাকে মুগ্ধ করতে পারে কম, কারণ আমার চোখে এটাই সবচেয়ে কঠিন লিটারেরি ফর্ম। যেকোনো লিটারেচার থেকে আমার একটাই চাওয়া- অন্তত কোনো এক জায়গায় মনে হতে হবে যেন এভাবে ভাবা হয়নি আগে। কোনো দুনিয়া বদলে ফেলা আইডিয়া না, আমি আশায় থাকি সূক্ষ্ম কোনো ইমোশন নিয়ে ভাবতে পারব। "তখন গল্পের তরে" পড়ে এজন্যেই ভালো লেগেছে, কারণ প্রতিটি গল্পের মধ্যে ভাষার মুন্সীয়ানা দেখানোর চেয়ে বেশি যত্ন নেয়া হয়েছে গল্পের প্রতি।
একটা একটা গল্প এক এক দিনে পড়া হয়েছে, অন্যান্য অনেক বইয়ের মতো এক বসায় পড়া হয়নি। তার পেছনে সময়ের অভাব যেমন দায়ী, তেমনি প্রত্যেকটা গল্পের পর একটু চিন্তা করার সময়ের প্রয়োজনটাও কাজ করেছে। আলাদাভাবে উল্লেখ করার মতো মনে হলো "যে দিন গেছে" আর "আনবিয়ারেবল মিনিংলেস অব বিয়িং" গল্পদু'টো। আমার এক্সপেকটেশন মিটিয়েছে বইটা, এজন্যেও অন্তত কিছু লেখা প্রয়োজন মনে করলাম।
তখন গল্পের তরে রিফাত আনজুম পিয়ার প্রথম গল্পের বই। আমি যখন বইটা হাতে নিই তখন মনে হয়েছিল ভালো লাগবে? কেন?
পাতা উল্টে মনে হচ্ছিল এতো স্বছন্দে একটা মানুষ গল্প বলে যাচ্ছে, ভালো লাগবে না?
মোটাদাগে বললেও গল্পের হরেক রকম প্রকারভেদ আছে। সব প্রকারভেদের ওপরে চিরায়ত ভাবে গল্প বলার যে কৌশল সেটা। পিয়া আদি কৌশলেই সব গল্প বলেছে। গল্পে উচ্চাভিলাষ নেই, কৌশলের বাড়াবাড়ি নেই। নিরেট সব গল্প।
যেমন বৃত্তস্থ ত্রিভুজ গল্পটা। ভাইয়ের প্রেমিকাদের সাথে তার নিজ বোনের সম্পর্ক নিয়ে অদ্ভুত একটা গল্প। এত সাধারণ বিষয়কে এভাবে দুরন্ত মনস্তাত্ত্বিক চালে নিয়ে আসার জন্য পিয়াকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যায় না।
প্রায় সব গল্প ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে গল্পের বিষয় নির্বাচন।
'জোনাকির রঙে ঝিলমিল' জীবনের কিছু কথা আছে এখানে। যে জীবন শালিকের-দোয়েলের তার সাথে দেখা হয় এখানে। এ বই এমন এক আবিষ্টতা দেয়- ভালো লাগায় চুপ করে বসে থাকি এক একটা গল্প পড়া শেষ হলে, বসে থাকি মধুর দুঃখ যাপনের আবেশে। সব কটা গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী, সব কটা গল্পের নামেই কবিতার ছন্দ; নারী কবিতার মতো বলে? নাকি কবিতার মতো জীবন খোঁজে বলে?
'তখন গল্পের তরে' গল্পগ্রন্থটি আমাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন নারীর গল্প শোনায়। শোনায় বিভিন্ন জনের কথা। গল্পগ্রন্থে বিদ্যমান সাতটি গল্পের প্রতিটির প্রধান চরিত্র নারী। গল্পগুলো কোন নীতিকথা শোনায় না বরং একজন মানুষের চোখে দেখে যাওয়া একটা সমাজ ব্যবস্থাকে উপস্থাপন করে। যে সমাজ ব্যবস্থায় সেখানের নারীরা কীভাবে বাঁচে তার চিত্র ফুঁটিয়ে তোলার দিকে নজর ছিলো লেখিকার। সেই নজরে নেই কোন প্রাচুর্য কিংবা কোনকিছুকে বাড়িয়ে তোলার আকাঙ্খা।
প্রথম গল্পটি হলো 'মেয়াদ ফুরানো নাম'। গল্পটি নাহিদা খানম নামের একজন নারীর। যিনি পরিবারকে আগলে রাখতে রাখতে বৃদ্ধ হচ্ছেন। তার শখ হয় নিজের চোখে একবার তাজমহল দেখবে। সেই শখ পূরণের পথের গল্প লেখিকার বয়ানে উঠে আসে। তারচেয়ে বড় কথা সেসব গল্প থমকে দেয় আমার মনকে। চিন্তা করতে বাধ্য করে পরিবারের প্রতিটি মা কী নাহিদা খানম নয় কী?
এরপরে তৃতীয় গল্পের নাম হলো 'যে দিন গেছে' দুই বান্ধবীর অদ্ভুত টানাপোড়েনের গল্প। তাদের মধ্যেকার মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রভাব ফেলে যায়। কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সুযোগ দেয় না আমাকে। তাদের টানাপোড়েনের মাঝে পাঠক পৃষ্ঠ হতে থাকেন।
এই দুইটি গল্প ছাড়াও দ্বিতীয় গল্প 'আমার অচিন পাখি' 'ট্রানজিট লাউঞ্জ', 'মায়া রহিয়া গেলো' চমৎকার সব গল্প।
একজন লেখক পাঠককে গল্প বলে টেনে নেয় গল্পের ভিতরে। তখন পাঠকের মনোজগতে ঘুরতে থাকে লেখকের গড়ে দেওয়া ভুবন। সেই ভুবন লেখিকা খুব সুন্দর করে গড়ে তোলেন। যার কারণে প্রতিটি গল্প সহজ এবং সারল্যপূর্ণ হলেও তার ভেতরের ঢুকে যেতে হয়, চিন্তা করতে হয়। সবশেষে পাঠককে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। সেই সিদ্ধান্ত পাঠকের মনোজগতে গড়ে ওঠা আরো পাঁচটা সিদ্ধান্তের মতো হলেও সেখানে রোপিত থাকে লেখিকার চিন্তার ফসল।
এটা গত কয়েক বছরে আমার পড়া সবচেয়ে ভালো ছোটগল্পের বই। বিশেষ করে ভালো লেগেছে "আমাদের যে দিন গেছে" শীর্ষক গল্পটি। সবগুলি গল্পের মুখ্য চরিত্র নারী। প্রতিটা গল্পই পাঠককে ভাবাবে, চিন্তার খোরাক যোগাবে এবং আপনি চিন্তা করতে বাধ্য। কোন ভাষাগত কারুকার্য বা গভীর জলের দার্শনিক কথাবার্তা নাই, সাধারণ জীবনের গল্পই উঠে এসেছে এখানে, স্পষ্ট ও সাবলীল ভাবে, তবুও তারা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এটা আমি বর্তমান সময়ের অবশ্যপাঠ্য একটা বই হিসেবে বিবেচনা করছি।
(অরূপরতনদা আর মহামুনি হারুন ভাই - এক্ষুনি এনাদের রিভিউ পড়ে আসেন, যান)
স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীলভাবে বর্ণিত এত বাস্তব গল্প পড়িনি অনেক দিন। গল্পগুলো এ সময়ের। গল্পগুলো আমাদের খুব চেনা। গল্পের চরিত্রেরাও আমাদের পরিচিত। তবু গল্পপাঠ শেষে আশ্চর্য হতে হয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গল্পগুলো সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘চেনা জগৎ, অচেনার স্বাদ’। একইসঙ্গে ‘এক মেধাবী গল্পকারের আবির্ভাব ঘটেছে বাংলাদেশের সাহিত্যে’—রিফাত আনজুম পিয়া সম্পর্কে বলা তাঁর এ কথার সঙ্গেও একমত না হয়ে পারা যায় না।
পিয়ার গল্পের চরিত্ররা আপন ভাষায় বাক্যালাপ করে। এই ভাষা খুবই ঘরোয়া, আড়ম্বরহীন। গল্পে নেই বিশেষ কোন চমক। গল্প পড়তে পড়তে অনেক সময় গল্পের পরিণতিও প্রেডিক্ট করা যায় খুব ইজিলি। অর্থাৎ গল্পে আউট অব দ্যা বক্স কোন এলিমেন্ট নেই বললেই চলে.. তবুও গল্পগুলো পড়তে ভালো লাগে। কেন? এই ‘কেন’ এর পিছনের লজিক খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই মাথায় আসে স্পন্টেনিয়াস ভাষার ব্যাপারটা.. জটিল সব বিষয়গুলোও পিয়া বলে যাচ্ছেন খুব সহজেই.. ভাষা সহজ কিন্তু একদমই হালকা না.. ফলে, এফোর্টলেসলি গল্প পড়তে পড়তে পাঠক আনন্দও পাবে.. আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, স্টোরি টেলিং.. পরিচিত গল্পগুলোকেই পিয়া বলছেন একটু অপরিচিত স্বরে .. ফলে গল্পের প্রতি লাইনে উঁকি মারতে বাধ্য হয় সন্ধানী মন। আরও একটা এক্স-ফ্যাক্টরের কথা না বললেই নয়, পিয়ার ইমোশনাল ডেলিভারি নিঃসন্দেহে চমৎকার.. ইমোশনাল এলিমেন্টগুলো মোক্ষম জায়গায় ব্যবহার করেছেন বলেই হয়তো গল্পের শেষে থেকে যায় রেশ।
প্রাণী কূল সবসময় একটা নীড় খুঁজে, যেখানে শান্তি মিলে। সন্ধ্যা হলে তাই পাখিরা ফিরে আসে। অফিস ফেরতা মানুষ সমস্ত ক্লান্তি ভুলে, গাড়িতে বাদুড় ঝোলা হয়ে কিংবা পায়ে হেঁটে ঘরে ফিরে। কারণ এই ঘর, এই নীড়ে শান্তি মিলে,এখানে ফিরলে স্বস্তি আসে। হোম,সুইট হোম।
প্রত্যকটা পাঠকের ও তেমনি কিছু শান্তির নীড় আছে। সেই নীড় হচ্ছে, এমন সব লেখা যেটা পড়লে,নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। অসম্ভব স্বস্তি তে পাঠের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে তখন। রিফাত আনজুম পিয়া'র লেখায় আমার পাঠের স্বস্তি ফিরে পেয়েছি। এত সুন্দর লেখা, আহ্! এই লেখার একমাত্র সঠিক উপমা হচ্ছে "পড়ন্ত বেলার শান্ত নদী। গায়ের ডুবন্ত সূর্যের রাঙা আলো, ঢেউ বাড়াবাড়ি নেই,ধীর লয়ে বয়ে যাচ্ছে শুধু....
গল্পগুলো যদি ভালো না ও হতো,আমি পড়ে যেতাম,শুধু মাত্র লেখকের মখমলে লেখার জন্য। এত চমৎকার লেখার কাছে অসাধারণ গল্পগুলো উপরি পাওনা। প্রথম চার টা গল্প অসাধারণ। অনবদ্য। শেষের তিন ও ভালো, কিন্তু প্রথম গল্পগুলোর তুলনায় একটু ক্লিশে লেগেছে।
এই বই শেষ করে,একটা ই কথা বলা যায়," উনার আগামী বই কবে আসছে,কবে আরেকটা মাস্টারপিস পড়ার সুযোগ পাব?? "
১. মেয়াদ ফুরোনো নাম: ৪.৫/৫ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবারা পরিবারের বোঝা টানতে টানতে তার জীবনের যত আহ্লাদ, ইচ্ছা, শখ সব কিছুকে কবর দিতে শিখে। কিন্তু সেসব পরিবারের মায়েদেরও যে এরকম আহ্লাদ, ইচ্ছা, শখ থাকতে পারে এবং সেগুলো নিয়ে গল্প হতে পারে তা যেনো সবার সামনে থাকলেও চোখে পড়ে না অথবা এ ব্যাপারটা যে থাকতে পারে তাও যেনো কারো মাথায় আসে না।
একজন সংগ্রামী মা, যে তার জীবনের সর্বস্ব দিয়ে বড়ো করেছে এবং করছে তার সন��তানদের, তারও একটা ভয় থাকে, দিন শেষে তার সন্তানের কাছেও তাকেও চাপা দিতে হয় তার খুব গোপন ইচ্ছেগুলোকে, তার আবেগকে, তার আহ্লাদকে। তার কাছে যেনো দাবি আছে সবার, তার কোনো দাবি নাই, দাবি থাকতে নাই, দাবি রাখতে নাই।
২. আমার অচিন আমি: ৫/৫ এরকম একটা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের কোনো একজন লেখিকার পক্ষে লেখা সম্ভব তাই যেনো ভাবতে কষ্ট হয়। গল্পের ফিনিশিংটা এতোটা সুন্দর ছিল যে গল্প শেষ করে প্রায় দশ মিনিট চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলাম।
৩. যে দিন গেছে: ৫/৫ মানুষের কিশোর বয়সের ভালো লাগা যৌবনে, যৌবনের ভালো লাগা মধ্য বয়সে, মধ্য বয়সের ভালো লাগা বার্ধক্যে এসে মিইয়ে যায়। এটাই স্বাভাবিক। এটাই হওয়া উচিত। কিশোর বয়সের ভালো লাগা ব্যাপারগুলো যদি যৌবনেও ভালো লাগে তার মানে আপনার চিন্তা চেতনা আটকে আছে, ইভলভ হচ্ছে না, ডেভেলপ হচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে ছোট বয়সের ভালো লাগা গুলোকে যে খাটো করে দেখতে হবে তাতো নয়। যারা ছোট বয়সের নিজের ভালো লাগা গুলোকে খাটো করে তারা আসলে অন্যের কাছে নিজেকে বড়ো করতে গিয়ে নিজের কাছেই নিজেকে ছোট করে ফেলে। তারা সবার মাঝে একটা সুপিরিয়র কমপ্লেক্সিটিতে আক্রান্ত থাকলেও নিজের কাছে নিজে ইনফেরিওর কমপ্লেক্সিটিতে ভোগে। গল্পের জ্যোতি চরিত্রটি এরকম একটি চরিত্র। এছাড়াও দুজন খুব কাছের বান্ধবীর মানসিক দ্বন্দ্বের, ভালো লাগার, হিংসার, প্রতিযোগিতার বা অহংকারের দ্বিমুখিতাকে লেখিকা চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমি মুগ্ধ।
৪. মায়া রহিয়া গেলো: ৪.২৫/৫ পুরো গল্পটা সাদামাটাই আগাচ্ছিলো। কিন্তু শেষের লাইনটা গল্পটাকে রঙিন করে দিলো, ফাল্গুনের বিকেলের মতো রঙিন, আদুরে, স্নিগ্ধতায় মাখানো যেনো। অনেকদিন একসাথে সংসার করলে ভালোবাসাটা আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায় আবার এই অভ্যাসের আড়ালেই ভালোবাসাটাও লুকিয়ে থাকে, ভিমরুলের চাকের মতো। ছোট একটু উছিলা পেলে সে ভালোবাসা ঝাঁক বেঁধে বেরিয়ে আসে। জড়িয়ে ধরে পুরো শরীর, মন। ভুল হয়ে যায় জীবনের সব ব্যাথা, আক্ষেপ, না পাওয়ার যন্ত্রণা আর হাহাকার।
৫. বৃত্তস্থ ত্রিভুজ: ২.৫/৫ সবচেয়ে দুর্বল গল্প লেগেছে।
৬. আনবিয়ারেবল মিনিংলেস অব বিয়িং: ৪/৫ একাকিত্ব নাকি একা থাকা? মনের চাহিদা আগে নাকি শরীরের? জীবনে বেঁচে থাকার জন্য নাগরিক উষ্ণতা বেশি দরকার নাকি গ্রামের স্নিগ্ধতা? মানুষ হিসেবে আমরা কী চাই? কেন বেঁচে থাকি? একজন মেয়ের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর কেমন? এই প্রশ্নগুলোই বা তার কাছে কীভাবে ধরা দেয়?
গল্পের ভালো লাগা লাইন "যন্ত্র অনেক সময় মানুষের চেয়ে বেশি মানবিক হয়।"
৭. ট্রানজিট লাউঞ্জ: ৪.৫/৫
এ সমাজ বড় নিষ্ঠুর। তথাকতিত সমাজের নিয়মের বাইরে কেউ ছিটকে পড়লে তাদেরকে আমরা আমাদের বাঝে বাঁচার জন্য কোন সুস্থ পরিবেশ রাখি না, রাখতে দেই না। ডিভোর্সি মেয়েদের জীবনে তার নিজের জীবনের কষ্টের সাথে যুক্ত হয় সমাজের দেওয়া চাপ এবং লাঞ্ছনা। এর মাঝে সেই মেয়ের জীবন হয়ে উঠে একাকী। সে একাকীত্বের হতাশা নিয়ে না পারে বাঁচতে না পারে মরতে। এমনি এক মেয়ের দাড়িয়ে ওঠার গল্প এটি, এমনি একটি মেয়ের নিজের মত করে নিজেকে গড়ে তোলার গল্পও এটি । এই পৃথিবী সবার জন্য সুন্দর হোক, সবাই যেনো বাঁচতে পারে নিজের মতো করে এই কামনা করি।
* তখন goodreads এ নতুন। হারুন ভাই আমাকে রেকমেন্ড করলো বইটা। তারপরও want to read এ add করি নাই। তারও অনেক দিন পর হারুন ভাই সশরীরে যখন রিকমেন্ড করলো তখন add করা। ২৩ এর বইমেলায় স্টলের লাস্ট বইটা কেনা। এবং দীর্ঘ ৭ মাস ধরে পড়লাম। হারুন ভাইকে ধন্যবাদ এতো চমৎকার চমৎকার বই সাজেস্ট করার জন্য।
নতুনদের মধ্যে কারা ভাল লেখেন এমন কোন আলোচনায় প্রথম রিফাত আনজুম পিয়ার নাম শোনা। নাম শোনা মাত্রই লেখকদের 'ফলো' করে রাখার একটা বাতিক হয়েছে ইদানিং। ফেসবুকের নীলরঙা নোটবুকে লেখকদের চিন্তার জলপ্রপাত ছাপ রেখে যায়, তাদের চিন্তার উৎস আর গতিধারা সম্পর্কে একটা স্থুল ধারণা হয়তো পাওয়া যায়। লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে একজন সংবেদনশীল মানুষের কল্পনা করা যায়। উৎসাহী হয়ে তাই ছোট বোনকে বলে রেখেছিলাম এই বইমেলায় 'তখন গল্পের তরে' নিয়ে রাখিস। নিজের জীবনের প্রথম বেতন থেকে যেটুকু সে তুলে রেখেছিল দাদাকে উপহার দেবে বলে, সেই অর্থের বিনিময়ে যে দশ বারোখানা বই চব্বিশের বইমেলা ঘুরে আমার হাতে এসেছে তারমধ্যে 'তখন গল্পের তরে' একটি। ছোট গল্পের বইয়ের একটা সুবিধা আছে বলে আমার মনে হয়। প্রতিটি গল্প যেন নতুন জীবন, নতুন সুযোগ। উপন্যাসের সেই ব্যাপারটা নেই। খেই হারিয়ে ফেললে উপন্যাস আর তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না, পাঠকের অবহেলায় তার জায়গা হয় অ্যাস্থেটিক মারানো বুকশেলফের এক ধারে। 'তখন গল্পের তরে'র সাত জীবনের মধ্যে বেশ কয়েকটি করোটির কোথাও দোলা দেয়। পাশের রুমে আমার মা শুয়ে যখন মোবাইল নিয়ে ফেসবুকে রিল হাতড়ান,'মেয়াদ ফুরানো নাম' তখন আমাকে ভাবায়। 'আমার অচিন আমি' আমাকে কঙ্কনা সেন শর্মার 'দ্যা মিরর' কে মনে করিয়ে দেয়। 'যে দিন গেছে' রিলেটেবল বলে অনুভূত হয়। বাকি সব পৃষ্ঠারা গল্পের তরেই আসে শুধু আমার কাছে। তবে তিন জীবন যখন ছায়া ফেলে এই এপ্রিলের তীব্র গরমে, তখন কেন লেখককে সম্ভাবনাময় বলা হয়, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। পঁচিশের বইমেলার জন্যে মুখিয়ে রইলাম।
বেড়াতে গিয়ে খুঁজে পাওয়া এক বুকশপের তাকে সাজানো এই বইটা দেখে এক নজরেই ভালো লেগে গিয়েছিলো। দুই-একটা পাতা উল্টে মনে হলো অনেক সমসাময়িক বই থেকে এই বইটা একটু আলাদা। ভুল ভাবি নি। ইদানীংকালের লেখকদের বই পড়তে কিছুটা অস্বস্তি লাগে আমার। সেই একই ধাঁচের লেখা, একই ধাঁচের কাহিনী! এই বইটা সেগুলো থেকে একদম আলাদা। সাতটা গল্পে সাজানো এই বইয়ের প্রত্যেকটা গল্পই একটি অন্যটি থেকে আলাদা। গল্পের বিষয়বস্তুগুলো খুব গভীর, ইমোশনাল এবং বোল্ড। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা অনেকেই ভাবি না। আর ভাবলেও হয়তো বলতে চাই না মানুষ কি বলবে এই চিন্তায়! লেখিকার লেখনী চমৎকার। কঠিন কঠিন বিষয় তিনি এতো সুন্দরভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন যে তা প্রশংসার দাবিদার। নতুন যুগের সাহিত্যেকদের কাছ থেকে এরকম লেখাই তো কাম্য। লেখিকার জন্য শুভকামনা। সামনে লেখিকার কাছ থেকে আরও চমৎকার কিছু বই পাবো বলে আশা রাখি।
খুব খুব ভাল লেগেছে। এত সাহসী লিখা নতুন লেখকের কাছ থেকে আশা করিনাই। আমাদের পাশের পরিচিত জগতকে, পরিচিত কিছু মানুষকে সম্পুর্ণ নতুন ভাবে চিনলাম। পরের বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।