জামশেদ! এক বিচক্ষণ শার্প শ্যুটার, ৮৮’তে সাফ গেমস্ শ্যুটিং কম্পিটিশনের গোল্ড মেডেল বিজেতা। ছোটবেলা থেকে এই এক শ্যুটিং এর প্রতিই প্রচন্ড ঝোঁক ছিলো! তবে এই প্রতিভাই একটা সময় পর তাকে খুনের আসামী তে পরিণত করলো! যদিও সেটা করা সম্পুর্ণ ভাবে যুক্তিযুক্ত ও আবশ্যক ছিলো! তবে সেটা প্রথম ঘটনার ক্ষেএে খুন হিসেবে ধরলেও পরের ঘটনাকে খুন কিংবা হত্যা বলা চলে না! নতুবা ঐ শ্বাপদ থেকে সমাজকে মুক্তি দিতো কে!! শয়তানের পূজারীকে হত্যা না করলে তাকে নিজেই যে বলি হতে হতো শয়তানের জন্য...আর সমাজকেও মুক্ত করা যেতো না ঐ অন্ধকার থেকে। প্রথম খুনের দায় নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো জামশেদ পরে বুঝতে পারে কেন সে তার বাবাকে বারবার স্বপ্নে দেখে তাকে বলতে “আসল নকল বিচার করো, আসল নকল বিচার করো!!” শ্বাপদের নামে গ্রামে যে চর্চা চলছে তা আসলেই কি কোনো অপার্থিব হিংস্র জন্তু, না এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ছলচাতুরী!! যা জামশেদ দেখেও দেখতে পারছে না কিংবা বুঝে কুলিয়ে উঠতে পারছে না!
আজ থেকে পাঁচ বছরেরও বেশি আগে, একরকম হঠাৎ করেই হাতে তুলে নিয়েছিলাম একটা উপন্যাস। কোনো প্রত্যাশা ছিল না। লেখকের সম্বন্ধে কিচ্ছু জানতাম না। শুধু নামটা ভারি অদ্ভুত লেগেছিল। গল্পটা এইরকম~ সাফ গেমসে স্বর্ণপদক পাওয়ার পরেও জামশেদের জীবনে শুধু শূন্যতা রয়ে গেছে। নানা সমস্যায় বিধ্বস্ত জামশেদ লুকিয়ে থাকার জন্য চলে এল রংপুরের এক গ্রামে— যেখানে দেখা দিয়েছে পিশাচ... বা কোনো ধূর্ত শ্বাপদ । তার সঙ্গী হল প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর শিপলু। তারপর কী হল? আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল সেই উপন্যাস। বাংলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রাফিক নভেল হিসেবে সেটিকেই নতুন করে আবিষ্কার করলাম এবার। কেমন লাগল?
উপন্যাসটির কাহিনি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আনরিলায়েবল ন্যারেটর, মনস্তত্ত্ব, রক্তাক্ত ইতিহাস, অপরাধ, আর অলৌকিকের আভাস— এই নিয়ে এক অনন্য জায়গায় পৌঁছে গেছিল 'শ্বাপদ সনে'৷ সেই কাহিনি এখানে আরও ছেঁটে, আরও লক্ষ্যভেদী আকারে পরিবেশিত হয়েছে। ছবি স্রেফ অসাধারণ! সাদা-কালো কাজ এমনই হওয়া উচিত। এড্রিয়েন অনীক এই ধরনের কাজের সুর এমন এক স্তরে বেঁধে দিলেন যে আগামী দিনে শিল্পীদের কাছে ব্যাপারটা বিলক্ষণ চ্যালেঞ্জিং হবে। শুধু দু'টি অনুযোগ রয়ে গেল। সেগুলো হল~ ১. বেশ কিছু অংশে লেখার ফন্ট-সাইজ আঁকা, এমনকি স্পিচ-বাবলের মোট জায়গার তুলনায় বড্ড ছোটো হয়ে গেছে। এই ব্যাপারটা পরের কাজে শুধরে নিলে ভালো হয়। ২. বানানের একেবারে শ্রাদ্ধ হয়েছে এতে। এত ভালো একটা কাজ প্রকাশের আগে প্রুফ-চেকিং করিয়ে নেওয়া হয়নি কেন?
আবারও বলি, এ এক গর্ব করার মতো কাজ। গ্রাফিক নভেলের অনুরাগী হলে, আর তারই সঙ্গে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের প্রতি দুর্বলতা থাকলে, এই বই আপনি উপভোগ করবেনই। আর বই পড়ে যদি হতাশ হন, তাহলে আমিও বলব, "সয় না জ্বালা, তুমি বিনে চইলাম আমি শ্বাপদ সনে...!"
৩.৫ স্টারস প্রথমে ভালো দিকগুলোর কথা বলি: ভয় পেতে চাইলে বইটা পড়তে পারেন। প্যারানরমাল কতগুলো সীন এর বর্ণণা অসম্ভব রকম ভালো লেগেছে পারফেক্ট ডিটেইলিং এর কারণে। সীনগুলোর স্লো বিল্ডাপ ভালো লাগাটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঝরঝরে লেখনীর কারনে পড়তেও খারাপ লাগেন কোথাও। কাহিনীর শুরু থেকে ১৫০ পাতা পর্যন্ত স্লো(সংগত কারণেই)। কিন্তু এর পরের পাতাগুলোই উড়ে উড়ে গিয়েছি । লেখক ডাক্তার, তাই মেডিকেল টার্মস এর ব্যাবহার করেছেন জায়গামত, ওটাও ভালো লেগেছে । ইংরেজি শব্দের ব্যবহার কিছুটা বেশী হলেও, আমার কাছে চলনসই লেগেছে ক্যারেক্টার গুলোর ভিত্তিতে। খারাপ লাগা প্রায় নেই বললেই চলে, কিন্তু আমার কাছে মূল প্লটটা একটু দূর্বল লেগেছে। আরেকটু ভালো এক্সিকিউশন হতে পারত, আশা করি লেখকের সামনের বইগুলোতে তাই হবে। :) ভাল একটা বইয়েরর জন্যে ধন্যবাদ।
বন্ধুর কথা ভুলব বলি শ্বাপদ সনে আইলাম চলি । সয়না জ্বালা, তুমি বিনে চইল্লাম আমি শ্বাপদ সনে ।।
▪️▪️▪️
শ্বাপদের শাব্দিক অর্থ সারমেয়ের পা; অন্য কথায়, হিংস্র জন্তু–মানুষও হতে পারে। সনে অর্থ সাথে, সঙ্গে। তার মানে কোনো হিংস্র কিছুর সাথে কেউ একজন কোথাও যাচ্ছে! (শিরোনাম ব্যাখ্যা আমার উর্বর মস্তিষ্কের অনুর্বর কল্পনাও হতে পারে!!) শুনতেই কেমন রোম-শিরশিরে প্লট না? একটুখানি হরর, অনেকখানি হ্যালুসিনেশন, আর শয়তানের উপাসনা ও চক্রীয় ষড়যন্ত্র—দেশি থ্রিলারে নতুন স্বাদ দিয়েছে।
নাবিল মুহতাসিমের প্রথম বই ছিল এটা। সেইক্ষেত্রে পাঠক হিসেবে খুবই সন্তুষ্ট হয়েছি পড়ে। এ রকম দুই লেয়ারের গল্পের শেষের মোড় নাটকীয় না হলে জমে না, লেখক সেদিকে কেয়ারফুল ছিলেন এটা দেখেই পড়াশেষের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে গেল।
গল্প কেমন লাগল? সেসব পরের কথা। আসল কথা হচ্ছে গল্পে কী হলো? এবং এই প্রশ্নে কবি নীরব! পুরো বই পড়ে শেষমেশ গিয়ে মনে হয়েছে, সত্যিই তো! কী হলো?
গল্প খারাপ লাগেনি। নাবিল সাহেবের লেখার হাত ভাল, বর্ণনা বেশ সুন্দর। তবে কয়েক যায়গায় একই বর্ণনা ফেরত এসেছে। সেগুলো অবশ্য সতর্ক সম্পাদনায় শুধরে ফেলা সম্ভব, তাই লেখককে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু একটা বিষয়ে লেখককে দোষ দেব, কিংবা অনুরধ করব। সেটা হলো, গল্পে শব্দের ইংরেজি উচ্চারণ ব্যবহারটা কমাতে হবে। প্রচুর ইংরেজি উচ্চারণের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যেগুলোর বাংলা সমার্থক কিছু দেয়া গেল হয়তো ভবিষ্যতের লেখক/লেখকদের উপকার হতে পারত, একটা আলাদা ষ্ট্যাণ্ডার্ড হতে পারত। আশাকরি পরবর্তীতে লেখক এদিকে নজর দেবেন।
প্রথমে ভেবেছিলাম গল্প শুরু হয়েছে দেরীতে, মূল কাহিনী আরাম্ভ হতে পেরিয়ে গেছে বইয়ের অর্ধেক। শেষ গিয়ে বুঝলাম, নাহ, আসলে কাহিনী শুরু হয়েছে শুরুতেই, কিন্তু শেষ যেটা হয়েছে সেটা আদেও শেষ কিনা তা গল্পে পরিষ্কার করা হয়নি! এই ব্যাপারটা রহস্যময়! একবার মনে হচ্ছে গল্প শেষ, আবার মনে হচ্ছে না, আবার মনে হচ্ছে না! শেষ কীভাবে?!
বইয়ের শেষ তিরিশ পাতা উড়ে উড়ে পড়েছি। প্রথমদিকেও গতি ছিল, তবে অতটা না। বইয়ের মাঝামাঝি একটা দুর্দান্ত কার চেজ দৃশ্য রয়েছে, যা চমৎকার বর্ণনায় তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে দুর্দান্ত কিছু টুইস্ট।
কাহিনী বিন্যাস ভালই, তবে মূল চরিত্র কখন ঘোরে চলে যাচ্ছে, আবার কখন বাস্তবে, কখন অবাস্তবে এই জিনিসগুলো আরও একটু ভেঙ্গে দেখাতে পারলে ভাল হত, অর্থাৎ ওসব প্যারাগ্রাফের শুরুতে কিছু একটা চিহ্ন ব্যবহার করা যেতে পারত, এবং সেটা করলে ভাল হত।
যেটা বলছিলাম। জীবনে খুব কম বইই মনে হয় রাতে টর্চের আলোয় শেষ করেছি! এই বইয়ের শেষ পাঁচ ছয় পাতা এভাবেই পড়েছি, মোবাইলে আলো জানিয়ে, কেন না আমার ঘরের লাইট বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছি, অথচ বইটা শেষ না করে ঘুমাতে ইচ্ছে করছিল না! সুতরাং কাহিনীতে কি পরিমান ডুবে গিয়েছিলাম বোঝাই যাচ্ছে!
নাবিল মুহতাসিম আরও ভাল ভাল গল্প লিখবেন আশা রইল, এবং অবশ্যই আরও বড় পরিসরে লিখবেন। গল্পের চরিত্রায়ন এই বইয়ের সবথেকে শক্তিশালী দিক। প্রতিটি চরিত্র আলাদা করে বিশেষ এবং তাদের স্বভাব থেকে শুরু করে সবকিছু অনন্য। গ্রামের ভাষার দারুণ প্রয়োগও চোখে লাগার মত। এছাড়াও এসেছে বিভিন্ন মেডিক্যাল ট্রামের দ্বারা গল্পের সমৃদ্ধকরণের ব্যাপারটি। বিশেষ করে কেন মাংস মাছ, শাক সব্জির তুলনায় ভাল সেই ব্যাখ্যা জীবনেও ভুলব না!
জামশেদ, বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্বাস খানের একমাত্র সন্তান। রগচটা, মাথা গরম, অ্যালকোহলিক, বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া সন্তান জামশেদ হলো সাফ গেমসে স্বর্ণপদক পাওয়া শার্প শ্যুটার। পিতার মৃত্যুর পর থেকেই পীড়নে তার মানসিক দশা ভঙ্গুর হতে থাকে। দুঃস্বপ্ন হানা দেয় ঘুমের ভেতর আর জেগে থাকলে দেখতে থাকে হ্যালুসিনেশন। সাইকিয়াট্রিস্ট কিছুদিন ঢাকার বাইরে থাকার পরামর্শ দেয়, প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বন্ধু শিপলুও দেয় উত্তরবঙ্গের এক অজপাড়াগাঁ এ নিয়মিত হানা দেওয়া কোনো অজানা জন্তুর শিকারে যাবার অফার। কিন্তু জামশেদ রাজি হয় না।
পরবর্তীতে প্রেমিকা আইরিনের টক্সিক এক্স রাশেদের সাথে ঝামেলা হলে জামশেদকে রাশেদের ভাড়া করা সন্ত্রাসী বোমা মজিদ আর তার দলের সাথে বন্দুক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্যে শিপলুর সাথে কাজিন সামাদকে নিয়ে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চল জগনান্দপুরে হাজির হয় সে। নব্বই দশকেও আধুনিক যুগের ছোঁয়া সেখানে খুব একটা লাগে নি। বদ্ধভূমি আর ঘন জঙ্গল দিয়ে আবদ্ধ সে গ্রাম। আর জঙ্গল থেকে এক অজানা জন্তু নিয়মিত হানা দিয়ে গরু-ছাগলের পাশাপাশি একাধিক মানুষকেও মেরে ফেলেছে। যদিও গ্রামের মানুষদের মতে এগুলো কোনো ভয়ংকর পিশাচের কাজ।
দক্ষ বন্দুকবাজ হওয়ায় জন্তুটা শিকারের কাজে লেগে পড়ে জামশেদ। অন্যদিকে মাসিক হালচাল পত্রিকায় দেশের নানান প্রান্তে ঘটে যাওয়া অতিপ্রাকৃত ঘটনা দিয়ে ফিচার লেখা সাংবাদিক শিপলু, যার বিশ্বাস তার নিজেরও কিছুটা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে, আভাস পাই ভয়ংকর কিছুর। মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার সাক্ষী এই প্রত্যন্ত গ্রামে কোন শ্বাপদ তার বিষাক্ত শ্বাস ফেলছে? কেনই বা জামশেদকে তার বাবা স্বপ্নে বারবার সাবধান করে বলছে "আসল নকল বিচার করো"? কিভাবে একটা অপয়া ছায়া গ্রাস করে নিয়েছে জগনান্দপুর গ্রামকে, আর কিভাবেই বা ঘটবে এসবের সমাপ্তি? নাবিল মুহতাসিমের লেখা হরর থ্রিলার বই অবলম্বন এড্রিয়েন অনীকের আঁকা গ্রাফিক নভেলে পাওয়া যাবে সবকিছুর উত্তর।
বর্তমান সময়ে বাংলা কমিক জগতে আমার মতে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এড্রিয়েন অনীকের গ্রাফিক নভেলগুলো। বাংলা সাহিত্যের বেশ কিছু ভালো আর ম্যাচিউরড গল্প যখন যথাযথ পরিসরে দক্ষ আর্টওয়ার্কের মাধ্যমে ফুটে উঠে, একজন কমিক-বুক ফ্যান হিসেবে গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশনের উন্নত মানের প্রোডাকশনে সেই কাজের স্বাদ নেওয়ার চেয়ে উপাদেয় আর কিছু নেই। এর আগে নাবিল মুহতাসিমের স্পাই-অ্যাকশন থ্রিলার জনরার বাজিকর বইয়ের গ্রাফিক নভেল অ্যাডাপ্টেশনটা আমার অসাধারণ লেগেছিল। তাই গ্রাফিক বাংলা পাবলিকেশনের বাকী গ্রাফিক নভেলগুলো সংগ্রহে নিতে একটুও দ্বিধা বোধ করি নি।
'শ্বাপদ সনে' গ্রাফিক নভেলটা নাবিল মুহতাসিমের প্রথম উপন্যাস অবলম্বনে বানানো। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আর সুপারন্যাচারাল হরর জনরার মিশ্রণে এর গল্পটা লেখা। গল্প আবর্তিত হয় এর মূল চরিত্র জামশেদ আর তার আশেপাশের কিছু চরিত্রকে ঘিরে। জামশেদের জবানীতে তার জীবনে ঘটতে থাকা ভয়ংকর সব ঘটনা, সেইসাথে তার বন্ধু শিপলুর কিছু কেস স্টাডি (মাসিক হালচাল পত্রিকায় অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে লেখা ফিচার) নিয়ে গল্প এগিয়েছে।
একটা সাইকোলজিক্যাল হরর কমিক হিসেবে 'শ্বাপদ সনে' এর গল্পটা খারাপ না। এরকম প্যারাসাইকোলজির সত্য-মিথ্যা দ্বিধার সাথে বাস্তব জগতে ঘটে যাওয়া ব্যাখ্যার অতীত ভয়ংকর গল্প নিয়ে বাংলায় কমিকস আগেও হয়েছে, তবে এতো ডিটেইলড আর বড় পরিসরের কাহিনী এবং জামশেদের মতো এতটা ধূসর আর সাইকোলজিক্যালি আনরিলায়েবল প্রোটাগনিস্ট নিয়ে গল্প তাতে পাওয়া যাবে না। গল্প একেবারে শুরু থেকে আগ্রহোদ্দীপক আর গতিশীল ছিল।
গল্প মূলত শুরু থেকে কিছুটা খন্ডাকারে এগিয়েছে। জামশেদের জবানবন্দি আর শিপলুর কেসস্টাডি দিয়ে সাজানো গল্পের খন্ডগুলোকে একটু ধীরে ধীরে বিল্ডআপ করে ডার্ক আর ইনটেন্স বানানো হয়েছে। বিল্ডআপ দিয়ে গল্পের হরর ওয়ার্ল্ড কিংবা অ্যাকশন দৃশ্যের সেটআপ সবই গড়ে তোলা হয়েছে ভালোভাবে। দুই-তিনটে অ্যাকশন দৃশ্য ছিল যেগুলো উপভোগ্য। রহস্যভেদ আর টুইস্টগুলো একটু গতানুগতিক হলেও ভালো ছিল। যদিও লেখকের অন্যান্য বই পড়া থাকলে আর গল্পের ধরণ বিবেচনা করলে টুইস্টগুলো কি তা আন্দাজ করা বেশী কঠিন হবে না, তবে বাংলা কমিকস হিসেবে দেখলে বেশ ভালো। 'শ্বাপদ সনে' বইয়ের যে সংলাপ কিংবা বর্ণনাগুলো এই গ্রাফিক নভেলে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো বেশ লেগেছে। বিশেষ করে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার সংলাপগুলো আর লেখকের নিজেরই লেখা বাউল সঙ্গীতখানা এক কথায় দারুণ।
শেষদিকে গল্পকে একটু ওপেন এন্ডেড সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের মতো বানিয়েছেন লেখক। যদিও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে 'শ্বাপদ সনে' এর গল্পটা কিছু ক্ষেত্রে দূর্বল হয়ে পড়ে। মূলত জামশেদ বাদে অন্যান্য চরিত্রগুলোকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেভাবে ডেভেলপ করতে না পারার কারণে এটা হয়েছে (বিশেষ করে একটা চরিত্রের ভালো মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রায়ন প্রয়োজন ছিল, তবে লেখক মূলত টুইস্টের জন্যে সেটা করেন নি)। আর থ্রিলার হিসেবে গল্পের গঠন আরও ভালো হওয়া দরকার ছিল। এটার অভাবে বারবার গল্পের প্রতি খন্ডের মোড় পরিবর্তন বিরক্তিকর ঠেকবে, কিংবা টুইস্টগুলোকে মনে হবে আরোপিত।
তাছাড়া একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বইয়ে লেখক চরিত্রের মনের অবস্থাকে গদ্যের দ্বারা যেভাবে দেখাতে পারেন, ভিজ্যুয়ালি সবসময় সেটা করা যায় না। তাই বোধহয় চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক গঠনের ক্ষেত্রে গ্রাফিক নভেলটা মূল বইয়ের চেয়ে দূর্বল। একারণে গ্রাফিক নভেলের পাশাপাশি পিডিএফে মূল বই-টাও পড়ছিলাম। আর গল্প হিসেবে শিপলুর কেস স্টাডিগুলা আহামরি কিছুই হয় নি, শুধু 'রিগর মর্টিস' গল্পের আইডিয়াটা মোটামুটি ভালো ছিল। এবার আসি আর্টওয়ার্কের ব্যাপারে। এক কথায় যদি বলি, এটা পড়ে আমি একইসাথে মুগ্ধ আবার হতাশও। কারণটা ব্যাখ্যা করছি।
এড্রিয়েন অনীকের একেবারে লেটেস্ট কাজটা বেশী দিন হয় নি আমি পড়েছি। নাবিল মুহতাসিমের 'বাজিকর' অবলম্বনে সেই গ্রাফিক নভেলে তিনি এককথায় দূর্দান্ত কাজ দেখিয়েছেন। তাই 'বাজিকর' এর বহু আগে প্রকাশিত আর্টিস্টের প্রথম গ্রাফিক নভেল 'শ্বাপদ সনে' পড়ার সময় বারবার বাজিকরের অসাধারণ আর্টওয়ার্কগুলো মাথায় ভেসে আসছিল। এমনকি পাশাপাশি বই দুটি রেখে তুলনাও করেছি।
জানি তুলনাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ একে তো বই দুটির জনরা এক নয়, তার উপরে একজন শিল্পী ক্রমাগত প্র্যাক্টিস করেই আগের কাজ বেটার কাজ উপহার দেয়, এটা জানা কথা। কিন্তু সেই বেটার কাজ অলরেডি পড়ে ফেলার কারণেই এই গ্রাফিক নভেলের কিছুটা দূর্বল আর্টওয়ার্ক, কনসিস্টেন্সির অভাব, কম্পোজিশনে ক্রপিংয়ের জন্য ঝাপসা করে ফেলা, লং শটে অতিরিক্ত সরলীকরণ আর ডিটেইলিংয়ের অভাব অনেক চোখে লেগেছে। সেইসাথে ছবির সাথে ডায়লগ বক্সের অসামঞ্জস্যতা আর তাতে বেশী লেখা আটাতে গিয়ে লেখা অতিরিক্ত ছোট করে ফেলা, প্যানেলগুলোর দূর্বল ফ্রেমিং দেখে হতাশ হতে হয়।
যদি এই গ্রাফিক নভেলটা আমি সবার আগে পড়তাম, তাহলে হয়তো আর্টিস্ট আস্ত বই অবলম্বনে প্রায় চারশো পৃষ্ঠার কমিকস এঁকেছেন দেখে সব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতাম। কিন্তু যেহেতু আমি আর্টিস্টের বেটার কাজ পড়েই ফেলেছি, তাই হতাশও হয়েছি বেশি। তবে এটা কি প্রশংসার ব্যাপার নয়? আর্টিস্ট তার প্রথম কাজের (গ্রাফিক নভেল হিসেবে) দূর্বলতার বেশীরভাগই কাটিয়ে উঠেছেন তার ৪র্থ কাজে। তার আর্টওয়ার্ক এর উন্নতি চোখে পড়ার মতো। এতে তো বোঝাই যায়, ভবিষ্যতে এড্রিয়েন অনীক আমাদের আরও অনেক ভালো মানের কাজ উপহার দেওয়ার পোটেনশিয়াল রাখেন।
আর একেবারে সবই যে খারাপ লেগেছে তা নয়। অনীক গল্পের প্রায় সব দৃশ্যগুলোকেই মোটামুটি ভালোভাবে চিত্রিত করেছেন। উত্তরবঙ্গের দৃশ্যায়নও বেশ ভালো হয়েছে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর গঠনও যথাযথ হয়েছে, যাতে মূল গল্���ের ইন্টেন্সিটিটা ফুটে উঠেছে। তবে আর্টিস্ট আসল দক্ষতা দেখিয়েছেন হরর পোর্শনগুলো দৃশ্যায়নে। এর আগেও ঢাকা কমিকসের 'পিশাচ কাহিনি' সিরিজের মাধ্যমে তিনি হরর কমিকস এঁকেছেন দক্ষভাবে, যার প্রভাব এই গ্রাফিক নভেলেও দেখতে পাওয়া যায়।
গল্পে আসা নানা মন্সটার, সুপার ন্যাচারাল এন্টিটিদের বেশ গোর, ভায়োলেন্ট আর ডিস্টার্বিংভাবেই এঁকেছেন তিনি, যা হরর দৃশ্যগুলোকে শক্তিশালী করে। একারণে শিপলুর কেস স্টাডির টিপিক্যাল ভূত এফএম মার্কা গল্পগুলোও গ্রাফিক নভেলে বিশেষ হয়ে ওঠে। সেইসাথে রাতের অন্ধকারের দৃশ্যগুলোর কালার গ্রেডিংটা বেশ ভালো হয়েছে। আর যেহেতু গল্পটা সাইকোলজিক্যাল, সেই হিসেবে আর্টিস্টকে চরিত্রদের অভিব্যক্তি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমার মতে সেটা তিনি মোটামুটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছেন। সবমিলিয়ে বলবো 'শ্বাপদ সনে' গ্রাফিক নভেল আমার মোটামুটি ভালোই লেগেছে। বেশ কিছু নেতিবাচক দিক যে ছিল না তা নয়, সেইসাথে আমার পড়া লেখক-আঁকিয়ে জুটির অন্য গ্রাফিক নভেলটা থেকেও অনেক দূর্বল। তবে সত্যি বলতে, বাংলা ভাষায় এমন মানের গ্রাফিক নভেলও খুব বেশি নেই। একারণে মোটামুটি ভালো মানের কমিকসও বাংলায় পড়লে অনেক বেশী ভালো লাগে।
শুক্রবার। বেলা ১১ টা। চারদিক নিঃস্তব্ধ। আমি একা ঘরের এক কোণার সর্ব আলোকিত রুমে বসে আছি। তারপর পড়া শুরু করলাম "শ্বাপদ সনে"। আর বাকিটা... ইতিহাস!
কাহিনীসংক্ষেপঃ বড়লোকের বখে যাওয়া সন্তান যাকে বলে আরকি, জামশেদ ঠিক তাই। ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেলিস্ট শুটার। বন্ধুর সাথে ইনভেস্টিগেশনে যায় এক গ্রামে যেখানে গরু-ছাগল থেকে শুরু করে মানুষের লাশ পড়ছে। গুজব শোনা যায়, এ সবই এক পিশাচের কাজ। কিন্তু বাস্তবিক অর্থেই কে রয়েছে এর পেছনে??
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ আমি ডার্ক ফ্যান্টাসি কিংবা হরর- যা-ই বলুন, এই জনরার বিরাট বড় ভক্ত। হরর জিনিসটাকে আমি অসম্ভব রকমের ভালোবাসি। যেমন ধরুন- রাতে বাথরুমে যাওয়ার সময় নিজে নিজে ভাবি- জানালার ওপাশ থেকে এখন কেউ অদ্ভুত স্বরে আমাকে ডাকবে কিংবা একা একা ঘুমালে নিজে থেকেই চিন্তা করি, 'আচ্ছা, আমি যদি এখন ভয় আনার চেষ্টা করি তবে কি সে আসবে? খাটের নিচ থেকে সে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে আমার দিকে, মুহূর্তের জন্য দম বন্ধ হয়ে আসে। এটার মধ্যেও মজা খুঁজে পাওয়া যায়। তা, তেমনই দুপুরের স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে চাদর মুড়ি দিয়ে এটা শুরু করেছি। আমার এক্সপেক্টেশনের বাইরে ছিল যে, এটা এই লেভেলের হরর হতে পারে।(অতিরিক্ত লেভেলের ভালো বলবো না, তবে হ্যাঁ, যতটুকু ভালো বর্ণনা দিয়েছে ততটা আশা করিনি।)
বাংলাদেশে সাধারণত হরর স্টোরিজ লেখা হয় 'ভূতের গল্প' নামে। কিন্তু এই দুটো শব্দ শুনলেই মনে পড়ে সেই চোখ নেই, কোটর থেকে রক্ত পড়া, চার পায়ে এগিয়ে আসতে থাকা সেই হাস্যকর ভূতগুলোর কথা। কিংবা, বাংলার ভূত-প্রেত-চূড়েল-স্কন্ধকাটা অয়্যারউলফও ইদানীংকালের হাস্যকর জিনিসে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভেতর থেকেও আমি নাবিল মুনতাসিমের এই বইটা পড়ে বেশ মজা পেয়েছি।
চরিত্রায়নঃ এই বইয়ে মোটমাট কয়টা চরিত্র ছিল তা গুনে দেখতে ইচ্ছে করছে না। তবে যাদের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে- জামশেদ, শিপলু, মজিদ দারোগা, খালেদুজ্জামান স্যার ব্লা ব্লা ব্লা। চরিত্রের সংখ্যা অগণিত।😑😶
আমার পুরো বই জুড়ে সবচেয়ে ভালোলাগা ক্যারেক্টর ছিল শিপলু। এমন উদ্ভট জিনিস ভালোলাগার কারণ- ডার্ক লাভার। আমি কিন্তু সত্যিই এই ক্যারেক্টার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। (যদিও বাস্তব জীবনে কখনো এমন চেইন স্মোকার চাইনা!😁) শেষের দিকে তাকে ভালো লেগেছে কিনা জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই। লাগেনি ভালো। এমনটা হবে যে কে জানতো!!😐🤐
প্রোটাগনিস্টঃ প্রথম থেকে ভাবছিলাম, এই পচা লোকটার কথা বারবার বারবার করে লিখছে কেন? হি ডোন্ট ডিজারভ টু বি দ্য প্রোটাগনিস্ট। এরপর কাহিনী এগুচ্ছিল, আর একেকটা জট খুলছিল নিজের কাছে। বাপের টাকার জোরে বিগড়ানো জামশেদকে আমার একদমই পছন্দ হয়নি। কিন্তু বুদ্ধিমান, চতুর, শুটার- জামশেদ জোশ ছিল।
অ্যান্টাগনিস্টঃ আমার জন্য অ্যান্টাগনিস্ট হিসেবে পিশাচটা-ই পারফেক্ট ছিল। কিন্তু এরপর সব বদলে যায়। ঘুরে যায় কাহিনীর মোড়। টুইস্টের কোণে হারিয়ে যায় ভূত-টুত নামে ভং-চং যা ছিল সব। ঘরের শত্রু বিভীষণের ন্যায় আচরণ করে। লাস্ট ১৫ পৃষ্ঠার আগ পর্যন্ত আমি ভাবতে পারছিলাম না, ভিলেইন কীভাবে চেঞ্জ হয়ে যেতে পারে।
হররঃ “I know always that I am an outsider; a stranger in this century and among those who are still men.” ― H.P. Lovecraft, The Outsider
এমন 'পিচাশ'ই যদি না থাকে তাহলে আর কি-ই বা হবে। যদিও বাস্তবে পিশাচ বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই; তবুও টুইস্টের আগে যতটুকু পর্যন্ত পিশাচের বর্ণনা ছিল ততটুকুই বেস্ট। হরর লাভার হিসেবে এই বইয়ে হরর এর,
রেটিং- ৩.৫/৫
থ্রিলারঃ খুব সম্ভবত থ্রিলার জিনিসটা আমার খুব একটা হজম হয়না। তাই এই বইয়ে পিশাচ সরিয়ে যখন সবকিছু মনুষ্যজাতিতে ফেরত আনলো, তখন একটু বিরক্ত লেগেছে। কেন, এই টুইস্টটা না আনলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত! তাই থিলার হিসেবে এই বইয়ের,
রেটিং- ২/৫ অ্যাকচুয়ালি থ্রিলার পার্টে প্লট হোল অনেক বেশি ছিল, যার কারণে এটাকে খুব উচ্চমারগীয় থ্রিলার জ্ঞান করতে পারছি না।
প্রচ্ছদঃ ডিলান (মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, সেটা সবারই জানা কথা)। মলাটের দিকে হঠাত করে তাকালে দেখতে মোটেও ভালো লাগে না। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি যখন তখন এটার কিছুটা রহস্য ভেদ করতে পেরেছি বৈকি!
গল্পের মাঝে মাঝে — ব্রেক কষে কষে— মাসিক হালচালে প্রকাশিত শিপলুর কয়েক পাতার কেস স্টাডি/ ইনভেস্টিগেশনগুলোয় মূল গল্পের চেয়ে বেশি আমেজ ছিল৷ গল্পের তড়িঘড়ি পথ পরিবর্তনে হঠাৎ ঝাঁকি খেয়ে ঘুম ভাঙার মত বিরক্তি ভাব জন্মেছে৷ কন্সেন্ট্রেশন আসছিল না৷ পথের ঝাঁকি সয়ে গেছে, তাই টুইস্ট নিয়ে ঝাঁকি খেলাম না — আহামরি নয়।
নাবিল মুহতাসিম এর উপন্যাসটি গ্রাফিক নোভেলে রূপ দেওয়া সহজ কাজ ছিল না মোটেও। তবে সেই কাজটি অসাধারণ ভাবে করেছেন এড্রিয়েন অনীক।
হয়তো এর থেকে বেটার করা সম্ভব ছিল না। প্রথম থ���কেই আমার অনেক এক্সপেক্টেশনস ছিল বইটার উপর। তবে তার উপরেও স্যাটিসফিকশন পাওয়া এটা সত্যিই রেয়ার।
গল্পের টার্নে টার্নে ছিল মার প্যাচ আর বুদ্ধির খেলা পাঠকদের জন্য। তবে গল্প যতটা না টেনেছে তার থেকে অনেক বেশি টেনেছে আর্টওয়ার্ক। এই দারুন আর্টওয়ার্ক করেছে শ্বাপদ সনে কে অসাধারণ।
তবে বই এর প্রডাকশন নিয়ে কথা না বললেই না৷ কমপ্লিট প্যাকেজ। পুরাপুরি প্রিমিয়াম ফিল দিয়েছে। Graphic বাংলা কে ধন্যবাদ এত দারুন কাজ করার জন্য।
প্লট বেশ ভালো, কাহিনীর গঠন আমার কাছে ভালো লেগেছে। কাহিনী বেশ লজিকাল, জোর করে ভৌতিক বানানোর চেষ্টা করে নি লেখক। কিন্তু, বেশ ভয় ভয় ভাব আছে গল্পের ভেতরে। যে ব্যপারটা একটু আক্ষেপ হয়েছে, তা হল গল্প সাজানোটা কেমন জানি বিক্ষিপ্ত, অগোছালো! সিক্রনাইজ নাই, এটা যদি ঠিক হত তাহলে গল্পটাকে ৫★ দিতাম। কিন্তু প্রথম বই হিসেবে দূর্দান্ত লিখেছেন লেখক।
প্রমিনেন্ট ইনডাস্ট্রিয়ালিস্ট আব্বাস রহমান খানের একমাত্র সন্তান জামশেদ। একসময়ের সাফ গেমসে শুটিং ক্যাটাগরির গোল্ড মেডালিস্টের জীবন তাঁর বাবার দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর কেমন জানি ছাড়া ছাড়া হয়ে যায়। ধনী ব্যক্তির সন্তান জামশেদ তাঁর কাজিন ডাক্তার সামাদ এবং অকাল্টের প্রতি অত্যন্ত প্যাশনেট, চলন্ত ট্রিভিয়া সাংবাদিক বন্ধু শিপলুসহ এক বড় বিপদে পরেন। এর আগে অবশ্য জামশেদের সাফ গেমস শুটিং কোচ খালেকুজ্জামান তাঁকে সাবধান করে যান যাতে জামসেদ আসল নকল বিচার করে। ডোপ টেস্টে ধরা খেয়ে অলিম্পিকে যাওয়ার সব প্রস্তুতির পরও ছিটকে পড়া এই শুটার তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারে না এই প্রাক্তন কোচের কথাবার্তা।
বিভিন্ন মানসিক সমস্যা, অদ্ভুত সব স্বপ্ন এবং হ্যালুসিনেশনে ভুগা জামশেদ দেরিতে হলেও সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যান। জেদী, বদরাগী, ঘারত্যাড়া জামশেদ কারো চিকিৎসকের কথাও শুনতে রাজি না। জীবনে এমন সব দুঃস্বপ্নের মতো স্মৃতি আছে এই গোল্ড মেডালিস্টের যে তাঁর এরকম খিটখিটে হয়ে যাওয়াটাই মনে হয় অবধারিত ছিল। আনফেইথফুল গার্লফ্রেন্ডের সন্ত্রাসী এক্সের সাথে গন্ডগোলে জড়িয়ে যান কাজিন সামাদ ও সাংবাদিক বন্ধু শিপলুসহ। ঘটনাচক্রে বেশ কিছু লাশ পড়ে। জামশেদ, সামাদ ও শিপলু মার্ডার কেইসে গ্রেফতার এড়াতে ঢাকা থেকে পালিয়ে যান।
এক চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া শিপলু ছোট বেলা থেকেই ভৌতিক, অকাল্ট এবং পরাবাস্তব বিষয়ের প্রতি অনুরক্ত। এসব বিষয় নিয়ে এত রিসার্চ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শিপলুর আছে যে তাকে বাংলাদেশে বিষয়গুলোর উপর লিডিং অথরিটি বলা যেতে পারে। যদিও জামসেদের কাছে এসব হাস্যকর ব্যাপার-স্যাপার।
ঢাকা থেকে পালিয়ে যে ভূতুড়ে অজপাড়াগাঁয়ে তিনজন গিয়ে পৌছান সেখানে না গিয়ে মনে হয় খুনের দায়ে জেল খাটা আরো ভালো হত। ৭১ এর গনহত্যার স্বাক্ষী এই গ্রামে কোন এক অজানা স্বাপদের শিকার হচ্ছেন একের পর এক নিরীহ মানুষ। শিশু থেকে শুরু করে নারী কেউ এই ভৌতিক প্রাণী থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। নিজের সাথে সবসময় থাকা এলকোহল, বন্দুক, বন্ধু ও কাজিনসহ সাফ শুটিং গোল্ড মেডালিস্ট নেমে পড়েন স্বাপদ শিকারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে গ্রামের পুলিশের আচরণ এত অদ্ভুত কেন? গ্রামবাসীও কি কিছু লুকাতে চায়? স্বাপদ হোক বা কোন বাঘ বা শিয়াল, সেটার শিকার করতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই ঐ তিনজন কি শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছেন?
লেখক নাবিল মুহতাসিমের নাম অনেকবার শুনেছি। পেশাগত জীবনে চিকিৎসক এবং বর্তমান সময়ের তরুন লেখকদের মধ্যে খুব সম্ভবত সেরা পাঁচ বা দশে আছেন বলে শুনেছি। তবে তাঁর লিখা "স্বাপদ সনে" বাতিঘর প্রকাশনী থেকে বই আকারে ২০১৬ সনে প্রকাশ পায় এবং ভারতের অভিযান পাবলিশার্স থেকে ২০১৯ সনে প্রকাশ পায়। নাবিল মুহতাসিমের এই গল্পের গ্রাফিক নভেল ফরম্যাট খুব ভালো লেগেছে। লেখনীতে একটা ইন্টেন্সিটি আছে। তরুনদের মধ্যে এগিয়ে এসে গ্রাফিক নভেলের মতো ভালো মাধ্যমে কাজ করার জন্যে তাঁকে ধন্যবাদ। গল্পে গ্রামের এক বাউলের গান আছে যেটার লিরিক লেখক যেভাবে লিখেছেন তা অনেকদিন মনে থাকবে। নাবিল মুহতাসিম একজন ব্রিলিয়ান্ট রাইটার।
কমিক্স আর্টিস্ট এড্রিয়ান অনীকের অঙ্কনের আমি বিগ ফ্যান সেই পিশাচ কাহিনি সাগা থেকেই। হরর স্টোরি অঙ্কনে শিল্পীর মুন্সিয়ানা আছে বেশ। এছাড়া হরর সিকোয়েন্স ছাড়াও ফুল স্টোরিতে দুর্দান্ত আর্ট করেছেন এই শিল্পী। থ্রিলারের থ্রিল বলুন বা হররের চিল, এড্রিয়ান অনীক অঙ্কনের মাধ্যমে আপনার মনোজগতে ভালোই ধাক্কা দিতে পারেন।
গল্প দুই ধরনের অধ্যায়ে ভাগ করা।
১) জামশেদের জবানবন্দি
২) শিপলুর জার্নাল
এখানে লেখক কয়েক লেয়ারে গল্প লিখেছেন। পাঠকের জন্যে অপশন রেখেছেন যেকোন একটা বেছে নিতে। দু'টি অপশনের যেকোন একটি পাঠক নিজের চিন্তার মাধ্যমে সঠিক মনে করতে পারেন। পাঠকের প্রতি এরকম চয়েস দিয়ে দেয়াটা খুব ভালো লেগেছে। এন্ডিং পাঠক নিজ বিবেচনায় বেছে নিতে পারবে। অসাধারণ এক প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী সেই সাথে ৪০০ পৃষ্ঠার গ্রাফিক নভেল প্রি-অর্ডারে মাত্র ৩০০ টাকায় পেয়ে ( জানি না এই অফার এখনো আছে কিনা) আমি বলতে গেলে সারপ্রাইজড হয়েছি। বইয়ের সামনের ফ্ল্যাপে যে কথাগুলো ছিল প্রথমে বুঝতে পারিনি সেসবের অর্থ, জামশেদ কি পেরেছে? পাঠক আপনি কি পারেন? কারণ ফ্ল্যাপে লিখা ছিল,
আমার পড়া লেখকের বইগুলির মধ্যে এটা সেরা। বাংলায় লেখা হরর-থ্রিলার ট্রাই করতে চাইলে এটা মাস্ট রিড। আমি বইয়ের গ্রাফিক নভেল ভার্সন দিয়ে পড়া শুরু করলেও গল্পের আসল স্বাদ নিতে পাশাপাশি অরিজিনাল বইটাও পড়ি। গল্পের টুইস্ট এবং শেষে এসে সব রহস্যের জট খোলাতে লেখকের মুন্সিয়ানা ফুটে উঠেছে। মূল গল্পের মাঝে মাঝে ছোট গল্পগুলোও পুরো বইটি পড়ার এক্সপেরিয়েন্স কে এলিভেট করেছে।
প্রায় এক সপ্তাহ লাগিয়ে শেষ করলাম 'শ্বাপদ সনে'। শুনে মনে হতে পারে, বিরক্ত লেগেছে বা ধীরগতির কাহিনী বলেই এত সময় লেগেছে। আসলে তা না, বিরক্ত তো লাগেই নাই, বরং কাহিনি যথেষ্ট আকর্ষনীয় এবং গতিশীল ছিল, - ব্যস্ততার কারণেই প্রায় দুশো পৃষ্ঠার হরর থ্রিলারটা পড়তে এতটা সময় লাগল। আকর্ষনীয় কাহিনীর মত লেখনিও চমৎকার ঝরঝরে। শুরুতে একটু স্লো হলেও (সঙ্গত কারণেই) গল্প যত এগিয়েছে, গল্পের গতিও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শেষের পঞ্চাশ পৃষ্ঠা তো ছিল আনপুটডাউনেবল। মূল কালপ্রিটকে আড়াল করার জন্য লেখক যথেষ্ট দক্ষতার সাথে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন, তবে কাহিনীতে মূল চরিত্রসংখ্যা কম হওয়ার কারণে, চরিত্রগুলোর চরিত্র এবং কর্মকান্ড বিস্লেষন করে বিশেষ একজনের দিকে আঙ্গুল তুলতে বিশেষ সমস্যা হয় না, অন্তত আমার হয় নাই :) । সৌভাগ্যবশত (নাকি দূর্ভাগ্যবশত?) যাকে সন্দেহ করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত সেটা মিলে যাওয়ায় ক্লাইম্যাক্সে অতটা ধাক্কা খাই নাই :( । তবে এটা ঠিক যে, মোটিভ সম্পর্কে কিছুটা ধোঁয়াশার মধ্যে ছিলাম, যেটা ধারণা করেছিলাম, সেটাও ভুল প্রমানিত হয়েছে। এবং এই জিনিসটাই পাঠকে ধরে রাখতে সক্ষম।এক কথায় বলা যায়, 'কে করছে?' এই প্রশ্নের চেয়ে বরং 'আসলে কী হচ্ছে? এবং 'কীভাবে হচ্ছে' এই প্রশ্ন দুটোই পাঠকে ধরে রাখবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। তবে সত্যি কথা বললে, এন্ডিং এ কিছুটা হলেও ডিজ্যাপয়েন্টেড হয়েছি। এমন না যে, লেখক গোঁজামিল দিয়ে শেষ করেছেন, বরং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভাবেই রহস্যের সমাপ্তি টেনেছেন। আসলে আমি সম্ভবত অন্য কিছু একটা আশা করছিলাম, যেটা হজম করতে আরেকটু বেগ পেতে হবে, যেটা তলপেটে কঠিন একটা পাঞ্চ দেবে, মাথাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরবে। তবে, মূল ট্যুইস্টটা আগে থেকে ধরতে না পারলে, অনেকেরই এরকম অনুভূতি হতে পারে। বানান ভুল বা মুদ্রনপ্রমাদ তেমন একটা চোখে পড়েনি। অবশ্য বাংলা একাডেমির নতুন বানানরীতি সম্পর্কে ধারণা না থাকায়, নিশ্চিতও হতে পারছিলাম না অনেক বানান সম্পর্কে। বিশেষ করে লেখক সব জায়গাতেই 'কি' ব্যবহার করেছেন, কোথাও 'কী' ব্যবহার করেন নি। এই বিষয়টা কিছুটা বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। এ বিষয়ে কারও ধারণা থাকলে, জানালে খুশি হব। লেখকের জন্য শুভকামনা। :)
The plot line was alright but I think the suspense needed more crafting and articulation. It needed more elements of thrill to make it more exciting as it falls under suspense thriller. The artwork was unexpectedly of good quality but the expressions of the characters lacked emotions (for example, all the characters looked serious all the time for no reason or, even though the script is saying a character is scared but their face looks complete opposite of it). There were multiple grammatical errors and lastly, at the end of the book It was sort of confusing (too much mixture of political elements into the actual story).
শ্বাপদ সনে বইটা আগেই পড়েছি। এবার পড়ে ফেললাম গ্রাফিক নভেলটা। প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটর শিপলুর কেস স্টাডিগুলো সবসময়ই পছন্দ আমার। ভয়ের একটা ব্যাপার থাকে ওগুলোতে। শ্বাপদ সনে গ্রাফিক নভেল পড়তে গিয়ে আবারও রিভাইস করা হল কেস স্টাডিগুলো। এবার সেইসাথে শিল্পীর তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে শিপলু, জামসেদরা। আর্টিস্ট দুর্দান্ত কাজ দেখিয়েছেন পুরো উপন্যাসটা গ্রাফিক নভেলে কনভার্ট করতে গিয়ে। বোঝাই যাচ্ছে কতটা প্যাশনেট ছিলেন তিনি, পরিশ্রমও করতে হয়েছে প্রচুর। মূল বইয়ের মতই কাহিনী টানটান ছিল, আর আঁকাও পরিষ্কার ও সুন্দর। কোথাও বুঝতে অসুবিধা হয়নি। যারা কমিকস/গ্রাফিক নভেল ভালোবাসেন অথবা যাদের শ্বাপদ সনে বইটা ভালো লেগেছিল তারা মাস্ট ট্রাই করবেন।
বইটি পড়ে আমি একদম চমকে উঠেছি শেষে। হরর জনরা আমার পছন্দ না ,পড়ি না বললেই চলে। আসলে ছোটবেলায় হরর জনরার মুভি দেখলেও এখন দেখি না, এ জন্য বইও তেমনটা পড়ি না। মূল কথা এখন একটু ভয় লাগে🐸 কিন্তু রিভিউগুলো দেখে এই বই পড়া থেকে বিরত থাকতে পারি নি। ভুগতেও হয়েছে বেশ খানিকটা। বই পড়ার সময় বাইরে অনেক বাতাস হচ্ছিল, কোথায় যেন কট কট শব্দ হচ্ছিল আর আমি চমকে উঠছিলাম একটু পর পর। ডিটেইলিং বেশ ভালো ছিল। আমি ভেবেছিলাম ছোট গল্পগুলো হয়তো কাহিনীর সাথে লিংকড আপ কিন্তু তেমনটা না, এই জায়গায় একটু হতাশ হয়েছি। বইটি হররের সাথে সাথে থ্রিলার না হলে ভয় পেয়ে কাটাতে হতো দিন কয়েক।
বেশকয়েকটা ভালোরকম প্লটহোল থাকা সত্ত্বেও শ্বাপদ সনে ভালো লেগে গেল। মজার ব্যাপার হলো, একটু খেয়াল করে পড়লে একটা সময় বোঝা যায় প্লটহোলগুলো লেখক বেশ সচেতন ভাবে ঢুকিয়েছেন, যাতে শেষটায় পাঠককে প্রশ্নবিদ্ধ থাকতে হয়, 'এটা নাকি ওটা?' ঠিক কোনটা সত্য, এই ভেবে। এর বেশি কিছু বললেই স্পয়লার হয়ে যাবে।
'শ্বাপদ সনে'র পৃথিবীতে কে শ্বাপদ আর কে মানুষ, আলাদা করে চেনা যায় না। বারবার ভ্রম হতে থাকে...। এখানে কখনও মানুষই শ্বাপদের রূপ ধারণ করে, আবার কখনও শ্বাপদেরা মানুষের রূপ নিয়ে মিশে যায় মানুষের মাঝে।
যদিও "শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল প্রবাহ" টাইপ লাইনের অত্যুক্তি যথেষ্ট বিরক্ত করেছে, কিন্তু গল্পের সহজ গতিময়তার কারণে দ্রুত শেষ করতে পেরেছি। লেখকের প্রথম বই হিসেবে বেশ ভালো।
আ'ম হ্যাপি দ্যাট আই স্টারটেড রিডিং হিজ ওয়ার্কস উইদ দিস ওয়ান। বাজিকর ট্রিলজি, বিভং থাকতেও নাবিল মুহতাসিমের প্রথম মৌলিক 'শ্বাপদ সনে' দিয়ে তার লেখা পড়তে শুরু করলাম। বইটা পড়েছি কৌশিক দেবনাথের রেকমেন্ডেশনে, এবং গড়পড়তা রেটিং তুলনা করে বুঝলাম কৌশিক এবং আমার, দুজনেরই এই বইটা বেশ ভাল লেগেছে।
কিছু আড়াই রেটিং, এক তারা আর ডিজাপয়েন্টমেন্ট দেখে পাঁচ তারা দিতে একটু বোকা-বোকা লাগছিল। তারপরও আমি তা-ই দিলাম, ওভারঅল বইটা যা ডেলিভারি দিয়েছে, সেটাই পারফেক্টলি দিয়েছে সেজন্যে। প্লট আরো উন্নত হতে পারতো। তবে দুশো পেইজে ওটুকু প্লটেরই চমৎকার এগজিকিউশন দেখতে পেয়েছি।
* ক্যারেক্টার ডেভ : এই একটা ব্যাপার এই বইকে অন্য মাপে নিয়ে গেছে। মূল চরিত্রটা জ্যান্ত একটা চরিত্র। মাথাগরম, বদরাগী আর বড়লোকের অহঙ্কারী ছেলের চরিত্র। তার প্রতিটা আচরণ, চিন্তা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এই মানুষের দ্বারা এভাবেই ভাবা স্বাভাবিক, মানুষটা স্বাভাবিক কেউ না। পাঠক এই বইয়ে ইংরেজি শব্দের বহুল ব্যবহার দেখতে পাবার অভিযোগ করেছেন। এখানে এটাও লক্ষ্যনীয় যে বইটা পুরোটাই এক বা একাধিক চরিত্রের মুখে বর্ণিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে যার যেমন বাচনভঙ্গী ও শব্দচয়ন, ন্যারেশানে সেটা আসা-ই স্বাভাবিক মনে হয়েছে আমার কাছে।
* খুচরা গল্প : অনেকবারই মূল কাহিনীর ফাঁকে ফাঁকে একটা 'চেইঞ্জ অব ম্যুডে'র মতো কয়েকটা গল্প ঢুকে গেছে, একজন পার্শ্বচরিত্রের জবানে। সেগুলো বইপড়াটাতে একটু হরর মাত্রা দিয়েছে। সঙ্কটের মুহূর্তে 'চেইঞ্জ অব ম্যুড' আর লেখকের নিজস্ব স্টাইল ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি ওগুলোকে। কিন্তু একদম শেষে বা তার আগে পাঠক বুঝতে পারবেন, ওই বিচ্ছিন্ন গল্পগুলো দিয়ে আসলে সূক্ষ্মভাবে পার্শ্বচরিত্রের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট করা হয়েছে, এবং এই ডেভেলপমেন্ট মূলত ওই গল্পগুলোতেই পাঠক দেখতে পাবেন যতটা না মূল গল্পে তাকে দেখতে পাবেন।
* একশন সিকোয়েন্সের ডিজাইন : চমৎকার। কিশোর পাশা ইমন কেন আলাদা করে এই লেখকের প্রশংসা করেন তা বুঝতে পারলাম। এমনিতে কেপি'র একশন সিকোয়েন্স আমার কাছে পারফেক্ট এবং উপভোগ্য মনে হয়, বাংলাদেশী লেখক যত পড়েছি তার মাঝে। নাবিল মুহতাসিমের একশনগুলোও একদম চোখে ভাসার মতো। এবং চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, ঘটনার সময় আশপাশ-টা ঠিক কেমন ছিল, দিনের/রাতের কোন সময়টা, কেমন আলো আছে চারপাশে, এইসব ব্যাপার আলাদা করে চোখে ভেসেছে পড়ার সময়।
* ছাঁটাই : লেখক একেবারেই বেদরকারি সিকোয়েন্স রাখেননি। এটা ঘটলো, তারপর ওমুক ওমুক ঘটে আবার ওটা ঘটলো, এমন দুটা আকর্ষক ঘটনার মাঝের এই 'ওমুক ওমুক' সিকোয়েন্সগুলো ছেঁটে ফেলেছেন। সাধারণ যেকোন গল্পের ক্ষেত্রে সেটা দৃষ্টিকটু হতে পারতো, কিন্তু এই কাহিনীতে সেটা সুন্দর মানিয়ে গেছে মূল চরিত্রের অন্তঃসংঘাতের সাথে। এবং এতে তৈরী হওয়া 'খাপছাড়া ভাব'-টা বরং বলে না দিয়েও পাঠককে বুঝতে দিয়েছে, যে, সামথিং ইজ রং উইদ সামওয়ান।
বইটা সামান্য থ্রিলার এবং অনেকটুকু হরর। ভয় পাবার অথবা ছমছমে অনুভূতি পেতে চাইলে বইটা পড়তে পারেন। হরর বলতে হাউমাউখাউ আশা করবেন না একদমই।
আমার পড়া প্রথম বাংলা গ্রাফিকাল নভেল। প্রোডাকশন থেকে শুরু করে লেখনী সবকিছু চমৎকার হয়েছে। এতো সুন্দর ভাবে আর্টওয়ার্ক করা হয়েছে যা দেখে আসলেই মুগ্ধ হয়েছি। আমার কাছে সবথেকে মজার ব্যাপার ছিল যে, আমি আগে বইটি পড়ি নি যার জন্য অনেক বেশি ইনজয় করেছি। একই সাথে গল্প পড়ে এবং আর্টওয়ার্ক এর মাধ্যমে গল্পের কথোপকথন নিজের চোখের সামনে ভিসুয়ালাইজ করে। আমার অভিজ্ঞতা বেশ টান টান উত্তজনায় ভরপুর ছিল। লেখক নাবিল মুহতাসিম ভাই এবং আর্টিস্ট এড্রিয়েন অনীক ভাইকে জানাই সাধুবাদ , উনাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই এত চমৎকার বাংলা গ্রাফিকাল নভেল আমরা হাতে পেয়েছি। অবশ্যই আমি সবাইকে রিকমেন্ড করবো নোভেলটি পড়ার জন্য , আশা করি ভালো লাগবে। হ্যাপি রিডিং
বহুদিন পরে একখানা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস পড়লাম। জর ফিকশন। পছন্দসই অন্ধকারাচ্ছন প্রেক্ষাপট। লেখকের প্রথম মৌলিক উপন্যাস। তবে 'শ্বাপদ সনে', তথাকথিত হরর নয়। বরঞ্চ, হরর আবহে রচিত একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। ভালোই। শেষ পর্যায়ে এসে বেশ খানিকটা হরকে গেলেও, ওভারল উপভোগ্য। আনরিলায়েবেল ন্যারেটর এবং একটি আদ্যোপান্ত ধূসর 'নায়ক' এর জন্যেই সাড়ে তিন তারা। শেষ খাতে, একটা খোলা পরিণতির আভাস দিয়েছেন লেখক। সেই সুক্ষতম প্রকোষ্ঠ গলে, আসল ও নকলের প্রকৃত বিচার করাটাই পাঠকের পরীক্ষা।
রিভিউ পড়লে জানতে পারবেন শ্বাপদ সনে আমার বেশ পছন্দের একটা কাজ, যদিও নাবিল মুহতাসিমের সবথেকে জনপ্রিয় বইগুলোর মাঝে এটা নেই। তাও ভিজুয়ালাইজ করার মতো অনেক কিছু ছিল বইটাতে, গল্পটাও একদম টানটান, তার সাথে হরর/প্যারানরমাল, সাসপেন্স, মিস্ট্রি, থ্রিলার অনেকগুলো জনরার ছোঁয়া আছে। তাই যখন জানতে পেরেছিলাম আস্ত উপন্যাসটার গ্রাফিক নভেল হতে যাচ্ছে, যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম। তাছাড়া, এমন কলেবরের কাজ বাংলাদেশে আগে ঘটেনি।
ফিডব্যাক :
> আর্ট : অনিক সরকারের কাজ আমার খুবই পছন্দ। কিন্তু শ্বাপদ সনে'র কাজ আমার সব মিলিয়ে পছন্দ হয়নি। অনেক কাজ বলে তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করা গেছে, অনেক জায়গায় ডিজিটালি কপিপেস্ট করা বলে মনে হয়েছে। তাছাড়া যে স্কেলে ছাপা হয়েছে, ওই স্কেলে আঁকা-ও হয়নি অনেক জায়গায়, যার কারণে পিক্সেলেটেড দেখা গেছে সেগুলো। এনাটমিকালি ভুল ছিল কোনো জায়গার আঁকা, চেহারা হয়েছে ত্যাড়াব্যাঁকা। রঙও সবটা জুড়ে একরকম ছিল না। কাজটাকে কেবল এই বলে মাফ করে দেওয়া যায় যে এত বড় কলেবরে করতে গিয়ে আর্টিস্ট সময়ের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারেননি।
> গল্পকে ধারণ করা : এই জায়গায় অনেকাংশে সফল হয়েছে গ্রাফিক নভেল-টা। গল্পের যেসব জায়গায় থ্রিল ছিল, গতি ছিল, ভালভাবে ফুটে উঠেছে গ্রাফিক নভেলেও। বিশেষত শিপলু'র যে গল্পগুলো আছে, সেগুলোর দারুণ চিত্রায়ন হয়েছে। তবে সাসপেন্সের ঘাটতি ছিল এখানে, আর্টিস্ট তাঁর আঁকায় ঠিক ফোটাতে সাসপেন্স-টা।
> বর্ণবিন্যাস : একেবারেই লেজেগোবরে। এক পৃষ্ঠার একেক জায়গায় একেক সাইজের একেক রকম ফন্ট। আর যেসব জায়গায় পৃষ্ঠাজোড়া বড় ফন্ট এসেছে ইফেক্টের জন্য, তাঁর অনেকগুলোই পিক্সেলেটেড।
> ছাপা : গ্রাফিক নভেল বা কমিক এইখানেই ঝামেলায় পড়ে, কেমন মাপে ছাপা হলো, কোথায় ছাপা হলো। আমার মনে হয়েছে শ্বাপদ সনে গ্রাফিক নভেলের ক্ষেত্রে একটা গুরুতর মিসকমিউনিকেশন ঘটেছে। একই পৃষ্ঠার কিছু আর্টওয়ার্ক সূক্ষ্ম, কিছু ভোঁতা। ফন্টের কথা তো বলেছি।
> শেষ কথা : আর্টিস্টের আঁকা নিয়ে আক্ষেপ যত না (শুধু কিছু ক্ষেত্রে এনাটমি ছাড়া), তারচে বেশি, পুরোটা জুড়ে ফন্টে, সূক্ষ্মতায়, রঙে আর আর্ট স্টাইলে খাপছাড়া ভাব নিয়ে আক্ষেপ বেশি। জানামতে, আর্টিস্ট আরো উপন্যাস নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে পুরোটা জুড়ে ইউনিফায়েড কাজ দেখব এটা আশা করি। বিশেষত, কোথায় লেখা বসবে, থট বাবল / ক্যাপশন কতটা জায়গা নিবে এগুলো যদি আগে থেকে ঠিক করা হয়, এবং বর্ণবিন্যাসে কম্পিউটার ফন্ট ব্যবহার না করা হয়, তবে আমার অন্তত দেখতে ভালো লাগবে।
১* বাংলা ভাষায় প্রথম এই কাজ গ্রাফিক নভেলের। শিল্পীকে কুর্নিশ। প্রকাশনীকে সেলাম।
২* শিল্পীর আঁচড়ে জীবন্ত ছবিগুলির টানে যে দৃষ্টিসুখ,তার কাছে এবং নাবিল ভাইয়ের বিখ্যাত এই কাহিনির টানে বানানের বেশ কিছু ভুল দৃষ্টিকটু হলেও পাঠকের কাছে গৌণ হয়ে যায়।
৩* এবং যা না বললে পাঠক হিসাবে ঘোর অন্যায় হবে, 'গ্রাফিক বাংলা'র অনবদ্য প্রোডাকশন! ৫০০ টাকায় এই প্রোডাকশনের বই এপার - ওপার, কোন বাংলাতেই ভাবা যায় না। কীভাবে সম্ভব!
শুধু এই তিনটি কারণ মাথায় রেখেই ৪০০ পাতার এই সুবৃহৎ গ্রাফিক নভেলকে ৫'তারা দিলাম। ভিনদেশী এই ৫'তারা, বাংলাদেশের জনৈক প্রতিভাবান শিল্পী, এড্রিয়েন অনীকের উদ্দেশ্যে, কলকাতা থেকে এক পরিতৃপ্ত পাঠকের উপহার...
বাংলা ভাষায় এরকম কাজ আরো আসুক। কলকাতা, বইপাড়া, কলেজস্ট্রিট — আপনারা নড়েচড়ে বসুন। It's high time!
এইরকম পূর্ণাঙ্গ একটা উপন্যাসের গ্রাফিক নভেল বাংলাতে এত তাড়াতাড়ি হবে এবং এই রকম অসাধারন হবে ভাবতেও পারি নাই। যেহেতু মূল বইটি আমার আগে পড়া ছিল না তাই আরো চমৎকার লেগেছে। এক অন্য জগতে নিয়ে যাবার মত সামর্থ্য আছে বইটির। সর্বশেষ অতলান্ত পড়ে এমন অনুভূতি হয়েছিল। এড্রিয়েন অনীক ভাইয়ের পিশাচ কাহিনীর আর্টওয়ার্কও মুগ্ধ করেছিল, কিন্তু এইটাই উনি নেক্সট লেভেলে নিয়ে গেসেন বইটাকে। বিশেষ করে হরর সিক্যুয়েন্সগুলো অসাধারণ। কাহিনী নিয়ে কিছু জায়গায় এবং বিশেষ করে শেষ নিয়ে একটু আপত্তি থাকলেও দুর্দান্ত আর্টওয়ার্ক সব ভুলিয়ে দিয়েছে। বইটি আরো আলোচিত হওয়া উচিৎ।
গল্পটার একটা স্ট্রং দিক হচ্ছে কিছু প্রেক্ষাপটের ডিটেইলস এতো নিখুঁত ভাবে দেয়া মনে হয়েছে যে আমি চোখের সামনেই দেখছি। গল্পের শুরুর দিকটা ভালো রকমের হরর, মাঝখান টুকু আমার কাছে খাপছাড়া এবং অগোছালো লেগেছে, আবার শেষের দিকটা বেশ ভালো।
একটা টুইস্ট ওয়ালা ভালো থ্রিলার বই পড়তে চাইলে বইটা নিঃসন্দেহে পড়ে ফেলতে পারেন।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কম্পিটিশনে শুটিং চ্যাম্পিয়ন জামসেদ। সে পাঁচ বছর আগের কথা। পাঁচ বছরে অনেক কিছুই বদলে যায়। এই যেমন জামসেদ এখন প্রচুর অ্যালকোহলিক। এই কারণে অলিম্পিকে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার পরও নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি।
এর পাঁচ বছর পর যখন গল্পটা শুরু হয়, তখন তার বাবা মা রা গিয়েছে। এরপর থেকে কেমন যেন অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে সে। দুঃস্বপ্ন দেখে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? মনস্তত্ত্বে বড়ো ধরনের সমস্যা অবশ্যই আছে। যার জন্য সাইকিয়াট্রিকের স্মরনাপন্ন হতে হয়।
বড়লোক, বদমেজাজি জামশেদের শত্রুর অভাব থাকার কথা না। তেমন এক শত্রুর সাথে যদি তার বর্তমান প্রেমিকার যোগাযোগ থাকে, তাহলে মাথা ঠিক রাখা সম্ভব? জামশেদের মতো বদরাগী মানুষ এমন কিছু ঘটিয়ে ফেলে, তার পেছনে একদল খুনে গু ণ্ডা পেছনে লেগে থাকে। শুটিং চ্যাম্পিয়ন জামশেদ, তার হাতের নিশানা নিখুঁত। এই ভরসাতেই এক গাড়ি শত্রুকে যেভাবে নিকেষ করল, এরপর কী হবে আর ভাবতে চায় না জামশেদ।
জামশেদের বন্ধু শিপলু একজন জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। বিশেষ করে অতিপ্রাকৃত, ভূতুড়ে বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান। এই বিষয় নিয়ে রিসার্চও করে প্রতিনিয়ত। একটি মাসিক পত্রিকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া অতিপ্রাকৃত, অদ্ভুত সব ঘটনার কেস স্টাডি লিখে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। মাঝেমাঝেই চিঠি পায় অদ্ভুত সব ঘটনার বিবরণসহ। রংপুর থেকেও এক চিঠি এসেছে। সেখানকার প্রত্যন্ত এক গ্রামে না-কি এমন এক প্রাণীর দেখা মিলেছে, যে মানুষখেকো। প্রাণী, না পিশাচ? আতঙ্কে আছে গ্রামবাসী। এই রহস্য সমাধান করতে তাই রংপুরে যেতে হবে শিপলুকে।
জামশেদের অঘটন ঘটানোর মুহূর্তে শিপলু ছিল সাথে। তাই তার পরামর্শ, কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় সুযোগ শিপলুর সাথে রংপুর যাওয়া। এতে যে মানসিক সমস্যায় আছে জামশেদ, তার জন্য হওয়া বদল হবে। নিজেকে আড়ালও করা যাবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নাহয় ফিরে আসা যাবে। তাছাড়া যে প্রাণীর কথা বলা হচ্ছে তাকে বধ করতে জামশেদকে প্রয়োজন। তার নিখুঁত নিশানাই একমাত্র ভরসা।
কিন্তু ওরা জানত না, কীসের মধ্যে ছুটে চলেছে ওরা। জামশেদ যদি জানত, এক ষড়যন্ত্রের চক্রবুহ্যে জড়িয়ে যাবে ও; তাহলে কি এই ভ্রমণে বন্ধুর সাথী হতো। গভীর এক চক্রান্ত, যার রূপরেখা অনেক আগেই আঁকা হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু বাস্তবায়নের অপেক্ষা। যার জন্য শুধু জামশেদকেই লাগবে। কী ঘটবে সেই গভীর রাতে জঙ্গলের ভিতর? বেঁচে ফিরে আসার উপায় কি পাবে? না-কি সেখানে প্রস্তুত মৃ ত্যুর সকল আয়োজন?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
নাবিল মুহতাসিমের সবচেয়ে জনপ্রিয় বই হিসেবে “বাজিকর ট্রিলজি” পাঠকের আস্থা অর্জন করেছে। তবে সিরিজটি প্রকাশের আগে লেখকের প্রথম বই “শ্বাপদ সনে” প্রকাশ পেয়েছিল। বইটির নামের মধ্যে একটা হরর জাতীয় অনুভূতি আছে। লেখক থেকে শুরু করে অনেক পাঠককে এই বইটিকে হরর জনরার বই হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও আমার শেষের দিকে তেমনটা মনে হয়নি। শেষের দিকে গল্প পুরোটা পুরো ১৮০° ঘুরে গিয়েছিল। সে বিষয়ে পরে আসছি।
নাবিল মুহতাসিমের সবচেয়ে ভালো বিষয় তার লেখনশৈলী, গল্প বলার ধরন। প্রথম বইতেও লেখকের লেখায় আড়ষ্টতা লক্ষ্য করা যায়নি। লেখকের লেখার ধরনে একধরনের ন্যাচারাল ভাব আছে। গল্প বলতে পারে দারুণভাবে। যদিও তার গল্প বলার ধরন ব্যতিক্রম। শুরুর দিকে ধীরে সুস্থ কাহিনি এগোয়, চরিত্রগুলোকে পরিচিত করিয়ে দেয়। চরিত্রের কর্মকাণ্ডগুলো উন্মুক্ত হয়। কাহিনি যতই এগোতে থাকে ধীরে ধীরে গল্পের গতি বৃদ্ধি পায়, শেষে এসে যেন লাগাম ছাড়া ঘোড়ার মতো ছুটতেই থাকে।
এই বইটির প্রথম একশ পৃষ্ঠা ভীষণ ধীর গতির। জামশেদকে পরিচয় করিয়ে দিতেই লেখক বেশ সময়ক্ষেপন করেছেন। গল্পের শুরুর থেকে একটা অংশ জামশেদ ও তার জীবনের গল্প। এখানে তার মানসিক অস্থিরতা প্রকাশ পায়। তাই শুরুর প্রায় একশ পৃষ্ঠায় বোঝা যায় না, গল্পটা কোনদিকে মোড় নিবে।
লেখকের বর্ণনা যেহেতু দারুণ, তিনি ঘটনার ভিজুলাইজেশন বেশ ভালো মতো তৈরি করতে পারেন। এখানে আক্রমণের কিছু দৃশ্য আছে। মনে হয়েছিল, চোখের সামনে যেন সবটা দেখছি। কাহিনি যেমনই হোক, এই বর্ণনাগুলো কারণে লেখকের লেখা পড়তে ভালো লাগে। তাছাড়া এই বইতে আপার ক্লাসের দিকেও লেখক আলোকপাত করেছে। তবে লেখকের লেখার মধ্যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। ইংরেজি শব্দের আধিক্য কিছুটা হলেও পড়ায় বাঁধা সৃষ্টি করেছে।
লেখক এখানে আশি, নব্বই দশকের সময়টাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সেই সময়ের বর্ণনা ভালো দিলেও ঠিক যথাযথ মনে হয়নি। আমার মনে হয়েছে, আরও বেটারভাবে উপস্থাপন করা যেত। সেই সময়ের রাজনৈতিক আবহ, পরিবেশ, সং���্কৃতি কিছুটা হলেও তুলে আনার সুযোগ ছিল।
আগেই বলেছি, শেষের দিকে কাহিনির গতিপথ পাল্টে যায়। হরর হিসেবে ঘটনা প্রবাহ পুরোটা থ্রিলারের আদলে রূপ নেয়। এখানে এসে কাহিনি ভালো লেগেছে। যদিও এর আগে কিছুটা মিশ্র অনুভূতি ছিল। অনেকটা জোর করে পৃষ্ঠা উল্টে গিয়েছি।
কাহিনির মাঝে মাঝে কিছু কেস স্টাডি ছিল। পড়তে ভালো লেগেছে। যদিও আমার মনে হচ্ছিল, এই কেস স্টাডিগুলো অবান্তর। কাহিনির সাথে যোগসাজশ নেই। যদিও শেষে এসে লেখক সেই ভুল প্রমাণ করেছে। পাঠকের কেস স্টাডিগুলোর সংযোগ ধরতে পারবে ঠিকঠাক। এক বিশাল যে ষড়যন্ত্রের বীজ গল্পে বপন করা হয়েছে লেখক প্রকাশের আগে তা ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি। তবে গল্প বর্ণিত পুলিশের হুট করে মানবিক হয়ে ওঠা, প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা আমার ধোঁয়াশা লেগেছে। এর পেছনের ব্যাকস্টোরি আরেকটু স্পষ্ট করে তোলা যেত।
জামশেদের শ্যুটিং প্রতিযোগিতাকে লেখক সাফ কম্পিটিশন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এখানে লেখক কিঞ্চিৎ ভুল করেছেন। সাফ প্রতিযোগিতা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দলগুলোর ফুটবল প্রতিযোগিতাকে বলা হয় থেকে। SAFF-এর ফুল মিনিং South Asian Football Federation. অন্যান্য খেলাসমৃদ্ধ টুর্নামেন্টকে এসএ গেমস বলে। অনেকটা অলিম্পিকের মতো দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতা। যেখানে সব ধরনের প্রতিযোগিতা হয়। আমি জানি না আশি, নব্বই দশকে কী নামে ডাকা হতো; তবে আমার ভুল করার কথা না।
বইটা পড়ার সময় ও এর পরে আমার অনুভূতি মিশ্র। লেখকের লেখা দারুণ লেগেছে। কাহিনি শুরুর দিকে এভারেজ, এক বড়লোক বখে যাওয়া সন্তানের কথা এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। যে বাবার মৃত্যুর পর হুট করে অঢেল সম্পত্তির মালিক। প্রচুর মদ্যপান করে, বন্ধুদের নিয়ে আসব জমায়। কাহিনি যত এগোতে থাকে তত জমজমাট হতে থাকে। আর শেষে পুরো ভিন্ন অনুভূতির সাথে লেখক পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। চমকটা ভালো লেগেছে। যদিও চমকের শেষেও চমক থাকে।
একজন যখন নিজের জবানে কাহিনি বলে, তখন কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যে মেশানো থাকে; বোঝার উপায় থাকে না। বিশ্বাস করে নিতে হয়। জামশেদের জবানবন্দিতে উঠে আসা তার এই ঘটনা কতটুকু সত্য সেটা পাঠকের ভাবনার উপর ছেড়ে দেওয়া যায়।
বইটি শেষের দিকে কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। হয়তো লেখক ইচ্ছা করেই ধোঁয়াশা রেখেছেন। পাঠকের ভাবনার উপর ছেড়ে দিয়েছেন ঘটনা। তবে হরর জাতীয় উপাখ্যান হিসেবে শুরু হওয়ার পর শেষের দিকে তার কিছুই না পাওয়া একটু হতাশ করেছে। একই সাথে এই বইটাকে হরর হিসেবে আখ্যা দেওয়াটাও ভুল।
▪️পরিশেষে, আমাদের চোখের সামনে থাকে সত্য। মিথ্যে ঘুরে ফিরে বেড়ায় চারিপাশে। আসল, নকলের ভিড়ে সঠিক বিচার করতে না পারলে জীবন গভীর খাদের কিনারে এসে দাঁড়ায়। তাই লেখকের মতো, জামশেদের অবচেতন মন যেভাবে বলে; আমিও সেভাবে বলতে চাই — আসল নকল বিচার করো।
বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশের একটি থ্রিলার উপন্যাস প্রায় গোগ্রাসে গিলেছিলাম.... উপন্যাসটির নাম ‛শ্বাপদ সনে’। সেই থেকে এখনো অবধি আমাকে কেউ আমার প্রিয় থ্রিলার উপন্যাসের নাম জিজ্ঞেস করলে আমি নির্দ্বিধায় বলি ‛শ্বাপদ সনে’।
যখন শুনলাম সেই উপন্যাসের গ্রাফিক নভেল তৈরি হচ্ছে, রীতিমতো চমকে উঠেছিলাম । এইরকম একটি দুর্দান্ত থ্রিলার উপন্যাসকে কমিকসের পাতায় ফুটিয়ে তোলা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং... কিন্তু এড্রিয়েন অনীক সেই চ্যালেঞ্জিং কাজটিই করে ফেলেছেন ভীষণ সুনিপুণভাবে ।
বিশ্বাস করুন বাংলা ভাষায় এইরকম গ্রাফিক নভেল আর তৈরি হয়েছে কিনা তা আমার অন্তত জানা নেই । দুর্দান্ত ইলাস্ট্রেশনস্ এবং অসম্ভব সুন্দর প্রোডাকশন, সবমিলিয়ে ৪০০ পাতার এই গ্রাফিক নভেলটি একটি ‛কালেকটরস্ আইটেম’ হয়ে থাকবে ।
▫️বইটির জন্য 10টি তারা... 5টি তারা নাবিল মুহতাসিমের লেখার জন্য, 5টি তারা এড্রিয়েন অনীকের জন্য ❣️