"দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন,
দেবতা জাগিলে মোদের রাতি—
ধরার নরক-সিংহদুয়ারে
জ্বালাই আমরা সন্ধ্যাবাতি।"
এই লাইনগুলো বোধহয় আমাদের সবারই মুখস্থ, তাই না? তবে হ্যাঁ, এগুলো ভাবলেই সেই সঙ্গে মনে পড়ে আরও অনেকগুলো শব্দ~ রেড-লাইট এরিয়া, ট্র্যাফিকিং, টাউট, মাসি... ইত্যাদি-ইত্যাদি।
সমাজ যেভাবেই দেখুক না কেন, তথাকথিত আদিমতম পেশাটি কিন্তু সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, গণভাবনায় বেশ জাঁকিয়ে বসে আছে। সেজন্যই প্রশ্ন জাগে, ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল এই পেশা? কীভাবে সমাজ পতি-পত্নী সম্পর্কের ঘোরতর পবিত্রতার পাশাপাশি এই পেশাটিকেও স্বীকৃতি দিল?
আর তারই সূত্রে প্রশ্ন জাগে, স্বীকৃতি কি আদৌ পেয়েছে এই পেশায় থাকা নারী ও পুরুষেরা?
ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, যৌনতার ধারণা, ধর্ম, অর্থনীতি— এত কিছু জড়িয়ে আছে যে জিনিসের সঙ্গে, তাকেই বিশ্বজিৎ এই ছোট্ট বইয়ে আঁটানোর চেষ্টা করেছেন।
'বলছিলাম কী...', 'শুরুর শুরু', 'সেই বিশেষ দিনের গল্প'— এই প্রাক্কথনের মাধ্যমে লেখক একটি ফ্রেমিং ডিভাইস তৈরি করেছেন। তিনি এই পেশায় থাকা একটি নারীর মুখে, কথক হিসেবে হোটেলে কর্মরত এক ওয়েটারকে রেখে, দেহ-ব্যবসার ইতিহাস ও ভূগোল তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাতে মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস, রোম, চিন, জাপান, ভারত— এমন নানা দেশ ও সভ্যতায় এই পেশার সম্বন্ধে নানা কথা বলা হয়েছে। কিন্তু...
প্রথমত, ফ্রেমিং ডিভাইস হিসেবে এমন এক জ্ঞানদা পতিতা নিতান্তই অবিশ্বাস্য। ওই জিনিসের কোনো দরকার ছিল না।
দ্বিতীয়ত, এই বিষয়টি রোমান্টিক আবিলতা বা যৌন-সুড়সুড়ি ছাপিয়ে অনেক বেশি গভীর। তাকে সরাসরি প্রবন্ধের আকারে, তথ্যসূত্র দিয়ে লেখাই কাঙ্ক্ষিত ছিল। লেখক ওই জ্ঞানদাকেই কথকের যাবতীয় জ্ঞানের আকর হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ফলে তথ্যসূত্র বা বিস্তৃত পাঠ-নির্দেশিকা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন তিনি বোধ করেননি। এর ফলে বইটার বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হয়ে গেছে।
তৃতীয়ত, ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ব্যাপারটাকে হাতে আসা দলিল-দস্তাবেজের উপরেই দাঁড় করানো উচিত। তার মধ্যে মিথ, লোককথা আর পুরাকথা ঢোকালে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি হয় ঠিকই; কিন্তু ফোকাস নষ্ট হয়ে যায়।
চতুর্থত, প্রস্টিটিউশন বা দেহ-ব্যবসার কথা বলতে গেলে রাষ্ট্র একে কীভাবে দেখেছে, সেই নিয়ে আলোচনা থাকা অত্যাবশ্যক। কিন্তু লেখক সেই নিয়ে একেবারে নীরব।
সব মিলিয়ে বলব, লেখকের এই বইটি আমাকে বেশ হতাশই করল।