কৃষ্ণ বাসুদেব ‘ বাণী বসুর মহাভারত সিরিজের শেষ গ্রন্থ। এই সিরিজে সুবিশাল মহাভারতকে রূপকথামুক্ত করতে চেয়েছেন লেখক। শ্রীকৃষ্ণের এই জীবনকাহিনিটিও সেই লক্ষ্যেই লিখিত। সিরিজের অন্তর্গতও বটে আবার স্বয়ংসম্পূর্ণও বটে । এই মহাজীবন ও মহামরণকে ঘিরে বহু মিথ বুনেছে সময় , তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন অর্ধেক মানুষ তো অর্ধেক কল্পনা। অসঙ্গতিতে ভরা তাঁর বিবরণ। তাঁর জন্য স্বর্গ থেকে গরুড় এসে পিঠ পেতে দেয় , পক্ষীমানুষ ? সুদর্শন চক্রটিও ডাকবামাত্র এসে অনামিকাগ্রে অধিষ্ঠিত হয় , তিনি দেবরাজ ইন্দ্রর সঙ্গে লড়াই করেন , তাঁর ষোলো হাজারের বেশি পত্নী আছে , পুত্র অসংখ্য। তিনি মৃত শিশুকে বাঁচিয়ে দ্যান , জোড় হাত করে প্রার্থনা করলেই সমুদ্র যোজন যোজন জমি দিয়ে দ্যান , তিনি হাতে নিলেও এরকা মুষল হয়ে যায় , আকাশ ও সূর্যকে তিনি শাসন করতে পারেন , অথচ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ থামাতে পারেন না , তাঁর নিজের বংশের ধ্বংস ঠেকাতে পারেন না , সামান্য এক ব্যাধ হরিণ ভ্রমে তাঁকে তিরবিদ্ধ করে মেরে ফেলে। মিথ ভেদ করতে গিয়ে এই গ্রন্থ আবিষ্কার করে এক অসামান্য বুদ্ধি ও চারিত্র বিশিষ্ট , মানবিক মূল্যবোধে অন্যান্য আধুনিক মানুষ , এ দেশের শাসনতন্ত্রকে যিনি পাপমুক্ত , প্রজামুখী ন্যায়বান , মানবিক করতে চেয়েছিলেন , যাঁকে আমরা পাঁচ হাজার বছর আগে পেয়েছিলাম , পাইনিকো আর। অদূর ভবিষ্যতেও পাবার কোনও আশা দেখছি না।
Bani Basu is a Bengali Indian author, essayist, critic and poet. She was educated at the well-known Scottish Church College and at the University of Calcutta.
She began her career as a novelist with the publication of Janmabhoomi Matribhoomi. A prolific writer, her novels have been regularly published in Desh, the premier literary journal of Bengal. Her major works include Swet Patharer Thaala (The Marble Salver), Ekushe Paa (twenty One Steps), Maitreya Jataka (published as The Birth of the Maitreya by Stree), Gandharvi, Pancham Purush (The Fifth Man, or Fifth Generation?) and Ashtam Garbha (The Eighth Pregnancy). She was awarded the Tarashankar Award for Antarghaat (Treason), and the Ananda Purashkar for Maitreya Jataka. She is also the recipient of the Sushila Devi Birla Award and the Sahitya Setu Puraskar. She translates extensively into Bangla and writes essays, short stories and poetry.
Bani Basu has been conferred upon Sahitya Academy Award 2010, one of India's highest literary awards, for her contribution to Bengali literature.
মহাভারত! এক অলীক নাম। সব গ্রন্থের, সব সামাজিক ব্যবস্থার, সব মহাকাব্যের আকর, সবচেয়ে সার্থক এই সুবিশাল কাহিনী। ছোটবেলাতে ছোটদের মহাভারত, পরবর্তীতে কিশোর সংস্করণ, এরপর রাজশেখর বসু পর্যন্ত মূল মহাভারতের নানা সারানুবাদ পড়ে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, প্রতিভা বসু এঁদের মুল্যায়ন পড়তে পড়তে প্রতিবার মনে হয়েছে, 'যতই গভীরে যাই মধু।' বাণী বসুর মহাভারত সিরিজটি শেষ হল এই কৃষ্ণ বাসুদেব বইয়ের ৬৫৫ পৃষ্ঠার মাধ্যমে, যে সিরিজের আগের প্রতিটা বই ছিল আকারে ছোট এবং ১৫০ পৃষ্ঠার আশেপাশে। কৃষ্ণ বাসুদেবকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাঁকে পৃষ্ঠার আকার বাড়ানোর সাথে সাথে আয়তনও বহুগুণে বাড়াতে হল, কারণ এই বইটি কৃষ্ণ বা আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ কূটনীতিককে নিয়ে। মহাভারত নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। কারো চোখে কর্ণই নায়ক, তো কেউ কেউ দূর্যোধনের গুণমুগ্ধ। পঞ্চপাণ্ডব বা কৃষ্ণের দেবত্ব তো অনেকদিন ধরেই প্রচলিত। বাণী বসুর এই বইটায় শুরুর দিকে আমার কাছেও মনে হচ্ছিল, তিনি বোধহয় একটু কৃষ্ণপ্রেমী। কিন্তু এগোতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, কৃষ্ণকে এমন করে বিশ্লেষণ সত্যিই আমি আগে পড়িনি। আমার পড়ার অনেক গ্যাপ আছে, তাই হয়তো। কিছুদিন আগে হরিশংকর জলদাসের দুর্যোধন পড়েছিলাম, তাতে আমি নতুন কিছু পাই নি। বরং লেখকের দুর্বিনীত লেখার স্টাইল আর একপাক্ষিকভাবে দুর্যোধনকে সেরা দেখানো এবং কৃষ্ণকে প্রায় নরকের কীট দেখানো ভালো লাগেনি। মহাভারতের চরিত্রগুলো তো আসলে সবাই মানুষই। আর মানুষ মাত্রই তার দোষ-গুণ-স্খলন সবই থাকে। শ্রেষ্ঠ কূটনীতিক, রাজনীতিক, মল্লযুদ্ধে পারদর্শী তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন কৃষ্ণ কি তাঁর জীবনে ভুল করেননি? ভুল করেননি যাদবদের জন্য নিজেকে প্রায় অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে? ভুল করেননি নরকাসুরের বন্দীশালা থেকে আনত ১৬০০ নারীকে বিয়ে করে? একজন অমিত প্রতিভাধর মানুষকে আমরা দেবতার কাতারে ফেলে দেই হরহামেশাই। কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে দেবত্ব লাভ সবসময়ই কি স্বস্তির? কৃষ্ণ চেয়েছেন নারীরা অধিকার পাক, সম্মান নিয়ে বাঁচুক, কিন্তু তাঁরা কী করবেন? ওই সমাজে নারীদের কাজ কী ছিল? বিবাহ ছাড়া সমাজে নারীর স্থান কোথায় ছিল? গণ্যমান্য কোন ব্যক্তি ধর্ষিত বিপুলসংখ্যক নারীকুলকে বিয়ে করতে রাজি হলেন না। কৃষ্ণের একার পক্ষে ১৬০০ নারীকে স্ত্রীর সত্যিকার মর্যাদা দেয়াও সম্ভব হল না। ফলাফল, স্বর্ণদ্বারকার পতন এগিয়ে আসা। কৃষ্ণ চেষ্টা করছেন দ্বারকা, মথুরাকে শত্রুমুক্ত করতে, যেখানে যা ধনসম্পদ পাচ্ছেন, ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার না করে জমা দিচ্ছেন রাজকোষে। দ্বারকা বা মথুরায় তখন আবার গণতন্ত্র চালু ছিল। এর ফলে অবস্থা দাঁড়িয়ে গেল, মাথারা সবাই কৃষ্ণের আনা ফলভোগ করছেন, কাজ না পেয়ে অলস হচ্ছেন এবং অবধারিতভাবে ষড়যন্ত্র করছেন। আর তাতে যোগ দিচ্ছেন অগ্রজ বলরাম সহ সহধর্মিণী সত্যভামা পর্যন্ত। পঞ্চপাণ্ডব এবং পাঞ্চালীর সাথে সৌহার্দ্য মেনে নিতে অনেকেরই কষ্ট হয়েছে। পার্থ এবং কৃষ্ণের সম্পর্ককেও মিথ দিয়ে নরনারায়ণে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণ বা অর্জুন দুজনেই যে ভীষণ একা, দুজনের মধ্যে এমনিতেও নানা বিষয়ে, গায়ের রঙে এবং ভাতৃসম্পর্কেও যে মিল, এমন মিল তো বন্ধুত্বকে পাকাপোক্ত করবেই। ব্যক্তিত্বহীন যুধিষ্ঠির যেমন অর্জুন দ্বারা প্রাপ্ত সকল সম্পদ ভোগ করতেন আবার হিংসাও করতেন তাঁকে, সরিয়ে দিতে চাইতেন দ্রৌপদীর সান্নিধ্য থেকে বারবার দূরে, তেমনি জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বারবার বলরাম ভুল বুঝেছেন কৃষ্ণকে, এমনকি দিয়েছেন চুরির অপবাদ। এমন নানা বিষয় কাছাকাছি এনেছিল কৃষ্ণার্জুনকে। নারীশক্তির অলস ক্ষয় কত কূটবুদ্ধির জন্ম দেয় তা দেখা যায় সত্যভামা এবং দুর্যোধনকন্যা শাম্বপত্নী লক্ষণার আচরণ থেকে। প্রথমজন, সবসময় দ্বারকাধীশ কৃষ্ণের প্রায়োরিটি চেয়ে এসেছেন, অথচ কক্ষনো বুঝতে চেষ্টা করেননি তাঁর মন। দ্বিতীয়জন পিতাপ্রেমে অন্ধ, তার চোখে পিতা ছাড়া বাকি সবাই খল। কৃষ্ণ তাই হয়ে পড়েন একা। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি আর প্রেম দুইয়ের মিশেলে কিছু ভুলও করেন। স্বাভাবিক স্বভাবমাধুর্যে যাদবদের গুরুস্থানীয় ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে দেরি করেন। এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে আসেন নিজের পতন। মহাভারতের রাজনীতি থেকে প্রতিটা মানুষ আজকের দিনেও ভীষণভাবে সত্য। আমাদের আশেপাশে, এমনকি অনেকক্ষেত্রেই আমরা নিজেরাও মহাভারতের একেকটি চরিত্র। এমনকি রাজনীতি-কূটনীতি সব ব্যাপারেই যেন দেখি সেই মহাভারতেরই ছায়া। যা নাই ভারতে, তা নাই ভারতে। আরো একবার অনুধাবনে সমর্থ হলাম৷