বইয়ের নামটাই যখন উইয়ার্ড, তখন ভেতরের গল্প তো আরো অদ্ভুতুড়েই হবে!
অনেকদিন পর এমন একটা স্যাটায়ার পড়লাম। 'ফাজিলের মহাভারত', নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে ফাইজলামি টাইপ কিছুই হবে। কিন্তু তাই বলে ধর্ম নিয়ে ফাইজলামি! . . জি হ্যাঁ, লেখক কোথাও কোনো ঘটনাকে 'প্রায়' অবিকৃত রেখে মহাভারতের মতো বিশাল মহাকাব্যকে আমাদের নিত্যদিনের কথ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। মনে হবে কোনো বন্ধু আমাদেরকে মহাভারত পড়ে শোনাচ্ছে। আমরা যেমন কথায় কথায় স্ল্যাং ব্যবহার করি, সার্কাস্টিক হয়ে যায় বা ডার্ক জোক করি, এইখানেও তাই।
মহাভারত আগেও পড়েছি। মহাভারতের নাম শুনলে সবার মত আমার মাথায়েও চলে আসে রাম, হনুমান, ভীম, কৃষ্ণ, অর্জুন, পঞ্চপাণ্ডব, ঘটৎকচ, যুধিষ্ঠির– এমন সব মিথোলজিক্যাল ক্যারেক্টারের নাম। একদম অরিজিনাল মহাভারতের বিস্তৃত তো বিশাল। পড়তেও কঠিন লাগে। অনেক জিনিসই বুঝতে পারি না৷ তবে সেগুলোকেই সাধারণ মানুষের জন্য মোটামুটি সহজভাবে লিখে গেছেন বাল্মীকি, রাজশেখর বসু, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ আরো অনেকেই।
তবে 'ফাজিলের মহাভারত' সব থেকে ভিন্ন। কারণ এখানে সাধু-চলিত ভাষার কোনো মিশ্রণ নেই, খটমট শব্দ নেই। একদম টিপিক্যাল 'আমাদের' ভাষাতেই সব বোঝানো হয়েছে। . . কাহিনি যেমন হোক, লেখকের লেখায় মুন্সিয়ানা আছে বটে। একেকটা অধ্যায়ে লেখক মহাভারতের একেকটা ঘটনা তুলে ধরেছেন। সাথে আবার লেজুড় জুড়ে দিয়ে লিখেছেন, "যদি এমন না হয়ে তেমন হতো, তাহলে কেমন হতো?" প্রশ্নগুলো দেখলে মনে হয় অযৌক্তিক তো কিছু জিজ্ঞেস করেননি! প্রচুর ব্যঙ্গকৌতুক ও মজার মাধ্যমে প্রশ্ন ও আলোচনায় সমৃদ্ধ এই বই।
বইয়ের মধ্যে সুকুমার রায় আর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রভাব যথেষ্ট লক্ষণীয় এবং লেখক নিজেও বইয়ের গোড়াতেই সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন। . . তবে এত রসাত্মক লেখা পড়েও মাঝের দিকে এসে একঘেয়েমি চলে আসলো। জোক নেওয়া যায়, তাই বলে প্রতি লাইনে জোক, শ্লেষ এসব থাকার কারণে পড়ার ফ্লোটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল৷ আর একই জিনিস বারবার রিপিট হচ্ছিল। কতই বা এভাবে পড়া যায়? বানানেও অনেক ভুল ছিল। আবার ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে এমন জোক, গালাগাল নিজের মোরালিটিতেও হাল্কা টোকা দিচ্ছিল। অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে, এত উপমা না দিলেও চলতো।
তবে বইটা পড়ে মহাভারতের অনেক অজানা কিসসার কথাও জানলাম যা আগে মিস করে গিয়েছিলাম হয়তো। লেখক আবার হাল্কা চালে একটা পার্টিকুলার রাজনৈতিক দলকেও লেখার মাধ্যমে ঠেস দিয়েছেন। . . লেখা দেখেই বোঝা গেছে যে উনি বেশ হোমওয়ার্ক করেই লিখেছেন৷ বেশ কিছু জায়গা পড়ে হো হো করে হেসেছি৷ লেখার ফাঁকে ফাঁকে চলে আসে সমাজচেতনা আর রাজনীতির কমেন্টরি। প্রতিটা ঘটনাই আধুনিক সময় বা দৈনন্দিন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে বর্ণনা করেছেন। বেশ প্রাঞ্জল লেখা।
মহাভারত পড়তে যেয়ে মনে হয়েছে এখানে শুধু ধর্মই না, একইসাথে রয়েছে সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, রণনীতি, দার্শনিক, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি– সবকিছুই। সম্পূর্ণ বিষয়টা হাস্যরসের মাধ্যমে প্রকাশ করাটা কিন্তু বেশ দুরূহ। আর সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন নিখাদ বাঙালি।
আমার মোটামুটি লেগেছে, তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে এটা একটু আঘাত দিতেও পারে।
মহাভারতের কথা অমৃত সমান, নিখাদ বাঙালি কথে, শুন পুণ্যবান। হ্যাঁ, এ এক মহাভারতই বটে। ব্যাসদেবের মহাভারতের প্রায় সবটুকু, প্লাস বেশ কিছু আঞ্চলিক মহাভারত, প্লাস গীতা— এই বি...ই...ই...শা...আ...ল জিনিসটাকে প্রচুর ঠাট্টা-রসিকতা এবং নিজস্ব ব্যাখ্যা ও টিপ্পনির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়েছে এতে। ভূমিকা, তিরিশটি চ্যাপ্টার এবং একটি পরিশিষ্ট দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একে। তাদের সার-সংক্ষেপ করব না। বরং বলব, ধীরে-সুস্থে এই বইটার আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলুন। কেন পড়বেন? তার কারণ ত্রিবিধ। প্রথমত, মহাভারত আর আমাদের মধ্যে বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার ভাষা। তাকে অতিক্রমের আশায় আমরা অমর চিত্র কথা পড়ি, নানা প্রবন্ধের বইয়ে মুখ গুঁজি, সর্বোপরি (সবচেয়ে সর্বনাশা ব্যাপারও বটে) সিরিয়াল দেখি। তার ফলে আমাদের অধিকাংশেরই মহাভারত-বিষয়ক জ্ঞান একেবারেই ভাসা-ভাসা। এই বই সহজ ও সরস ভঙ্গিতে কিন্তু আদত গল্পটা পুরোপুরি বলে দিয়েছে। এটা পড়লে অনেক তথ্যগত ভ্রান্তি দূর হতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, বিদেশি পুরাকথা পড়ে হাঁ হয়ে থাকা আমরা এই বইটা পড়লে বেশ বুঝব, কীভাবে আমাদের দেশের প্রাচীনতর উপাদানগুলো ছিনতাই করে অন্যরা সেগুলো 'নিজস্ব' বলে চালাচ্ছে। তারই সঙ্গে জেনে ফেলা যাবে অনেক গল্পের সামাজিক ও ঐতিহাসিক শিকড়। ভুল আর মিথ্যাতে আচ্ছন্ন অতীতের একটা স্বচ্ছতর ছবি কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্পষ্ট হবে দু চোখের সামনে। তৃতীয়ত, এই বইয়ে লেখক একেবারে সোজা-সাপটা ভঙ্গিতে দেখিয়েছেন, মহাভারত আসলে একটা পলিটিক্যাল কাহিনি— যাকে হাজার বছরেরও বেশি ধরে ধান্দাবাজির মিক্সার-গ্রাইন্ডারে ফেলে 'ধর্ম' প্রচারের মাধ্যমে পরিণত করা হয়েছে। সেই ধর্মও কোড অফ কনডাক্ট বা অন্য কোনো নিরিখে সদাচার নয়। বরং যুধিষ্ঠির অ্যান্ড কোং এবং তাদের দ্বারা পালিত পাবলিক ধর্মের নামে যা-ইচ্ছে-তাই চালিয়ে গেছে সবার সঙ্গে, এমনকি নিজের ও আত্মীয়দের ওপরেও! তবে এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ কী জানেন? হাসিঠাট্টার পাশাপাশি এতে তৎসম ভাষায় যে গালিগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো একবার মুখস্থ করে জায়গামতো প্রয়োগ করতে পারলে পুরো ফাটিয়ে দেওয়া যাবে। কার কী ফাটিয়ে দেওয়া যাবে— এই ধরনের মেঢ্রসুলভ প্রশ্ন করবেন না প্লিজ। বরং বইটা পড়ে ফেলুন। বইটার এই চতুর্থ মুদ্রণ প্রকাশের আগেও ভালোমতো প্রুফ দেখানো হল না দেখে যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে আছি। তবে এই বিশেষ প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশাও করি না। শুধু নিখাদ বাঙালি এমন শাণিত কলমেই অতীতের নানা রহস্য আমাদের সামনে উন্মোচিত করে চলুন— এই প্রার্থনাই করি।
অভাজনের মহাভারত পড়ে থাকলে এই ভার্সনের মহাভারতের লিখনশৈলী সম্পর্কে পাঠকের ধারনা থাকার কথা৷ সরস বর্ণনা, স্ল্যাংয়ের ব্যবহার, কোথাও কোথাও অশ্লীল শব্দ মিলিয়ে লিখেছিলেন মাহবুব লীলেন।
নিখাদ বাঙালি নামের লেখক মহাশয় আরেক কাঠি সরেস, প্রচলিত ইংরেজি ব্যবহার করেছেন ব্যাপক। প্রচলিত ইংরেজি বলতে কিশোর তরুণরা তাদের সংলাপে যেরকম শব্দ ব্যবহার করে সেসব। কোথাও কোথাও মডার্ণ ডে কালচার অর্থ্যাৎ কিনা কলিযুগের সংস্কৃতি চলে এসে। মহাভারতের চরিত্ররা একে অপরের কাছে সিগারেট চাইছে, অ্যাঁ?
এই বিষয়গুলো অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লেগেছে৷ সরস আলোচনা, স্ল্যাংয়ের ব্যবহার ভালো লাগে, কিন্তু মহাভারতের চরিত্ররা মডার্ন কালচার প্রয়োগ করছে; এটা পুরো বইটার আমেজ নষ্ট করেছে।
কোন পৌরাণিক কাহিনী কে যে রকের আড্ডায় বসে গল্প করে বলা হয়েছে, আর আড্ডা টা এমন ছিল যেন মনে হয়েছে চলুক আরও লম্বা সময় ধরে, অসাধারণ সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেন লেখক তাঁর লেখনী তে। অবশ্যয় পাঠ্য একটি বই হয়ে থাকবে আমার তালিকায়।
It was an entirely new & exciting experience to read this book. We all more or less are familiar with the stories of the Epic Mahabharata, and this book did not alter that tale. What it does though, is to narrate the story with a comedic relief that would keep the readers engrossed. The language is lucid, and free flowing, and the way it is written definitely shows that the author has done thoroughly researched the material. Satire intertwined with philosophy is what gives the author the edge. And it certainly questions some of the well known events that we clearly fail to notice. An enjoyable read overall.