বিপ্লবী লেনিনের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন আবুল হাসানাত। মূলত এটিকে কিশোর-উপযোগী জীবনীগ্রন্থ বললেই যথোপযুক্ত হয়। আবুল হাসানাত এই মহান বিপ্লবীর গুণগ্রাহী। তাই লেনিনের কোনো সীমাবদ্ধতা এখানে স্থান পায়নি।
তুখোড় মেধাবী বলতে যা বুঝায় ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ওরফে লেনিন ঠিক তেমন ছিলেন। শিক্ষাজীবনে আ্যকাডেমিক পড়াশোনার বাইরে প্রচুর পড়তেন। এই পড়াশোনা পরবর্তীতে লেনিনকে বাকি দশজনের চাইতে ব্যতিক্রমী হতে সহায়তা করেছিল। ছোটবেলা থেকেই রাজতন্ত্র বিরোধী একটি পরিবেশে লেনিন বেড়ে উঠেছেন। গুপ্ত বিপ্লবী দল গঠন করে জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল লেনিনের বড় ভাই। জার সরকার তাকে ধরে ফেলে এবং ফাঁসি দেয়। এই হত্যাকাণ্ড ব্যক্তিগতভাবে লেনিনকে প্রভাবিত করেছিল। মনের মধ্যে ঘৃণার জন্ম দিয়েছিল জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
ছাত্রাবস্থায় মার্কসের লেখালিখি নিয়ে পাঠচক্রে যোগদান করেছিলেন লেনিন। পরবর্তীতে কিষাণ-মজদুরদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় লেনিনের পাঠচক্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষক ও শ্রমিকদের দেশের সার্বিক অবস্থা বুঝাতে কোনো তত্ত্বকথার আশ্রয় লেনিন নিতেন না। বরং বাস্তব উদাহরণ দিয়ে সহজেই বুঝিয়ে দিতেন। লেনিনের পাঠচক্র হতো সক্রিয় আলোচনার জায়গা। ফলে এই পাঠচক্র থেকে বের হওয়া কর্মীরা আন্তরিকভাবে শ্রমিকদের সাথে মিশে যেতে পারতেন। হয়ে উঠতেন কৃষকদের একজন। ফলে সহজেই তারা মার্কসের মতাদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়তো।
যে-কোনো মতবাদের প্রচারেই প্রসার। জনতার মনোজগতে স্থান করে নেওয়ার কোনো সুযোগ বামপন্থিরা হাতছাড়া করতো না। তারা নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা বের করে তা কৃষক-শ্রমিকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতো। লেনিন নিজেও নিয়মিত পার্টির বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতেন। মোটকথা, বিপ্লবের পরিবেশ তৈরিতে গণমাধ্যমে 'প্রোপাগাণ্ডা' অত্যন্ত জরুরি।
দশ বছরের বেশি সময় নির্বাসনে ছিলেন লেনিন। কিন্তু এই নির্বাসিত জীবন বেছে নেওয়ার আগে তাকে সইতে হয়েছে জেল-জুলুম। রাজার রোষানলে পড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে লেনিনকে। আবুল হাসানাত অল্পকথায় লেনিনের পলাতক জীবনের দিনগুলির কথা লিখেছেন। এসব ঘটনা নিয়ে নির্দ্বিধায় রোমাঞ্চকর থ্রিলার লেখা যাবে।
সরকারের ভয়ে বিচিত্র সব উপায়ে বিপ্লবীরা যোগাযোগ রাখতেন। যেমন: লেনিন দুধ ও রুটি দিয়ে বার্তা পাঠানোর অভিনব কায়দা আয়ত্ত করেছিলেন। যা সাদা চোখে কারো পক্ষে ধরা অসম্ভব।
১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের আগে ফেব্রুয়ারিতে একটি বিপ্লব হয়েছিল। আবার, ১৯০৫ সালের ব্যর্থ বিপ্লব তৈরি করেছিল সফল বিপ্লবের পাটাতন।
বিপ্লব সফল করার চাইতে সফল বিপ্লব ধরে রাখা কষ্টকর। দেশের অভ্যন্তরে বিপ্লবী বনাম প্রতিবিপ্লবী , বিপ্লবী বনাম বিপ্লবী দলগুলোর বিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে চৌদ্দটি দেশের আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয়েছে বিপ্লবকে জিইয়ে রাখতে। লেনিন শান্তিতে দেশশাসন করতে পারেননি। ১৯২৪ সালে তিনি মারা যান।
লেনিন, বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের গুণকীর্তনে লেখক আবুল হাসানাত পঞ্চমুখ। এই জীবনীগ্রন্থকে এক ধরনের প্রোপাগাণ্ডা বলতে বাড়িয়ে বলা হবে না।
এই বই পড়তে গিয়ে ভাবনায় এলো বাংলাদেশে কেন কোনো লেনিনের জন্ম হলো না। অথচ এখানে তো বিপ্লবের উর্বরভূমি হওয়ার সকল উপকরণ মজুদ ছিল। কারণ এদেশের সম্ভাব্য লেনিনদের কারো সাহস ও বুদ্ধিমত্তা থাকলেও বিদ্যাবত্তা ছিল না। আবার, কেউ-বা ছিলেন জনগণের নিকটবর্তী অথচ পড়াশোনায় খুবই নিম্নমানের ও চিন্তাশক্তিতে রিক্ত। সাহস, বিদ্যাবত্তা ও সাংগঠনিক শক্তির মিশ্রণ সম্ভাব্য লেনিনদের ছিল না। তাই এই ভূখণ্ডে লেনিন পয়দা হয়নি।