হিমশৈল পর্বতের পাদদেশে মেঘলোকের অন্তরালে অবস্থিত রাজ্য মায়াকানন। এই রাজ্যের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং খনিজের প্রতি প্রতিবেশী সকল রাজ্য কমবেশি আকৃষ্ট। কিন্তু আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু মহারানি সপ্তপর্ণী। আপন রাজ্যের বাইরে কোনকালেই পদার্পণ না করা রানি কী রাজ্যবিস্তারে সক্ষম হবেন? মায়াকানন ব্যতীত অমরাবতী এবং কাঞ্চনগড় রাজ্য কীভাবে পর্ণার অধীনে আসবে? কোন কূটনীতি কাজ করবে তিন রাজ্য ব্যাপী মহাযুদ্ধের নেপথ্যে? মহারানি সপ্তপর্ণীর বিজয়গাথা বর্ণিত হয়েছে এই আখ্যানের প্রতিটি ছত্রে।
সত্যি বলতে একেবারেই কোন এক্সপেক্টশন ছাড়াই বইটা হাতে নিয়েছিলাম। খারাপ লাগেনি। ওয়ার্ল্ডবিল্ডিংয়ে আরো কিছু বর্ননা দিলে ভালো হতো। সপ্তপর্নীর চরিত্র যতটা ফুটে উঠেছে, পৃথিশ ছিলো ততটাই সাদামাটা। আর সপ্তপর্নীকে অনেক কঠিন হৃদয়ের চরিত্র হিসেবে দেখানো হলেও, প্রেম ঘটিত ব্যাপারে তার ন্যাকামি একেবারেই অসহ্য লেগেছে৷ এর চেয়ে বৃন্দার চরিত্র শক্তিশালী ছিলো। অদ্রিনারায়ন চরিত্রে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও হঠাতই যেন শেষ হয়ে গেলো। বীরদত্তের আসল মোটিভ পুরোপুরি বুঝতে পারি নি। সবচেয়ে নেগেটিভ দিক ছিলো- হঠা করে এক প্যারার পরেও আরেক প্যারায় দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে চ্যাপ্টার ব্রেক দিলে পড়তে সহজ হতো। সবচেয়ে ভালো হতো পুরো বইটা কয়েকটা অধ্যায়ে ভাগ করে দিলে। তবে শেষের দিকে পর্না আর পৃথিশের যুদ্ধটা এপিক ছিলো। এভাবে যে শেষ হবে ভাবতে পারি নি। আর শেষে কিছু সুতা ছেড়ে গিয়েছেন লেখক। আশা করি পরের পর্বে আরো ভালো কিছু পাবো। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। লেখকের জন্য অনেক শুভকামনা রইলো।
এ এক মায়ারাজ্যের রূপকথার কাহিনী। যে কাহিনীতে আছে রূপ, রং, মাধুর্য্য। আছে প্রেম। আছে ঘৃণা, বিশ্বাসঘাতকতা। আছে ভয়াবহতা, আছে যুদ্ধ। সবকিছু মিলে মিশে একাকাএ হয়ে গিয়েছে মায়াকাননের মায়াময় জগতে। লেখিকা তাঁর অপরূপ ভাষার জাদু কাঠি ছুঁয়ে শব্দের পর শব্দ বুনে কল্পলোকের এই জগত সৃষ্টি করেছেন। চোখের সামনে নিপুণভাবে এঁকে দিয়েছেন চতুর্দিকে পুরুষতান্ত্রিকতার জঞ্জালের মধ্যেই স্বাধীনভাবে বসবাস করা এক মাতৃতান্ত্রিক রাজত্ব, যে দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা শুধু নারীই, পুত্রজন্ম সেখানে অভিপ্রেত নয়, নারীর অপমানের উত্তর সেখানে প্রাণ দিয়ে চুকিয়ে যেতে হয়। সে দেশে নারী অস্ত্রশিক্ষা করে তো বটেই, সমানতালে যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত ঝরায়। সে দেশে নারীকে শেখানো হয় না- লজ্জা নারীর ভূষণ... বরং কৈশোর থেকে দেওয়া হয় লজ্জাত্যাগের শিক্ষা- কারণ লজ্জাহীনা নারীর ন্যায় প্রাণঘাতী অস্ত্র কিছু নেই। এই রাজ্যের পটভূমিতেই সৃষ্ট কাহিনী সপ্তপর্ণী, যা ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে আরম্ভ করে নায়িকার যৌবনে পদার্পণের পর থেকে। সেই কাহিনীতে উত্থানপতন রয়েছে অবশ্যই, কিন্তু লেখিকার লেখনীগুণে তা হৃদয় স্পর্শ করে। নায়িকা সপ্তপর্ণীর চরিত্র প্রথম থেকে বড় যত্নে একটু একটু করে গড়ে তোলা হয়েছে। সে ঠিকভুল মেশানো এক মানবী, সব কিছুর ঊর্ধ্বে থাকা দেবী নয়। তবুও শেষে গিয়ে মনে হয়েছে চরিত্রের মধ্যে আবেগের উদগীরণ অত্যাধিক- যা তার মত রাণীকে শোভা পায়না। হয়তো এই ত্রুটির রচনা ইচ্ছাকৃত, পরবর্তী পর্বে চরিত্রটির উত্তরণ আরো মনোগ্রাহী করে তোলার জন্য। মন ছুঁয়ে যায় বৃন্দা ও রামেশ্বর। পৃথ্বীশের চরিত্র আরেকটু স্থানের দাবি করে বলে মনে হয়েছে, যদিও শেষ অংশে সে অপূর্ব। অদ্রিনারায়ণের চরিত্রটিও আরেকটু বিশদ করা যেত। তাকে শুধু প্লট ডিভাইস হিসেবেই রেখে দেওয়া হল। শেষের দিকে বেশ কিছু চরিত্র বড় তাড়াতাড়ি যাওয়া আসা করে, ঘটনাগুলো অতি দ্রুত ঘটে যায়। তাছাড়া কিছু কিছু জায়গায় দৃশ্যপট পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়ে যায় কোনো বিরতি ছাড়া। দুটো দৃশ্যের মাঝে পর্ব ভাগ করলে বা নিদেনপক্ষে একটা পেজব্রেক দিলে পড়তে সুবিধা হয়। রক্তময় এই প্রেমের আখ্যানে আবেগ ও আসক্তি একসাথে হাত ধরে চলে। গল্পের শেষতম মুহুর্তে অদ্ভুতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায় প্রেম ও ঘৃণা, চুম্বনের সাথে মিলে যায় রক্তের কটু স্বাদ। লেখিকার লেখনীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হল এই কাহিনীর মাধ্যমেই। এবং নিশ্চিতরূপে তা মনজয় করেছে।