যত কবিতার রচয়িতা বলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে কবিতাপ্রেমী মানুষ জানেন, তার দশগুণ কবিতা লিখেছিলেন তিনি। সেইসব বিপুল সংখ্যক কবিতা লীন হয়ে আছে ১৯৫৫-১৯৯৫— এই চল্লিশ বছরে প্রকাশিত হাজার হাজার ছোট পত্রিকায়। যে-কোনও সময়েই যেন কবিতার উপলব্ধিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে থাকতেন শক্তি। সামান্যতম নাড়া লাগলেই তা উক্তি হয়ে উপচে পড়ত। যে-কোনও জায়গায়, যে-কোনও অবস্থায়, অনুরুদ্ধ হয়ে বা না-হয়েও, তাঁর কবিতা লিখে দেওয়ার অজস্র কাহিনি আজও লোকমুখে প্রচলিত।
এই বইতে ‘ছিন্নবিচ্ছিন্ন’ সমেত প্রায় দ্বিশতাধিক কবিতা আছে যা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাতখণ্ড ‘পদ্যসমগ্র’-তে নেই। এখনও শক্তির বহু কবিতা আমাদের নাগালের বাইরে অন্তরালে থেকে গেছে।
সংগৃহীত গদ্যরচনাগুলি নানা ধরনের সাক্ষাৎকার ও আত্মকথা-বিষয়ক রচনা। শৈশব ও বাল্যের যে-গ্রামজীবন নিয়ে শক্তি সারাজীবন ধরে প্রায় মোহগ্রস্ত হয়ে কাটিয়েছিলেন, যার উল্লেখ ক্লান্তিহীনভাবে তাঁর পদ্য, উপন্যাস, ছোটগল্প স্মৃতিচারণায় ফিরে ফিরে এসেছে, সেই বহডুবাস ও প্রেসিডেন্সি কলেজের দিনগুলিরই মুগ্ধ পুনরুল্লেখে ভরা অধিকাংশ গদ্য রচনা। তবে মূল্যবান ব্যতিক্রমও কিছু আছে। যেমন ‘কৃত্তিবাস’ প্রকাশিত তাঁর প্রথম গদ্যরচনাটি, যা নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে বিসংবাদের ফলে তিনি কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিলেন।
সব মিলিয়ে এই বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে ধরা আছে নিবিড় অন্বেষণে ও অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আশ্চর্য অনির্বাণ নানা রচনা।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯৩৩, বহড়ু, চব্বিশ পরগনা। শৈশবে পিতৃহীন। বহড়ুতে মাতামহের কাছে ও বাগবাজারে মাতুলালয়ে বড় হন। পড়াশোনা: বহড়ু হাইস্কুল, মহারাজা কাশিমবাজার স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ; যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যয়ন অসমাপ্ত। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘যম’ কবিতা লিখে (১৯৫৬) সাহিত্যজগতে প্রবেশ। যুক্ত ছিলেন কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে। ‘কবিতা সাপ্তাহিকী’ পত্রিকা প্রকাশ করে আলোড়ন তুলেছিলেন কবিতাজগতে৷ প্রণীত, অনূদিত-সম্পাদিত কবিতা ও গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক, তা ছাড়া অজস্র অগ্রন্থিত রচনা ছড়িয়ে আছে পত্রপত্রিকায়। পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গঙ্গাধর মেহের পুরস্কার, মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার। জীবিকাক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে। অতিথি-অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বভারতীতে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের অধ্যাপনায় রত থাকাকালীন অকস্মাৎ হৃদরোগে শান্তিনিকেতনে মৃত্যু, ২৩ মার্চ ১৯৯৫।
এই বইতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন সমেত প্রায় দ্বিশতাধিক কবিতা আছে যা শক্তির সাত খণ্ড 'পদ্যসমগ্র" তে নেই। এবং গদ্যগুলো নানা ধরনের সাক্ষাৎকার, আত্মকথা ও গ্রন্থসমালোচনা বিষয়ক। আর একটা বড়গল্প আছে।
শক্তির গদ্যের হাত যে পদ্যের মতোই সমৃদ্ধ ছিল তা তাঁর গদ্য পড়লেই সবাই বুঝবে। আর শক্তির গদ্য তাঁর পদ্যকে বুঝতে আরও সহায়তা করবে। শক্তির পদ্যে যে জীবনানন্দের প্রভাব ছিল সেটা স্বয়ং শক্তি স্বীকার করেছে গদ্যে।
'একটি অদ্ভুত চাকরি' মতো বড়গল্প যে লিখতে পারে সে অবশ্যই আমাদের অনেক সার্থক উপন্যাস উপহার দিতে পারতো। তবে শক্তি বোধহয় পদ্যের মধ্যেই তার শান্তি খুঁজে পেয়েছিল। এজন্য ঈশ্বরের এক ভয়ংকর প্রতিনিধি হয়েও সে বেশি গদ্য লিখেনি। যদি লিখতো তবে সুনীলের চেয়ে শক্তির বেশি পাঠকপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা থাকতো বর্তমানে এবং অদূর ভবিষ্যতে। কিন্তু হায় যে জাতি পদ্যকে ভুলে গেছে সে জাতির কাছে মৃত হয়ে যাচ্ছে শক্তির সমস্ত সাহিত্যকর্ম।
সুনীল, ভাস্কর, শঙ্খ ঘোষ, বিনয়ের কবিতার চেয়ে শক্তির কবিতা ভাল লাগছে বেশি। হয়ত ভবিষ্যতে জীবনানন্দের পর শক্তি আমার প্রিয় কবি হবে।
নিচের অংশ না পড়লে ক্ষতি নেই। কবিতা নিয়ে একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি।
কবিতা আমরা কেন পড়ি?
নিজস্ব প্রয়োজনে কোনো একটা কবিতা পড়ে ওপলপালট চিন্তা করার জন্য। আর সর্বত্রই তো কবিতা। চারপাশে কবিতার অস্তিত্ব। মনে কবিতা, অঙ্গে কবিতা। আর একটি কবিতার মাঝেই তো লুকিয়ে থাকে সহস্র অক্ষর, অসীম অনুভূতি। আমরা যখন কোনো কবিতা পড়ি তখন সেটা আমাদের স্মৃতি-বিস্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাঠকৃত কবিতাটা আমাদের নিজস্ব হয়ে যায়।
অনেকের কাছে কবিতা অংকের মত জটিল লাগে। তবে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে যেমন অংক অতি সহজ লাগে; তেমনি প্রতিদিন কবিতা পড়ার ফলেও কবিতা বোধগম্য হবে এবং সবাই কবিতার প্রেমে পড়বে। আর কবিতাও সবার প্রেমে পড়বে। কবিতাকে ভালো না বাসিলে কবিতা রাণী কেনই বা তোমায় ভালোবাসবে!
একটা প্রেমিকার জন্য যতটা শ্রম দেয় প্রেমিকরা ততটা শ্রম যদি কবিতা সাধনায় দিত তবে কবিতা প্রেমিকদের শান্তি দিত প্রেমিকাদের চেয়েও বেশি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে মধ্যরাতের বৃষ্টিতে শুয়ে আমি আর আমার মিউজিশিয়ান বন্ধু ইস্তি শক্তির 'যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো' কাব্যগ্রন্থ পড়েছিলাম পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে দু'মাস আগে। তখন থেকেই শক্তির পদ্যের প্রেমে পড়ি। গত তিনদিন যাবত এই 'অগ্রন্থিত পদ্যগদ্য' সাথে নিয়ে বাইক দিয়ে গ্রাম-শহর আর ব্রক্ষপুত্র ঘুরে ঘুরে বৃষ্টিতে ভিজে স্নানাতুর পাগলের মতো বইটা পড়েছি।