বইটির লেখক এসএম সাইদুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর। বইয়ের নাম শুনে মনে হতে পারে বইটি শুধু সেনাবাহিনীর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়ে লেখকের স্মৃতিকথা। তবে, বইটি মোটেও তেমন নয়। মূলত, ক্যাডেট কলেজ থেকে সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং সিগন্যাল কোরের কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখা 'জেনারেলদের সাথে'।
আমরা যারা বেসামরিক মানুষ তাদের সামরিক বাহিনী নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। সাইদুল ইসলাম আশির দশকের মাঝামাঝি অর্থাৎ এরশাদের আমলে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন। তিনি ক্যাডেট কলেজের জীবন, আইএসএসবি উতড়ানো এবং বিএমএ থাকাকালীন সময়ের কথা সুন্দরকরে বর্ণনা করেছেন। সাধারণ পাঠকের কথা বিবেচনা করে সামরিক টার্মগুলোর অর্থ টীকাকারে দিয়েছেন।
সেনাবাহিনী থেকে এরশাদের অবসরগ্রহণ এবং এই সংক্রান্ত প্রস্তুতি নিয়ে লেখকের বয়ান,
"বিদায় সংবর্ধনার সুষ্ঠু আয়োজনের লক্ষ্যে একের পর এক মিটিং হতে থাকল। আমার মনে পড়ে গেল, বছর দেড়েক আগে এধরণের একটি মিটিংয়ে আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সত্যি বলতে কি সেই মিটিংয়ের অর্ধেক সময় চলে গিয়েছিল প্রেসিডেন্টকে ডাবের পানি কিভাবে খাওয়ানো হবে সেই আলোচনায়।
বিদায়ের অনুষ্ঠানে এরশাদের স্মৃতিচারণ শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে গেলাম।
ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আতিক আমার স্ত্রীকে বোন ডেকেছিল, সে তো আমার ভাইয়ের মত। এরপর যখন বললেন, সালাম আমার ছেলের মত, তাঁর স্ত্রী রুবিকেও আমি দীর্ঘ দিন ধরে চিনি, তখন সব কিছু মেকি মনে হলো। কারণ জেনারেল এরশাদের বয়স তখন ৫৬ আর জেনারেল সালামের বয়স ৫০ ছুঁয়েছে প্রায়। "
'৮৬ সালের নির্বাচনে তার এক সহকর্মীর অভিজ্ঞতার কথা তিনি এভাবে লিখেছেন,
"ইলেকশন ডিউটি থেকে ফেরা অফিসারদের কাছে তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে অবাক হলাম। দাউদকান্দির কাছে একটি আসনে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার ঘনিষ্ঠ একজন লেফটেন্যান্ট পরাজিত জাতীয় পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বীর আক্রোশের শিকার হন। প্রার্থী প্রথমে তাকে ভালোবাসায় ভোলাতে চেয়েছিলেন, পরে তাঁর ভাবলেশহীন ভাব দেখে গুন্ডা পাঠিয়েছিলেন। অফিসার তাঁকে বেঁধে পুলিশে হস্তান্তর করলে তার অন্য সাগরেদরা আপন পরান বাঁচা নীতি অবলম্বন করায়, পেশি নির্ভর এই প্রার্থীর পরাজয় হয়। সেই প্রার্থীর ভাই ছিলেন সেনাসদরের বড় কর্তাদের একজন। "
প্রার্থীর প্রভাবশালী ভাইয়ের কারণে বেচারা লেফটেন্যান্টকে যথেষ্ট পেশাগত ধকল পোহাতে হয়েছিল।
বইয়ের শেষ অধ্যায়ে দেখি লেখকের পোস্টিং হয়েছে বিডিআরে এবং এই কারণে তার মন ভীষণ খারাপ। লেখক ইঙ্গিত দিয়েছেন তখনকার সেনাকর্মকর্তারা বিডিআরে পোস্টিংকে রীতিমতো পদাবনতির মতো মনে করতেন।
বইটি যথাযথভাবে সম্পাদনা করা হয়নি। অনেক বানান ভুল রয়ে গেছে। সাইদুল ইসলাম পেশাদার লেখক নন। তাই অসাধারণ গদ্যবৈভব আশা করিনি। তবু, বলব লেখা পড়ে হতাশ হয়েছি। বইটিতে এমন কিছুই নেই যা না জানলে পাঠক বড়ো কিছু হাতছাড়া করবেন। ইদানীং অবসরে যাওয়া সেনাকর্মকর্তারা তাদের সেনাজীবন নিয়ে বই লিখছেন। পূর্বে দুটো পড়েছি। তারা ঠিক কেন বই লেখেন তা বুঝতে পারিনি। মেজর আনোয়ারের 'হেল কমান্ডো'র মতো একটা বই তো ওনারা লিখতেই পারছেন না ; এমনকি তার কাছাকাছিও পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।