স্বাধীন ভারতে প্রথম কোন বাঙালী মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর নাম কী, প্রশ্নটা করলে অনেকেই হয়ত সঠিক নামটা বলতে পারবেন না। এমনকি রাজ্যটাও। এই বাঙালী ভদ্রমহিলা, যিনি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীও বটে, স্বাধীনতা ও দেশভাগের আগে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে ত্রাণকর্মী হিসেবে নিপীড়িত মানুষদের সাহায্য করতে গিয়েছিলেন। শোনা যায়, সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে, দেশবরেণ্য সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীকেও সম্ভাব্য লাঞ্ছনার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সঙ্গে সব সময় সায়ানাইড অ্যাম্পুল রাখতে হত।
নামটা হয়ত এতক্ষণে অনুমান করতে পেরেছেন। সুচেতা মজুমদার (কৃপালনী), উত্তরপ্রদেশের তথা ভারতের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী, যিনি জন্মসূত্রে ছিলেন একজন বাঙালী। আর সেই ঘটনাটি হল নোয়াখালি গণহত্যা, যাকে আমরা কেউ কেউ ভুল করে নোয়াখালি দাঙ্গা বলে জানি। দাঙ্গা বলতে আমরা যা বুঝি, ভারতে যা দেখি, পূর্ববঙ্গে, পূর্ব পাকিস্তানে এবং অবশেষে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকেই থেকেই সে জিনিস হয়নি। যা হয়েছিল, যা আজও হয়ে চলেছে, তা হল শতধাবিভক্ত অসহায় এক জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম সংখ্যাগুরু শরিয়তি মৌলবাদীদের একতরফা নির্যাতন। লুণ্ঠণ-ধর্ষণ-গণহত্যার পৈশাচিক উৎসব। যার সর্বশেষ কুনাট্যটি হয়ে গেল এই কদিন আগে, বিগত বছরের (২০২১) পুজোর দিনগুলোয় কুমিল্লা জেলায়। বাঙালীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপুজোর দিনগুলোয় পরিকল্পিত এক মিথ্যা অভিযোগকে কেন্দ্র করে একের পর এক জেলায় আক্রান্ত হল পূজামণ্ডপ, স্থায়ী মন্দির, সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িঘর। অভিযোগ এল একের পর এক হত্যা, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতনের। পোড়া মণ্ডপে, ভাঙা প্রতিমার সামনে বসে চোখের জলে অঞ্জলি দিয়ে, চোরের মত চুপি চুপি বিসর্জন শেষ করে শারদীয় দুর্গোৎসব 'উদযাপন' করলেন সংখ্যালঘু হিন্দুরা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সে দেশের প্রশাসন কিছুদিন বাদে সমস্ত হত্যা-নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে হাত ধুয়ে ফেললেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লক্ষ হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষ পূর্ববঙ্গ/বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের ৬০ লক্ষ মানুষ হারিয়েছেন ২৬ লক্ষ একর জমি, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মিলিয়ে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তৎকালীন সময়ে ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার সাহিত্য দেশভাগের পরের কিছুটা সময় বাদে ক্রমশ এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে উচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যদিও বা কিছুটা কথা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের ঘরছাড়া মানুষদের নিয়ে মূলধারার নীরবতা প্রকট।
এই নীরবতার পিছনে একটা চন্দনচর্চিত নান্দনিক যুক্তি দেওয়া হয়: "অতীতের পুরোনো কথা খুঁড়ে তুলে বিবাদ বিসম্বাদ ঘৃণা জাগিয়ে তোলার অর্থ হয় না"। মূলধারার নীরবতার কারণ কতটা এই প্রচারিত যুক্তিতে আন্তরিক বিশ্বাস, কতটা ইতিহাসচেতনার সার্বিক অনুপস্থিতি আর কতটা পনেরো ষোলো কোটি মানুষের সম্ভাব্য ক্রেতার বাজারকে চটাতে না চাওয়ার 'বাস্তববোধ' তা হলফ নিয়ে বলতে পারা মুশকিল। আমরা তো কখনও দেখিনি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গরা মার্টিন লুথার কিংয়ের আন্দোলনের প্রসঙ্গে আলোচনা থামিয়ে দিতে চেয়েছেন "ঘৃণা জাগিয়ে" তুলতে না চেয়ে, অথবা ইহুদিরা হলোকস্টের ইতিহাস চর্চায় বাধা দিয়েছেন "অতীতের পুরোনো কথা" তুলে আনা অর্থহীন এই মর্মে। তাই নিজ জনগোষ্ঠীর উপরে নির্যাতনের ইতিহাস মুছে দিতে চেয়ে এই চরম নির্লজ্জ স্বার্থপরতারকে দেখলে অবাকই হতে হয়। কিন্তু এইটুকু জোর দিয়েই বলা যেতে পারে এগুলো আর যাই হোক "অতীতের পুরোনো কথা" নয়, এগুলো এথনিক ক্লেনজিংয়ের ঘটমান ধারাবাহিকতার অংশ যা বিগত সাত দশক ধরে ক্রমাগত ঘটে চলেছে, যার শিকার কখনও সংখ্যালঘু বাঙালী হিন্দু, কখনও খ্রিষ্টান আদিবাসী, কখনও চাকমা-মারমা প্রভৃতি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী।
সাহিত্যের কাজ নয় দগদগে ঘায়ের উপর আলপনা এঁকে তাকে ঢেকে দেওয়া, বরং সৎ সাহিত্যের কাজ হল সমাজের ক্ষতগুলোকে দিনের আলোয় উদোম করে দেওয়া। চিকিৎসার প্রথম ধাপ, ক্ষতটা যে আছে তাকে স্বীকার করার সৎ সাহস রাখা। অস্বীকারের নিরাপদ ও সহজ বিকল্প বরং সমাজ রাজনীতির এইসব ঘা আরও বিষিয়ে তোলে। এই দীর্ঘ নীরবতার কারাগার ভাঙতে চেয়েছে 'বেড়াল শকুন এবং অন্যরা'। এটি একটি রাজনৈতিক উপন্যাস কিনা এই প্রশ্নের একটিই উত্তর দেওয়া যেতে পারে, কোনোরকম নান্দনিক ন্যাকামি ও ঢং ব্যতিরেকে নির্যাতনকে নির্যাতন ও পিশাচকে পিশাচ বলতে পারার রাজনীতি ছাড়া আর কোনো রাজনীতি এ লেখার নেই। ডাম্বলডোর বলেছিলেন, বিপন্ন সময়ে আমাদের সকলকেই সহজ ও সঠিকের মধ্যে বেছে নিতে হয়। 'বেড়াল শকুন এবং অন্যরা' সেই বেছে নেওয়ার কাজটা করতে পেরেছে।
আপনার যদি পছন্দ হয় দক্ষিণ কলকাতার সুখী কার্ডবোর্ডের বাক্সের ভিতরে নিজেকে আটকে রাখা উপন্যাস, যদি আপনি চান শেষপর্বে সুখী সমাপন দেখিয়ে নটে গাছের মুড়িয়ে যাওয়ার গল্প তাহলে এ বই আপনি পড়বেন না। এখানে বাস্তবের হিংস্রতাকে, নির্মমতাকে বিন্দুমাত্র আড়াল করতে চাওয়া হয়নি। আবার যদি আপনার পছন্দ হয় ভালো রাজপুত্র ও কালো রাক্ষসের রূপকথার একমাত্রিক গল্প, তাহলেও এ বই আপনাকে হতাশ করবে। কারণ বাস্তব ও জাদুবাস্তবের মধ্যে অনায়াস যাতায়াতের ফাঁকে সাদা ও কালোর মাঝের ধূসর চরিত্রদের বার বার ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছে এই বই। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত ফিকশন, কখনোই ইতিহাস নয়। কিন্তু সেই অপ্রিয়, অবাঞ্ছিত, দুঃস্বপ্নের ইতিহাসের দিকে যাত্রার প্রথম পদক্ষেপটুকু হতে পারে 'বেড়াল শকুন ও অন্যরা'।
দুঃস্বপ্নের অন্ধকার ও ভাগ্যের মারের কাছে আত্মসমর্পণ না করে, ঝড়ের মুখে নুয়ে পড়েও আবার খাড়া হয়ে দাঁড়ানো গাছের মত মানুষদের গল্প যদি আপনার পছন্দ হয়ে থাকে যারা সান্তিয়াগোর মতই বিশ্বাস করেছিল, "মানুষকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু হারানো যায় না", তাহলে, 'বেড়াল শকুন ও অন্যরা'-র ভুবনে আপনাকে স্বাগত।
ইতিহাসকে পরিপূর্ণভাবে অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর ব্যাখ্যা করলেও সামাজিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বহীন হয়ে যায় কি? যায় না। সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যাকার ঐতিহাসিক প্রায়শই তুলে নিয়ে আসেন সমাজের অবচেতনায় লুকিয়ে থাকা ধূসর সময়কে। যে কারণে Romain Rolland এই obscure zone of history' কেই যথার্থ ইতিহাস বলে চিহ্নিত করেন।
## আমার কৈফিয়ত - জীবন সাধারণভাবে চলে। তার নিজস্ব এক ছন্দ, এক চাহিদা আছে। পরিপার্শ্ব যেমনই হোক ভিন্ন ভিন্ন সমাজ, তার আচার-আচরণ ছায়া ফেলতে চায় সৃষ্টির, শিল্পের চৌহদ্দিতে। তবুও কি ছায়া ফেলে? চেতনা অবশ্যই একটা বড় ভূমিকা নেয়। চেতন, অব-চেতন স-চেতন, নানা অবস্থানে নিয়ে যায় স্রষ্টাকে। স্রষ্টা কখনো সখনো রচনার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। তাঁর স্বপ্নে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তব দেখা দেয়। ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্প, বিবিধ স্বপ্নলব্ধ রচনা স্রষ্টাকেই রচিত করতে থাকে। তিনি তাঁর স্বপ্নে তাঁর রচনাকে সঙ্গ দেন। একেই Roland Barthes, তাঁর The Pleasure of the Text-এ বলছেন “…the book creates meaning, the meaning creates life.” সে মুহূর্তে স্রষ্টার হতাশা, ক্ষোভ, উষ্মা, এসব ব্যবহারিক বাহ্যিক অভিপ্রকাশ নিতান্তই গৌণ। আকর্ষণের চৌম্বক ক্ষেত্র স্রষ্টাকে দ্রুত নিয়ে যায় অনাবিষ্কৃত একটা ক্ষেত্রে, যেখানে জমে আছে বিস্ময়। অপার বিস্ময় ও কৌতুহলই আসল সূত্র।
বৌদ্ধিক ও দার্শনিক অনুভব এ সবকিছুর অলক্ষ্যে ক্রিয়া করে যায়। অনেক গভীর থেকে উঠে আসে বোধ, উপলব্ধি, দৃশ্য, লেখনীর গতি, তার ছন্দ, চরিত্রের মনস্তত্ত্বের নানা আঙ্গিক। সাধারণভাবে এক নজরে পাঠক একে উপলব্ধি নাও করতে পারেন। আবার চকিতে সে কিছু সংকেত, কিছু বার্তা, হাওয়ার ঝাপটার মতো ছড়িয়ে দিয়ে যেতেও পারে। মূল বিষয়, ন্যারেটিভ ও পাঠকের এক তালে, এক ছন্দে পরিপূরক হয়ে ওঠা। আমি পাঠক হিসেবে কতটা আগ্রহী ওই ভাষা স্পর্শ করার জন্য? টেক্সটের অন্তরাত্মাকে, তার অন্তরের অন্তরতম সংকেতকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দ আমাকে কতটা বিভোর করে? আমার ও স্রষ্টার মধ্যবর্তী দূরত্ব কমছে কি ? Roland Barthes-এর ভাষায় “I pass lightly through the reactionary darkness.” টেক্সটের করে সমস্যার শুরু এই সূত্র থেকেই একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ তার আগ্রহ পাঠকের মধ্যে থেকে যায়
আগাগোড়া ঝকঝকে কথনভঙ্গি বজায় রেখেছে সাম্যদর্শী। বিষয়বস্তু নির্বাচনে মুনশিয়ানা ও পরিবেশনায় সে সাবলীল। সাম্যদর্শীর এই উপন্যাসের চরিত্রেরা বারংবার পরিস্থিতির ফাঁদে পড়েন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য লড়াই করেন। অস্তিত্বের ফাঁদে ফেলেই সাম্যদর্শী নিজের চরিত্রগুলির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, কুটিলতা, হতাশা, দ্বেষ, অসহায়তা লেখেন। কৈফিয়তের এক্কেবারে শেষে বলে রাখা শ্রেয় যে, এই উপন্যাসের প্রত্যেকটি ডিডাকশন, প্রায় নিরানব্বই শতাংশ অ্যানালিসিস, এবং বর্ণনার ব্যাকরণ সব, সঅঅঅঅব মার্ক্সের ক্লাস থিওরী ধরেই করা। সাম্যদর্শী মনস্তত্বের ছাত্র। প্রসঙ্গত সাইকোলজিও ক্লাস কনফ্লিক্টকে নিজের মত করে সংজ্ঞায়িত করে।
## গল্পের নেপথ্যে - ১৯৪৬। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল।অপরিসীম বেদনা , শোক, মৃত্যু ও যুগপৎ আনন্দ-উন্মুখতার এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণ। ঠিক যেমন বাস্তিলের প্রাকারে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত করাঘাতে পতনোম্মুখ এক ইতিহাসের কথা স্মরণ করে ডিকেন্সের সেই উক্তি -- "It was the best of times, it was the worst of times, it was the age of wisdom, it was the age of foolishness, it was the epoch of belief, it was the epoch of incredulity, it was the season of Light, it was the season of Darkness, it was the spring of hope, it was the winter of despair..." স্বাধীনতার প্রাকপর্বের এক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়। দুশো বছরের বিদেশী শাসনের কবলমুক্তির জ্যোতির্ময় পুতাগ্নি ও দাঙ্গার আগুনে ঝলসে যাওয়া দেশ, ক্ষমতার দড়ি টানাটানি, কুটিল লাভ লোকসানের হিসাবনিকাশ। "....we had everything before us, we had nothing before us, we were all going direct to Heaven, we were all going direct the other way.."
নোয়াখালির মাটিতে বারুদ স্তূপীকৃত ছিল। তার উৎকট গন্ধ ছিল নোয়াখালির আকাশে বাতাসে। বারুদগন্ধী সেই বাতাসে সুযোগসন্ধানী সাম্প্রদায়িক চিন্তাতাড়িত বিধায়ক গোলাম সারোয়ার নিক্ষেপ করেছিলেন তাঁর 'মুসলিম জাতীয় রক্ষীবাহিনী' নামক ফ্যাসিবাদী স্ফুলিঙ্গটি। জ্বলে উঠেছিল দাঙ্গার আগুন। খুনের বদলা খুন। কলকাতা বদলা নোয়াখালি। নোয়াখালিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা কান্ড শুরু হয় ১৯৪৬ সালের ১০ই অক্টোবর। ঐদিন সকালবেলায় সংগঠিত ও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মুসলিম গুন্ডাবাহিনী, হিন্দু বাড়ির পাশে সমবেত হয়। নেতৃস্থানীয় হিন্দু পরিবার ও জমিদারদের ওপরেই মুসলিম বাহিনী প্রথম আক্রমণ শানায়। শুরু হয় হত্যা, অগ্নিসংযোগ, সম্পত্তি-বিনাশন, লুন্ঠন, হিন্দু-নারী অপহরণ-ধর্ষন-বলপূর্বক বিবাহ। দাঙ্গা তার নৃশংস চরিত্র নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ত্রিপুরা, ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের অন্যান্য জেলায়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে বহু হিন্দু কে এই সময় জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে মুসলিম বাহিনী। কিছু কিছু গ্রামে মৌলানা-মৌলবীরা বলপূর্বক ধর্মান্তরিত হিন্দুদের নিয়মিত ভাবে কোরআন থেকে কালমা ও আয়াতের শিক্ষা দিতে থাকেন। অনেক স্থানে জোর করে গোমাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য করা হয়। ত্রিপুরা জেলায় হেমচরের বাজার, বসতি এলাকায় নৃশংসতা ও হিংসা এতটাই ভয়ঙ্কর চেহারা নয় যে হেমচর শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়। নোয়াখালির দত্তপাড়ায় একই ঘটনা ঘটে। হাজার হাজার পলাতক হিন্দু রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। শত শত হিন্দু প্রাণ হারান। ধর্ষিতা ও ধর্মান্তরিতের সংখ্যাও অজস্র। প্রায় দুই-তিন মাস ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত হিংসাকান্ড ক্রিয়াশীল ছিল।
মিজানুর রহমান সাহেবের মতো কেউ কেউ হাস্যকরভাবে নোয়াখালিতে নিহতের সংখ্যা ১০০ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই তথ্য সম্ভবত অসম্পূর্ণ। মার্ক্সপন্থী তাত্বিক জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে, পূর্ববঙ্গের নিহতের সংখ্যা আরেকটু এগিয়ে গিয়ে কয়েক'শ বলে তাঁর Remembering Partition গ্রন্থে আমাদের জানিয়েছেন। নোয়াখালিতে সূচিত হওয়া হিংসা ক্রমশ পূর্ববাংলার বহু গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতার দাঙ্গায় প্রথমদিকে মুসলিমরা প্রাধান্য নিলেও শেষের দিকে তা বজায় রাখতে পারেনি। আর নোয়াখালিতে গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল মুসলিমদের প্রাধান্য। নোয়াখালী অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৭০ থেকে ৮১ শতাংশ মানুষ ছিলেন মুসলিম। নোয়াখালি জেলাতেই ছিল মুসলিম ধর্মের নেতৃস্থানীয় মৌলানা, মৌলভী, হাজীদের ভীড়। এঁদের অনেকেই উত্তর-ভারত থেকে আগত অবাঙালি মুসলমান ছিলেন। গোলাম সারোয়ার, মৌলানা ও মৌলবীরা একযোগে কলকাতায় দাঙ্গার বদলা নিতে বলে সাধারণ মুসলমানদের উত্তেজিত ও সংগঠিত করেন। ১৯৪৬ সালের ৭-ই অক্টবর হয় এক ঐতিহাসিক সভা। প্রকাশ্যে ডাক দেওয়া হয় হিন্দুনিধনের। এখানে উল্লেখ্য যে নোয়াখালির সব মুসলমান কিন্তু লীগের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। সাধারণ গৃহস্থ বাঙালি মুসলমানদের একাংশের এই হিংসায় সমর্থন ছিল না। তারা অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু মহিলাদের, এমনকি অনেক পরিবারকে ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবন ও ইজ্জত রক্ষা করেছেন। কলকাতার দাঙ্গার সময় ঠিক একই রকম ঘটনা অনেক ঘটেছে। কোথাও মুসলমানরা হিন্দুদের রক্ষা করেছেন আবার কোথাও হিন্দুরা মুসলমানকে রক্ষা করেছে। অজস্র অন্ধকারের মধ্যে মানবিকতার এসব দৃষ্টান্তই মানুষকে মানুষ করে তুলতে সাহায্য করে।
যে ছেচল্লিশ মানে নয়-ছয় হয়ে যাওয়া অস্তিত্ব , যে ছেচল্লিশ মানে ছিন্নমস্তার রুধির পান, যে ছেচল্লিশের অভ্যন্তরে বহু ভগ্ননীড়ের বোবা কান্নার মধ্য দিয়ে , সর্বস্ব হারানো লিয়ারের হাহাকার ফেটে পড়ছে -- Blow, winds, and crack your cheeks! rage! blow! You cataracts and hurricanoes, spout Till you have drench'd our steeples, drown'd the cocks! --- সেই ছেচল্লিশ এই উপন্যাসের মূল ন্যারেটিভকে সূত্রবদ্ধ করেছে।
## আলোচনা: উপন্যাসের কাহিনী, গতিপ্রকৃতি ও চলনের অনুপুঙ্খ নিয়ে দু'কথা বলার ছিল। ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনায় সাম্যদর্শী আশ্রয় নিয়েছে নানাবি�� চিত্রকল্পের। উপন্যাসের প্রায় সবকটি অধ্যায়েই সম্পর্কের বহুস্তরীয় বুনন। বহিঃপ্রকাশ ও ভাষার ব্যবহার এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত, সহজ ও সাবলীল যে, সহজেই তা সাধারণের আকর্ষণের কেন্দ্রে পৌঁছে যেতে পারে। সাম্যদর্শী গল্প বলতে জানে। বলে সহজ, সরল ভঙ্গিতে। তার target audience বা প্রত্যাশীত পাঠক সম্পর্কেও একটা আঁচ পাওয়া যায়। নোয়াখালী, কলকাতা, কলকাতার কাছের মফঃস্বল, অর্থাৎ যুক্তবঙ্গ ও মুক্তবঙ্গের অনেকটা স্পেস লেখক ব্যবহার করেছেন। বাংলা-বিহার যুক্ত ভূমিতে এ গল্প যাওয়া-আসা করে। চল্লিশের দশক বাঙালির জীবনে নির্ণয়ের দশক। দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা এবং দেশভাগের ত্র্যহস্পর্শে হাজার বছরের বাঙালি জীবন ওলটপালট হয়ে যায়। তার নৈতিক এবং মানবিক চিন্তার ক্ষেত্রে যে অধঃপতন ঘটে, তার পুনরুদ্ধার আজও সম্ভব হয়নি। ১৯৪৬ সালে মূল কাহিনীর সূত্রপাত। গল্পের প্রধান চার-পাঁচটি চরিত্র ও তাদের ভুবনের কক্ষপথ চালিত হয়েছে দেশভাগ, দাঙ্গা, স্বাধীনতা এবং তৎপরবর্তী ইতিহাসকে কেন্দ্র করে।
Cyril Radcliffe সীমান্তরেখা টানার পর এক লহমায় লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তুর তকমা অর্জন করলেন। দাঙ্গা আর হিংসা এবং নিপীড়নের ভয়ে ছিন্নমূল, সহায়সম্বলহীন মানুষের স্রোত আছড়ে পড়ল এ পারে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে ও বিধাতাপুরুষের অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে ‘উদ্বাস্তু’ কথাটির সঙ্গে মানবাধিকার, গণপলায়ন, হিংসা, জাতীয় নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো জড়িয়ে গেল। থেকে গেল বুকের ভিতরের অনন্ত হাহাকার। জুড়ে গেল নিরবচ্ছিন্ন অপমান, অসম্মান। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা শিখ ও হিন্দুদের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হয়েছিল এবং ভারতে প্রবেশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। অথচ বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন হল না। তাঁরা বাংলা ও বাংলার বাইরে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় দিনমজুর, বস্তিবাসী হলেন। ‘ট্রানজ়িট ক্যাম্প’-এ ঠুসে রাখা হল তাঁদের। অসহায় মানুষগুলি বাঁচার জন্য অবৈধ দখলদারিও করেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা এই উদ্বাস্তুদের প্রায় ৯০ শতাংশই বাঙালি হিন্দু। পরে আসা আরও উদ্বাস্তু, যাঁদের সারা দেশে আদিবাসীবহুল জঙ্গল এলাকায় আন্দামান থেকে উত্তরাখণ্ড, দণ্ডকারণ্য থেকে দক্ষিণ ভারতে ‘পুনর্বাসন’দেওয়া হল, তাঁদের অধিকাংশকেই নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁরা সংরক্ষণ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত এবং বাস্তবে তাঁদের মাতৃভাষায় শিক্ষারও অধিকার নেই। তাঁরা ক্ষতিপূরণও পাননি কস্মিনকালে। দেশভাগের সাত মাসের মধ্যেই, ১৯৪৮ সালের ২২ মার্চ জওহরলাল একটি চিঠিতে বিধানচন্দ্রকে লিখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান থেকে এ পারে চলে আসার প্রবণতাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত হবে না... অনেক উদ্বাস্তু এলে সেটা পশ্চিমবঙ্গ, এবং বৃহত্তর ভাবে ভারতের পক্ষে সামাল দেওয়া মুশকিল হবে।... উদ্বাস্তুরা যদি আসেই, তবে দেখভাল না করে উপায় নেই... কিন্তু তাঁদের এ পারে আসতে বারণ করাই ভাল।’ উদ্বাস্তুরা যেন সরকারি নিমন্ত্রণ রক্ষায় নিজেদের ভিটে ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে আসছিলেন! কী অবস্থায় পড়লে মানুষ নিজের সর্বস্ব ছেড়ে অচেনার উদ্দেশে পা বাড়ায়, সে কথা জওহরলাল জানতেন না, এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই।
সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর ধারণার ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার পর দুটি স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্রেই নতুন সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু শ্রেণি তৈরি হল, এবং তাদের অস্তিত্ব ও সুরক্ষাও নির্ভরশীল হয়ে পড়ল দুই রাষ্ট্রের তৈরি নীতির ওপর। দুই দেশে দুই রকম রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণে সংখ্যালঘু সমাজ, সংখ্যাগুরু সমাজ, শরণার্থী, দলিত, এমনকী আইনি ভাষায় যাঁরা রাষ্ট্রহীন, সেই মানুষরা— সকলেই দেশভাগের অন্তঃসারশূন্যতাকে স্বাধীন দেশের মধ্যে নানা ভাবে অনুভব করলেন। অর্থাৎ দেশভাগ হল প্রথমে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ব্যবহার করা সমাধান সূত্র, তার পর নতুন রাষ্ট্র তৈরির হাতিয়ার। মনে করুন ঘালিবের সেই কবিতা -- হাজারোঁ খোয়াইশে আইসি কে হর খোয়াইশ পে দম নিকলে -- মর্মে যবে মত্ত আশা সর্পসম ফোঁসে, অদৃষ্টের বন্ধনেতে দাপিয়া বৃথা রোষে -- এই আবেশের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ আলতাফের চরিত্র।
আলতাফের মধ্যে একটা স্বার্থপর মানুষ বিরাজ করছে। সেই মানুষটা যে কল্পনা করে 'দখলের', কিন্তু এককভাবে। তার সম্পত্তিতে অন্যেরা ভাগ বসাবে এটা সে মেনে নিতে পারে না। কোনো একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আঙ্গিকে এইটা একরকমের গভীর প্রেম। নিজের সম্পদের প্রতি ভালোবাসা। মান উন্নয়নের প্রতি নয়। কিন্তু যাদের সাহায্যে সে সম্পত্তি দখল করবে ভেবেছিল, করবীর বাস্তব দেখে সে তাদের প্রতিই ঈর্ষান্বিত হয়, এবং এই দ্বন্দ্বে সে হয়ে ওঠে এক প্রকারের 'Alpha Male'। তার ভোগের নারী হয় সে পাবে, অথবা আর কেউই পাবে না।এদিকে আলতাফের অবচেতনে সংযুক্ত হয়ে রয়েছে যুবক বয়সের কোন এক রহস্যময় অভিজ্ঞাতাজনিত ভয়। সেটা তার মনের ক্যানভাসে হঠাৎ আঘাত করে। সেটা তাকে পঙ্গু করে দেয়। হঠাৎই তার মনে হতে থাকে, সেই ঘটনায় সবাই মারা গেছিল রহস্যময়ভাবে, তাদের বাড়ির লোকেরাও। নিজের বাড়ির কথা সহসাই তার মনে পড়ে। এবং এইখানেই আচম্বিতে দিব্যদৃষ্টি প্রাপ্ত হয় সে। সে হঠাৎই উপলব্ধি করে যে তার স্ত্রীও আসলে তারই মতো অনেকের ভোগ্যা হতে পারে। "মুসলমান মুসলমানের ঘর পোড়ায় না" যে আত্মবিশ্বাসে সে বলেছিল, এটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। এবং তাড়া খাওয়া কুকুরের মত পালাতে থাকে, তার সেই আতঙ্কের অভিজ্ঞতা তাকে তাড়া করে...
আলতাফের মধ্যে দিয়ে সাম্যদর্শী একজন নন-কালেক্টিভ ইন্ডিভিজুয়ালের চরিত্র দেখাতে চেয়েছে যে মানুষ হিসেবে Grey Zone-এ বসবাস করে। সে না ভালো না সম্পূর্ণ ডার্ক -- দুই বৈপরীত্যের দ্বন্ধে সে দীর্ণ।
এগিয়ে চলে ন্যারেটিভ। বকরূপী ধর্মের প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, দুনিয়ায় সবচেয়ে দ্রুতগামী হলো মানুষের মন। এই মনের উপর ভর করেই মানবকল্পনা বিচিত্রগামী। এবং অবসম্ভাব্যগামীও বটে। নদীর এপারের দুঃখময় জীবন ত্যাগ করে ওপারের সর্বসুখ সমন্বিত কোনও এক আদর্শ ভূমির খোঁজ , মানুষের চিরকালই প্রিয়। এই চিরবসন্তময় দেশের অস্তিত্ব কল্পনা করেই মানুষ ভেবেছে স্বর্গের কথা। কিন্তু বিপরীতের অস্তিত্ববিহনে কবেই বা মানুষ পরিপূর্ন সুখ পেয়েছে? গালব ও তার ভেঙে যাওয়া পরিবারের এক্সোডাস আমাদের প্রতিভা বসুর দুকূলহারা গল্পকে মনে করিয়ে দেয়। আঘাতে আঘাতে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গালব ইন্ডিয়ায় প্রবেশ করে। সেই প্রাচীন যুগ থেকে নানা লেখকের কল্পনাবাহিত কলমে ফুটে ওঠা সনাতন ভারত। তদ্দিনে পরিস্থিতির মহাকাব্যিক অভিঘাত তার মতো অনেকের জীবন থেকে ভালোবাসা-স্নেহ সব কেড়ে নিয়েছে। পরিপূর্ন সতেজ জীবন পরবাসে শুষ্ক, শীর্ণ জীবনে পরিণত হতে আরম্ভ করে।
'শকুন' অধ্যায়টি যে প্রচন্ড ইমোশনাল বিস্ফোরণ সহকারে শেষ হচ্ছে, সেখানে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে রাষ্ট্র আসলে কী? তত্ত্বে যেমন পড়া যায়, রাষ্ট্র কি তবে সেই শ্বাপদ জন্তুদের সঙ্গেই তুলনীয়? প্রথমে তারা নিজেদের ‘বিচরণের ভূমি’ তৈরি করে, তার পর সুরক্ষার নামে তাকে চিহ্নিত করে বলে দেয়, কতখানি বৈধ, আর কতখানি নয়, কে থাকতে পারে আর কে থাকতে পারে না? তারই মধ্যে নাগরিক/ অ-নাগরিকরা রাষ্ট্রের আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, সীমান্ত বস্তুটিকে পাত্তা না দিয়ে একটা সমান্তরাল চলমানতা তৈরি করে চলে। অর্থাৎ দেশভাগ ও দেশনির্মাণ যখন একত্রে চলে, তা আসলে অনেকগুলো বিকল্প অস্তিত্ব তৈরি করে ফেলে, কোনও একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় আদলে রেখে একে ব্যাখ্যা করাই মুশকিল হয়ে যায়। বিভিন্ন শ্রেণি ও বিভিন্ন জাতির মানুষরা রাষ্ট্রেরই নির্দেশে নিজেদের নতুন অস্তিত্বের খোঁজে বেরিয���ে পড়ে, নানা ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে তৈরি হয় কত রকম আঞ্চলিক জন-সমাজ, আলাদা আলাদা প্যাটার্নের। পশ্চিমবঙ্গে অসহায় নিপীড়িত উদ্বাস্তুদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি। পরে এই উদ্বাস্তুরা বামপন্থীদের স্থায়ী ভোটব্যাঙ্ক হয়ে ওঠেন।
কিন্তু এখানেও হলো এক নিদারুন irony of fate! বামপন্থীরা বলেছিলেন যে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বা অবাধ ধনতন্ত্র তো নৈতিক দিক থেকে কোনওমতেই সমর্থন করা যায় না, এবং এর মোকাবিলার তাগিদেই এক শ্রেণীহীন, শোষণহীন সমাজের সূচনা করতে হবে। কিন্তু স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, সিনথেটিক সমাজতন্ত্রের বাস্তব যে চেহারাটা বেরোল, তা হল মুক্তসমাজের বদলে একনায়কতন্ত্র, স্বাধীনতার বদলে নিপীড়ন, উন্নয়নের বদলে জনগণের জন্যে দারিদ্রের সমবণ্টন, আর পার্টির এলিট আর আমলাদের সামন্ততান্ত্রিক যথেচ্ছাচারের শোষণমূলক এক নির্মম, অন্ধকার চেহারা। আত্মসমীক্ষা, আত্মমূল্যায়ন এবং আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে অন্ধকারের কাছে নিজেদের সমর্পন করলো বৈপ্লবিক দল।
এই সামগ্রিক অবক্ষয়ের চিত্রায়ন, উপন্যাসটির শুরু ও শেষকে একটি বিনিসুতোয় গেঁথে রেখেছে। উপন্যাসটির এই কাঠামোতে লেখক অনেককিছু পুরে দিয়েছেন। দেশভাগ, বামপন্থার অবক্ষয় প্রসঙ্গ, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, পূর্ববঙ্গ ছাড়ার স্মৃতি, বেদনা, প্রাদেশিকতার বিদ্বেষ, দুই কালের মূল্যায়ন, পুরুষের বহুগামিত্ব, হিন্দুর প্রতি অশিক্ষিত দরিদ্র মুসলমানের নিষ্ফল আক্রোশ, নারীর বহুপ্রেমিক তত্ব, নারীর স্বীয় maternal instinct, নারীর আত্মনির্ভরতাবাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ম্যাথমেটিকাল লজিক, সনাতন ভারতের আজন্মলালিত আধ্যাত্মিকতা, যৌন ঈর্ষা ইত্যাদি, প্রভৃতি। দূর অতীতের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যত গভীর ও বিস্তৃত হবে , উপন্যাসের বাস্তবতা তত উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ঔপন্যাসিক তাঁর রচনাকর্মে ততোধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।
## শেষে যা বলার রইল: যেভাবে ক্রমশ পরিণতির দিকে এগিয়েছে কাহিনী, তাতে কোথাও তার গতি মন্থর হয়নি। তার চরিত্র নির্মাণের ক্ষমতাও সমাদরযোগ্য। লখা চরিত্রটি উল্লেখযোগ্য। বিশ্বসাহিত্যে প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক হ্যান্ডলার তথা পেশাদার খুনির চরিত্রের অভাব নেই। লখা চরিত্রটির মধ্যে বিশ্বের বহু কনট্র্যাক্ট কিলারের চরিত্রের আদল দেখা যায়। তবু স্রেফ গঠনের পটুতায় লখার চরিত্রটি একটি ভিন্ন আবেদন নিয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে। জঁর অবধারণ করতে গেলে বলতে হয় যে সাম্যদর্শীর এই উপন্যাস ঐতিহাসিক ও থ্রীলার এই দুই অনুষঙ্গকেই অ্যাডপ্ট করেছে নিজের মতো করে। এখানে ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে আমার কিছু বক্তব্য আছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাসে ঘটনার পর ঘটনার উপস্থাপন দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলির চমৎকারিত্ব প্রশ্নাতীত। কিন্তু যে নিগূঢ় কামনা-বাসনার আলোড়নে ঘটনা সংঘটিত হয়, সে বিবরণ ঔপন্যাসিকের কাছেই লভ্য , ঐতিহাসিকের কাছে নয়। ইতিহাসে প্রাপ্ত মানুষের প্রামাণিকতা সন্দেহাতীত। উপন্যাসে প্রাপ্ত মানুষ তাঁদের আবেগ-অনুভূতির নানা বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে পাঠকের কাছে অনন্য হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিকের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো তুচ্ছ ঘটনাও ঔপন্যাসিকের কাছে ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠতে পারে। ঐতিহাসিক Edward Hallett Carr তাই যখন বলেন যে কোনো এক শতাব্দীর ইতিহাসের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ফুটনোট পরবর্তী শতাব্দীর ক্লাসিক উপন্যাসের সরঞ্জাম হতে পারে। সাম্যদর্শী দশে দশ পাবে উপন্যাসের প্রথম দু'টি অংশের জন্য। 'বেড়াল', 'শকুন' এই দুই অধ্যায়ে সাম্যদর্শী নির্মাণ ও অবিনির্মাণের এক কল্পবাস্তবের সম্মোহনে আটকে রেখেছে পাঠককে। এখানে লেখকের শারীরিক শক্তি, মানসিক শক্তি, নৈতিক শক্তি সবটুকুই তমালিনী তমসায় ব্যাপৃত। সে নিজেই অন্ধকার হয়ে উঠেছে।
কিন্তু তৃতীয় অংশ অর্থাৎ 'এবং অন্যরা'-তে সে নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ডার্ক রাইটিং'এর natural deathtrap এইটাই যে একটি স্পেসিফিক লেভেল পেরিয়ে লেখক নিজেই সেটার থেকে একটা মুক্তি খোঁজেন। খোঁজার সময়ও তিনি বুঝতে পারেন হয়তো যে তিনি সরে যাচ্ছেন। এই উপন্যাটি সামগ্রিকভাবেই একটা ডার্ক টোনে শেষ করা উচিৎ ছিল। কিন্তু শকুনের শেষাংশে যখন তার গতি হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল, পাঠক হিসেবে আমার মনে হচ্ছিল যে সে বোধকরি কোনোভাবে এই পরিবেশটা ছেড়ে পালাতে চাইছে। 'শকুনে' সাম্যদর্শী হুমায়ুন আজাদকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছে। পারেনি। পারেনি কারণ সাম্যদর্শীর হেরে যাওয়া ক্যারাক্টারগুলোও লড়ে গিয়েছে শেষ পর্যন্ত। তারা তাদের টক্সিকেশনকেই ব্যবহার করে পুষ্ট হয়ে শেষ রক্তবিন্ধু অবধি সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। ফলে আজাদের মত অল ডার্ক নিঃসীম ফ্লোলেসনেস আনা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তারপরও বেড়ালের ডায়ালেক্টিক্স, সাক্সেসফুলি শকুনে তো সে নিঃস্সরণ করতে পেরেছেই, সাথে সাথে হাইটটাও অনেকটা বাড়িয়ে দিতে পেরেছে। কিন্তু একদম শেষতক লখা ক্যারাক্টারটার কাছে সাম্যদর্শী নিজেই হেরে গিয়েছে অকারণ মানবিক হতে গিয়ে। সাম্যদর্শী হেরে গিয়েছে মিস গুহরায়কে বন্ড বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে। এবং সাম্যদর্শী গডফাদার ও মিস গুহরায়কে শেষ দানে Deus ex machina বানাতে গিয়ে ও চটজলদি ডিশ রান্না করে পাঠককে খুশি করার চেষ্টা করার অপচেষ্টায় হাফ পয়েন্ট হারালো।
লেখক সততই একজন সাক্ষী, নির্লিপ্ত, নিরপেক্ষ এবং নিরাবেগ। তাঁর দায় শুধু ঘটমানকে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।বাকি চরযাচর্যবিনিশ্চয়ের দায় পাঠকের।
সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, এই বই একটি দলিল। একটি ক্রাইম থ্রিলার হঠাৎই যে কখন মোড় ঘুরে আপনাকে নিয়ে যাবে আমাদের পূর্বদিকের এক ভূখন্ডে যা একদা আমাদের কারোর কারোর পূর্বজদের ভিটা ছিলো, সাক্ষী দেবে বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম মাস এক্সোডাসের, যা কিনা বিদ্দজ্জনের মতে কেবলই ভূমিসংস্কারের ফসল, ধরতে পারবেন না।
বাকিটা, পড়েই ফেলুন না হয়, তারপর দেখুন বেড়াল, শকুন এবং অন্যদের চিনতে পারেন কিনা 🙂
গল্পের প্রথমার্ধের প্লটকে বেড়ালের নিঃশব্দ পদচারনায় বেঁধেছেন ৷ 'লখা'র উৎপত্তির কিয়দংশ প্রকাশ পেলেও তাঁর 'কেন?' প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শেষাংশে যেতে হয় ৷ প্রথমারর্ধে তৈরি সাসপেন্সের সাথে দ্বিতীয়ার্ধের 'শকুন' পর্বের মিল নেই, তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে বর্ণিত শকুন—কথা দাঙ্গা বিদ্ধস্ত নোয়াখালির জীবন্ত সাক্ষী, পাঠকের মানসপটে ভেসে ওঠে ৪৬—এর রক্তাক্ত লক্ষ্মীপূর্নিমার রাত, একটি পলায়মান পরিবারের ভয় আতঙ্ক ও অন্ধকার মিলেমিশে পাঠককে বড়শিতে গেঁথে ফেলে দেয় উত্তাল কালপদ্মায় ৷ আদিম যৌনতা, পরাবাস্তবতা ও বাঁচার উদগ্র ইচ্ছারা চরিত্রদের জীবন্ত করেছে, একই সাথে আঞ্চলিক ভাষার সীমিত প্রয়োগ হওয়ায় এটি সহজপাঠ্য হয়েছে ৷
শেষাংশের '...অন্যরা' অত্যন্ত থ্রিলিং ও সাবলীলভাবে বর্ণিত ৷ 'বেড়াল' এর 'কেন?' ও 'শকুন' এর 'কোথায়?' এর সম্মিলিত উত্তর চরিত্রদের সম্পূর্ন করেছে ৷ এটি এতটাই গতিশীল যে সিনেমার স্ক্রিপ্ট পড়ছেন ভাবলে ভুল হবেনা ৷
তবুও কিছুক্ষেত্রে লেখকের পরিস্থিতি এবং প্রকৃতির দীর্ঘবর্ননা গল্পকে স্লথ করেছে ৷ রথীন রায়, প্রভাত পালদের সম্পূর্ন ডার্ক দেখালেও বিপরীতের নায়িকা 'মিস গুহরায়' , ��ায়ক 'লখা' সম্পূর্ন কলঙ্কমুক্ত নয় ৷ বাস্তবক্ষেত্রে সমাজে নেতারা সাদা পাঞ্জাবী পরে কালোকে ঢাকার চেষ্টা করেন, সাধারন মানুষের সেই ইমেজ ধরার দায়টাও নেই, তাই চরিত্ররাও সেই সব সাধারন মানুষদেরই একজন ৷ মিস গুহরায়ের মোহিনী অবতার কৃষ্ণের মত যুদ্ধের প্রকৃতিকে তাঁর নিয়ন্ত্রনাধীন রেখেছে, প্রথম প্রজন্মের মাধবীর আত্মত্যাগের আগুনে সৃষ্টি এই চরিত্রটি যেন তাঁরই শতগুণ updated version ৷ 'মিস গুহরায়' চরিত্রটির ভবিষ্যতে অন্যসিরিজে আবির্ভাবের ইঙ্গিতও লেখক দিয়েছেন, যদিও লেখকের আগের আধা খ্যাচরা কাজগুলো নিয়ে ভক্তবৃন্দের অভিযোগের অন্ত নেই ৷ ইনি দয়া পরবশ হয়ে চরিত্রটির অন্যান্য মিশন নিয়েও এর চেয়েও বেশী exciting গল্প ফাঁদবেন এই আশায় অধমের রিভিউ দেওয়া ৷
'বেড়াল, শকুন এবং অন্যরা' নিঃসন্দেহে থ্রিলারের উর্দ্ধে উঠে বাংলা সাহিত্যের নিষিদ্ধ এলাকায় সগর্বে বিচরণ কারী ভিন্নধর্মী কাজ ৷ বীভৎস ঘটনাক্রম লিখনশৈলীতে ঘৃণাউদ্রেক করেছে, হাহাকাররা হাতুড়ি হয়ে পড়েছে পাঠকের বুকে, যা নিদারুন বাস্তব বলেই হয়তো সম্ভব ৷ এই কারনে 'শকুন'কেই গল্পের শ্রেষ্ঠ অংশ বলা যায় ৷
একজন লেখক এর লেখা স্বার্থক তখন ই যখন সেই লেখা পড়তে পড়তে ঘটনা গুলো চোখের সামনে ভাসতে থাকে।। "বেড়াল শকুন এবং অন্যরা" পড়তে পড়তে যেন মনে হচ্ছিল আমার ও চোখের সামনে সেসব ভাসছে। এখানেই উপন্যাস টিকে আরো রোমাঞ্চকর করে তুলেছেন লেখক।