প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য বাংলায় লেখা রহস্য উপন্যাসের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবু এই বইটি... স্পেশাল। লেখক বিশ্বজিৎ নন-ফিকশন গবেষণামূলক কাজের জন্য বিখ্যাত। আর পাঁচটা কাজের মতো তিনি এই বইয়েও থিম হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাংলায় নিতান্ত স্বল্পচর্চিত এক থিমকে। নারী সমকামিতা! তবে "কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী"-র ধিকিধিকি জ্বলে নিঃশেষ হওয়াকে তিনি উপজীব্য করেননি। বরং এই বইয়ের দু'টি লেখা সরাসরি পাঠকের চোখে চোখ রেখে জানতে চেয়েছে, "কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?" বইয়ের প্রথম লেখা~ 'ডুবসাঁতার।' এটি শুরু হয়েছে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সাগ্নিকের অসুস্থতা নিয়ে। তখনই, তাঁর পরমাত্মীয় হিসেবে আমরা চিনতে পারি বৃষ্টিকে। একটু-একটু করে নন্দিতার সঙ্গেও আমাদের আলাপ হয়। এরপর ধীরে-ধীরে উন্মোচিত হয় অতীতের অনেক পাপ— যাদের দীর্ঘ ছায়া ঢেকে দেয় বাস্তবকে। অনেক অন্ধকার আর ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলে অমোঘ ভঙ্গিতে। আসে মৃত্যু। আসে সত্য! বইয়ের দ্বিতীয় লেখা~ 'নির্জনে বৃষ্টি।' প্রথম কাহিনি যেখানে শেষ হয়েছে, তার ঠিক পর থেকেই শুরু হয় এটি। এই গল্পটির নিয়ামক হয় প্রতিশোধস্পৃহা। ঘাত ও প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এই কাহিনিও পৌঁছোয় কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে। কিন্তু লেখক কি এদের রহস্য-উপন্যাস হিসেবে নির্মাণ করতে চেয়েছেন? আমার তা মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, দু'টি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা প্লেটনিক সীমা পেরিয়ে শরীরের আকর্ষণে উদ্বেলিত হলে কী হয়— সেটি দেখতে তথা দেখাতে চাওয়াই তাঁকে দিয়ে এই দু'টি কাহিনি লিখিয়ে নিয়েছে। তাই ফরেন্সিক বা মনস্তাত্ত্বিক খুঁটিনাটি পাইনি আমরা। খলচরিত্রদের ভীষণরকম একপেশে করে দেখানো হয়েছে। বরং নারীদেহের বর্ণনায়, শয্যায় আদিম খেলায় এবং রিরংসার প্রবল প্রকাশে তাঁর এই লেখারা উচ্ছ্বসিত। সন্দেহ হয়, লেখকও কি তাঁর দুই কেন্দ্রীয় চরিত্রের সম্বন্ধে "হয়তো সে কন্যার হৃদয়/ শঙ্খের মতন রুক্ষ, অথবা পদ্মের মতো— ঘুম তবু ভাঙিবার নয়" জাতীয় কিছুই ভেবেছিলেন? তবে হ্যাঁ, ইংরেজিতে যারে "টো-কার্লিং ডেসক্রিপশন" কয়, শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলায় সে-জিনিস পড়তে চাইলে এটি অবশ্যই পড়তে পারেন। বিলক্ষণ আনন্দ পাবেন। বইটির ছাপা ও বানান শুদ্ধ। প্রচ্ছদটি 'ওয়াইকিকি'-র কথা মনে করিয়েও বেশ শৈল্পিক। সব মিলিয়ে এই ব্যতিক্রমী বইটিকে আপন করে নেওয়াই যায়। অলমিতি।