অধ্যাপক রাজা ভট্টাচার্য লিখে যাবেন, আর আমি দায়িত্ব সহকারে সবটা পড়ে যাবো। এই হলো নয়া নিয়ম। পুরাণ থেকে মহাকাব্য, ইতিহাস থেকে শিশুপাঠ্য, সবেতেই সোনা ফলান যেন। ভারী ভালো লাগে। ওনার লেখা শেষ পড়েছিলাম গত বছর। সেই আশ্চর্য বইটি! বাল্মীকির রামায়ণ নিয়ে সেই অসামান্য গ্রন্থটি নিয়ে যত বলি, তত কম শোনায়। তাহলেই ভাবুন, যখন দেখি 'জলে জঙ্গলে পাহাড়ে' বইটির দ্বিতীয় গল্পে, লেখক তার ক্ষুদে হিরোদের মুখে আবার সেই রামায়ণ চর্চা করাচ্ছেন। তাও আবার অ্যাডভেঞ্চারের মোড়কে! ভালো না লেগে, যায় কি?
অ্যাডভেঞ্চারধর্মী এই বইতে পাচ্ছেন তিনটে গল্প। আর্য, অরিত্র, ঋতম। তিন তরুণের যুগ্ম-অভিযান ঘিরে আবর্তিত কাহিনী। কখনো সিকিম পাহাড়ে পথ হারিয়ে ওরা পায় এক অদ্ভুত লোকের দেখা। কখনো বা এক কিংবদন্তির খোঁজ, ওদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় ছত্তিশগড়ের অচেনা জঙ্গলে। সাথে শেষ পাতে, আন্দামানের নিষিদ্ধ প্রজাতি ও হারানো জাহাজের হাতছানিতে অভিযানে মাতে তিনমূর্তি। যা কিছুটা বালখিল্য, কিছুটা ইচ্ছাপূরণধর্মী, তবুও রোমাঞ্চকর। মানস ভ্রমণে ঘাটতি হয় না একেবারেই!
অবশ্য, তিনটের মাঝে দুটো গল্পেই, রেজোলিউশনের খাতিরে, ফ্যান্টাসি ও সাই-ফাইকে বেছে নিয়েছেন লেখক। এটা ব্যক্তিগতভাবে আমায় খুব একটা সন্তুষ্ট করেনি। তবুও পড়ে যেতে হয়। পড়ে যেতে হয় আর্য, অরিত্র ও ঋতমদের জন্য। মানবিক ক্যারেকটার মোমেন্টস ও সুনিপুণ ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং দিয়ে সবটাই পুষিয়ে দেন লেখক। পাঠক হিসেবে আমি এতেই সন্তুষ্ট। নিজ বাড়ির চার-দেওয়ালের মাঝেই বন্দী অনুভব করি যারা, অ্যাডভেঞ্চারের গল্প বুঝি তারাই বেশি পড়ি। আমাদের তিন মক্কেল, বড়লোক, তবুও রিক্ত। উদাসীন, ঝগড়ুটে, টক্সিক সব পরিবার থেকে উঠে আসছে তারা, মুক্তি খুঁজছে ভ্রমণের নেশায়। একে অপরের সাহচর্যে কাটিয়ে উঠতে চাইছে ব্যক্তিগত প্রতিকূলতা।
একটি কিশোরপাঠ্য সিরিজে এরূপ গভীরতা সচরাচর পাওয়া যায় কি? তাই পারলে অবশ্যই পড়ুন। আপাতদৃষ্টিতে দোষ-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করলেন নাহয়। হলফ করে বলছি, মন্দ লাগবে না।
সাহিত্যিক রাজা ভট্টাচার্যের নাম শুনলেই মাথার মধ্যে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। দ্বারকানাথ, রামমোহন, লক্ষ্মণ, রাম... এমন বেশ কিছু মানুষ— যাঁদের মধ্যে কেউ ঐতিহাসিক, কেউ মহাকাব্যিক— মনের দরজার সামনে এসে দাঁড়ান। স্পষ্ট বুঝতে পারি, এইবার তাঁদের হাত পড়বে দরজায়। তারপর খুলে যাবে একটা দরজা। সেখান দিয়ে হু-হু করে ধেয়ে আসবে এমন এক সমুদ্র— যার মধ্য থেকে উঠে আসে সবকিছু, আবার যাতে তলিয়ে যায় সবকিছু। সময়! এই কিশোরপাঠ্য হয়েও ভীষণরকম প্রাপ্তমনস্ক তিনটি লেখার সংকলন পড়তে গিয়েও সেই 'সময়' সমুদ্রের গর্জন শুনলাম আবার; স্পর্শ পেলাম তার নোনা জলের। বইয়ের প্রথম লেখা 'একা সেই লোকটা।' আর্য, ঋতম আর অরিত্রের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয় এই লেখার মধ্য দিয়ে। এই তিন যুবকের ভেতরের কষ্ট, স্বপ্ন, আর একেবারে অন্যরকম চোখে দুনিয়াকে দেখার বাসনাও আমরা জানতে পারি এতে। কিন্তু সে-সব ঘটে পরে। তার আগেই লেখক আমাদের, একেবারে কনকনে নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো করে, ফেলে দেন এক বিপদসংকুল পাহাড়ি উপত্যকায়— যেখানে হিমেল রাতের মধ্য দিয়ে, প্রাণ হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছে তিন বন্ধু। ক্রমে তাদের পরিচয় হয় এক আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে। তখন ওই তিন বন্ধুর মতো আমাদেরও মনে অনেকগুলো প্রশ্ন জেগে ওঠে। মিথ্যে কথায় ভরা এই জটিল জীবন হঠাৎ বড্ড ফাঁপা বলে মনে হয়। বইয়ের দ্বিতীয় লেখা 'ঋক্ষবিলের রহস্য।' রামায়ণের এক অতি স্বল্পজ্ঞাত, অথচ অনন্য আখ্যানকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে উঠেছে এই অ্যাডভেঞ্চারটি। হ্যাঁ, এতে জঙ্গল আছে তার রোমাঞ্চ আর শিহরন নিয়ে। অবশ্যই এতে আছে বেড়ানোর নিজস্ব আমেজ আর পায়ের তলায় সরষের ছোঁয়া পাওয়ার সেই একান্ত বাঙালি ভাবনা। কিন্তু সবকিছুর গভীরে আছে এক রহস্য— যার অনুসন্ধান আদতে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় কয়েকটি শাশ্বত প্রশ্নের সামনে। আমার মতে এই বইয়ের সবচেয়ে চিন্তা-উদ্রেককারী কাহিনি এটিই। বইয়ের তৃতীয় লেখা 'আতঙ্কের রং নীল।' রোমহর্ষক অনুভূতি, আতঙ্ক, আবার একইসঙ্গে বেড়ানোর আনন্দ— এই তিনটি জিনিসই জাগানোর ব্যাপারে লেখাটা ফুল মার্কস পাবে। লেখক নিজের সহজ অথচ মর্মভেদী ভাষাকে দক্ষ শল্য-চিকিৎসকের হাতের স্ক্যালপেলের মতো ব্যবহার করে আমাদের চোখের সামনে থেকে ঘোলাটে স্তরগুলো সরিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির এক সর্বগ্রাসী রূপ, তারপরেই তিনি দেখিয়েছেন মানবিকতার যথার্থ, সাহসী রূপটিকে। আর হ্যাঁ, এবারেও পাশাপাশি এসেছে সময়-সমুদ্রের দু'টি স্তর বা দু'টি তীর— যাদের জুড়ে দিয়েছে তিন বন্ধুর কৌতূহল আর সাহস। এই বইয়ের সেরা লেখা, আমার মতে, এটাই। বইটি প্রকাশের লগ্নে লেখক বলেছিলেন, ছোটোদের জন্য না লিখলে লেখনী শুদ্ধ হয় না। ভাগ্যিস তিনি এমন কিছু ভেবে, মূলত পুত্র ও তার সমবয়সীদের জন্য এগুলো লিখেছিলেন। ভরসা রাখি যে আগামী দিনে তাঁর ব্যক্তিগত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আর কালচেতনা মিশে গিয়ে এমন আরও কিছু লেখা উপহার দেবে। সেগুলো পড়তে গিয়ে তিন বন্ধুর সঙ্গে আমরাও তাহলে রওনা দেব জলে, জঙ্গলে, পাহাড়ে... আর সময়ে! মন ভালো করে দেওয়া, কিছুটা ভিজিয়ে দেওয়া, আর অতি অবশ্যই তাজা করে দেওয়া তিনটি লেখার এই সংকলন ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে সুন্দরভাবে সেজে উঠেছে। মুদ্রণটিও পরিপাটি ও শুদ্ধ। সব মিলিয়ে তাই নির্দ্বিধায় পাঠকদের বলব বইটি পড়ে ফেলতে। অলমিতি।