নিগৃঢ় এর প্রথম সংকলন থেকে ২য় সংকলনের গল্প গুলো ঠিক মত জমে নি। জানি না নিজেস্ব রুচির জন্য কিনা, তবে ৫ টা গল্পের ভেতরে প্রাচীন মুদ্রা আর অমল কান্তির চাকরি ছাড়া কোনোটাই যেন দুই স্টারের বেশি দেওয়া যায় না।
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের পাঁচটি ছোট গল্পের সংকলন নিগৃঢ় ২। প্রথমে প্রতিটি গল্প নিয়ে নিজের অনুভূতি বর্ণনা করছি। এরপর পুরো বইটা নিয়ে ওভারঅল একটা ব্যক্তিগত অনুভূতি জানাবো।
প্রাচীন মুদ্রাঃ গল্পটা শুরু হয় শরৎ স্যান্যাল নামের একজনের বয়ানে, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এমফিল করছেন। বাংলাদেশের মধ্য পশ্চিম অঞ্চলে নীলকর সাহেবদের উত্থান নিয়ে থিসিস করার লক্ষ্যে এক পুরোনো নীলকুঠির খোঁজে বামুন্দিতে এসে পৌছান তিনি। তার বামুন্দিতে পৌছানোর পুরো অংশটুকু অত্যধিক সুন্দর বর্ণনার মাধ্যমে ফুঁটিয়ে তুলেছেন লেখক। এই লেখাগুলো পড়তে গেলে কেমন একটা ঘোরলাগা অনুভূতি হয়। এরপর স্যারের ট্রেডমার্ক অনুসারে গল্পে চলে আসে ইতিহাস। ইতিহাসের শুরুতে আমরা জানতে পারি নীলচাষের ইতিবৃত্ত, নীলকুঠি স্থাপন আর কুঠিয়ালদের অত্যাচারের কথা। ইতিহাসের পরের অংশ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই দেশে আসা পাকিস্তানি হামিদ বালুচি নামের একজন মেজরের অনেক পুরোনো এক ডায়েরি খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কিছু অংশ বর্ণনা করা হয় তার বয়ানে। এরপর গল্প চলে যায় তার নানা গাউস পিশানি আর প্রত্নতাত্ত্বিক ভ্যান হাওসেনের বয়ানে। তাদের সবার লক্ষ্য একটাই, বহু পুরোনো প্রাচীন মুদ্রা, স্পেসিফিকলি বললে জুডাস কয়েন খুঁজে পাওয়া। বলা হয়ে থাকে এই কয়েনগুলোর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা ছিলো। এগুলো সেই ৩০টা রূপার পয়সা যার বিনিময়ে যিশু খ্রীষ্টের সাথে বেঈমানী করেছিলেন জুডাস নামে তাঁরই এক অনুসারী। এই কয়েন খুঁজতে গিয়ে একে একে উঠে আসে পাহাড়ে বসবাসকারী ভয়ানক কাকুরদের কথা, দ্য কেভ অভ স্পিরিট এর পৌরণিক কাহিনী, আদ আর সামুদ জাতির বর্ণনা, তাদেরও পূর্ব পুরুষ নেবাতিয়ান জাতির কথা, এক অপদেবী উজ্জার কথা, সেখান থেকে যীশুর ওই কয়েনের প্রসঙ্গ, সেই কয়েন তৈরী করা জাতি ফিনিশিয়ানরাও চলে আসে কাহিনীতে আর আসে কনিষ্ক রাজার ঘটনা। এই এতো এতো ইতিহাসের গল্প আমি বলতে গেলে গোগ্রাসে গিলেছি। লেখকের লেখনীতে পুরোনো অদ্ভুত সব কাহিনী গুলো যেনো জীবন ফিরে পেয়েছিলো। যদিও আমি নিশ্চিত না এগুলোর মধ্যে কোন কোন ঘটনাগুলো ঐতিহাসিকভাবে সত্য আর কোনগুলো লেখকের কল্পনা। বিশেষ করে আমাদের নবীজী (সা:) কি আসলেই 'স্পেসিফিকলি' ওই অপদেবী উজ্জার মূর্তি এবং মন্দির ধ্বংস করার জন্য বারবার খালিদ-ইবন-আল-ওয়ালিদ কে পাঠিয়েছিলেন? এই ঘটনাটা সম্পর্কে কোনো হাদিস কারো জানা থাকলে জানাবেন। গল্পেটা কিছুটা রহস্য রেখে দিয়ে শেষ হলেও। ওভারঅল আমার পড়া আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখাগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সেরা গল্প এটাই মনে হয়েছে। রেটিংঃ ০৫/০৫
অমল কান্তির চাকরিঃ অমল কান্তি নামের এক বেকার যুবকের গল্প। তন্ত্র, মন্ত্র, রিচুয়াল আর অশরীরী অপদেবীর গল্প। এখানেও যথারীতি অনেক ইতিহাসের বর্ণনা। বিশেষ করে কালো জাদু সম্পর্কিত। সেই সূত্রে চলে আসে হারুত মারুতের মর্ত্যে নেমে আসার গল্প, সোলায়মান (আ:) এর আংটির কাহিনী। মূল গল্পের সাথে এই কাহিনীগুলোর কোনো যোগসূত্র না থাকলেও, জাদুবিদ্যার শুরুর দিকের ইতিহাস হিসাবে জানানো হয়েছে পাঠককে। এই গল্পে ইতিহাসের পাশাপাশি থাকে ধাঁধার খেলা এবং সেই সংক্রান্ত একটা গল্প। ওভারঅল এটাও বেশ ভালো লেগেছে। শেষটা অপ্রত্যাশিত, তবে অতিপ্রাকৃতিক গল্প হিসাবে মেনে নেয়ার মতোই। রেটিংঃ ০৪/০৫
হাতকাটা তান্ত্রিকঃ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ওপারে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেয়া এক যুবকের গল্প। গল্পটার আগামাথা ঠিক বুঝলাম না। আরো একবার ব্যাপক ইতিহাস উঠে এসেছে গল্পে কিন্তু সেগুলোর সাথে মূল গল্পটার যোগসূত্র পেলাম না। এবং এরপর হুট করেই মাঝপথে গল্প শেষ! তবে ফাঁকাতালে ইতিহাসের যে অংশটুকু পড়েছি সেটুকু অবশ্য বেশ ভালো লেগেছে। এই গল্পটার শেষে পরিশিষ্টের অংশটায় যে কথাগুলো লেখা আছে সেগুলো কি আসলেই লেখকের নিজের জীবনে ঘটা সত্যি ঘটনা? নাকী ওটাও ফিকশন? জানতে পারলে বেশ ভালো হতো। রেটিংঃ ৩.৫০/০৫
নজ্জুমি কিতাবঃ ১৪ পৃষ্টার এই গল্পটা আসলে কি সেটাই বুঝতে পারলাম না। এই গল্পে কোনো ইতিহাস নেই। একটা রহস্যময় বই খোঁজ করা, একটা রহস্যময় মৃত্য; ব্যস গল্প শেষ! কি চমৎকার ভাবেই না শুরু হয়েছিলো গল্পটা। লেখকের লেখায় মুগ্ধ হয়ে যখন গল্পে ডুবে যাচ্ছি, তখন লেখকের মনে হইলো আর লিখে কি হবে!! পাতা উলটে প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায়নি যে গল্পটা ওভাবেই শেষ হয়ে গিয়েছে। পরে গুডরিডসে গিয়ে রিভিউ পড়ে বুঝলাম যে আসলেই গল্পটা এতোটুকুই। হতাশ পুরোপুরি। রেটিংঃ ০১/০৫
ভুদুয়া জমজমঃ বইয়ের একমাত্র আক্ষরিক অর্থেই ভৌতিক গল্প সম্ভবত এটাই। খুব অল্প ইতিহাস আর অনেকখানি ভয়ের আবহ নিয়ে এগিয়েছে গল্পটা৷ লেখকের লেখা যারা পড়েছেন তারা বেশ ভালো করেই জানেন গল্পের পরিবেশ বা আবহ তৈরীতে লেখক অনবদ্য। আর তাই একদমই সাদামাটা গল্পটাও মোটামুটি ভালোই লেগেছে। রেটিংঃ ০৩/০৫
পুরো বই নিয়ে কিছু কথাঃ লেখকের লেখা যারা আগে পড়েছেন তারা বেশ ভালো করেই জানেন কতোটা শক্তিশালী উনার লেখার হাত। পারিপার্শ্বিক বর্ণনা, সেন্স অফ হিউমার আর আবহ তৈরীতে অনন্য উনি। তবে সমস্যা হচ্ছে উনার প্রতিটা গল্পই অনেকটা কাছাকাছি প্যাটার্নের। যে কারনে গল্পগুলো টানা পড়তে গেলে কিছুটা বিরক্ত লেগে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে গল্পের সাথে কোনো ধরণের সামঞ্জস্য নেই, এমন কিছু ইতিহাসও গল্পে নিয়ে এসেছেন লেখক। আমার রহস্যময় ইতিহাসের কপচাকপচি ভালো লাগে, তাই আমি টানা পড়ে যেতে পেরেছি। তারপরেও অতিরিক্ত তথ্যের ভারে মাথা দুই একবার হ্যাং হয়ে যাচ্ছিলো 🥴। তবে সবাই তো আর আমার মতো নয়। তাই যারা পড়বেন তারা প্রতি গল্পের ফাঁকে একটু গ্যাপ দিয়ে অন্য গল্প পড়লে আমার মনে হয় ভালো হবে।
পুরো বইয়ের ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৬.৭৫/১০ (নিগৃঢ়-১ এর তুলনায় নিগৃঢ়-২ কিছুটা পিছিয়ে থাকবে আমার মতে। এক প্রাচীন মুদ্রা গল্পটার জন্যই বইটা কালেকশনে রাখা যায়, সৌভাগ্যক্রমে সেটাই বইয়ের সবচেয়ে বড় গল্পও। তবুও সংকলনের একটা খুবই ভালো গল্প, একটা এবোভ এভারেজ গল্প, দুইটা এভারেজ গল্প এবং একটা খুবই বাজে গল্প; সব মিলিয়ে এই রেটিং ঠিকঠাক মনে হয়েছে আমার কাছে)
প্রোডাকশনঃ প্রোডাকশন নিয়ে বলার আগে বলি, প্রাচীন মুদ্রা গল্পটা এর আগে আমি তিন পয়সা নামে সতীর্থ প্রকাশনীর গল্প সংকলন থ্রিল এক্সপ্রেসে পড়েছিলাম। থ্রিল এক্সপ্রেস আমার পড়া এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে ছোট গল্পের সংকলন, সেই কথা না হয় এখন তোলা থাকুক। তো সেখানে এই গল্পটায় এতো এতো পরিমাণে বানান ভুল, বাক্যে অসামঞ্জস্যতা ছিল যে গল্পটার পুরো আবেশটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। এটা দেখে ভালো লাগতেছে যে বিবলিওফাইল সেই ব্যাপারগুলোর দিকে নজর দিয়েছে। অল্প কিছু বানান এখানেও ভুল থাকলেও, তা অন্তত পড়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা করেনি। বাদবাকী প্রোডাকশন লেখকের চাহিদা অনুসারে একেবারে প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির। একই প্রচ্ছদ রেখে ভিন্ন ভিন্ন কালারে ছাপানোর ব্যাপারটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগে নাই। স্পাইনে মিল রেখে বাকী ফ্রন্ট কাভারে অন্তত একটু চেঞ্জ থাকলে ভালো লাগতো।
নিগৃঢ় ২ মুহম্মদ আলমগীর তৈমুর মুদ্রন মূল্য ৩৬০ টাকা পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪০ রিডিং টাইম - ২ দিন রেটিং - ৩.৫/৫
লেখক আলমগীর তৈমুরের নিগৃঢ় সিরিজের দ্বিতীয় বই " নিগৃঢ় ২ " অন্যান্য বইয়ের মতন এই বইয়েও ৫ টি গল্পের সংকলন রয়েছে। গল্পগুলোর নাম প্রাচীন মুদ্রা, অমল কান্তির চাকরি, হাতকাটা তান্ত্রিক, নজ্জুমি কিতাব, ভুজুয়া জমজম। এর মধ্যে প্রাচীন মুদ্রা বড়গল্প, বাকিগুলো ছোটোগল্প।
লেখকের যে কয়টা বই পড়েছি, উনার গল্পগুলো মূলত খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোরের পটভূমিতে লেখা হয়, আর লেখায় একটা কলকাতা ভাইব থাকে। মূলত বিভিন্ন ডাকিনী, তান্ত্রিকের কাহিনীই থাকে গল্পগুলোতে, আর বিভিন্ন বেপারে ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্তে ভরপুর। আর প্রায় সব গল্পের শেষেই অপঘাতে মৃত্যুর বেপার থাকবেই থাকবে।
গল্পগুলোর শুরুতে যেই আবহে শুরু হয়, সেটা ভালো লেগেছে। তবে, শেষটায় কেমন যেন একটু "জোর করেই" গল্পের ইতি টানা হয় বলে আমার মনে হয়। গল্পগুলো আরেকটু বড় হলে ভালো হতো। খুব একটা ভাল লাগেনি।
বর্তমান সময়ের লেখকদের মধ্যে আলমগীর তৈমুর স্যার আমার প্রিয় লেখক। তার লেখা মানেই ভিন্ন স্বাদের এক উপভোগ্য পাঠ যাত্রা। এক ভিন্ন ধরনের শীতল আবহাওয়া তার কাহিনিতে বিরাজ করে। ইতিহাসকে কল্পনার সঙ্গে যেভাবে তিনি মেলাতে পারেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁকে সমসাময়িক লেখকদের ভিড়ে আলাদা করে তোলে। নিগৃঢ়-২ বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এটিই আমার পড়া এই বছরের শেষ বই। আমি যেই ধরনের জনরা, যেই ধরনের কাহিনি প্যাটার্ন পছন্দ করি স্যার যেন ঠিক তাই লেখে। তার গল্পের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হলো কাহিনির ভিতরে কাহিনি আবার তার ভিতরে কাহিনি। এবং সেইসব কাহিনির পটভূমি ছড়িয়ে থাকে, বিভিন্ন পুরাণ,কিংবদন্তি এবং বিস্তৃত ইতিহাসজূড়ে।
এই বইটি মোট ৫টি কাহিনির সংকলন, কাহিনি গুলো হলোঃ ১. প্রাচীন মুদ্রা ২. অমল কান্তির চাকরি ৩. হাতকাটা তান্ত্রিক ৪. নজ্জুমি কিতাব ৫. ভুদুয়া জমজম
এই ৫ টি কাহিনির ভিতর সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে “প্রাচীন মুদ্রা”। এই কাহিনিটি নিয়ে তাই একটু বিস্তারিত আলোচনা করছি। এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক ভয়ংকর ও অভিশপ্ত প্রতীক জুডাস কয়েন। কাহিনি শুরু হয় একজন তরুণ ইতিহাসের গবেষকের হাত ধরে, যে ব্রিটিশ আমলের নীল কুঠি এবং নীলকরদের নিয়ে গবেষণা করছে। কাহিনির পথচলায় তার হাতে আসে এক পাকিস্তানি মেজরের ডায়েরি। সেই ডায়েরির পাতায় পাতায় খুলতে থাকে ইতিহাসের এক গোপন দরজা। ব্রিটিশ আমলের হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর এক প্রত্নতাত্ত্বিক ও তার এক বালুচ সঙ্গীর সাথে আমরাও যেন ঘুরে আসি প্রাচীন বালুচ সভ্যতার মেহেরগড়, গ্রিক-মিশরীয় জগৎ, রোমান সাম্রাজ্য,উপমহাদেশের কুশাণ সাম্রাজ্য হয়ে মক্কার ইসলামি যুগ। এই “গল্পের ভেতরে গল্প” কাঠামোই লেখকের স্বাক্ষরশৈলী, যা এই কাহিনিতেও স্পষ্ট।
খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জুডাস ইসকারিয়াত মাত্র ত্রিশটি রূপার মুদ্রার বিনিময়ে যিশু খ্রিস্টকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়েছিল। এই মুদ্রাগুলোকে সাধারণভাবে টাইর নগরীতে নির্মিত রোমান শেকেল হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই মুদ্রা গুলো আগেই অনেক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলো। যিশুর রক্ত স্পর্শ করার পর এই কয়েনগুলো অভিশপ্ত হয়ে ওঠে, যা পরিচিত হয় ব্লাড কয়েন বা জুডাস কয়েন নামে। ধর্মীয় গ্রন্থ ও লোককথায় বলা হয়, এই মুদ্রাগুলো যার হাতেই গেছে, তাকে দিয়েছে সীমাহীন ক্ষমতা, প্রাচুর্য আর তার বিনিময়ে এনেছে মৃত্যু, নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংস। উপন্যাসে এই ঐতিহাসিক-ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে অতিপ্রাকৃত রহস্যের বিস্তৃত জাল।
এই বইয়ের যেই ব্যাপারটা সব থেকে বেশি ভালো লেগেছে, তা হলো : এর বিষয়বস্তু ও গবেষণালব্ধ পটভূমি। বিভিন্ন কিংবদন্তি, পৌরাণিক কাহিনি, কুরআনে বর্ণিত আদ-সামুদ জাতি, আল-উজ্জা দেবীর উপাসনা, প্রাক-ইসলামি আরবের ধর্মবিশ্বাস, বাইবেল ও কুরআনের রেফারেন্স সবকিছু মিলিয়ে লেখক এক বিস্ময়কর ইতিহাসের সাফারি করিয়েছেন পাঠককে। আমার মতো ইতিহাসপ্রেমী পাঠকের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ পাঠ অভিজ্ঞতা।
তবে এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো কাহিনির বর্ণনার আধিক্য আর বাক্যের ভেতর ব্যবহৃত কিছু অপ্রয়োজনীয় উপমা, যেগুলো না দিলেও চলতো। অনেক জায়গায় মনে হয়, গল্পের চেয়ে ইতিহাসই বেশি এগিয়ে যাচ্ছে। চরিত্রদের পারস্পরিক সংলাপ, আবেগ বা দৃশ্যায়ন তুলনামূলকভাবে কম। ফলে চরিত্রগুলো পুরোপুরি প্রাণ পায় নি সাথে কাহিনির গতিও কিছুটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। বিশেষ করে উপন্যাসের শেষে এসে দ্রুত কাহিনির যবনিকা পতন হয়। এই দ্রুত নেমে আসাটা, খানিকটা অপূর্ণতার অনুভূতি রেখে গেছে। কী হলো জুডাস কয়েন গুলোর? আজিজ মাস্টারই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি। এই কাহিনির একটি স্যিকুয়েল আনলে ভালো হয়।
অনন্য কাহিনিগুলো নিয়ে যদি বলি, সব গুলোর কাহিনি প্যাটার্নই প্রায় সেইম। ইতিহাস, কিংবদন্তী আর পুরাণের মিশেল। তবে প্যাটার্ন সেইম হলেও কাহিনি আর তার বৈচিত্রতা ভিন্ন।
অমল কান্তির চাকরিঃ এই গল্পটির কেন্দ্রে আছে অমল কান্তি নামের এক বেকার যুবক, যার জীবনে ঢুকে পড়ে তন্ত্র-মন্ত্র, রিচুয়াল এবং অশরীরী অপদেবীর অদ্ভুত এক জগৎ। গল্পের মূল কাঠামোর পাশাপাশি লেখক এখানে বিস্তর ইতিহাস এনেছেন। বিশেষ করে কালো জাদুর উৎস ও প্রাচীন বিশ্বাস নিয়ে বিস্তর ইনফো ডাম্পিং। হারুত-মারুতের পৃথিবীতে অবতরণ, হযরত সোলায়মান (আ.)-এর আংটির কাহিনি; এসব অংশ সরাসরি মূল ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না হলেও জাদুবিদ্যার শুরুর ইতিহাস হিসেবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এই গল্পের শেষটা প্রথম থেকে অনুমান করা না গেলেও, অতিপ্রাকৃতিক গল্প হিসেবে পরিণতিটা গ্রহণযোগ্য লেগেছে। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে গল্পটি বেশ উপভোগ্য।
হাতকাটা তান্ত্রিকঃ আমার কাছে এই গল্পটি একটু দুর্বল লেগেছে। গল্পের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়। একজন যুবক দেশ ছেড়ে ওপারে গিয়ে ট্রেনিং নেয়। এই জায়গা থেকে গল্প শুরু হলেও, কাহিনির গঠন খুব পরিষ্কার মনে হয়নি। গল্পের ভেতরে ব্যাপক ইতিহাস আছে। সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো; গল্পটি হঠাৎ করেই মাঝপথে শেষ হয়ে যায়, যেন লেখক নিজেই থামতে চেয়েছেন। গল্পে ইতিহাসের যে অংশগুলো এসেছে, সেগুলো আলাদা করে পড়লে বেশ আকর্ষণীয়।
নজ্জুমি কিতাবঃ এটি মোটামুটি কৌতুহলউদ্দিপক। রহস্যময় একটি বইয়ের সন্ধান আর একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু, এই পর্যন্তই গল্প। কোনো ইতিহাস নেই, কোনো গভীর ব্যাখ্যাও নেই। শুরুটা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল সামনে বড় কিছু আসছে। কিন্তু আচমকা গল্প শেষ! তবে আশার কথা হলো এই কাহিনি নিয়ে বিশাল আকারের একটি বই এসেছে,ওটি পড়লে কাহিনিটা ভালো মত বুঝা যাবে।
ভুদুয়া জমজমঃ এই গল্পটি প্রথম সানডে সাসপেন্সে শুনেছিলাম। আমাদের ��ুলনার পটভূমির উপর কাহিনি। ইতিহাস এখানে খুব অল্প, এটি মূলত কিংবদন্তি আর পৌরাণিক কাহিনির উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। হরর হিসাবে অনন্য গল্পের তুলনায় এর সরাসরি হরর উপাদান রয়েছে। কাহিনি খুব সাধারণ হলেও পরিবেশ নির্মাণে লেখক এখানেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। অল্প উপাদান দিয়েই কীভাবে গা ছমছমে অনুভূতি তৈরি করা যায়, এই গল্প তার উদাহরণ।
বিবলিওফাইল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হার্ডকভার বাইন্ডিং এর এই বইটির ওভারঅল প্রডাকশন বেশ ভালো। প্রতিটি গল্পেই একটি করে ইলাস্ট্রেশন আছে। সবশেষে বলি, এমন ঐতিহাসিক-ধর্মীয় মিথ এবং এমন সাহসী কল্পনা বাংলা সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। যারা ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মীয় রহস্য ও অতিপ্রাকৃত গল্প ভালোবাসেন তাদের জন্য এই বই এক অনন্য পাঠযাত্রা হবে বলেই আমার বিশ্বাস। তবে যারা দ্রুতগতির, চরিত্রনির্ভর গল্প খোঁজেন, তাদের কাছে বইটি কিছুটা ভারী লাগতে পারে।