পেটের উপর থেকে শাড়িটা একপাশে সরিয়ে সেখানে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে সুজাতা বলল, 'আর কটা দিন চুপচাপ থাক।' সুজাতার ক্রমান্বয়ে স্ফীত হওয়া পেটটা প্রতিদিন বড় হচ্ছে। পেটের ভেতর টলটলে পানি, সেই পানিতে ডুবে আছে আরেকজন। যে প্রতিদিন প্রহর গুনছে পৃথিবীর আলো দেখার। এই আলো কী দেখার সুযোগ পাবে সে? সুজাতার ভয় হয়। বড্ড ভয় হয়। আশেপাশের অবস্থা ভালো না। নানান কথা কানে আসে। এইসব কানকথায় খুব একটা পাত্তা দেয় না সুজাতা। তবুও ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সামনে কঠিন সময়। যুদ্ধদিন। আগুনের দিন।
দ্রুত পড়ে ফেললাম ছোট গল্পটি। লেখক এখানে গ্রামের মোড়লমার্কা লোকের লোলুপ দৃষ্টি, জেলে পাড়ার মানুষের সংগ্রামের বিষয় ছাপিয়ে যুদ্ধাবস্থায় মানবিক টানাপোড়েনের গল্প এঁকেছেন। বইয়ের শেষলাইনটা অদ্ভুত সুন্দর। ছোটোগল্পে শেষলাইন বলে দিলে স্পয়লার হয়ে যাবে তাই বললাম না।
"ছায়া সন্ধান" বইটা যুদ্ধের সময়ের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবসময় একটি বিভেদের দেওয়ার তুলে দাঁড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক বৈষম্য। প্রাচুর্যের আধিক্য থাকলে মানুষ পাষাণ হয়ে যায়। শোষণ করে আরও সম্পদ গড়তে চায়। চায় সবাই তার পায়ের নিচে থাকবে। কাজের সাথে কামের দিকেও নজর থাকে গ্রামের মোড়ল জাতীয় মানুষদের। তাদের লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে বাঁচার তাগিদ খুঁজে নারীরা।
"ছায়া সন্ধান" এমনই এক ছোটো গল্প যেখানে আর্থিক দৈন্যতার পাশাপাশি উঠে এসেছে গ্রামের মোড়লের কু-নজর। সেই সাথে যুদ্ধের ভয়ংকর দিকের প্রতিও আলোকপাত করেছেন লেখক। গল্পের শেষ দারুণ লেগেছে। বেশি কিছু বলছি না, স্পয়লার হয়ে যাবে।
লেখকের গল্পবুনন, শব্দশৈলী সবসময়ই চমৎকার। ভাষাশৈলী মুগ্ধ করেছে। গল্পের গতিও মন্দ ছিল না। তবে মনে হয়েছে, লেখক চাইলেই মাঝের জায়গাগুলোতে গল্পের গতি শ্লথ করতে পারতেন। দ্রুততার সাথে এগিয়ে যাওয়া গল্প কখন যে শেষ হয়ে গেল, ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। এক পর্যায়ে ভুলেই গিয়েছিলাম যে ছোটো গল্প পড়ছি। এমন গল্প বৃহৎ পরিসরে আসার দাবি রাখে। সে কারণেই হয়তো কিছুটা অপ্রাপ্তি ঘিরে ধরছে। গল্প আরেকটু বড়ো হলে খারাপ হতো না।
পাঁচ অধ্যায়ে রচিত "ছায়া সন্ধান" প্রকাশ করেছে ইবুক প্রকাশক "বইঘর"। বইঘর অ্যাপের একটা কমন সমস্যা লক্ষ্য করেছি, গল্পের মাঝে অনেক জায়গায় ফন্ট বড়ো ছোটো থাকে। এছাড়া দুয়েকটা মুদ্রণ প্রমাদ ছিল। কিছু জায়গায় 'য়' আসেনি। যেমন 'সময়' হয়ে গিয়েছিল 'সম'। 'ধোঁয়ায়' এর পরিবর্তে লেখা ছিল 'ধোঁয়া'.... ইত্যাদি।
"ছায়া সন্ধান" ছোটো গল্প হিসেবে পারফেক্ট। দ্রুত সময়ের মধ্যেই পড়ে নেওয়া যায়। ইবুক জাতীয় এমন প্রকাশনা মুগ্ধ করছে। ভবিষ্যতে এমন আরও ভালো কাজ চাই তাদের কাছ থেকে।
বই : ছায়া সন্ধান লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম অধ্যায় : ৫ প্রকাশনী : বইঘর (ইবুক) মূল্য : ৩০ টাকা
“শক্তি এবং ক্ষমতা নিয়ে বরাবরই এক ধরনের ঝামেলা সবার মাঝেই লেগে যায়।” — অ্যান্ড্রিউ কুমো
যার আছে তার আরো চাই, যার নেই তার পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ সব পাওয়া সেই যার আছে তার ঝুলিতেই। ক্ষমতা পেলে তার অপব্যবহার করার লোকের সংখ্যাই অধিক। তেমনই এক গ্রামের মোড়ল রহিম মুন্সী। ক্ষমতা আর সম্পদ বাড়িয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। আর এদিকে অভাবী জেলে গ্রামের সকলেই কোনমতে এক বেলা, দু'বেলা আধপেটা খেয়ে দিনাতিপাত করছে। সুজাতা দিন গুনছে পৃথিবীতে এক নতুন মুখের শুভেচ্ছা জানাতে। স্বামী সুবল আর শশুর অমলকে নিয়ে তার সংসার। অভাবের মাঝেও ভালোই দিন যাচ্ছিল। কথায় আছে, "যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ"। তেমনটাই হয়েছিল। গ্রামে পাক সেনাদের আগমনের পূর্বাভাস। শহর জ্বালিয়ে তারা এগিয়ে আসছে। গ্রামকে গ্রাম মৃত্যুপুরীতে পরিণত করছে তাদের হিংস্র থাবায়। চারদিকে মৃত্যুদূত ঘুরছে। এরমাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে কি?
পাঠ প্রতিক্রিয়া: ছোটগল্প পড়ার এই এক অসুবিধে। গল্পের ভেতর ঢুকতে ঢুকতেই বের করে দেয়। "ছায়া সন্ধান" সেরকমই একটি গল্প। যেখানে ক্ষমতা লোভী এক মোড়ল আছে, আছে অভাবে দিন কাটানো গ্রামবাসী। ক্ষমতার ঝুলি বড়ো করতে একজন ছুটছে, আরেকজন ছুটছে একবেলা পেটে কিছু অন্ন জোগাড় করতে। এভাবেই দিন কাটছে। পাশাপাশি লেখক যুদ্ধের সেই দিনগুলোর ভয়াবহতার ছোট্ট একটা চিত্র দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন শত আঁধারের মাঝেও একটু আলো। অল্প পরিসরে জীবনের বাস্তবতা আর ইতিহাসের এক টুকরো লেখক সুন্দর করেই প্রকাশ করেছেন। পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। ছোটগল্প নিয়ে আসলে বেশি কিছু বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যায়। তাই আর কথা না বাড়াই।