What do you think?


আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা
স্মৃতিচারণ-মূলক লেখা।
In this memoir, Bimal Kar reminisces about friendships forged throughout his career as an illustrious author. Memories of laughter, arguments come flooding to him as he travels back to all the good times with other authors in College Street. Family stories, literature, jokes – the conversation topics knew no limit. With ‘Ami o Amar Tarun Lekhok Bondhura’, Bimal Kar takes us on a trip down memory lane filled with nostalgia for him while revealing unknown anecdotes about our favourite authors to us.
In this memoir, Bimal Kar reminisces about friendships forged throughout his career as an illustrious author. Memories of laughter, arguments come flooding to him as he travels back to all the good times with other authors in College Street. Family stories, literature, jokes – the conversation topics knew no limit. With ‘Ami o Amar Tarun Lekhok Bondhura’, Bimal Kar takes us on a trip down memory lane filled with nostalgia for him while revealing unknown anecdotes about our favourite authors to us.
- GenresNonfiction
200 pages, Hardcover
Published December 1, 2021
About the author
Bimal Kar
136 books38 followersBimal Kar (Bengali: বিমল কর) was an eminent Bengali writer and novelist. He received 1975 Sahitya Akademi Award in Bengali, by Sahitya Akademi, India's National Academy of Letters, for his novel Asamay.
বিমল কর-এর জন্ম ৩ আশ্বিন ১৩২৮। ইংরেজি ১৯২১। শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। জব্বলপুর, হাজারিবাগ, গোমো, ধানবাদ, আসানসোল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন: ১৯৪২ সালে এ. আর. পি-তে ও ১৯৪৩ সালে আসানসোলে মিউনিশান প্রোডাকশন ডিপোয়। ১৯৪৪-এ রেলওয়ের চাকরি নিয়ে কাশী। মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরাগ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক, পরে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকা ও ‘সত্যযুগ’-এর সাব-এডিটর। এ-সবই ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে। ১৯৫৪-১৯৮২ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২-১৯৮৪ ‘শিলাদিত্য’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদক। বহু পুরস্কার। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৭ এবং ১৯৯২। অকাদেমি পুরস্কার ১৯৭৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার ১৯৮১। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহদাস পুরস্কার ১৯৮২। ‘ছোটগল্প—নতুন রীতি’ আন্দোলনের প্রবক্তা।
প্রয়াণ: ২৬ আগস্ট ২০০৩।
বিমল কর-এর জন্ম ৩ আশ্বিন ১৩২৮। ইংরেজি ১৯২১। শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। জব্বলপুর, হাজারিবাগ, গোমো, ধানবাদ, আসানসোল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন: ১৯৪২ সালে এ. আর. পি-তে ও ১৯৪৩ সালে আসানসোলে মিউনিশান প্রোডাকশন ডিপোয়। ১৯৪৪-এ রেলওয়ের চাকরি নিয়ে কাশী। মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরাগ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক, পরে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকা ও ‘সত্যযুগ’-এর সাব-এডিটর। এ-সবই ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে। ১৯৫৪-১৯৮২ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২-১৯৮৪ ‘শিলাদিত্য’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদক। বহু পুরস্কার। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৭ এবং ১৯৯২। অকাদেমি পুরস্কার ১৯৭৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার ১৯৮১। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহদাস পুরস্কার ১৯৮২। ‘ছোটগল্প—নতুন রীতি’ আন্দোলনের প্রবক্তা।
প্রয়াণ: ২৬ আগস্ট ২০০৩।
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 6 of 6 reviews
November 26, 2023
অজয় দাশগুপ্ত। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। অমলেন্দু চক্রবর্তী। আনন্দ বাগচী। আশিস ঘোষ। দিব্যেন্দু পালিত। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবেশ রায়। নিখিলচন্দ্র সরকার। প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়। প্রফুল্ল রায়। প্রবোধবন্ধু অধিকারী। বরেন গঙ্গোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব গুহ। মিহির মুখোপাধ্যায়। রতন ভট্টাচার্য। শক্তি চট্টোপাধ্যায়। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। শিশির লাহিড়ী। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শেখর বসু। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। সত্যেন্দ্র আচার্য। সমরেশ মজুমদার। সমীর মুখোপাধ্যায়। সুধাংশু ঘোষ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীল দাস। সুনীল বসু। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ। সোমনাথ ভট্টাচার্য।
বইয়ের পিছনে উল্লেখিত নামগুলো আছে। এবং আছে বিমল করের সিগন্যাচার। তাঁর সাইন অনেক কিছুই বলে দেয়। একজন আজীবনের সাহিত্য সাধক, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের চমৎকার মুখবন্ধ অনুসারে সাহিত্য সম্রাট বিমল কর।
আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা। বইয়ের দুই মলাটের মাঝ দিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর আবার একইসাথে আনন্দ-বিষাদে মাখা কালের কথা বলে গেছেন লেখক। উপরে লিখিত লেখকদের কারো কারো বই আমার পড়া আছে। অন্যদিকে আমার সাহিত্য বিষয়ক কম জানার কারণে অনেকের সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলাম। বোদ্ধা পাঠকেরা নিশ্চয় ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন তৎকালীন সাহিত্য রথী-মহারথীদের তরুণ বয়সে লেখকের সাথে যে যোগাযোগ এবং হৃদ্যতা তা নিয়েই এ মেমোয়ার গ্রন্থ রচিত।
১৯৫৭-৫৮ সালে যখন অর্থনৈতিক অবস্থা ভারতে বেশ খানিকটা ভালোর দিকে তখন বই লিখা, বইয়ের দোকান দেয়ার একটা হিড়িকের শুরুটা হয়েছিলো। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের পরবর্তি। আট বছরের আড্ডায় বিমল করের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ থেকে আন্তরিকতা হয়েছে অনেক তরুণ লেখকের। তারপর আড্ডা গেছে এসপ্লানেডে তারপর কার্জন পার্কের ডালিমতলায়। যা সঞ্জীবের মতে বিমলতলা। সেখানে আড্ডা চলমান ছিলো প্রায় সাত বছর।
'দেশ' পত্রিকায় চাকরি করার সুবাদে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিসম লেখক, সম্পাদকের সাথে একত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আড্ডা, খুনশুটি এবং সাহিত্যচর্চা করে গেছেন বিমল কর। চা বাগানের এক সময়ের বড় বাবু বীরেশ্বর বসুর ভাড়াটে ছিলেন বিমল, সাহিত্য প্রেমী বীরেশ্বরের বিমল করের ভাষায় 'দাদা' । লেখক তাঁর উপন্যাস 'দেওয়াল' এর প্রথম খন্ড লিখেছিলেন সেই দাদার দলসিংপাড়া চা বাগানের বাড়িতে বসে। চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর বীরেশ্বর বাবু কলেজ স্ট্রিটে 'কথামালা' বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবোধবন্ধু অধিকারী কথামালার 'অল পারপাজ ম্যান' ছিলেন।
এই বই থেকে জানা যায় 'অগ্রণী'র একটি অনিয়মিত স্টল ছিলো 'কথামালা'র আগে। 'নিজ স্ক্রিপ্ট' এসে হাজির হলো ১৯৬০ সালে। মালিক অশোকানন্দ দাশ, জীবনানন্দের অনুজ। দেখাশোনা করতেন অজয় দাশগুপ্ত যাকে সবাই খোকা হিসেবে বেশি চিনতেন।
বিমল কর এই গ্রন্থে তাঁর তরুণ লেখক বন্ধুদের জীবনী লিখেন নি, না কোন সাহিত্যতত্ত্বের রেফারেন্স বই লিখেছেন। একজন অগ্রজের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি আলোচনা করেছেন সেই সময়ের বেশ ক'জন সম্ভাবনাময় এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের লেখনি, মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিনিয়ত ঘা খাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলী এবং হিউমারসমৃদ্ধ এক একটি ইভেন্টের কথা।
শিল্পী সুবোধ দাশগুপ্ত প্রচ্ছদ করতে গিয়ে কিভাবে বিভিন্ন সময় তাদের ডুবিয়েছেন, দেবেশ রায়ের সাথে বিমল করের অদ্ভুত প্রথম সাক্ষাৎ, প্রফুল্ল রায়ের চরম বাউন্ডুলেপনা, কবি শংকর চট্টোপাধ্যায়ের সাথে জৌতির্ময় গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন ফাজলামি কিংবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের অঘটন-ঘটন-পটিয়সী আচার-আচরণ অনেক কিছুই দেখেছেন লেখক।
বিমল করের ঐ সময়রেখায়ই শীর্ষেন্দু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সমরেশ মজুমদারের লেখালেখির প্রতি শ্রদ্ধার কথা বইয়ে ঘুরেফিরে চলে আসে। এই তিনজন ছাড়াও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখালেখির ব্যাপারে লেখকের মুগ্ধতা বলার মতো। অনেকের অনেক বিষয় বিমল করের হয়তো অপছন্দ ছিলো, তবে সেসব অপছন্দ মনে হয় একজন অগ্রজের দৃষ্টি থেকে দেখেছেন তিনি। বইটি পড়ার সময় ক্লোজ রিডিং করলে বুঝা যায় অনেকের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় তিনি খুব সম্ভবত গোপন করেছেন।
সাহিত্য পাতা করতে গিয়ে তৎকালেও বারবার ধরা খাওয়ার অভিজ্ঞতা এই লিস্টের প্রায় সব লেখকের হয়েছে। বিমল কর একজন সিনিয়র লেখক হওয়ায় নির্লিপ্ত থেকে গেছেন। অনেক অম্ল-মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বইয়ে। লিস্টের নামের বাইরের অনেকে আছেন। উক্ত সময়েই বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত এবং লিজেন্ডারি লেখকেরা উঁকি দিয়ে গেছেন বিমল করের ভাষার জলতরঙ্গ দিয়ে। পারিবারিক-অর্থনৈতিক কারণে বহু লেখকের রাইটিং থেকে সরে আসার কষ্টের গল্প বলেছেন বিমল কর। সাহিত্যে ভাষার ক্ষেত্রে লেখকের মধ্যে রক্ষণশীলতা বরাবরের মতোই ছিলো না। তিনি এমনকি তৎকালীন 'শাস্ত্র-বিরোধী আন্দোলন' এর লেখক শেখর-সুব্রত-আশিস-রমানাথের লেখা ফলো করে গেছেন।
যেকোন লেখক কোন রাজনৈতিক দর্শনের কিংবা কী করে বেড়াচ্ছে সেসবের চেয়ে তাদের কোন কোন জনকে নিয়মিত লেখালেখির দিকে ধাবিত করার প্রচেষ্টা বরাবরের মতোই তাঁর মাঝে কাজ করে গেছে।
রতন ভট্টাচার্যের বিয়ে করে রাইটিং এর জগত থেকে গায়েব হয়ে যাওয়া, একই সময়ে সোমনাথ ভট্টাচার্যের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এবং সমান্তরালে দু'জনেরই ক্রিয়েটিভ ফিল্ডে ফিরে আসার আশ্চর্যজনক বর্ণনা আছে বিমল করের লেখনিতে। আনন্দ বাগচীর বাকুরায় গিয়ে রাইটার্স ব্লকে পড়ে যাওয়া, কলকাতায় আসার পর কবি এবং একজন তীক্ষ্ম রম্যলেখক হিসেবে নিজেকে ফিরে পাওয়া, এসবই ঘটেছে সাহিত্যের এই ভেটেরানের জ্ঞাতসারেই।
সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ এবং অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন লেখকের চোখে মুর্শিদাবাদের রত্ন। কখনো সিরাজের সাহেবি চালচলনের কথা আবার কখনো বাঘের মতো বন্ধু শিশির লাহিড়ীর ফূর্তিবাজী যেন পাঠকের চোখের সামনেই চলে আসে বইটি পড়ার সময়।
সবচেয়ে মজার লেগেছে নিখিলচন্দ্র সরকারের বিয়ের লগ্ন মিস হওয়ার ভয়ে প্রেসার ডাউন, বাদল বোসের তীব্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে নিখিলকে লগ্ন ধরানো কান্ডটা।
বিমল করের স্মৃতিচারণের উপর বেইস করে অশোক দাস সূচী ও লেখক পরিচিতি বর্ণানুক্রমিকভাবে প্রস্তুত করেছেন।
সাহিত্য অনুরাগীরা এ রিভিউর প্রথমে মেনশন করা লেখকদের সবার গুরুত্বপূর্ণ বই এবং বিমল করের অদ্ভুত সুন্দর ভাষায় সেই সকল বইয়ের টুকরো টুকরো অথচ মোক্ষম পর্যালোচনা পাবেন "আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা'তে।
বিমল করের মতে ইতিহাসের মতো সিরিয়াল স্মৃতিচারণে মেইন্টেইন করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে সাহিত্য করতে যে বিপুল সাধনার প্রয়োজন এবং সাহিত্যের পারম্পর্যের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করতে এই চমৎকার বইটি সচেতন পাঠকের খুব ভালো লাগতে পারে। এই বইয়ে লেখকদের প্রতি আছে রাইটিং ক্রাফ্টস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইট। আমার মতে "আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা"তে পাঠকের ফিরে আসা যাবে বহুবার।
বই রিভিউ
নাম : আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা
লেখক : বিমল কর
প্রথম কমলা-গিতা-বীণা প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২১
দ্বিতীয় মুদ্রণ : আগস্ট ২০২২
প্রচ্ছদ : মৃণাল শীল
পরিবেশক : পত্রভারতী
জনরা : মেমোয়ার
রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
বইয়ের পিছনে উল্লেখিত নামগুলো আছে। এবং আছে বিমল করের সিগন্যাচার। তাঁর সাইন অনেক কিছুই বলে দেয়। একজন আজীবনের সাহিত্য সাধক, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের চমৎকার মুখবন্ধ অনুসারে সাহিত্য সম্রাট বিমল কর।
আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা। বইয়ের দুই মলাটের মাঝ দিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর আবার একইসাথে আনন্দ-বিষাদে মাখা কালের কথা বলে গেছেন লেখক। উপরে লিখিত লেখকদের কারো কারো বই আমার পড়া আছে। অন্যদিকে আমার সাহিত্য বিষয়ক কম জানার কারণে অনেকের সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলাম। বোদ্ধা পাঠকেরা নিশ্চয় ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন তৎকালীন সাহিত্য রথী-মহারথীদের তরুণ বয়সে লেখকের সাথে যে যোগাযোগ এবং হৃদ্যতা তা নিয়েই এ মেমোয়ার গ্রন্থ রচিত।
১৯৫৭-৫৮ সালে যখন অর্থনৈতিক অবস্থা ভারতে বেশ খানিকটা ভালোর দিকে তখন বই লিখা, বইয়ের দোকান দেয়ার একটা হিড়িকের শুরুটা হয়েছিলো। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের পরবর্তি। আট বছরের আড্ডায় বিমল করের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ থেকে আন্তরিকতা হয়েছে অনেক তরুণ লেখকের। তারপর আড্ডা গেছে এসপ্লানেডে তারপর কার্জন পার্কের ডালিমতলায়। যা সঞ্জীবের মতে বিমলতলা। সেখানে আড্ডা চলমান ছিলো প্রায় সাত বছর।
'দেশ' পত্রিকায় চাকরি করার সুবাদে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিসম লেখক, সম্পাদকের সাথে একত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আড্ডা, খুনশুটি এবং সাহিত্যচর্চা করে গেছেন বিমল কর। চা বাগানের এক সময়ের বড় বাবু বীরেশ্বর বসুর ভাড়াটে ছিলেন বিমল, সাহিত্য প্রেমী বীরেশ্বরের বিমল করের ভাষায় 'দাদা' । লেখক তাঁর উপন্যাস 'দেওয়াল' এর প্রথম খন্ড লিখেছিলেন সেই দাদার দলসিংপাড়া চা বাগানের বাড়িতে বসে। চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর বীরেশ্বর বাবু কলেজ স্ট্রিটে 'কথামালা' বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবোধবন্ধু অধিকারী কথামালার 'অল পারপাজ ম্যান' ছিলেন।
এই বই থেকে জানা যায় 'অগ্রণী'র একটি অনিয়মিত স্টল ছিলো 'কথামালা'র আগে। 'নিজ স্ক্রিপ্ট' এসে হাজির হলো ১৯৬০ সালে। মালিক অশোকানন্দ দাশ, জীবনানন্দের অনুজ। দেখাশোনা করতেন অজয় দাশগুপ্ত যাকে সবাই খোকা হিসেবে বেশি চিনতেন।
বিমল কর এই গ্রন্থে তাঁর তরুণ লেখক বন্ধুদের জীবনী লিখেন নি, না কোন সাহিত্যতত্ত্বের রেফারেন্স বই লিখেছেন। একজন অগ্রজের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি আলোচনা করেছেন সেই সময়ের বেশ ক'জন সম্ভাবনাময় এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের লেখনি, মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিনিয়ত ঘা খাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলী এবং হিউমারসমৃদ্ধ এক একটি ইভেন্টের কথা।
শিল্পী সুবোধ দাশগুপ্ত প্রচ্ছদ করতে গিয়ে কিভাবে বিভিন্ন সময় তাদের ডুবিয়েছেন, দেবেশ রায়ের সাথে বিমল করের অদ্ভুত প্রথম সাক্ষাৎ, প্রফুল্ল রায়ের চরম বাউন্ডুলেপনা, কবি শংকর চট্টোপাধ্যায়ের সাথে জৌতির্ময় গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন ফাজলামি কিংবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের অঘটন-ঘটন-পটিয়সী আচার-আচরণ অনেক কিছুই দেখেছেন লেখক।
বিমল করের ঐ সময়রেখায়ই শীর্ষেন্দু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং সমরেশ মজুমদারের লেখালেখির প্রতি শ্রদ্ধার কথা বইয়ে ঘুরেফিরে চলে আসে। এই তিনজন ছাড়াও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখালেখির ব্যাপারে লেখকের মুগ্ধতা বলার মতো। অনেকের অনেক বিষয় বিমল করের হয়তো অপছন্দ ছিলো, তবে সেসব অপছন্দ মনে হয় একজন অগ্রজের দৃষ্টি থেকে দেখেছেন তিনি। বইটি পড়ার সময় ক্লোজ রিডিং করলে বুঝা যায় অনেকের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় তিনি খুব সম্ভবত গোপন করেছেন।
সাহিত্য পাতা করতে গিয়ে তৎকালেও বারবার ধরা খাওয়ার অভিজ্ঞতা এই লিস্টের প্রায় সব লেখকের হয়েছে। বিমল কর একজন সিনিয়র লেখক হওয়ায় নির্লিপ্ত থেকে গেছেন। অনেক অম্ল-মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বইয়ে। লিস্টের নামের বাইরের অনেকে আছেন। উক্ত সময়েই বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত এবং লিজেন্ডারি লেখকেরা উঁকি দিয়ে গেছেন বিমল করের ভাষার জলতরঙ্গ দিয়ে। পারিবারিক-অর্থনৈতিক কারণে বহু লেখকের রাইটিং থেকে সরে আসার কষ্টের গল্প বলেছেন বিমল কর। সাহিত্যে ভাষার ক্ষেত্রে লেখকের মধ্যে রক্ষণশীলতা বরাবরের মতোই ছিলো না। তিনি এমনকি তৎকালীন 'শাস্ত্র-বিরোধী আন্দোলন' এর লেখক শেখর-সুব্রত-আশিস-রমানাথের লেখা ফলো করে গেছেন।
যেকোন লেখক কোন রাজনৈতিক দর্শনের কিংবা কী করে বেড়াচ্ছে সেসবের চেয়ে তাদের কোন কোন জনকে নিয়মিত লেখালেখির দিকে ধাবিত করার প্রচেষ্টা বরাবরের মতোই তাঁর মাঝে কাজ করে গেছে।
রতন ভট্টাচার্যের বিয়ে করে রাইটিং এর জগত থেকে গায়েব হয়ে যাওয়া, একই সময়ে সোমনাথ ভট্টাচার্যের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এবং সমান্তরালে দু'জনেরই ক্রিয়েটিভ ফিল্ডে ফিরে আসার আশ্চর্যজনক বর্ণনা আছে বিমল করের লেখনিতে। আনন্দ বাগচীর বাকুরায় গিয়ে রাইটার্স ব্লকে পড়ে যাওয়া, কলকাতায় আসার পর কবি এবং একজন তীক্ষ্ম রম্যলেখক হিসেবে নিজেকে ফিরে পাওয়া, এসবই ঘটেছে সাহিত্যের এই ভেটেরানের জ্ঞাতসারেই।
সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ এবং অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন লেখকের চোখে মুর্শিদাবাদের রত্ন। কখনো সিরাজের সাহেবি চালচলনের কথা আবার কখনো বাঘের মতো বন্ধু শিশির লাহিড়ীর ফূর্তিবাজী যেন পাঠকের চোখের সামনেই চলে আসে বইটি পড়ার সময়।
সবচেয়ে মজার লেগেছে নিখিলচন্দ্র সরকারের বিয়ের লগ্ন মিস হওয়ার ভয়ে প্রেসার ডাউন, বাদল বোসের তীব্র গতিতে গাড়ি চালিয়ে নিখিলকে লগ্ন ধরানো কান্ডটা।
বিমল করের স্মৃতিচারণের উপর বেইস করে অশোক দাস সূচী ও লেখক পরিচিতি বর্ণানুক্রমিকভাবে প্রস্তুত করেছেন।
সাহিত্য অনুরাগীরা এ রিভিউর প্রথমে মেনশন করা লেখকদের সবার গুরুত্বপূর্ণ বই এবং বিমল করের অদ্ভুত সুন্দর ভাষায় সেই সকল বইয়ের টুকরো টুকরো অথচ মোক্ষম পর্যালোচনা পাবেন "আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা'তে।
বিমল করের মতে ইতিহাসের মতো সিরিয়াল স্মৃতিচারণে মেইন্টেইন করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে সাহিত্য করতে যে বিপুল সাধনার প্রয়োজন এবং সাহিত্যের পারম্পর্যের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করতে এই চমৎকার বইটি সচেতন পাঠকের খুব ভালো লাগতে পারে। এই বইয়ে লেখকদের প্রতি আছে রাইটিং ক্রাফ্টস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইট। আমার মতে "আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা"তে পাঠকের ফিরে আসা যাবে বহুবার।
বই রিভিউ
নাম : আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা
লেখক : বিমল কর
প্রথম কমলা-গিতা-বীণা প্রকাশ : ডিসেম্বর ২০২১
দ্বিতীয় মুদ্রণ : আগস্ট ২০২২
প্রচ্ছদ : মৃণাল শীল
পরিবেশক : পত্রভারতী
জনরা : মেমোয়ার
রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
August 25, 2025
লেখকদের লেখা ও লেখক নিয়ে স্মৃতিকথা বা আত্মজৈবনিক ধরণের লেখাপত্রে আমার খুব আগ্রহ। যে সারস্বত জীবন আমার নাগালের বাইরে সেটার বর্ণনায় অন্য এক দুনিয়ার আভাস পাই। বিমল করের এই বইটি তাই খুব আগ্রহ নিয়ে বসেছিলাম। পড়ে হতাশ হলাম খুব। লেখক যে নিজ ইচ্ছায় এই স্মৃতিচারণ লিখতে বসেননি, তা লেখার পরতে পরতে বোঝা যায়। সবাই মিলে চেপে ধরেছে বলে কোনরকমে যখন যা মনে এসেছে তিনি লিখেছেন। তবে হ্যাঁ, সবই খুব ভালোভালো ভাসা ভাসা কথা ; শক্তি ছেলেটা মস্ত কবি তবে একটু পাগলাটে, প্রফুল্লটা কি যে একটা উপন্যাস লিখে আর লিখলোনা, অমুকের গদ্য কত ভালো কিন্তু এখনো কি লিখে? এমন টাইপ সব মন্তব্য। দায়সারাভাবে সবাইকে নিয়ে কিছু মিষ্টি মিষ্টি কথা। তবে ডালিমতলার তাঁদের সেই বিখ্যাত আড্ডা কিংবা নিজ সময়ের ছবি, দৃশ্যকল্প বা সাহিত্যিকদের স্মৃতিপট একেবারেই আসেনি সেটা নয়। আমার প্রত্যাশাটা হয়তো বেশি ছিলো। ভেবেছিলাম অচ্যিন্তকুমারের "কল্লোলযুগ" ধরণের কিছু পড়বো। তাই হয়তো ধরা খেলাম।
May 13, 2025
বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়তে বসেছিলাম। দেখলাম সবার ব্যাপারে মন জোগানো কথাবার্তা দেয়া। মনে হলো লেখক কাউকে আহত করতে চান না। তাই মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছেন। বিশেষ আগ্রহ ছিল সুনীল, শক্তি আর শ্যামলের ব্যাপারে। তিনজনের কথাই এসেছে। তবে তিন জনের লেখালেখি নিয়ে যতটা না এসেছে তারচেয়ে ব্যক্তি হিসেবে বেশি এসেছে।
ঠিক মন ভরলো না।
ঠিক মন ভরলো না।
October 17, 2025
পুরো বই জুড়ে যাদের কথাই লেখক এনেছেন তাদের সবাই খুব ভালো, তাদের লেখাও খুব ভালো। সর্বমঙ্গলময়।
এমন মন জোগানো লেখা ভালো লাগলো না।
প্রতিটি লেখা একই স্টাইলে। অমুককে এত বছর ধরে চিনি-অমুক এই করেছেন সেই করেছেন, এভাবে লেখা৷
এমন মন জোগানো লেখা ভালো লাগলো না।
প্রতিটি লেখা একই স্টাইলে। অমুককে এত বছর ধরে চিনি-অমুক এই করেছেন সেই করেছেন, এভাবে লেখা৷
June 24, 2025
বই: আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা
লেখক: বিমল কর
প্রকাশনী: পত্র ভারতী (ভারত)
পৃষ্ঠা: ১৯৯
মূল্য: ৩০০ রূপী
বিমল করের স্মৃতিচারণ-মূলক লেখা "আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা"। তৎকালীন সাহিত্য জগতের তরুণ লেখকদের লেখালেখির শুরুর দিকটা এবং সেই বিষয়ক আড্ডার স্মৃতিকথা এই বই। ঝরঝরে, স্বচ্ছল বাক্যে লেখা বইটি পড়তে যেমন সহজ ও সরস, ঠিক তেমনি আগ্রহোউদ্দীপক। স্মৃতিচারণ-মূলক লেখা হলেও এই সংকলনে নিজের কথার চেয়ে অনেক অনেক তরুণ সাহিত্যিকের কথাই হয়েছে যারা পরে যেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য জগতের রথী-মহারথীতে।
বইয়ের দোকানে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে কিছু দোকান সবে মাত্র শুরু। এই সময়ের দুটো দোকান - "কথামালা" এবং "নিউ স্ক্রিপ্ট"। কথামালার মালিক বীরেশ্বর বসু। আর নিউ স্ক্রিপ্ট এর মালিক শ্রীঅশোকানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের অনুজ তিনি। প্রথম দিকে "কথামালা"র সামনেই বসে সেই সব তরুণ সাহিত্যিকদেদর নিত্য আড্ড। ধীরে ধীরে সময় বুঝে সেই আড্ডা "নিউ স্ক্রিপ্ট" দোকনের সামনেও বিস্মৃতি লাভ করে।
আমাদের দেশে এরকম প্রাকটিস ঠিক আছে কিনা আমার চোখে পড়েনি, তবে অনেক মুভিতেই দেখেছি বিশেষ বিশেষ প্রিয় ফটোগ্রাফের পিছনে ছোট করে নোট রাখে অনেকে পরবর্তী সময়ে মেমরি-লেনে হাঁটার সুবিধার্থে। "আমি ও আমারা তরুণ লেখক বন্ধুরা" অনেকটা যেন অজস্র স্ন্যাপ-শটের মতো - যার প্রতিটা ছবির পিছনে বিমল কর তার কিছু স্মৃতি লিখে রেখেছেন। বইটি না সাহিত্যের ইতিহাস- না কোন সাহিত্যকর্মের আলোচনা। স্মৃতিকথাটি আক্ষরিক অর্থেই বিমল করের স্মৃতির মাঝে যে সব তরুণ সাহিত্যিকদের সাথে মেলামেশার কথা জড়িয়ে আছে তার আখ্যান।
সেই অর্থে যতটুকু আশা করেছিলাম সেই প্রাপ্তি হয়নি বই থেকে নিশ্চিত। তবে কোন অংশেই বড়সড় কোন শূন্যতাবোধের কারন হয়ে ওঠেনি বইটি। বরং অবশ্যই বইটি বিমল করের অনবদ্য এক সৃজন। অজস্র পার্ষদকে নিয়ে এরূপ কোন আখ্যান যে কোন সাহিত্য-প্রেমী পাঠকের জন্যে গোল্ড-মাইন। বইয়ের প্রচ্ছদেই সেই অজস্র পার্ষদের নামগুলো যথেষ্ঠ বইটির অনবদ্যতা প্রকট করতে -
অজয় দাশগুপ্ত। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। অমলেন্দু চক্রবর্তী। আনন্দ বাগচী। আশিস ঘোষ। দিব্যেন্দু পালিত। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবেশ রায়। নিখিলচন্দ্র সরকার। প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়। প্রফুল্ল রায়। প্রবোধবন্ধু অধিকারী। বরেন গঙ্গোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব গুহ। মিহির মুখোপাধ্যায়। রতন ভট্টাচার্য। শক্তি চট্টোপাধ্যায়। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। শিশির লাহিড়ী। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শেখর বসু। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। সত্যেন্দ্র আচার্য। সমরেশ মজুমদার। সমীর মুখোপাধ্যায়। সুধাংশু ঘোষ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীল দাস। সুনীল বসু। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। সোমনাথ ভট্টাচার্য।
এমন অজস্র নামগুলো এবং তাদের তরুণ বয়সের সাহিত্য-বিষয়ক অথবা সাহিত্যিক-সাহিত্যিক আড্ডাগুলো পাঠককে কিছুটা হলেও তৃপ্তি দেবে ও সমৃদ্ধ করবে।
প্রেমাঙ্কুর আতর্থী আমার অনেক প্রিয় লেখক একজন। তাঁর একটি স্মৃতি দিয়ে শেষ করি:-
“প্রেমাঙ্কুর সম্পর্কে একটা গল্প পড়েছি নলিনীকান্ত সরকারের লেখায়। পড়ে হাসতে হাসতে মরেছি। গল্পটা বলি। একবার উত্তর কলকাতার সাহিত্যিক আড্ডায় এক তর্ক বেঁধে গেল। তর্কের বিষয় গুরুতর কিছু নয়, কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে তর্ক বেঁধে গেলে সেটা যেমন বে-লাইনে চলে যায় সেই রকম প্রেমাঙ্কুর এবং প্রেমাঙ্কুরের অবাঙালী এক বন্ধুর মধ্যে বাগযুদ্ধ শুরু হল, বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ বড়, না, হিন্দী কবি তুলসীদাস? বাগযুদ্ধে এর কোনো মীমাংসা হচ্ছে না দেখে প্রেমাঙ্কুর বন্ধুকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন। বললেন, শোন-আমি এই দিন-দুপুরে নাংগা হয়ে এখান থেকে ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে ওপারে যাব, আবার ফিরে আসব। আমি যদি পারি, আমার বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ বড়; আর তুই যদি পারিস তোর তুলসীদাস বড়। আয়, দেখি। প্রেমাঙ্কুর এরকম অসম্ভব, অবিশ্বাস্য কর্মটি সহজেই করতে পেরেছিলেন। দিনের আলোয় দিগম্বর হয়ে দিব্যি তিনি কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের এপার ওপার করে দেখিয়ে দিলেন, বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ বড়।"
লেখক: বিমল কর
প্রকাশনী: পত্র ভারতী (ভারত)
পৃষ্ঠা: ১৯৯
মূল্য: ৩০০ রূপী
বিমল করের স্মৃতিচারণ-মূলক লেখা "আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা"। তৎকালীন সাহিত্য জগতের তরুণ লেখকদের লেখালেখির শুরুর দিকটা এবং সেই বিষয়ক আড্ডার স্মৃতিকথা এই বই। ঝরঝরে, স্বচ্ছল বাক্যে লেখা বইটি পড়তে যেমন সহজ ও সরস, ঠিক তেমনি আগ্রহোউদ্দীপক। স্মৃতিচারণ-মূলক লেখা হলেও এই সংকলনে নিজের কথার চেয়ে অনেক অনেক তরুণ সাহিত্যিকের কথাই হয়েছে যারা পরে যেয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য জগতের রথী-মহারথীতে।
বইয়ের দোকানে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে কিছু দোকান সবে মাত্র শুরু। এই সময়ের দুটো দোকান - "কথামালা" এবং "নিউ স্ক্রিপ্ট"। কথামালার মালিক বীরেশ্বর বসু। আর নিউ স্ক্রিপ্ট এর মালিক শ্রীঅশোকানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের অনুজ তিনি। প্রথম দিকে "কথামালা"র সামনেই বসে সেই সব তরুণ সাহিত্যিকদেদর নিত্য আড্ড। ধীরে ধীরে সময় বুঝে সেই আড্ডা "নিউ স্ক্রিপ্ট" দোকনের সামনেও বিস্মৃতি লাভ করে।
আমাদের দেশে এরকম প্রাকটিস ঠিক আছে কিনা আমার চোখে পড়েনি, তবে অনেক মুভিতেই দেখেছি বিশেষ বিশেষ প্রিয় ফটোগ্রাফের পিছনে ছোট করে নোট রাখে অনেকে পরবর্তী সময়ে মেমরি-লেনে হাঁটার সুবিধার্থে। "আমি ও আমারা তরুণ লেখক বন্ধুরা" অনেকটা যেন অজস্র স্ন্যাপ-শটের মতো - যার প্রতিটা ছবির পিছনে বিমল কর তার কিছু স্মৃতি লিখে রেখেছেন। বইটি না সাহিত্যের ইতিহাস- না কোন সাহিত্যকর্মের আলোচনা। স্মৃতিকথাটি আক্ষরিক অর্থেই বিমল করের স্মৃতির মাঝে যে সব তরুণ সাহিত্যিকদের সাথে মেলামেশার কথা জড়িয়ে আছে তার আখ্যান।
সেই অর্থে যতটুকু আশা করেছিলাম সেই প্রাপ্তি হয়নি বই থেকে নিশ্চিত। তবে কোন অংশেই বড়সড় কোন শূন্যতাবোধের কারন হয়ে ওঠেনি বইটি। বরং অবশ্যই বইটি বিমল করের অনবদ্য এক সৃজন। অজস্র পার্ষদকে নিয়ে এরূপ কোন আখ্যান যে কোন সাহিত্য-প্রেমী পাঠকের জন্যে গোল্ড-মাইন। বইয়ের প্রচ্ছদেই সেই অজস্র পার্ষদের নামগুলো যথেষ্ঠ বইটির অনবদ্যতা প্রকট করতে -
অজয় দাশগুপ্ত। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। অমলেন্দু চক্রবর্তী। আনন্দ বাগচী। আশিস ঘোষ। দিব্যেন্দু পালিত। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবেশ রায়। নিখিলচন্দ্র সরকার। প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়। প্রফুল্ল রায়। প্রবোধবন্ধু অধিকারী। বরেন গঙ্গোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব গুহ। মিহির মুখোপাধ্যায়। রতন ভট্টাচার্য। শক্তি চট্টোপাধ্যায়। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। শিশির লাহিড়ী। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শেখর বসু। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। সত্যেন্দ্র আচার্য। সমরেশ মজুমদার। সমীর মুখোপাধ্যায়। সুধাংশু ঘোষ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীল দাস। সুনীল বসু। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। সোমনাথ ভট্টাচার্য।
এমন অজস্র নামগুলো এবং তাদের তরুণ বয়সের সাহিত্য-বিষয়ক অথবা সাহিত্যিক-সাহিত্যিক আড্ডাগুলো পাঠককে কিছুটা হলেও তৃপ্তি দেবে ও সমৃদ্ধ করবে।
প্রেমাঙ্কুর আতর্থী আমার অনেক প্রিয় লেখক একজন। তাঁর একটি স্মৃতি দিয়ে শেষ করি:-
“প্রেমাঙ্কুর সম্পর্কে একটা গল্প পড়েছি নলিনীকান্ত সরকারের লেখায়। পড়ে হাসতে হাসতে মরেছি। গল্পটা বলি। একবার উত্তর কলকাতার সাহিত্যিক আড্ডায় এক তর্ক বেঁধে গেল। তর্কের বিষয় গুরুতর কিছু নয়, কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে তর্ক বেঁধে গেলে সেটা যেমন বে-লাইনে চলে যায় সেই রকম প্রেমাঙ্কুর এবং প্রেমাঙ্কুরের অবাঙালী এক বন্ধুর মধ্যে বাগযুদ্ধ শুরু হল, বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ বড়, না, হিন্দী কবি তুলসীদাস? বাগযুদ্ধে এর কোনো মীমাংসা হচ্ছে না দেখে প্রেমাঙ্কুর বন্ধুকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন। বললেন, শোন-আমি এই দিন-দুপুরে নাংগা হয়ে এখান থেকে ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে ওপারে যাব, আবার ফিরে আসব। আমি যদি পারি, আমার বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ বড়; আর তুই যদি পারিস তোর তুলসীদাস বড়। আয়, দেখি। প্রেমাঙ্কুর এরকম অসম্ভব, অবিশ্বাস্য কর্মটি সহজেই করতে পেরেছিলেন। দিনের আলোয় দিগম্বর হয়ে দিব্যি তিনি কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের এপার ওপার করে দেখিয়ে দিলেন, বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথ বড়।"
April 9, 2023
বিমল কর এক অসাধারণ গদ্যলেখক এবং তার সেই অকপট বা 'সাদা বাংলা'য় ঝরঝরে গদ্যে লেখা স্মৃতিচারণামূলক লেখার সংকলন এটি।
না, স্মৃতিচারণা বলতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা এখানে তিনি বলেননি, তার এই রচনায় উঠে এসেছে তার লেখক-জীবনের সান্নিধ্যে আসা, তারসঙ্গে আড্ডা মারার সৌভাগ্য পাওয়া অসংখ্য গদ্যকার, কবি, প্রাবন্ধিকদের সম্বন্ধে যথেষ্ট খোলামেলা অথচ সুপাঠ্য আলোচনা। এই লেখককুলের বেশিরভাগই আমাদের ভীষণ পরিচিত এবং বাংলা সাহিত্যের বহুপঠিত দিকপাল সব....... শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ মজুমদার, অতীন বন্দোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায় প্রমুখ। এদের মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ উল্লেখিত হয়েছে তুলনামূলকভাবে কম খ্যাত সুনীল বসু, তুলসী সেনগুপ্ত, প্রবোধ অধিকারী, রতন ভট্টাচার্য, আশিষ ঘোষ, শেখার বসু, সুব্রত সেনগুপ্ত ও আরো অনেকে এবং তাদের সৃষ্ট বেশ কিছু অমূল্য রচনা যা কিনা বাংলা সাহিত্যকে কম সমৃদ্ধ করেনি। অমলেন্দু চক্রবর্তী বা বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী ঔপন্যাসিকের কথাও অন্য কোথাও এতো গুরুত্ব সহকারে পড়িনি এর আগে।
বইয়ের প্রতিটি আলোচনাই লেখা যেন আড্ডারই ঢংয়ে, পড়তে পড়তে পাঠকও যেন টাইম মেশিনে চড়ে ঘুরে আসবেন কলেজস্ট্রিট বর্ণপরিচয় মার্কেটের নিউস্ক্রিপ্টের আড্ডা বা ধর্মতলার কে সি দাসের আড্ডা কিংবা কার্জনপার্কের ডালিমগাছতলার আড্ডার ঠেক থেকে আর সাথে নিয়ে আসবেন অসংখ্য অজানা তথ্য, দারুন দারুন সব বাংলা উপন্যাস, বাংলা ছোটগল্পের নাম আর গঠনমূলক সমালোচনা। বইটির শেষে সংযোজিত লেখক পরিচিতিটি কাজ সহজ করে দেবে এক মূল্যবান তালিকা তৈরী করতে, যা হয়ে উঠবেই আগ্রহী পাঠকের আগামী দিনের রসদ।
না, স্মৃতিচারণা বলতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা এখানে তিনি বলেননি, তার এই রচনায় উঠে এসেছে তার লেখক-জীবনের সান্নিধ্যে আসা, তারসঙ্গে আড্ডা মারার সৌভাগ্য পাওয়া অসংখ্য গদ্যকার, কবি, প্রাবন্ধিকদের সম্বন্ধে যথেষ্ট খোলামেলা অথচ সুপাঠ্য আলোচনা। এই লেখককুলের বেশিরভাগই আমাদের ভীষণ পরিচিত এবং বাংলা সাহিত্যের বহুপঠিত দিকপাল সব....... শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ মজুমদার, অতীন বন্দোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায় প্রমুখ। এদের মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ উল্লেখিত হয়েছে তুলনামূলকভাবে কম খ্যাত সুনীল বসু, তুলসী সেনগুপ্ত, প্রবোধ অধিকারী, রতন ভট্টাচার্য, আশিষ ঘোষ, শেখার বসু, সুব্রত সেনগুপ্ত ও আরো অনেকে এবং তাদের সৃষ্ট বেশ কিছু অমূল্য রচনা যা কিনা বাংলা সাহিত্যকে কম সমৃদ্ধ করেনি। অমলেন্দু চক্রবর্তী বা বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী ঔপন্যাসিকের কথাও অন্য কোথাও এতো গুরুত্ব সহকারে পড়িনি এর আগে।
বইয়ের প্রতিটি আলোচনাই লেখা যেন আড্ডারই ঢংয়ে, পড়তে পড়তে পাঠকও যেন টাইম মেশিনে চড়ে ঘুরে আসবেন কলেজস্ট্রিট বর্ণপরিচয় মার্কেটের নিউস্ক্রিপ্টের আড্ডা বা ধর্মতলার কে সি দাসের আড্ডা কিংবা কার্জনপার্কের ডালিমগাছতলার আড্ডার ঠেক থেকে আর সাথে নিয়ে আসবেন অসংখ্য অজানা তথ্য, দারুন দারুন সব বাংলা উপন্যাস, বাংলা ছোটগল্পের নাম আর গঠনমূলক সমালোচনা। বইটির শেষে সংযোজিত লেখক পরিচিতিটি কাজ সহজ করে দেবে এক মূল্যবান তালিকা তৈরী করতে, যা হয়ে উঠবেই আগ্রহী পাঠকের আগামী দিনের রসদ।
Displaying 1 - 6 of 6 reviews







