What do you think?


মেঘপাহাড়
উপন্যাসের শুরুটা একটি মৃত্যু দিয়ে। যে ব্যক্তি মারা যান তিনি এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। না, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা তিনি নন। কিন্তু তার মধ্যে আছে মানবিক গুণাবলির সমাহার। মানুষের জন্য, গ্রামের জন্য, শিক্ষার জন্য তার দরদ সবাইকে মোহিত করে রাখে। সেই ব্যক্তির মৃত্যু দিয়ে উপন্যাসের শুরু। ঘটনাপরম্পরায় এ উপন্যাসে যুক্ত হয় তার পরিবারের সদস্যরা। তাদের চালচলন কথাবার্তা এবং সেই মহান ব্যক্তির সমাপ্ত-অর্ধসমাপ্ত এবং অসমাপ্ত কার্যাবলি ঘিরে এগিয়ে চলে উপন্যাসের চাকা। উপন্যাসের ভাঁজে ভাঁজে কখনো যুক্ত হয় গ্রাম্য পলিটিক্স, কখনো যুক্ত হয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়, কখনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কথা। দীর্ঘ সময় শহরে বাস করে হঠাৎ গ্রামে, নিজ ভিটায়, বাস করতে আসা এই ব্যক্তির আচার-আচরণে প্রথমে গ্রামের সবাই বিভ্রান্ত হলেও পরে বুঝতে পারে, আদতে তিনি চান গ্রামে নারীশিক্ষার প্রসার ঘটুক, গ্রামের মানুষের জীবিকার বিশেষ করে কৃষিনির্ভর মানুষগুলো ভালো থাকুক – এটাই তার কাম্য। তার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের মাঝে গ্রামের মানুষ প্রথমে তারই প্রতিমূর্তি খুঁজে ফেরে। তবে তাদের সঙ্গে তাদের বাবার যে বিস্তর ফারাক তা বুঝতে বেশি সময় নেয় না তারা। অবশ্য এ পরিবারের সবাই তাদের কাছে সম্মানের পাত্র হিসেবেই বিবেচিত হয়। এই সম্মানিত পরিবারের ছোট ছেলে, যে বাবার মৃত্যুর বেশ পরে এ বাড়িতে আসে, তার চোখে হঠাৎ করেই কিছু অসংগতি যেন ধরা পড়ে। তিনি যে বাবাকে চিনতেন-জানতেন, গ্রামের লোকদের বর্ণনার সঙ্গে মাঝে মাঝেই তার কোনো মিল খুঁজে পান না। বিভ্রান্তি পেয়ে বসে তাকে। এর মধ্যে হঠাৎ সেই ব্যক্তির নামে রটে যায়, তার আরেকটি পরিবার রয়েছে, তবে তা অবৈধ, অর্থাৎ বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক ছাড়াই সন্তানের পিতা তিনি। এ নিয়ে সৃষ্টি হয় ধূম্রজাল। চলতে থাকে কানাঘুষা।
128 pages, Hardcover
First published January 1, 2000
About the author
Wasi Ahmed
27 books24 followersওয়াসি আহমেদের জন্ম ১৯৫৪ সালে, সিলেট শহরের নাইওরপুলে। স্কুলের পাঠ বৃহত্তর সিলেটের নানা জায়গায়। পরবর্তী শিক্ষাজীবন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘শবযাত্রী স্বজন’। কথাসাহিত্যে, বিশেষত গল্পে, মনোনিবেশ আশির দশকে। প্রথম গল্প সংকলন ‘ছায়াদণ্ডি ও অন্যান্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। পুস্তকাকারে প্রথম উপন্যাস ‘মেঘপাহাড়’ প্রকাশ পায় ২০০০ সালে। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনসহ কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা অঙ্গনে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব প্রধান সাহিত্য পুরস্কার।
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 5 of 5 reviews
April 11, 2023
৩.৫/৫
ধরুন কাহিনি জমে গেছে। এরপর কী হবে সেটা নিয়ে পাঠক উত্তেজিত। সেই উত্তুঙ্গ মুহূর্তে ওয়াসি আহমেদ তার উপন্যাস শেষ করে দেবেন। প্রায় প্রতিবার। অনেকগুলো "হয়তো", অনেকগুলো "প্রশ্ন" সামনে রেখে। সেই "হয়তো" আর "প্রশ্ন" দুয়ার খুলে দেবে অনেক সম্ভাবনা আর আলোচনার। "মেঘপাহাড় " এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটলো। এটা লেখকের প্রথম উপন্যাস। বরাবরের মতোই খুব সাধারণ আর চেনা গণ্ডি থেকে গল্প শুরু করেছেন ওয়াসি আহমেদ। সেই গল্প একসময় পৌঁছেছে অচিন প্রান্তরে, হতবিহবলকর এক পরিস্থিতিতে; যেমনটা তার উপন্যাসে প্রতিবার ঘটে থাকে। "মেঘপাহাড় " অবশ্য পুরোটাই জমজমাট (সব শ্রেণির পাঠকেরই ভালো লাগার কথা।) মূল গল্প অপ্রধান কোনো কথাসাহিত্যিক এর হাতে পড়লে বস্তাপচা মেলোড্রামায় পরিণত হতে পারতো। শুধু ওয়াসি আহমেদের গম্ভীর, গতিশীল, বিচ্ছুরিত গদ্যের বিভায় গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়েছে।
(১২ এপ্রিল, ২০২৩)
ধরুন কাহিনি জমে গেছে। এরপর কী হবে সেটা নিয়ে পাঠক উত্তেজিত। সেই উত্তুঙ্গ মুহূর্তে ওয়াসি আহমেদ তার উপন্যাস শেষ করে দেবেন। প্রায় প্রতিবার। অনেকগুলো "হয়তো", অনেকগুলো "প্রশ্ন" সামনে রেখে। সেই "হয়তো" আর "প্রশ্ন" দুয়ার খুলে দেবে অনেক সম্ভাবনা আর আলোচনার। "মেঘপাহাড় " এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটলো। এটা লেখকের প্রথম উপন্যাস। বরাবরের মতোই খুব সাধারণ আর চেনা গণ্ডি থেকে গল্প শুরু করেছেন ওয়াসি আহমেদ। সেই গল্প একসময় পৌঁছেছে অচিন প্রান্তরে, হতবিহবলকর এক পরিস্থিতিতে; যেমনটা তার উপন্যাসে প্রতিবার ঘটে থাকে। "মেঘপাহাড় " অবশ্য পুরোটাই জমজমাট (সব শ্রেণির পাঠকেরই ভালো লাগার কথা।) মূল গল্প অপ্রধান কোনো কথাসাহিত্যিক এর হাতে পড়লে বস্তাপচা মেলোড্রামায় পরিণত হতে পারতো। শুধু ওয়াসি আহমেদের গম্ভীর, গতিশীল, বিচ্ছুরিত গদ্যের বিভায় গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়েছে।
(১২ এপ্রিল, ২০২৩)
August 16, 2023
❝তাকিয়ে থেকে চাঁদের পিন্ডটাকে আলাদা করে ধরার উপায় নেই। আকাশভর্তি রেণু-রেণু মিহি-ঠাণ্ডা আলো ছড়িয়ে, সাদা মেঘে এই ভেসে এই ডুবে চাঁদটা মাঝরাতে আর চাঁদ নেই। ধপধপে ধোঁয়ার মতো মেঘ কুণ্ডলী পাকিয়ে, কোথাও হাত-পা এলিয়ে, ঘাড় মাথা শিং বাঁকিয়ে, ডিগবাজি খেয়ে রেণু-রেণু সবটুকু আলো শুষে চাঁদের মুখটা চেপে ধরে আছে। আর চোরাগোপ্তা ফাঁকফোকর দিয়ে ফিনকি- তোলা আলোর ঝাপটায় হাত পা ঘাড় মাথা শিংয়ে হঠাৎ হঠাৎ সিরসির কাঁপুনি উঠছে। চাঁদ নেই। আলোভরাট আকাশে সাদা মেঘ। মেঘ থেকে আলোটা চুঁইয়ে নেমেছে নিচে—ঝুলঝুলে ছেঁড়া কুয়াশায়, তারপর টলতে টলতে যখন গাছপালার মাথায়, টিনের চকমকি চালে, ঝোপঝাড়ে, ঘাসে, মাটিতে, পুকুরে, ডোবায়, তখন মেঘ-কুয়াশার ধোঁয়া নাকি শরৎ আকাশের ছিটেফোঁটা নীলের কারণে জোছনার রঙ-রূপ ঠাহর করা কঠিন হয়ে পড়ে। যারা দেখেছে, দেখে শনাক্ত করতে চেয়েছে জোছনাকে, অথবা আলোঠাসা আকাশে চাঁদ খুঁজে বিফল হয়েছে, তারা জানে, এই চাঁদ-জোছনা কত রহস্যময়!❞
কোনো বই যখন শুরুতেই এত মায়ামাখা শব্দের বুননে পাঠককে আটকে রাখে- তাকে কি ভালো না লেগে পারে?- উপরের কথাগুলো ওয়াসি আহমেদ-এর "মেঘপাহাড়" উপন্যাস থেকে নেয়া। জ্যোৎস্না নিয়ে এত সুন্দর বর্ণনা কখনো পড়েছি বলে মনে হয় না। কলেবরে ছোট হলেও বইটির মূল আকর্ষন হলো এর ভাষাভঙ্গি- কত সহজ শব্দের বুননে এত গভীরভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়, তা মেঘপাহাড় না পড়লে বোধগম্য হতো না।
যাই হোক, রিভিউয়ের মূল থিম হওয়া উচিত এর প্লট, বর্ণনারীতি তো আরো পরের বিষয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত জজের মৃত্যুর মধ্যে শুরু হয় বইটির আসল গল্প। জালালুদ্দিন রিজভী- যিনি অবসর নেয়ার পর তার শিকড়ে ফিরে এসে বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হন, গ্রামবাসীরা তাকে তুলে দেন দেবত্বের উচ্চতায়। মৃত্যুর পর বাবাকে যেন নতুন রূপে আবিষ্কার করতে থাকেন তার ছেলেরা। ছোট ছেলে কামরানের সাথে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ তো আগে থেকেই ছিল বৃদ্ধ জজসাহেবের- শেষের দিকে এসে এটাই প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে যায় সবার সামনে - মানুষ কি কখনো দেবতা হতে পারেন? দেবতাদেরও তো অনেক সময় পদস্থলন ঘটে। কামরানের সাথে জজসাহেবের যুদ্ধ অমিমাংসীত থেকে যায়- সে তখন খুঁজতে থাকে তার বাবার বিচিত্র চিন্তাধারাকে।
প্লটের দিক থেকে অনেকটা গতানুগতিক ধারার মনে হলেও, উপন্যাসটির মূল আকর্ষণ এর বাচনভঙ্গি, এইজন্যই রিভিউটি শুরু করেছি উল্টাদিক থেকে। ওয়াসি আহমেদের অন্য বই গুলোও পড়ে ফেলব শীঘ্রই। দশে আট দেয়ার মতো বইটি।
বইয়ের নাম: মেঘপাহাড়
লেখক: ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশনা : ঐতিহ্য
রচনাকাল: ১৯৯৮
কোনো বই যখন শুরুতেই এত মায়ামাখা শব্দের বুননে পাঠককে আটকে রাখে- তাকে কি ভালো না লেগে পারে?- উপরের কথাগুলো ওয়াসি আহমেদ-এর "মেঘপাহাড়" উপন্যাস থেকে নেয়া। জ্যোৎস্না নিয়ে এত সুন্দর বর্ণনা কখনো পড়েছি বলে মনে হয় না। কলেবরে ছোট হলেও বইটির মূল আকর্ষন হলো এর ভাষাভঙ্গি- কত সহজ শব্দের বুননে এত গভীরভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়, তা মেঘপাহাড় না পড়লে বোধগম্য হতো না।
যাই হোক, রিভিউয়ের মূল থিম হওয়া উচিত এর প্লট, বর্ণনারীতি তো আরো পরের বিষয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত জজের মৃত্যুর মধ্যে শুরু হয় বইটির আসল গল্প। জালালুদ্দিন রিজভী- যিনি অবসর নেয়ার পর তার শিকড়ে ফিরে এসে বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত হন, গ্রামবাসীরা তাকে তুলে দেন দেবত্বের উচ্চতায়। মৃত্যুর পর বাবাকে যেন নতুন রূপে আবিষ্কার করতে থাকেন তার ছেলেরা। ছোট ছেলে কামরানের সাথে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ তো আগে থেকেই ছিল বৃদ্ধ জজসাহেবের- শেষের দিকে এসে এটাই প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে যায় সবার সামনে - মানুষ কি কখনো দেবতা হতে পারেন? দেবতাদেরও তো অনেক সময় পদস্থলন ঘটে। কামরানের সাথে জজসাহেবের যুদ্ধ অমিমাংসীত থেকে যায়- সে তখন খুঁজতে থাকে তার বাবার বিচিত্র চিন্তাধারাকে।
প্লটের দিক থেকে অনেকটা গতানুগতিক ধারার মনে হলেও, উপন্যাসটির মূল আকর্ষণ এর বাচনভঙ্গি, এইজন্যই রিভিউটি শুরু করেছি উল্টাদিক থেকে। ওয়াসি আহমেদের অন্য বই গুলোও পড়ে ফেলব শীঘ্রই। দশে আট দেয়ার মতো বইটি।
বইয়ের নাম: মেঘপাহাড়
লেখক: ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশনা : ঐতিহ্য
রচনাকাল: ১৯৯৮
January 13, 2025
মৃত্যুই মনে হয় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি। যা নিরেট বাস্তবের মত আসি আসি করে একদিন হুট করে সামনে চলে আসে। যাকে এগিয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। মানুষ তবুও এড়িয়ে যেতে চায়। মৃত্যুর মতো সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। কিন্তু যা ভবিতব্য, তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও কি সফল হওয়া যায়?
“মেঘপাহাড়” বইটা পড়া শুরু করেছিলাম ইবুকে। প্রথম অধ্যায় পড়ার পর মনে হলো, বইটার হার্ডকভার আয়েশ করে না পড়তে পারল তৃপ্তি পাওয়া যাবে না। তাই খুঁজে বের করে পড়তেও সময় নেইনি। মানুষের মৃত্যুর মতন নির্মম সত্য, জোছনা ওঠা মায়াবী রাতে প্রকৃতির মিশে যাওয়া— একই সাথে একইরূপে বর্ণনা করার যে দারুণ শব্দের মায়ায় লেখক বেঁধেছেন, এখানেই বইটি প্রথম দফায় সার্থক হয়ে উঠেছে।
“মেঘপাহাড়”-এর গল্প অসাধারণ কিছু না। সাধারণ এ গল্প অসাধারণত্বের ছোঁয়া পেয়েছে লেখকের লিখনশৈলীর জাদুতে। আর এখানেই পাঠককে জড়িয়ে ধরার উপলক্ষ্য রচিত হয়েছে। গল্পটা একজন মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। না, কোনো রহস্যজনক মৃত্যু তাকে ছুঁয়ে যায়নি। সাধারণ, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া জালালুদ্দিন রিজভী শেষ বয়সে এসে যেভাবে বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, সেভাবেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন।
মৃত্যুর বছর বারো আগে তিনি তার পৈতৃক ভিটায় বসতি গেড়েছিলেন। এর আগে সরকারি চাকরির সুবাদে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শেষ বয়সে জজ সাহেব খেতাব পেয়ে নিজ গ্রামে এসে থিতু হতে চেয়েছেন। হয়তো অমরত্বের লোভ পেয়ে বসেছিল। তাই পুরোনো এক ইচ্ছা এখানে পূর্ণ করতে এসেছেন। গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা যেন পড়াশোনা করতে পারে তাই একটি গার্লস স্কুল খোলার তোড়জোড় শুরু করে। সফলও হোন।
নিজ গ্রামে নিজ দায়িত্বে এমন অনেক কিছুই করেছেন, যা তাকে মানুষ থেকে রাতারাতি দেবতার আসনে বসিয়েছে। তবে মানুষ যে দেবতা হতে পারে না, এটা গ্রামের মানুষদের কে বোঝাবে? যে মানুষটা তাদের জন্য এত করল, রাজনীতির ছত্রছায়ায় না থেকেও যে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগা যায়; বিষয়টা বিশ্বাসযোগ্য না। তবুও জালালুদ্দিন রিজভী সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। আর এমন মানুষকে দেবতুল্য মনে না করা পাপ।
মৃত্যুর পরও মানুষ হারিয়ে যায় না। মানুষের মনে থাকে, মূল চরিত্র হয়ে বিচরণ করে। জালালুদ্দিন রিজভীর মৃত্যুর পর গ্রামের বাড়িতে পরিবারের মেলা বসে। সন্তানদের পরিচয় এখানে উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক অন্যরকম মিলনমেলা গড়ে ওঠে। একজন মানুষকে ঘিরে গ্রামের মানুষের ভালোবাসা, তাদের অনুভূতি এখানে গুরুত্বপুর্ণ হিসেবে ধরা দেয়। সেই সাথে গ্রামীণ রাজনীতিও ফুটে উঠেছে সমানভাবে। যে মানুষটা সবাইকে নিয়ে চলেছেন, কোনো দলাদলির মধ্যে ছিলেন না; তার মৃত্যুর পর সেই ভেদাভেদ দৃশ্যমান হবে স্বাভাবিক। যিনি অদৃশ্য সুতোয় সবাইকে বেঁধে রেখেছেন, তিনিই যে নেই।
জালালুদ্দিন রিজভী মৃত্যুর পরও এই গল্পের প্রধান চরিত্র। আর তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তারই ছোট ছেলে কামরান। প্রশ্ন আসতে পারে, ছেলে আবার প্রতিপক্ষ হয় কী করে? একজন শান্ত, ভদ্র, সব মেনে নেওয়া বাবা— যিনি কখনোই কারো উপর গলা উঁচু করে কথা বলেননি, কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি, সব মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন; সন্তানদের মধ্যে কেউ একজন এমন থাকতে পারে যে এই বিষয়গুলোর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় মশগুল।
কামরান তেমনই একজন সন্তান। পড়াশোনার দিক দিয়ে মেধাবী ছেলেকে সুযোগ্য বলাই যায়। কিন্তু বাকি কাজগুলো যে তাকে বিপরীতমুখী করে তোলে। বাবার সাথে বিরোধের সূত্রপাত এখন থেকেই। এই বিরোধ আসলে কতটা গভীর তা হয়তো অনুমান করা যায় না। এই বিরোধ কি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ? না-কি অন্যকিছু? মৃত্যুর মতো নিরেট সত্য কি কামরানের অনুভূতিগুলো বদলে দিবে? না-কি বাবার মুখোমুখি হয়ে একটা হেস্তনেস্ত করতে না পারার আক্ষেপে পোড়াবে?
আমরা মানুষেরা খুব অদ্ভুত। আমাদের অনুভূতিগুলো অদ্ভুত। আমরা যে ভালো কাজের জন্য একজন মানুষকে দেবতার আসনে তুলে ধরতে পারি, ঠিক পরক্ষণেই তাকে কোনো এক ভুলের কারণে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারি। ভুল হয়তো সামান্য, কিংবা মারাত্মক। কিন্তু এর ফলে সব ভালো কাজের ফর্দ ভুলে যাই। নিঃস্বার্থ কাজগুলো তখন ভ্রম বলে মনে হয়। যদিও কোনো এক ভুল বা অন্যকিছু ভালো কাজের পরিধিকে ছোট করতে পারে না। মিথ্যে করতে পারে না। তবুও মানুষের কাছে ভালো কাজের চেয়ে ভুলকেই সবসময় সত্য বলে মনে হয়। আর এখান থেকেই মানুষ পালিয়ে বেড়ায়। সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। কামরানের মতো কেউ কেউ হয়তো মুখোমুখি হতে চায়। কিন্তু সেখানে কতটা সত্য আর কতটা ভ্রম লুকিয়ে থেকে, তা আবিষ্কার করা যায় না।
আগেই বলেছি, বইটির লিখনশৈলী খুবই অসাধারণ। ভাবনার খোরাক যোগায়। ভাষাশৈলী বা গদ্যশৈলী, যাই বলা হোক না কেন— সাধারণ এক গল্পকে অসাধারণ রূপ দিয়েছে। শব্দচয়ন, উপমার প্রয়োগ ও ব্যবহার বইটি পড়ার ক্ষেত্রে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। প্রাকৃতিক রূপের শোভা বর্ধন করেছে। গ্রামীণ পরিবেশের বর্ণনার মধ্যে মায়াবী দৃশ্য লেখক রচনা করতে পেরেছেন। চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রাণ ছিল। খুব বেশি চরিত্রকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যারা গুরুত্ব পেয়েছে প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গা থেকে নিজেদের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত। স্বল্প পরিসরে এভাবে চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তোলাও দক্ষতার মধ্যে পড়ে।
বইটার শেষটা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে গেল। অনেক রহস্যের সমাধান হয়নি। আমাদের জীবন বোধহয় এমনই। কতশত রহস্যের জাল বুনে, তার কতটা সমাধান হয়?
◾বই : মেঘপাহাড়
◾লেখক : ওয়াসি আহমেদ
◾প্রকাশনী : বেঙ্গল পাবলিকেশন
◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
“মেঘপাহাড়” বইটা পড়া শুরু করেছিলাম ইবুকে। প্রথম অধ্যায় পড়ার পর মনে হলো, বইটার হার্ডকভার আয়েশ করে না পড়তে পারল তৃপ্তি পাওয়া যাবে না। তাই খুঁজে বের করে পড়তেও সময় নেইনি। মানুষের মৃত্যুর মতন নির্মম সত্য, জোছনা ওঠা মায়াবী রাতে প্রকৃতির মিশে যাওয়া— একই সাথে একইরূপে বর্ণনা করার যে দারুণ শব্দের মায়ায় লেখক বেঁধেছেন, এখানেই বইটি প্রথম দফায় সার্থক হয়ে উঠেছে।
“মেঘপাহাড়”-এর গল্প অসাধারণ কিছু না। সাধারণ এ গল্প অসাধারণত্বের ছোঁয়া পেয়েছে লেখকের লিখনশৈলীর জাদুতে। আর এখানেই পাঠককে জড়িয়ে ধরার উপলক্ষ্য রচিত হয়েছে। গল্পটা একজন মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। না, কোনো রহস্যজনক মৃত্যু তাকে ছুঁয়ে যায়নি। সাধারণ, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া জালালুদ্দিন রিজভী শেষ বয়সে এসে যেভাবে বার্ধক্যজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, সেভাবেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন।
মৃত্যুর বছর বারো আগে তিনি তার পৈতৃক ভিটায় বসতি গেড়েছিলেন। এর আগে সরকারি চাকরির সুবাদে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শেষ বয়সে জজ সাহেব খেতাব পেয়ে নিজ গ্রামে এসে থিতু হতে চেয়েছেন। হয়তো অমরত্বের লোভ পেয়ে বসেছিল। তাই পুরোনো এক ইচ্ছা এখানে পূর্ণ করতে এসেছেন। গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা যেন পড়াশোনা করতে পারে তাই একটি গার্লস স্কুল খোলার তোড়জোড় শুরু করে। সফলও হোন।
নিজ গ্রামে নিজ দায়িত্বে এমন অনেক কিছুই করেছেন, যা তাকে মানুষ থেকে রাতারাতি দেবতার আসনে বসিয়েছে। তবে মানুষ যে দেবতা হতে পারে না, এটা গ্রামের মানুষদের কে বোঝাবে? যে মানুষটা তাদের জন্য এত করল, রাজনীতির ছত্রছায়ায় না থেকেও যে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগা যায়; বিষয়টা বিশ্বাসযোগ্য না। তবুও জালালুদ্দিন রিজভী সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন। আর এমন মানুষকে দেবতুল্য মনে না করা পাপ।
মৃত্যুর পরও মানুষ হারিয়ে যায় না। মানুষের মনে থাকে, মূল চরিত্র হয়ে বিচরণ করে। জালালুদ্দিন রিজভীর মৃত্যুর পর গ্রামের বাড়িতে পরিবারের মেলা বসে। সন্তানদের পরিচয় এখানে উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এক অন্যরকম মিলনমেলা গড়ে ওঠে। একজন মানুষকে ঘিরে গ্রামের মানুষের ভালোবাসা, তাদের অনুভূতি এখানে গুরুত্বপুর্ণ হিসেবে ধরা দেয়। সেই সাথে গ্রামীণ রাজনীতিও ফুটে উঠেছে সমানভাবে। যে মানুষটা সবাইকে নিয়ে চলেছেন, কোনো দলাদলির মধ্যে ছিলেন না; তার মৃত্যুর পর সেই ভেদাভেদ দৃশ্যমান হবে স্বাভাবিক। যিনি অদৃশ্য সুতোয় সবাইকে বেঁধে রেখেছেন, তিনিই যে নেই।
জালালুদ্দিন রিজভী মৃত্যুর পরও এই গল্পের প্রধান চরিত্র। আর তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তারই ছোট ছেলে কামরান। প্রশ্ন আসতে পারে, ছেলে আবার প্রতিপক্ষ হয় কী করে? একজন শান্ত, ভদ্র, সব মেনে নেওয়া বাবা— যিনি কখনোই কারো উপর গলা উঁচু করে কথা বলেননি, কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি, সব মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন; সন্তানদের মধ্যে কেউ একজন এমন থাকতে পারে যে এই বিষয়গুলোর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় মশগুল।
কামরান তেমনই একজন সন্তান। পড়াশোনার দিক দিয়ে মেধাবী ছেলেকে সুযোগ্য বলাই যায়। কিন্তু বাকি কাজগুলো যে তাকে বিপরীতমুখী করে তোলে। বাবার সাথে বিরোধের সূত্রপাত এখন থেকেই। এই বিরোধ আসলে কতটা গভীর তা হয়তো অনুমান করা যায় না। এই বিরোধ কি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ? না-কি অন্যকিছু? মৃত্যুর মতো নিরেট সত্য কি কামরানের অনুভূতিগুলো বদলে দিবে? না-কি বাবার মুখোমুখি হয়ে একটা হেস্তনেস্ত করতে না পারার আক্ষেপে পোড়াবে?
আমরা মানুষেরা খুব অদ্ভুত। আমাদের অনুভূতিগুলো অদ্ভুত। আমরা যে ভালো কাজের জন্য একজন মানুষকে দেবতার আসনে তুলে ধরতে পারি, ঠিক পরক্ষণেই তাকে কোনো এক ভুলের কারণে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারি। ভুল হয়তো সামান্য, কিংবা মারাত্মক। কিন্তু এর ফলে সব ভালো কাজের ফর্দ ভুলে যাই। নিঃস্বার্থ কাজগুলো তখন ভ্রম বলে মনে হয়। যদিও কোনো এক ভুল বা অন্যকিছু ভালো কাজের পরিধিকে ছোট করতে পারে না। মিথ্যে করতে পারে না। তবুও মানুষের কাছে ভালো কাজের চেয়ে ভুলকেই সবসময় সত্য বলে মনে হয়। আর এখান থেকেই মানুষ পালিয়ে বেড়ায়। সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। কামরানের মতো কেউ কেউ হয়তো মুখোমুখি হতে চায়। কিন্তু সেখানে কতটা সত্য আর কতটা ভ্রম লুকিয়ে থেকে, তা আবিষ্কার করা যায় না।
আগেই বলেছি, বইটির লিখনশৈলী খুবই অসাধারণ। ভাবনার খোরাক যোগায়। ভাষাশৈলী বা গদ্যশৈলী, যাই বলা হোক না কেন— সাধারণ এক গল্পকে অসাধারণ রূপ দিয়েছে। শব্দচয়ন, উপমার প্রয়োগ ও ব্যবহার বইটি পড়ার ক্ষেত্রে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। প্রাকৃতিক রূপের শোভা বর্ধন করেছে। গ্রামীণ পরিবেশের বর্ণনার মধ্যে মায়াবী দৃশ্য লেখক রচনা করতে পেরেছেন। চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রাণ ছিল। খুব বেশি চরিত্রকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যারা গুরুত্ব পেয়েছে প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গা থেকে নিজেদের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত। স্বল্প পরিসরে এভাবে চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তোলাও দক্ষতার মধ্যে পড়ে।
বইটার শেষটা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে গেল। অনেক রহস্যের সমাধান হয়নি। আমাদের জীবন বোধহয় এমনই। কতশত রহস্যের জাল বুনে, তার কতটা সমাধান হয়?
◾বই : মেঘপাহাড়
◾লেখক : ওয়াসি আহমেদ
◾প্রকাশনী : বেঙ্গল পাবলিকেশন
◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
January 21, 2024
ওয়াসি আহমেদ ছোট গল্প থেকে এই বইয়ের মাধ্যমে উপন্যাসে পা রেখেও সমান গভীড়তা দেখিয়েছেন| এর কাহীনিটা শুরু হয় এক গ্রামের এক কিংবদন্তি শিক্ষাবিদের বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু থেকে| তার মৃত্যুর পর তার বাড়িতে নানান লোকেদের সমাগম হয়, কেউ আত্মীয়, কেউ সুদূর প্রবাসি সন্তান, কেউ গ্রামবাসি| সেই সমাগমে, মৃত ব্যাক্তির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের সাথে সাথে চলতে থাকে নানান রকমের রাজনীতি আর স্বার্থের লড়াই| এই সব কিছু থেকে একমাত্র তার ঘরছাড়া প্রবাসি ছেলেটাই মুক্ত, সেই ক্রমশ তার বাবার একটা অচেনা মিশ্র-চরিত্র দেখে উঠতে পারে|
মানুষকে তার নানান বৈপরীত্যের সাথে সর্ব্বাঙ্গীন ভাবে দেখতে পাওয়াই লেখকের কাজ| লেখক সেটা চমতকার করেছেন| ওনার লেখার কায়দা খুবই সুখপাঠ্যকর|
বইটার শুরু আর শেষ হয়েছে ইলিয়াসের খোয়াবনামার কায়দায় -- একটা কিংবদন্তির সাথে স্বপ্নে দেখা একটা অতিজাগতিক দুনিয়ার মিশেলের সাথে| তবে এই বইটে সেই রেশ লেখক ধরে রাখতে পারেন নি| তাই শুরু আর শেষের বিবৃতিটায় কিছুটা ছন্দপতন হয়| খোয়াবনামায় মজনু শাহের প্রবাদ পুরো কাহীনি জুড়ে আছে|
মানুষকে তার নানান বৈপরীত্যের সাথে সর্ব্বাঙ্গীন ভাবে দেখতে পাওয়াই লেখকের কাজ| লেখক সেটা চমতকার করেছেন| ওনার লেখার কায়দা খুবই সুখপাঠ্যকর|
বইটার শুরু আর শেষ হয়েছে ইলিয়াসের খোয়াবনামার কায়দায় -- একটা কিংবদন্তির সাথে স্বপ্নে দেখা একটা অতিজাগতিক দুনিয়ার মিশেলের সাথে| তবে এই বইটে সেই রেশ লেখক ধরে রাখতে পারেন নি| তাই শুরু আর শেষের বিবৃতিটায় কিছুটা ছন্দপতন হয়| খোয়াবনামায় মজনু শাহের প্রবাদ পুরো কাহীনি জুড়ে আছে|
January 11, 2025
বই টার সবচেয়ে বড় ড্র ব্যাক হল অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা।
তবে সুন্দর লেখনীর জোরে এগিয়ে যাওয়া যাই।
আরেকটা ব্যাপার হল : এটা ফিকশন হলেও আমার ব্যক্তিগত ভাবে প্রশ্ন রেখে শেষ করে দেওয়া ব্যাপার টা পছন্দ না।
তবে বইটা পড়ে বেশ ভাল লেগেছে।
একটু ধৈর্য্য বিচ্যুত হবেন ই
Rating: 7.5/10
তবে সুন্দর লেখনীর জোরে এগিয়ে যাওয়া যাই।
আরেকটা ব্যাপার হল : এটা ফিকশন হলেও আমার ব্যক্তিগত ভাবে প্রশ্ন রেখে শেষ করে দেওয়া ব্যাপার টা পছন্দ না।
তবে বইটা পড়ে বেশ ভাল লেগেছে।
একটু ধৈর্য্য বিচ্যুত হবেন ই
Rating: 7.5/10
Displaying 1 - 5 of 5 reviews






