সন্ধে নামার পর যত না ভয়ের গল্প,তার থেকে বেশি আবহের গল্প। গোটা বইটির পটভূমিকায় রয়েছে এই মন খারাপ করা ভয়ের পরিবেশ। শুনেছিলাম, পশ্চিমি দেশে আত্মহত্যার পরিমাণ প্রাচ্যের চেয়ে বেশি। এর কারণ, ওখানকার পরিবেশের একটা বড় প্রভাব। স্যাঁতস্যাঁতে ধূসর আকাশ, ঝুপঝুপ বৃষ্টি অথবা একটা দমবন্ধ করা ভ্যাপসা গরম, স্লেট আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে অশুভ বার্তা নিয়ে আসে। Gloomy Sunday এর মতো ব্যাপার অনেকটা। পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে নিয়ে খেলেছেন নির্বাণ। পাঠককে বাধ্য করেছেন স্বাদ পেতে সেই "অবসাদিক ভয়ের"। রাইমনির মতো ক্লাসিক ভয়ের চরিত্রকে পুনর্বিন্যাস করেছেন নিজের তৈরী এই অবসাদের পরিবেশে। তথাকথিত তন্ত্র,মন্ত্রের বা গতানুগতিক ভয়ের থেকে বেরিয়ে শুধুমাত্র পরিবেশ তৈরি করে পাঠককে দিয়েছেন "অবসাদিক ভয়" এর স্বাদ। এখানেই নির্বাণের মুন্সিয়ানা। অন্য রকম ভয় পেতে চাইলে এই বই অবশ্য পাঠ্য।
🍁 বই - সন্ধে নামার পর 🍁 লেখক - নির্বাণ রায় 🍁 প্রকাশনী - বনবিবি 🍁 দাম - ২২৫ টাকা
সদ্য পড়ে শেষ করলাম আমার বহু প্রতীক্ষিত প্রাপ্তমনস্ক ভয়ের সংকলন 'সন্ধে নামার পর'। দারুন একটা বই পড়লাম। গ্রামবাংলার পটভূমিতে একেকটা ভূতের গল্প সত্যি গায়ে কাঁটা দেয়। কাল সন্ধে নামার পর লোডশেডিং এর মাঝেই পড়েছি বইটা। যে যে কাহিনিগুলি এই বইতে আছে সেগুলি হল --
🌿 ছোটগল্প 🌿
🍁 ঘোর - কোনও এক বৃষ্টির সন্ধ্যেতে খেলে বাড়ি ফেরার পথে চায়ের দোকানে বসে শ্যামলকাকা তার একসময়ের ভৌতিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। কি ছিল সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিজ্ঞতা ?
🍁 বীভৎস - বুবুনের মাসির বাড়ি এসে বুবুনের মেসো আর তার ছেলে স্বপনের থেকে এক বীভৎস মৃত্যুর ঘটনা শোনেন বক্তা। কি ছিল সেই বীভৎস ঘটনা ?
🍁 ডাক - দুই বোন নীলু আর বিলু পড়া ছেড়ে উঠে পুকুরের সামনে গিয়ে অন্ধকারে মন্ত্র পড়ছিল কেন ? প্রভাতবাবু মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই বা কি ভয়ঙ্কর জিনিস দেখলেন ?
🍁 দরজা - বুম্বা, বাপি, শুভ আর মানিক চারজন মিলে মদ্যপান করতে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল এক ভাঙাচোরা বাড়ি। বুম্বা সেখানে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। তারপরেই সে জ্ঞান হারায়। কিন্তু কোন ঘটনার সাক্ষী ছিল সে ?
🍁 ঘুড়ি - ছেলেটা ঘুড়ি ওড়াতে খুউব ভালোবাসে। আজ আবার বিশ্বকর্মা পুজো। কিন্তু মা তার ছেলেকে আজ ঘুড়ি ওড়াতে দেবে না। কেন ? ছেলেটি কি তবে আজ ঘুড়ি ওড়াবে না ?
🍁 অন্ধকার - বাবা মা মারা যাওয়ার পর ইন্দ্রজিৎ একাই। তবে বড্ড নোংরা সে, পরিষ্কার থাকে না একদম। একদিন হঠাৎ সে তার পকেটে দুটো চাবি পায়। ছাদের আর চিলেকোঠার। চিলেকোঠার ঘরের তালা খুলতেই যা দেখল সে তাতে তার হাড় হিম হয়ে যায়। কি দেখেছিল সে ? তারপরেই সে থানায় ফোন করে। তারপর কি হল ?
🍁 নেক্রোফিলিয়া - সনৎ মর্গে কাজ করে। সুরো তাকে এনে দিয়েছে সদ্যমৃত মেয়ের লাশ। ভারী পছন্দের সনতের। আজ আবার চন্দ্রগ্রহণ। কিন্তু নেশায় থাকলেও সে মর্গের ভেতরেই দেখতে পায় এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। কি ছিল সেটি ?
🌿 বড়গল্প 🌿
🍁 বিনু আর ওরা - বিনু আর বাকিরা ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরবে। আজ ফনী ঝড় আসবে। বাড়ি ফেরার আগে একটা অদ্ভুত জিনিস অনুভব করে বিনুরা। ফেরার পথে বিনু বক্তাকে রতনকাকার একটা পা বাদ যাওয়ার ভয়ঙ্কর ঘটনা শোনায়। কি ছিল সেটি ?
🍁 মানত - মৌসুমীদির বিয়ের পরে কিছু কারণে তাকে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কেন ? এরপর একদিন মৌসুমী দি গলায় দড়ি দেয়। কিন্তু কেন ? আর বিনু এসবের মাঝে কীভাবে জড়িয়ে রইল ?
🍁 মুরগিচোর - বিনুদের বাড়ি থেকে একদিন মুরগি চুরি যায়। শুধু তাদের বাড়িই নয়, আশেপাশে অনেক বাড়ি থেকেই এই লকডাউনে অনেক ছাগল, মুরগি, হাঁস, গরু চুরি যায় আর নয়ত মরে পড়ে থাকে। কিন্তু কেন ?
🍁 মঙ্গল - বিশ্ব আর মৌ কলকাতায় আছে এখন। বিশ্ব অফিসে বেরিয়ে গেলে মৌ একা। কিন্তু এখন তার একমাত্র সঙ্গী একটা বিড়াল, মঙ্গল। কিন্তু একটা বিড়ালের উপস্থিতি দাম্পত্যে বাধা হয়ে দাঁড়াল বিশ্ব আর মৌ এর। এরপর কি হবে ?
🌿 সম্পূর্ণ উপন্যাস 🌿
🍁 তৃষ্ণা - দুর্গাপুজোর এক সন্ধ্যেয় বাড়ির কাজের লোক সুখিয়া গঙ্গার ঘাট থেকে এক বউ রাসমণিকে নিয়ে আসে। মালকিন অনেক দিন ধরেই একজন মেয়ে খুঁজছিলেন নাকি! কিন্তু হঠাৎ তারপর থেকে সুখিয়া, রাম সিং মারা গেল। কেন ? বিশু বাগদি একদিন বাড়ির পেছনে এক ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কি ছিল সেটি ? এই ঘটনাগুলির মধ্যে কি কোনও সম্পর্ক আছে ?
এইসব মিলিয়ে একটা দারুন সংকলন এই 'সন্ধে নামার পর'। বেশিরভাগ গল্পেই উঠে এসেছে গ্রামবাংলার পরিচয়। কিছু কিছু গল্প রীতিমত তীব্র অস্বস্তিকর। 'নেক্রোফিলিয়া' বা 'মুরগিচোর' বা 'মানত' গল্পগুলো পড়ার পর কেমন একটা লাগছিল। অস্বস্তির ভাবটা বাড়ছিল। ভয়ের পরিবেশ যেভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার প্রশংসা না করলেই নয়। লেখকের লেখনী আর গল্পের ভাবনাগুলিও দারুন। বলতে পারি আমার বহুদিনের অপেক্ষা সার্থক। আর এই বইয়ের অসাধারণ প্রচ্ছদটা ওঙ্কারনাথ বাবুর করা। সাথে প্রচুর অলঙ্করণ গুলিও তাঁরই করা। প্রচ্ছদ আর অলঙ্করণ বইয়ের সৌন্দর্যের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বানান ভুল তেমন চোখে পড়েনি। বনবিবির প্রথম বই হিসেবে দারুন প্রোডাকশন। পেজ কোয়ালিটিও দারুন। লেখকের থেকে এক্সপেকটেশন অনেক বেড়ে গেল। এটা একটা মাস্ট রিড বই আমি বলব। আপনারা সকলেই পড়ে দেখুন বইটি। ভালো লাগবেই। লেখকের লেখনী চলতে থাকুক। ভালো থাকবেন সকলে।
◆সন্ধে নামার পর ◆নির্বাণ রায় ◆প্রচ্ছদ ও অলংকরণ ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য ◆বনবিবি পাবলিকেশন ◆প্রথম প্রকাশ ২০২২ ◆২২৫ টাকা
ভয়ের গল্প অথবা ভৌতিক গল্প বেশিরভাগ পাঠকদের কাছে পছন্দের বিষয়।আমিও এই বিষয়ের উপর বই পড়তে বেশ ভালোবাসি। সম্প্রতি পড়লাম নবীন লেখক নির্বাণ রায়ের লেখা ( প্রাপ্তমনস্ক) ভয়ের গল্প সংকলন 'সন্ধে নামার পর '। এই বইতে মোট সাতটি গল্প ,চারটি বড় গল্প এবং একটি উপন্যাস রয়েছে। ■গল্প ঘোর বীভৎস ডাক দরজা ঘুড়ি অন্ধকার নেক্রোফিলিয়া ■বড়গল্প বিনু আর ওরা মানত মুরগিচোর মঙ্গল ■উপন্যাস তৃষ্ণা ভৌতিক বা ভয়ের গল্প কাহিনি প্রচুর লেখালেখি হয়েছে ,হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে তাই আমার মনে হয় যে এই বিষয়ের উপর অন্যরকম কিছু লেখা মোটেও সহজ নয় কারণ ভৌতিক গল্পে কিছু কমন এলিমেন্ট লক্ষ্য করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে এই সংকলন আমার দারুণ লেগেছে।এর মূল কারণ লেখকের গল্প বলার ধরন।প্রতিটি গল্প এতো সুন্দরভাবে পরিবেশন করা হয়েছে যা একদিকে যেমন ভয়ের আবহ তৈরী করেছে ,তেমনই মনোগ্ৰাহী হয়ে উঠেছে।এই সব বৈ��িষ্ট্য ভৌতিক বা অলৌকিক গল্পকে আকর্ষণীয় করে তোলে।শুধু ভৌতিক আবহ বা গা ছমছমে অনুভূতি নয় প্রায় প্রতিটি গল্পেই উঠে এসেছে গ্ৰাম মফস্বলের প্রকৃতি ও গল্পের চরিত্রগুলির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনের কথা।প্রতিটি গল্প সম্পর্কে আলাদা করে আলোচনায় যাচ্ছি না। আমার প্রত্যেকটি গল্পই ভালো লেগেছে। তবু ব্যক্তিগতভাবে অন্ধকার,দরজা,ডাক , বিনু আর ওরা , মঙ্গল, মানত এবং তৃষ্ণা খুবই ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ লেখক নির্বাণ। ভালো থাকবেন। আপনার আরো লেখা পড়বার অপেক্ষায় থাকবো।
ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য এই বইএর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন যা এই সংকলনের সম্পদ ।প্রচ্ছদে অন্ধকার আবহে হ্যারিকেন ও তার হলুদ আলো ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে করিয়ে দিলো। আর প্রতিটি গল্পের অলংকরণ এককথায় অনবদ্য হয়েছে যা গল্পে লেখা ভৌতিক আবহকে সম্পূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
নতুন প্রকাশনা বনবিবির এটাই প্রথম বই।বানান ভুল চোখে পড়েনি। প্রোডাকশন বেশ ভালো হয়েছে।যারা ভৌতিক গল্প পড়তে ভালোবাসেন তারা এই সংকলন পড়তে পারেন ।আশা করি ভালো লাগবে।
বেশ একটা গা শিরশির ভাব আছে, পড়তে গিয়ে টের পেয়েছি। মঙ্গল গল্পটা একদম 👌👌।। সন্ধ্যে নামার পর পড়লে কিন্তু গা ছমছম করবেই 👽। লেখকের কাছে থেকে আরো এরকম আশায় রইলাম। 🙏