১৮৫৭। সালটা বললেই মাধ্যমিকের যেকোনো ছাত্রের মনে চট করে ভেসে উঠবে যে নামটি সেটি হলো - 'সিপাহী বিদ্রোহ'। মহাবিদ্রোহও বলা হয় একে। ঠিক কী হয়েছিল ১৮৫৭ সালে? . প্রায় শতবর্ষের জমানো বারুদস্তুপে সে বছর আগুন লেগে গিয়েছিল খুব। ১৮৫৭ তে কী হয়েছিল এটার জবাব হিসেবে এই কথাটা বেশ যুৎসই হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বিশ্বাসঘাতকদের বেঈমানির ফলে যখন রক্তসাগরে ডুব দিলো বাংলা তথা উপমহাদেশের স্বাধীনতা সূর্য, তারপর থেকেই শুরু হলো ইংরেজ বেনিয়াদের লুণ্ঠন আর যুলুমের নতুন এক নৃশংস যুগের। একশ বছর পর সেই যুলুম আর বঞ্ছনারই একটি মহাবিস্ফোরণ দেখেছিল ভারতবর্ষ। . শক্তিমান লেখক ইমরান রাইহানের কলমে উঠে এসেছে সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের এক অনন্য উপাখ্যান। এই বই ইতিহাসের সেই দুর্দান্ত আর ঝড়ো সময়কে কাগজের বুকে ধরে রাখবার স্বাপ্নিক এক প্রয়াস। এ প্রয়াস সেই তীব্র লড়াইয়ে মুসলিমদের গৌরবোজ্জ্বল ও চেতনাদীপ্ত অবদানের প্রতি এই প্রজন্মের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিনম্র নিবেদনের। এই প্রয়াস সত্যকে জানার ও তুলে ধরার, যাতে কোনো মিথ্যুকের মিথ্যা আমাদের ইতিহাস নিয়ে আমাদেরকেই বিভ্রান্ত না করে ফেলতে পারে। . ১৮৫৭।
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর থেকেই এর ইতিহাসকে নানাভাবে বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে৷ 'সিপাহি বিদ্রোহ' নামকরণের মাধমে একে শুধুমাত্র সিপাহিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে, যা আদতে ছিল জনমানুষের আন্দোলন।
বিদ্রোহের আগুন সেনা ব্যারাক থেকে জ্বলে উঠে কীভাবে তা ক্রমেই জনমানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল সেই ঘটনাই লেখক সংক্ষেপে তুলে এনেছেন৷
বইটিতে খুবই সংক্ষেপে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আলোচনা করা হয়েছে যার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যেমন- ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈ, মাওলানা ফজলে হক খইরাবাদি, মাওলানা জাফর থানেশ্বরীসহ আরো অনেকের আলোচনা ইচ্ছাকৃত বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে লেখক এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে পরে স্বতন্ত্র আরেকটি গ্রন্থ রচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন৷ ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।
ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতাকামী সকল মানুষের জন্য আজ অব্দি এক মর্মান্তিক অধ্যায় ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম। স্বাধীনতাকামী কোনো ব্যক্তি এই ইতিহাস অধ্যয়ন করে ব্যথিত না হয়ে পারে না হোক সে মুসলমান বা হিন্দু।
যদিও আল্লাহর ইচ্ছায় এবং নানান জাগতিক দুর্বলতার ফলে ১৮৫৭ সালের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছিল তবুও এতে নিহিত রয়েছে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা যা আজ ২৪-এর গনঅভ্যুত্থানের ছয় মাসের মাথায় দাঁড়িয়েও অনেক প্রাসঙ্গিক মনে হয়। যদিও সময়ের ব্যবধান প্রায় ১৭০ বছর তাও মানুষের চরিত্র বৈশিষ্ট্য তো একই তারা তো এক আল্লাহরই সৃষ্টি।
তখন যেভাবে ইংরেজ দখলদার শাসনের নির্যাতন নিপিড়নে অতিষ্ঠ হয়ে সিপাহি জনগন এক সময় বাধ্য হয়েছিল অস্ত্র হাতে নিতে। সেই একই চিত্র বিগত আওয়ামী শাসনের। মংগল পান্ডের মৃত্যুদন্ড আর কৌটা আন্দোলনই বিপ্লবের সম্পুর্ন চিত্র নয়। জনগনের ক্ষোভ আর অসন্তোষ অনেক পুরাতন, শিকড় অনেক গভীর।
ইংরেজ শাসনের অবৈধ দখলদারিত্ব,অযৌক্তিক কর্য ধারণ,সর্বসাধারণের উপর বর্ণনাতীত যুলুম-নির্যাতন,মুসলমান-হিন্দু উভয় জাতীর ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত,নীল চাষ ইত্যাদি বিষয় জাতিকে ইংরেজ শাষনের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলেছিল। আওয়ামী শাষনের গুম,খুন,আয়নাঘর,দূর্ণীতি,গণহত্যা,দখলদারিত্ব,চাঁদাবাজী,বাকস্বাধীনতা হরণ,দেশ ও জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ডারতের খোলাখুলি দালালি (এই লিস্টের কোনো শেষ নেই) এ সবকিছু এক দমবন্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিল পুরো দেশজুড়ে। দীর্ঘদিন থেকে এসবকিছু একত্রে জমা হয়ে মহা বিস্ফোরণ ঘটেছিল মংগল পান্ডে আর কৌটা সংস্কার আন্দোলনের ক্ষণে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন যখন ব্যর্থ হলো আল্লাহর ইচ্ছা ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিদ্যমান নানান দুর্বলতার ফলে তখন পুরো জাতির উপর নেমে এলো এক বর্ণনাতীত নির্যাতনের স্টিমরোলার। কেবল দিল্লিতে ফাঁসিই দেয়া হলো ২২ হাজারের মতো লোককে। এর বাহিরে যে আরও কতো মানুষ হত্যা করা হয়েছে আর কতো সম্পদ লুট ও জমিন দখল করা হয়েছে। তা নিশ্চিত আমাদের কল্পনাকেও হার মানাবে।
ইতিহাস সাক্ষী বিপ্লব ব্যর্থ হলে পরিণতি সর্বদা এমনই নিষ্ঠুর হয়। ২৪-এর বিপ্লবের আমরা যারা সাক্ষী আমাদের জন্য ইতিহাসের এই শিক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। মুজিবের পতনের পর হাসিনার ফিরে আসা কতোটা ভয়ংকর ছিল তা সকলের জানা। আবারও যদি এই অভিশপ্ত গোষ্ঠী ফিরে আসে আমাদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তখন আগের সব বার থেকে আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েই আসবে এটাই স্বাভাবিক। আর যেন কোনো সুযোগই কেউ না পায় টু শব্দ করার এই বন্দোবস্ত করবে। মনে রাখবেন ১৮৫৭ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন হতে লেগেছিল আরও ৯০ বছর!
আজ যারা আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের কথা বলছেন। তারা হয়তো সেইফ খেলতে চাচ্ছেন। বা বিদেশী প্রভুদের খুশি করতে অতি ভালো মানুষ সাজতেছেন। তাদের জেনে রাখা উচিত আওয়ামী লীগ ফিরে আসলে জনগণের যা হওয়ার তো হবেই তবে যারা দালালী করে তাদের পরিণতিও খুব একটা ভালো হয় না। মীর জাফর,মীর সাদিক বা পরে সংগ্রামের সময় আরও যারা ছিল ব্রিটিশের এজেন্ট তাদের কারও পরিনতি খুব একটা ভালো হয়নি।
ইতিহাস লেখে বিজিতরা। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের ক্ষেত্রেও উলামায়ে কেরাম ও ইসলামপন্থীদের অবদান অনেকে উড়িয়ে দিতে চায়। অথচ প্রকৃত ইতিহাস বা স্বয়ং ব্রিটিশদের নানা তথ্য থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পারি কতো বড় ভূমিকা রেখেছিলেন ইসলামপন্থীরা উক্ত সংগ্রামে। এমনকি অনেকে তো বিদ্রোহ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই কাজ করে যাচ্ছিলেন এই উদ্দেশ্যে। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে শায়খ আহমাদুল্লাহ শাহ রাহিমাহুল্লাহ। এমন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আমার ক্ষুদ্র পড়ুয়া জীবনে আমি কম পেয়েছি। অথচ দুঃখজনক ভাবে এদের নামও আগে কখনও জানা হয়নি। এক বিশেষ গোষ্ঠী বিশেষ উদ্দেশ্যে এদেরকে সবসময় আড়াল করে রাখে।
২৪-এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলামপন্থীদের আবারও কোনঠাসা করা হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। ষোলো বছরের আওয়ামী অপশাসনে অসংখ্যবার যুলুমের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন আর রক্ত দিয়েছেন এদেশের আলেম উলামা ও তৌহিদী জনতা। ২৪-এর আন্দোলনেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটে নি। যাত্রাবাড়ী থেকে নিয়ে দেশের সর্বত্রে ইসলামপন্থীদের উপস্থিতি সুস্পষ্ট। ফটো,ভিডিও ফুটেজ সবকিছু রয়েছে। তাও এক গোষ্ঠী কোনো ক্রেডিট দিতে নারাজ। নতুন সরকারেও নেই তেমন কোনো অবস্থান।
ইমরান রাইহান ভাইয়ের ইতিহাস বিষয়ক লেখালেখির আমি পুরনো ভক্ত। তাই উনার লিখা নিয়ে আর কিছু বলার নেই বরাবরের মতো অসাধারণ ও রোমাঞ্চকর আবার একই সাথে প্রকৃত ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত। বইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। সকল প্রশংসা এই বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর।