ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় চরিত্র চতুর্থ মুঘল সম্রাট নুরুদ্দিন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর। শিল্পপ্রেমী, স্বভাবে খামখেয়ালী, নিষ্ঠুরতা আর কোমলতায় ভরা এক চরিত্র। বিশতম স্ত্রী নূরজাহানের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের গভীর প্রেম মুঘল ইতিহাসের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ঘটনাগুলোর একটি। আলমপনাহ উপন্যাস কেবল জাহাঙ্গীর ও নূরজাহানের অমর প্রেমের গল্পই নয়, সতেরো শতকের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক অনুপুঙ্খ দলিলও।
আমার হিস্ট্রিক্যাল ফিকশন বরাবরই পছন্দের হলেও আসলে বাংলায় বলার মত হিস্ট্রিক্যাল ফিকশন তেমন কেউ লিখেছেন বলে মনে পড়ে না। অবশ্যই সুনীল, শরদিন্দুর পরে, অন্তত আধুনিককালের হিস্ট্রি বাদ দিয়ে। সেখানে মুঘল সম্রাজ্যের টালমাটাল সময় নিয়ে দুই দুইটা উপন্যাস?? আই এম ইন!!!
লেখক লিখেছেন মন্দ না। প্রাসাদের ভেতরে ও বাহিরে চলা রাজনৈতিক চাল তুলে ধরেছেন দারুণভাবে। কিন্তু শরদিন্দু পড়ে যার হাতেখড়ি, ভাষাটা তার নজরে পড়বে। ওইজন্যেই একতারা কাটলাম।
সম্রাট আকবর, নূরজাহান, জাহাঙ্গীর, খুররম ওরফে শাহজাহান, সবাইই স্বমহিমায় ভাস্বর৷ মাত্র দুইদিনে ২৮৮ পাতার বই পড়া একটু কঠিন, কিন্তু ঘটনা ঘটা শুরু করলে তা চুম্বকের মত টেনে রাখবে আপনাকে। এই বই মুঘল আমলের আমির, দেওয়ান, রাজপুত বীর, মানে সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আপনাকে। আবহ সৃষ্টিতে, কাহিনী বর্ণনায় দারুণ মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন মোস্তাক শরীফ।
সত্যিই মানসম্মত একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস। যারা এ জনরার পাঠক, তাদের জন্য অবশ্য রেকমেন্ড করার মত। আর লেখককেও কুর্নিশ!
প্রথমেই বলতে হয় বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে। সুন্দর মখমলের মতোন একটা প্রচ্ছদ যেন দেখা মাত্রই পড়বার তীব্র বাসনা জাগে মনে। এবারের বইমেলার (২০২৪) অন্যতম সংগ্রহ ছিলো এই বইটি। এখন সুযোগ হলো আয়েশ করে পড়তে বসার।
প্রচ্ছদে বইটিকে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের প্রেমের আখ্যান হিসেবে সম্বোধন করা হলেও শুধুমাত্র প্রেমে সীমাবদ্ধ থাকেনি কাহিনীর বিন্যাস। আদতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মসনদ দখলের বাসনার সময়কাল থেকে শুরু করে তাঁর পুরো শাসনামল এবং সবশেষে পুত্র শাহজাহান এর মসনদে আসিন হওয়ার মাধ্যমে শেষ করে জাহাঙ্গীরের পুরো সময়কালটাকেই তুলে ধরেছেন লেখক বইটির মধ্যে। মসনদ দখল নিয়ে পিতার প্রতি পুত্রের বিদ্রোহ, শাহাজাদাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, প্রসাদ রাজনীতি এবং এবং সেই সাথে জাহাঙ্গীর এবং নুরজাহানের প্রেমের কলি থেকে প্রুস্ফটিত হওয়ার পুরো জার্নিটাই অত্যন্ত চমকপ্রদ ছিল। মেহেরুন্নেসা নামের জেনানা মহলের সেই সামান্য আশ্রিতা এক বিধবা নারী কিভাবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেম এবং মন জয় করে নিয়ে ধীরে ধীরে তীক্ষ্ণ এবং ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন প্রবল প্রতাপশালী এক সম্রাজ্ঞী নূরজাহান হয়ে উঠলেন সেই গল্প পড়ে বিস্মিত হতে হয় বটে! এমনকি একটা সময় সকলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলো যে জাহাঙ্গীরকে কেবল কাঠের পুতুল বানিয়ে রেখে আদতে পেছনে বসে মসনদ চালাচ্ছেন নূরজাহান। মসনদের যোগ্য উত্তরসূরী খুররম উরফে শাহজাহানকে সরিয়ে নিজ জামাতা অযোগ্য শাহরিয়ারকে মসনদে বসানোর পরিকল্পনা এবং রাজনীতি করতে থাকেন দীর্ঘ সময় ধরে। তবে এই কঠিন রাজনীতির মহিলাও একসময় হার মানেন ভাগ্যের কাছে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যু এবং শাহজাহান সম্রাট হয়ে মসনদে বসার পর জীবনের বাকি আঠারোটি বছর লাহোরে সম্রাটের সমাধির পাশে থেকে কাটিয়ে দেন নির্বিরোধী হয়ে।
হিস্ট্রির জনরাতে আমি নতুন পাঠক। নব্য পাঠক হিসেবে বইটি আমাকে ভালোই বিমোহিত করে রেখেছিলো বেশ কিছুদিন যাবত। ইতিহাসই বলে গেছেন লেখক গল্পের মতোন সহজ এবং সাবলিল ভঙ্গিতে। এমনকিছু একটাই আশা করেছিলাম বইটির থেকে এবং নিরাশ হইনি।