What do you think?


নভেরা
‘নভেরা’ পত্রিকান্তরে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যে বিপুল আলোড়ন তোলে তার কোনো তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। হারিয়ে যাওয়া অসাধারণ এক শিল্পীকে, জেদী সংবেদী তরুণীকে বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনা শুধু নয়, তাকে আজকের দিনের পটভূমিকায় প্রাসঙ্গিক ও সজীব চরিত্রে রূপান্তর করেছেন হাসনাত আবদুল হাই। জীবনীভিত্তিক সাহিত্য-রচনায় যে অনুপম সিদ্ধির পরিচয় রেখেছেন তিনি, ‘নভেরা’ রচনার সুবাদে তা সাফল্যের নতুন মেরুশেখর স্পর্শ করলো। বহুমাত্রিক এই উপন্যাসে যন্ত্রণা-জর্জর শিল্পীর আর্তি দাগ কেটে যায় আমাদের অন্তরের গভীরতম প্রদেশে, ফেলে আসা এক অতীত মুখর হয়ে ওঠে সমাজবাস্তবতার সমগ্রতা নিয়ে, শিল্প ইতিহাসের অজানা পর্ব দ্যুতিময় হয়ে ওঠে চরিত্রচিত্রণ কুশলতায় এবং বিস্মৃত, অবহেলিত, উপেক্ষিত নভেরা এ উপন্যাসের সূত্রে আবার হয়ে ওঠেন আমাদের খুব কাছের নভেরা, অতীতের সকল ব্যর্থতা মুছে দিয়ে সমাজ আবার বরণ করতে এগিয়ে আসে সাহসিক এক শিল্পীকে, শুরু হয় নতুন করে ’নভেরা অনুসন্ধান’। হাসনাত আবদুল হাই-এর এই উপন্যাস তাই জন্ম দিয়েছে বড় মাপের সামাজিক ঘ টনার। রচনার শিল্পগুণ ও বিষয়ের অভিনবত্ব যে কতটা আলোড়ন উদ্রেকী হতে পারে তার সাক্ষ্য বহন করছে ’নভেরা’।
- GenresBiography
200 pages, Hardcover
First published February 1, 1995
About the author
Hasnat Abdul Hye
79 books17 followersহাসনাত আব্দুল হাই (English: Hasnat Abdul Hye) একজন বাংলাদেশি লেখক এবং প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তিনি ঢাকা, ওয়াশিংটন, লন্ডন ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করেন। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জগদীশ চন্দ্র বসু পুরস্কার, শের-ই-বাংলা পুরস্কার, এস.এম. সুলতান পুরস্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কারে ভূষিত হন।
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 28 of 28 reviews
May 3, 2016
"…মনে পড়ে গেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দু’জন তাদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমত আমরা একেবারেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন, যদিও বা কেউ জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম, খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদের সঙ্গে আরো একজন ছিলেন— হামিদের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দু’জনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন। অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ।"
—সৈয়দ শামসুল হক
এসব কী বলে লোকটা? আমি প্রি-স্কুল পর্যায় থেকেই সাধারণ জ্ঞান বইয়ে পড়ে এসেছি, আমাদের শহিদ মিনারের নকশা করেছেন হামিদুর রহমান। আর এখন কিনা শুনি উনি একা কাজটা করেননি, আরো কেউ ছিলেন! কিন্তু কেউ থাকলে তাঁর ব্যাপারে আগে শুনিনি কেন? কেউ বলেইনি কেন?
না শোনার কারণটা অজ্ঞাত। সবখানেই শুনলাম, "অজ্ঞাত" কারণে তাঁর নাম বাদ পড়েছে সরকারি নথি থেকে। তাঁর নাম বাদ পড়ার কারণের মত নামটাও আমার কাছে অজ্ঞাত থেকে যেত, যদি না প্রথম আলোতে তাঁর মৃত্যু সংবাদটা না পড়তাম। সেটা পড়ার পরেও অন্য অনেকের মত তাঁর নামটা ভুলে যেতাম, যদি উনার শহিদ মিনারের নকশা করার তথ্যটা সেখানে না থাকত। সেই খবরের সূত্র ধরেই অনলাইনে তাঁর ব্যাপারে তথ্য খোঁজাখুঁজি। উইকিপিডিয়ায় কিছু তথ্য পেয়েছি, কিছু পাইনি। বিশেষ করে "অজ্ঞাত" কারণটা জ্ঞাত হয়নি।
তারপর একদিন দুদিন করে কেটে গেছে প্রায় বছর খানেক। হঠাৎই হাতের কাছে বইটা পেলাম। হাসনাত আবদুল হাই নভেরা আহমেদকে নিয়ে জীবনীমূলক উপন্যাস লিখেছেন। বইটা তুলে নিলাম, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর রহস্যময়ী চরিত্র নভেরাকে জানার ইচ্ছে থেকেই।
হারিয়ে যাওয়া নভেরার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভবত লেখকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই নভেরাকে চিনতেন, এমন অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছেন লেখক, অনেকের জবানিতে একটু একটু করে পরিচিত করেছেন নভেরাকে। একটু একটু করে সকলের মনে থাকা নভেরার ভাঙা ছবি জোগাড় করেছেন, এরপর সেই ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে নভেরার একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
মোটের উপর নভেরার জীবনযাপন, স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব এসব বিষয় সম্পর্কে ধারণা করা যায় বইটা পড়ে। রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণযোগ্য না, তবে ধারণাটা পরিষ্কার করার জন্য আমরা যেমন অনেক সাপ্লিমেন্টারি বই পড়ি, তেমন বই হিসেবে বেশ চলে। বইয়ের কিছু তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষন করে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় চিঠি দিয়েছিলেন নভেরা আহমেদের বোন কুমুম হক। তার সেই চিঠি এবং লেখকের সংযুক্ত হয়েছে উপন্যাসের পেছনে।
মোটের ওপর খারাপ না। লেখা সাবলীল, পড়তে গিয়ে আটকাতে হয়নি। একটা তথ্য পেলাম, সত্যমিথ্যা জানিনা। আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র নাকি নভেরা আহমেদ আর হামিদুর রহমানকে মাথায় রেখে লেখা। যাই হোক, খারাপ না লাগলেও খুব একটা মুগ্ধও করতে পারেনি বইটা। নভেরা আহমেদকে নিয়ে কেউ যদি আগ্রহী হন, পড়তে পারেন।
—সৈয়দ শামসুল হক
এসব কী বলে লোকটা? আমি প্রি-স্কুল পর্যায় থেকেই সাধারণ জ্ঞান বইয়ে পড়ে এসেছি, আমাদের শহিদ মিনারের নকশা করেছেন হামিদুর রহমান। আর এখন কিনা শুনি উনি একা কাজটা করেননি, আরো কেউ ছিলেন! কিন্তু কেউ থাকলে তাঁর ব্যাপারে আগে শুনিনি কেন? কেউ বলেইনি কেন?
না শোনার কারণটা অজ্ঞাত। সবখানেই শুনলাম, "অজ্ঞাত" কারণে তাঁর নাম বাদ পড়েছে সরকারি নথি থেকে। তাঁর নাম বাদ পড়ার কারণের মত নামটাও আমার কাছে অজ্ঞাত থেকে যেত, যদি না প্রথম আলোতে তাঁর মৃত্যু সংবাদটা না পড়তাম। সেটা পড়ার পরেও অন্য অনেকের মত তাঁর নামটা ভুলে যেতাম, যদি উনার শহিদ মিনারের নকশা করার তথ্যটা সেখানে না থাকত। সেই খবরের সূত্র ধরেই অনলাইনে তাঁর ব্যাপারে তথ্য খোঁজাখুঁজি। উইকিপিডিয়ায় কিছু তথ্য পেয়েছি, কিছু পাইনি। বিশেষ করে "অজ্ঞাত" কারণটা জ্ঞাত হয়নি।
তারপর একদিন দুদিন করে কেটে গেছে প্রায় বছর খানেক। হঠাৎই হাতের কাছে বইটা পেলাম। হাসনাত আবদুল হাই নভেরা আহমেদকে নিয়ে জীবনীমূলক উপন্যাস লিখেছেন। বইটা তুলে নিলাম, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর রহস্যময়ী চরিত্র নভেরাকে জানার ইচ্ছে থেকেই।
হারিয়ে যাওয়া নভেরার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভবত লেখকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই নভেরাকে চিনতেন, এমন অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছেন লেখক, অনেকের জবানিতে একটু একটু করে পরিচিত করেছেন নভেরাকে। একটু একটু করে সকলের মনে থাকা নভেরার ভাঙা ছবি জোগাড় করেছেন, এরপর সেই ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে নভেরার একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
মোটের উপর নভেরার জীবনযাপন, স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব এসব বিষয় সম্পর্কে ধারণা করা যায় বইটা পড়ে। রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণযোগ্য না, তবে ধারণাটা পরিষ্কার করার জন্য আমরা যেমন অনেক সাপ্লিমেন্টারি বই পড়ি, তেমন বই হিসেবে বেশ চলে। বইয়ের কিছু তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষন করে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় চিঠি দিয়েছিলেন নভেরা আহমেদের বোন কুমুম হক। তার সেই চিঠি এবং লেখকের সংযুক্ত হয়েছে উপন্যাসের পেছনে।
মোটের ওপর খারাপ না। লেখা সাবলীল, পড়তে গিয়ে আটকাতে হয়নি। একটা তথ্য পেলাম, সত্যমিথ্যা জানিনা। আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র নাকি নভেরা আহমেদ আর হামিদুর রহমানকে মাথায় রেখে লেখা। যাই হোক, খারাপ না লাগলেও খুব একটা মুগ্ধও করতে পারেনি বইটা। নভেরা আহমেদকে নিয়ে কেউ যদি আগ্রহী হন, পড়তে পারেন।
May 25, 2017
বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোতে প্রায়ই চোখে পড়ে নানা রকম দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য এবং শিল্পকর্ম। কিন্তু এই শিল্পের এই নান্দনিক শাখাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় না, কারণটা আমার অজানা। দেশের অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম, শহীদ মিনারের স্থপতির নাম জিজ্ঞেস করলে তাই অনেকেই চুপ হয়ে যায়, কেউ কেউ একটু চিন্তা করে বলে – হামিদুর রহমান। কিন্তু মূল নকশাটা যে তার ছিল না, এটা কয়জন জানে?
নভেরা আহমেদ – নামটা কবে, কোথায় শুনেছিলাম ঠিক মনে নেই। কিন্তু মনে রেখেছিলাম, এটা মনে আছে। আস্তে আস্তে জানলাম, তিনি একজন ভাস্কর ছিলেন। বাংলাদেশের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর, নভেরা আহমেদ। বিভিন্ন উৎস থেকে তার সম্পর্কে ভাসা ভাসা আরও কিছু তথ্য জানা গেল – তার চালচলন ছিল বিদেশিনীদের মতো, আপাদমস্তক বোহেমিয়ান। খটকা লাগল – শহীদ মিনার তো যত দূর জানি, পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তৈরি। সেই সময়ে একজন বাঙালী নারীর মাঝে এমন বৈশিষ্ঠ কি বিরল নয়? অনুভব করলাম, এই নারীর সম্পর্কে আরও জানতে হবে আমার।
সতেরোর বইমেলার শুরুতে যখন বিভিন্ন প্রকাশনীতে ঘুরে ঘুরে লিস্ট বানাচ্ছি আর বই দেখে বেড়াচ্ছি, তখনই হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা একটা বইয়ের উপর চোখ আটকে গেল। নামঃ নভেরা। উপরে একটা পরিচিত মুখের ছবি। সাদা কালো ছবিটায় এক নারী ঈষৎ মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে ডান দিকে, কিছুটা রাগ আর অভিমান মেশানো মুখাবয়ব। কপালে হাতে আঁকা টিপ, চুল চুড়ো করে বাঁধা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। ইন্টারনেটে আগেই ছবিটা দেখেছিলাম, চিনতে একটুও দেরি হলো না – ইনিই নভেরা আহমেদ। বইটা কি গল্প না উপন্যাস না নন ফিকশন কিছুই দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না, কিনে ফেললাম।
বইয়ের শেষে লেখক বলেছেন, এটি একটি জীবনীমূলক উপন্যাস। অর্থাৎ, নভেরা আহমেদের জীবনের বিভিন্ন সময়ের কথা উঠে এসেছে এখানে, গল্পের ঢঙে। হাসনাত আবদুল হাই এই বই লেখার সময় সাহায্য নিয়েছেন নভেরার পরিচিত বিভিন্ন কাছের এবং দূরের মানুষের, তাদের কাছ থেকে শোনা গল্পগুলোকে সহজ ভাষায় রূপ দিয়েছেন উপন্যাসে। কখনও নভেরার নিজের জবানিতে, কখনও হাসনাত ওরফে লেখকের বর্ণনায়, সেই সাথে মুর্তজা বশীর, খান আতা, শামসুর রাহমান সহ আরও অনেক ব্যক্তিত্ব স্ম্রৃতিচারণ করেছেন নভেরাকে নিয়ে। তাদের সেই বর্ণনার মনোমুগ্ধকর সংগ্রহ এই বইটি পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগলাম এক অদ্ভুত নারীর সাথে। জন্ম তার ত্রিশের দশকে, কোলকাতায়। তবে নিবাস ছিল চট্টগ্রাম। তিন বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে মিশুক, এবং ডানপিটে। খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ করেছিলেন নিজের ইচ্ছা – ভাস্কর হবেন তিনি। ইংল্যান্ডে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে চলে গেলেন প্রিয় বিষয়ের উপর। সেখান থেকেই বোধ করি তার বোহেমিয়ান জীবনের শুরু। আপাদমস্তক শিল্পী বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই ছিলেন তিনি – কখনও থিতু হতে পারেননি কোথাও, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লাহোর, করাচি, লন্ডন, প্যারিস, বোম্বে ঘুরে বেড়িয়েছেন যাযাবরের মতো। শিল্পকে নিজের সব কিছু উৎসর্গ করেছিলেন বলেই বোধহয়, স্বার্থপর বা উশৃঙ্খল ধরণের তকমাও জুটে গিয়েছিল কপালে। কিন্তু সে সবকে পায়ে দলে গেছেন বারবার। ভাস্কর্য শিল্প ছাড়াও গান এবং নাচের প্রতিও আগ্রহ ছিল তার, যেখানেই শিল্পকে ভালবাসার সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ছুটে গেছেন।
প্রচণ্ড গুণী এই শিল্পি বাস্তবে ছিলেন মিশুক, কিন্তু নিজের কাছাকাছি আসতে দিতেন না কাউকে। যারাই তার কাছে এসেছে, তারা নাকি হতাশ হতে ভুলে গেছে – এমনি ছিল তার এক গুণমুগ্ধ বন্ধুর মন্তব্য। তার সম্পর্কে জয়নুল আবেদিন মন্তব্য করেছিলেন, নভেরা যে কাজ করছে তার মূল্য এই যুগের মানুষ বুঝতে পারবে না। কিন্তু একুশে পদক জয়ী এই শিল্পীর শেষ জীবন কেটেছে প্যারিসে, স্বেচ্ছা নির্বাসনে। সকলের প্রতি কোন এক অভিমান তাকে বাধ্য করেছিল পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আড়ালে, প্যারিসে অজ্ঞাতবাস রচনা করতে। সেই প্যারিস, যা সকল শিল্পীর কাছে মায়ের মতো, যে সবাইকে হাত বাড়িয়ে ডাকে, আয়, আয়...
বইটি পড়ার পর কেমন এক বিষণ্নতা বোধে আক্রান্ত হতে হয়। কিছুটা কি প্রেমেও পড়ে গিয়েছিলাম নভেরার? হতে পারে! প্রেমের উলটো দিকেই তো বিষাদ লুকিয়ে থাকে। আর বইটি পড়ে যা বুঝলাম, নভেরার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতোই। বইটিতে সকল তথ্য হয়তো সঠিক নেই, যেটা লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু এটি তো কোন জীবনী নয় যে দিন তারিখ বছর ঠিক থাকা লাগবে। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বাস্তবের মিশ্রণে একটি উপন্যাস হিসেবেই ধরে নিলে ক্ষতি কি, যার মূল চরিত্র চির রহস্যময়, চির সবুজ?
নভেরা আহমেদ – নামটা কবে, কোথায় শুনেছিলাম ঠিক মনে নেই। কিন্তু মনে রেখেছিলাম, এটা মনে আছে। আস্তে আস্তে জানলাম, তিনি একজন ভাস্কর ছিলেন। বাংলাদেশের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর, নভেরা আহমেদ। বিভিন্ন উৎস থেকে তার সম্পর্কে ভাসা ভাসা আরও কিছু তথ্য জানা গেল – তার চালচলন ছিল বিদেশিনীদের মতো, আপাদমস্তক বোহেমিয়ান। খটকা লাগল – শহীদ মিনার তো যত দূর জানি, পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তৈরি। সেই সময়ে একজন বাঙালী নারীর মাঝে এমন বৈশিষ্ঠ কি বিরল নয়? অনুভব করলাম, এই নারীর সম্পর্কে আরও জানতে হবে আমার।
সতেরোর বইমেলার শুরুতে যখন বিভিন্ন প্রকাশনীতে ঘুরে ঘুরে লিস্ট বানাচ্ছি আর বই দেখে বেড়াচ্ছি, তখনই হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা একটা বইয়ের উপর চোখ আটকে গেল। নামঃ নভেরা। উপরে একটা পরিচিত মুখের ছবি। সাদা কালো ছবিটায় এক নারী ঈষৎ মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে ডান দিকে, কিছুটা রাগ আর অভিমান মেশানো মুখাবয়ব। কপালে হাতে আঁকা টিপ, চুল চুড়ো করে বাঁধা। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। ইন্টারনেটে আগেই ছবিটা দেখেছিলাম, চিনতে একটুও দেরি হলো না – ইনিই নভেরা আহমেদ। বইটা কি গল্প না উপন্যাস না নন ফিকশন কিছুই দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না, কিনে ফেললাম।
বইয়ের শেষে লেখক বলেছেন, এটি একটি জীবনীমূলক উপন্যাস। অর্থাৎ, নভেরা আহমেদের জীবনের বিভিন্ন সময়ের কথা উঠে এসেছে এখানে, গল্পের ঢঙে। হাসনাত আবদুল হাই এই বই লেখার সময় সাহায্য নিয়েছেন নভেরার পরিচিত বিভিন্ন কাছের এবং দূরের মানুষের, তাদের কাছ থেকে শোনা গল্পগুলোকে সহজ ভাষায় রূপ দিয়েছেন উপন্যাসে। কখনও নভেরার নিজের জবানিতে, কখনও হাসনাত ওরফে লেখকের বর্ণনায়, সেই সাথে মুর্তজা বশীর, খান আতা, শামসুর রাহমান সহ আরও অনেক ব্যক্তিত্ব স্ম্রৃতিচারণ করেছেন নভেরাকে নিয়ে। তাদের সেই বর্ণনার মনোমুগ্ধকর সংগ্রহ এই বইটি পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগলাম এক অদ্ভুত নারীর সাথে। জন্ম তার ত্রিশের দশকে, কোলকাতায়। তবে নিবাস ছিল চট্টগ্রাম। তিন বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে মিশুক, এবং ডানপিটে। খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ করেছিলেন নিজের ইচ্ছা – ভাস্কর হবেন তিনি। ইংল্যান্ডে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে চলে গেলেন প্রিয় বিষয়ের উপর। সেখান থেকেই বোধ করি তার বোহেমিয়ান জীবনের শুরু। আপাদমস্তক শিল্পী বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই ছিলেন তিনি – কখনও থিতু হতে পারেননি কোথাও, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লাহোর, করাচি, লন্ডন, প্যারিস, বোম্বে ঘুরে বেড়িয়েছেন যাযাবরের মতো। শিল্পকে নিজের সব কিছু উৎসর্গ করেছিলেন বলেই বোধহয়, স্বার্থপর বা উশৃঙ্খল ধরণের তকমাও জুটে গিয়েছিল কপালে। কিন্তু সে সবকে পায়ে দলে গেছেন বারবার। ভাস্কর্য শিল্প ছাড়াও গান এবং নাচের প্রতিও আগ্রহ ছিল তার, যেখানেই শিল্পকে ভালবাসার সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ছুটে গেছেন।
প্রচণ্ড গুণী এই শিল্পি বাস্তবে ছিলেন মিশুক, কিন্তু নিজের কাছাকাছি আসতে দিতেন না কাউকে। যারাই তার কাছে এসেছে, তারা নাকি হতাশ হতে ভুলে গেছে – এমনি ছিল তার এক গুণমুগ্ধ বন্ধুর মন্তব্য। তার সম্পর্কে জয়নুল আবেদিন মন্তব্য করেছিলেন, নভেরা যে কাজ করছে তার মূল্য এই যুগের মানুষ বুঝতে পারবে না। কিন্তু একুশে পদক জয়ী এই শিল্পীর শেষ জীবন কেটেছে প্যারিসে, স্বেচ্ছা নির্বাসনে। সকলের প্রতি কোন এক অভিমান তাকে বাধ্য করেছিল পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আড়ালে, প্যারিসে অজ্ঞাতবাস রচনা করতে। সেই প্যারিস, যা সকল শিল্পীর কাছে মায়ের মতো, যে সবাইকে হাত বাড়িয়ে ডাকে, আয়, আয়...
বইটি পড়ার পর কেমন এক বিষণ্নতা বোধে আক্রান্ত হতে হয়। কিছুটা কি প্রেমেও পড়ে গিয়েছিলাম নভেরার? হতে পারে! প্রেমের উলটো দিকেই তো বিষাদ লুকিয়ে থাকে। আর বইটি পড়ে যা বুঝলাম, নভেরার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতোই। বইটিতে সকল তথ্য হয়তো সঠিক নেই, যেটা লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু এটি তো কোন জীবনী নয় যে দিন তারিখ বছর ঠিক থাকা লাগবে। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বাস্তবের মিশ্রণে একটি উপন্যাস হিসেবেই ধরে নিলে ক্ষতি কি, যার মূল চরিত্র চির রহস্যময়, চির সবুজ?
February 7, 2021
নভেরা আহমেদ — প্রথম বাঙালি ভাস্কর৷ কিন্তু এই পরিচয় ছাপিয়ে আরেকটা অম্লান পরিচয় হলো — শহীদ মিনারের মূল নকশাকার৷ হামিদুর রহমান শহীদ মিনারের রূপকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য, আর নভেরা আহমেদ উপেক্ষিত সত্য৷ দুইজন একসাথেই নকশা পরিকল্পনা করলেও মূল আইডিয়াটা ছিল নভেরা আহমেদের৷ শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরের ভাষায়, ''আমার মনে আছে ওই সময় আমি এবং আমার বন্ধু আমিনুল ইসলাম প্রায়ই বিকেলে আমরা যেতাম হামিদ আর নভেরার সঙ্গে আড্ডা দিতে৷ একদিন দেখলাম, নভেরা কাদা-মাটি দিয়ে শহীদ মিনারের একটি মডেল তৈরি করছে। মাটির প্রশস্ত চত্বর আর বেশ কিছু লম্বা সিঁড়ি সামনে। পেছনের দিকে গাছের ছোট ছোট ডাল দিয়ে, যা বর্তমানে সিমেন্টের খুঁটি আর লোহার রড দিয়ে তৈরি হয়েছে।’’ এক সাক্ষাৎকারে ভাস্কর নভেরা আহমেদ শহীদ মিনার প্রসঙ্গে বলেছেন ,‘’আমি আমার আইডিয়ার কথা বলেছি। কী করতে হবে বলেছি। অনেক কাজ একা করতে হবে বলে হামিদকে বলি সাহায্যের জন্য। সে আমার কথা অনুসরণ করত। কারণ আইডিয়া আমার। সে বুঝত না আমি কী চাচ্ছি, সম্পূর্ণভাবে কী চাচ্ছি। তাই আমি যখন যা করতে বলতাম, তখন তাই করত।’’ এত বছর পরেও শহীদ মিনারের অন্যতম স্থপতিকে প্রাপ্য সম্মান না দেওয়াটা দুখঃজনক।
নভেরা আহমেদ — দৃঢ় স্বাধীনচেতা মানুষটা সম্পর্কে শুধু বিমূর্ত কিছু ধারণা পাওয়া যায়৷ সেই পঞ্চাশের দশকেও বাঙালি নারীদের রক্ষণশীলতার আবরণ ছিঁড়ে অবাধ চলাফেরা — সময়ের তুলনায় অগ্রগামী চিন্তাভাবনা — আধুনিক পোশাক-পরিচ্ছদ — বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছেন৷ কখনো কলকাতা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, লন্ডন, ইতালি কিংবা প্যারিস! তবুও, নভেরার সাথে খুব কম মানুষের সাথেই মেলামেশা ছিল৷ মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তিবর্গ যেমন, জয়নুল আবেদীন, মর্তুজা বশির, আমিনুল হক, সাঈদ আহমেদ আর নিকট আত্নীয়দের থেকে পাওয়া তথ্য, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণা মিলিয়ে নভেরা আহমেদের জীবনভিত্তিক উপন্যাস 'নভেরা'৷ বইয়ে ব্যাক্তি নভেরা নিয়ে একটা এবস্ট্রাকট ধারণা পাওয়া যায়, কিন্তু তাঁর কাজ সম্পর্কে কম-ই বলা হয়েছে৷ নভেরার প্রথমদিককার কয়েকটা কাজ এবং একক প্রদর্শনীর কথা উল্লেখ আছে৷ ১৯৬০ সালে নভেরা ৭৫টি ভাস্কর্য নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করছেন, যা একটি বিরল ঘটনা। কারণ, তখনো পাকিস্তানে স্কাল্পচার ট্যাবু হিসাবে স্বীকৃত ছিল। নভেরার শিল্পকর্মে হেনরি মুর এবং বারবারা হেপওয়ার্থের প্রভাব যদিও চোখে পড়ে, তবুও কাজের ধরনে স্বকীয়তা লক্ষণীয়।সম্ভাবনা ছিলো তাদের মতই একজন হয়ে উঠায়, যা কেবল সম্ভবনাতেই স্থির রয়ে গেলো৷ স্বাধীনতার আগেই অভিমান নিয়ে দেশ ছেড়ে শিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যই হয়ত পরবর্তীতে তাঁর সমন্ধে এবং শিল্পকর্ম নিয়ে বেশি জানা সম্ভব হয় নি৷ ১৯৯৭ সালে একুশে পদক গ্রহণ করার জন্যও দেশে ফেরেন নি।
নভেরা আহমেদকে নিয়ে কৌতুহল জন্মালে নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। তবে প্রথম কয়েক অধ্যায় অবিন্যস্ত লেগেছে – খাপছাড়া ভাব। মাঝে মাঝে আবার ন্যারেশন উত্তম পুরুষ থেকে হঠাৎ প্রথম পুরুষে পরিবর্তন ভ্রকুটি হওয়ার মতন। বইয়ে তথ্যগত কিছু ভুল ছিল, সেগুলো নভেরার বড় বোন কুমুম হকের চিঠিতে সংশোধন করা হয়েছে (বইয়ের শেষে দ্রষ্টব্য)৷
নভেরা আহমেদ — দৃঢ় স্বাধীনচেতা মানুষটা সম্পর্কে শুধু বিমূর্ত কিছু ধারণা পাওয়া যায়৷ সেই পঞ্চাশের দশকেও বাঙালি নারীদের রক্ষণশীলতার আবরণ ছিঁড়ে অবাধ চলাফেরা — সময়ের তুলনায় অগ্রগামী চিন্তাভাবনা — আধুনিক পোশাক-পরিচ্ছদ — বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছেন৷ কখনো কলকাতা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, লন্ডন, ইতালি কিংবা প্যারিস! তবুও, নভেরার সাথে খুব কম মানুষের সাথেই মেলামেশা ছিল৷ মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তিবর্গ যেমন, জয়নুল আবেদীন, মর্তুজা বশির, আমিনুল হক, সাঈদ আহমেদ আর নিকট আত্নীয়দের থেকে পাওয়া তথ্য, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণা মিলিয়ে নভেরা আহমেদের জীবনভিত্তিক উপন্যাস 'নভেরা'৷ বইয়ে ব্যাক্তি নভেরা নিয়ে একটা এবস্ট্রাকট ধারণা পাওয়া যায়, কিন্তু তাঁর কাজ সম্পর্কে কম-ই বলা হয়েছে৷ নভেরার প্রথমদিককার কয়েকটা কাজ এবং একক প্রদর্শনীর কথা উল্লেখ আছে৷ ১৯৬০ সালে নভেরা ৭৫টি ভাস্কর্য নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করছেন, যা একটি বিরল ঘটনা। কারণ, তখনো পাকিস্তানে স্কাল্পচার ট্যাবু হিসাবে স্বীকৃত ছিল। নভেরার শিল্পকর্মে হেনরি মুর এবং বারবারা হেপওয়ার্থের প্রভাব যদিও চোখে পড়ে, তবুও কাজের ধরনে স্বকীয়তা লক্ষণীয়।সম্ভাবনা ছিলো তাদের মতই একজন হয়ে উঠায়, যা কেবল সম্ভবনাতেই স্থির রয়ে গেলো৷ স্বাধীনতার আগেই অভিমান নিয়ে দেশ ছেড়ে শিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যই হয়ত পরবর্তীতে তাঁর সমন্ধে এবং শিল্পকর্ম নিয়ে বেশি জানা সম্ভব হয় নি৷ ১৯৯৭ সালে একুশে পদক গ্রহণ করার জন্যও দেশে ফেরেন নি।
নভেরা আহমেদকে নিয়ে কৌতুহল জন্মালে নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। তবে প্রথম কয়েক অধ্যায় অবিন্যস্ত লেগেছে – খাপছাড়া ভাব। মাঝে মাঝে আবার ন্যারেশন উত্তম পুরুষ থেকে হঠাৎ প্রথম পুরুষে পরিবর্তন ভ্রকুটি হওয়ার মতন। বইয়ে তথ্যগত কিছু ভুল ছিল, সেগুলো নভেরার বড় বোন কুমুম হকের চিঠিতে সংশোধন করা হয়েছে (বইয়ের শেষে দ্রষ্টব্য)৷
March 15, 2023
অগোছালো জীবনের প্রতি আমার খুব যে আকর্ষণ কাজ করে এমনটা নয়। তবে শিল্প-স্রষ্টাকে ভালো করে জানতে হলে তাঁর জীবনটাও আলোচনাতে চলেই আসে।
মধুসূদন এর যে জীবন, যে উদ্দামতা, বালখিল্যতা, স্বার্থপরতা, পরনির্ভরশীলতা এবং সর্বোপরি আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকা, এই বিষয়গুলো সাদা চোখে মোটেই কোন অসাধারণ বিষয় না। তাঁর প্রতিভা প্রণম্য, কিন্তু তাঁকে মানুষ হিসেবে সেরা মানুষ মোটেই বলা যায় না।
তেমনি কাজী নজরুলও যখন বিয়ের রাতেই নার্গিসকে ফেলে চলে যান নিজের খেয়ালে বা আত্মসম্মানে ঘা লাগার ফলে, সেটাও মোটেই অসাধারণ একজন মানুষের কোন কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না৷
কিন্তু তাঁদের সৃষ্টির অনুপ্রেরণা বা পটভূমি সম্পর্কে জানতে হলে জীবন সম্পর্কে জানতে হয় কিছুটা, আর বাকিটা কেবল পাঠকসুলভ কৌতূহল।
একই ব্যাপার এই নভেরার ক্ষেত্রেও। তবে তিনি উক্ত দুজনের মতো নি:সন্দেহে এত আলোচিত বা জনপ্রিয় নন, ক্ষেত্র ও আলাদা। একসময় হয়তো নভেরার নাম জানতেন না অনেক বিদগ্ধ লোকই, এখনো কজন জানেন তাঁর কাজ সম্পর্কে সে নিয়ে সংশয় রয়েছে৷
নভেরা এমন এক চরিত্র, অবশ্যই রক্ত-মাংসের, যিনি ছিলেন সময়ের চাইতে অনেক এগিয়ে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনেকদূর ছিল তা নয়, কলেজে গিয়ে পড়া ছেড়ে দেন৷ ভাস্কর্যজ্ঞান অর্জনের জন্য পাড়ি দেন লন্ডনে৷ সাজপোশাকে রুদ্রাক্ষের মালা আলাদা করে নজর কাড়ে। চলাফেরায় সপ্রতিভ ছিলেন বলে নজর কাড়তেন প্রায় সবার। কাকে পছন্দ করছেন, কাকে নয় সহজে বোঝাও যেত না৷
নভেরার নামটাও অভিনব, ইটালিয়ান ছোঁয়া। ভাস্কর হতে চেয়ছেন, এই চাওয়াটাও ওই সময়ের জন্য ভীষণ অন্যরকম। কজন মেয়ে ভাস্কর হতে চেয়েছে? বোহেমিয়ান জীবন কাটাতে ভালোবাসতেন, নিজের পছন্দের বাইরে কিছুই করতে চাইতেন না। তাই হামিদুর রহমানের সাথে দীর্ঘদিন সম্পর্ক থাকার পরেও একসময় নিজেই ভেঙে দেন তা। সাঈদ আহমেদ, মানে নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, হামিদুর রহমানের ভাই, বারবার বলছেন সে জানত না সে কী ছিল। এই অজানা ভাবটাই নভেরাকে আলাদা করে দিয়েছে অন্য সবার থেকে।
যৌবনে বা সৃষ্টিশীলতার সময়ে খেয়ালখুশিমত জীবন কাটালেও শেষজীবনটা সুখে কাটেনি তাঁর।
ফরাসি সভ্যতা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে। সিমোন দ্য বোভোয়ার দ্বারাও ছিলেন অনুপ্রাণিত কিন্তু খুব বেশি কিন্তু পড়াশোনা ছিল না তাঁর৷ বর্ণাঢ্য জীবনে অতিথি হয়েছেন উর্দু ভাষার প্রখ্যাত নারী সাহিত্যিক ইসমত চুঘতাই এর। নাচ শিখেছেন বৈজয়ন্তীমালার কাছে।
রহস্যঘেরা জীবনে আড্ডার মধ্যমণি থাকলেও ১৪ বছরে বিয়ের এক অন্ধকার স্মৃতিও আছে জীবনে, যে বিয়ে টেকেনি ৫ মাস ও। স্বজ্ঞা ছিল রহস্যময় পর্যায়ের, ইএসপি বলে নিজে বিশ্বাস করতেন সেটাকে।
হাসনাত আবদুল হাই উপন্যাসটি লিখেছেন নন-লিনিয়ার ফর্মুলাতে। কখনো নভেরার বয়ানে, কখনো তৃতীয় পুরুষে নিজেকে রেখে, কখনো সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে নভেরার জীবনের একটা টুকরো ছবি আঁকতে পেরেছেন। পরিশিষ্টতে শহীদ মিনারের ইতিহাস, নভেরার বোন কুমুম হকের চিঠি, সাঈদ আহমদ এবং লেখকের নিজের কথা সংযোজিত হয়েছে।
উপন্যাসটিকে আমি অবশ্যপাঠ্য কাতারে ফেলব না৷ তবে বিস্মৃতপ্রায় এক নারী ভাস্করের জীবনগঠনপ্রণালীটা কিছুটা হলেও জানতে, আগ্রহী পাঠকেরা পড়তে পারেন উপন্যাসটি।
মধুসূদন এর যে জীবন, যে উদ্দামতা, বালখিল্যতা, স্বার্থপরতা, পরনির্ভরশীলতা এবং সর্বোপরি আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকা, এই বিষয়গুলো সাদা চোখে মোটেই কোন অসাধারণ বিষয় না। তাঁর প্রতিভা প্রণম্য, কিন্তু তাঁকে মানুষ হিসেবে সেরা মানুষ মোটেই বলা যায় না।
তেমনি কাজী নজরুলও যখন বিয়ের রাতেই নার্গিসকে ফেলে চলে যান নিজের খেয়ালে বা আত্মসম্মানে ঘা লাগার ফলে, সেটাও মোটেই অসাধারণ একজন মানুষের কোন কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না৷
কিন্তু তাঁদের সৃষ্টির অনুপ্রেরণা বা পটভূমি সম্পর্কে জানতে হলে জীবন সম্পর্কে জানতে হয় কিছুটা, আর বাকিটা কেবল পাঠকসুলভ কৌতূহল।
একই ব্যাপার এই নভেরার ক্ষেত্রেও। তবে তিনি উক্ত দুজনের মতো নি:সন্দেহে এত আলোচিত বা জনপ্রিয় নন, ক্ষেত্র ও আলাদা। একসময় হয়তো নভেরার নাম জানতেন না অনেক বিদগ্ধ লোকই, এখনো কজন জানেন তাঁর কাজ সম্পর্কে সে নিয়ে সংশয় রয়েছে৷
নভেরা এমন এক চরিত্র, অবশ্যই রক্ত-মাংসের, যিনি ছিলেন সময়ের চাইতে অনেক এগিয়ে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনেকদূর ছিল তা নয়, কলেজে গিয়ে পড়া ছেড়ে দেন৷ ভাস্কর্যজ্ঞান অর্জনের জন্য পাড়ি দেন লন্ডনে৷ সাজপোশাকে রুদ্রাক্ষের মালা আলাদা করে নজর কাড়ে। চলাফেরায় সপ্রতিভ ছিলেন বলে নজর কাড়তেন প্রায় সবার। কাকে পছন্দ করছেন, কাকে নয় সহজে বোঝাও যেত না৷
নভেরার নামটাও অভিনব, ইটালিয়ান ছোঁয়া। ভাস্কর হতে চেয়ছেন, এই চাওয়াটাও ওই সময়ের জন্য ভীষণ অন্যরকম। কজন মেয়ে ভাস্কর হতে চেয়েছে? বোহেমিয়ান জীবন কাটাতে ভালোবাসতেন, নিজের পছন্দের বাইরে কিছুই করতে চাইতেন না। তাই হামিদুর রহমানের সাথে দীর্ঘদিন সম্পর্ক থাকার পরেও একসময় নিজেই ভেঙে দেন তা। সাঈদ আহমেদ, মানে নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, হামিদুর রহমানের ভাই, বারবার বলছেন সে জানত না সে কী ছিল। এই অজানা ভাবটাই নভেরাকে আলাদা করে দিয়েছে অন্য সবার থেকে।
যৌবনে বা সৃষ্টিশীলতার সময়ে খেয়ালখুশিমত জীবন কাটালেও শেষজীবনটা সুখে কাটেনি তাঁর।
ফরাসি সভ্যতা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে। সিমোন দ্য বোভোয়ার দ্বারাও ছিলেন অনুপ্রাণিত কিন্তু খুব বেশি কিন্তু পড়াশোনা ছিল না তাঁর৷ বর্ণাঢ্য জীবনে অতিথি হয়েছেন উর্দু ভাষার প্রখ্যাত নারী সাহিত্যিক ইসমত চুঘতাই এর। নাচ শিখেছেন বৈজয়ন্তীমালার কাছে।
রহস্যঘেরা জীবনে আড্ডার মধ্যমণি থাকলেও ১৪ বছরে বিয়ের এক অন্ধকার স্মৃতিও আছে জীবনে, যে বিয়ে টেকেনি ৫ মাস ও। স্বজ্ঞা ছিল রহস্যময় পর্যায়ের, ইএসপি বলে নিজে বিশ্বাস করতেন সেটাকে।
হাসনাত আবদুল হাই উপন্যাসটি লিখেছেন নন-লিনিয়ার ফর্মুলাতে। কখনো নভেরার বয়ানে, কখনো তৃতীয় পুরুষে নিজেকে রেখে, কখনো সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে নভেরার জীবনের একটা টুকরো ছবি আঁকতে পেরেছেন। পরিশিষ্টতে শহীদ মিনারের ইতিহাস, নভেরার বোন কুমুম হকের চিঠি, সাঈদ আহমদ এবং লেখকের নিজের কথা সংযোজিত হয়েছে।
উপন্যাসটিকে আমি অবশ্যপাঠ্য কাতারে ফেলব না৷ তবে বিস্মৃতপ্রায় এক নারী ভাস্করের জীবনগঠনপ্রণালীটা কিছুটা হলেও জানতে, আগ্রহী পাঠকেরা পড়তে পারেন উপন্যাসটি।
May 21, 2020
নভেরা আহমেদ-এই নামটার সাথে পরিচয় সাধারণ জ্ঞানের কল্যাণে। কেবল এক লাইনের একটা পরিচিতি। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর। অবশ্য তখনও বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। তাকে বোধ করি পুরো উপমহাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর বলা যায়৷
ঐ এক লাইনে কি আর সেই কিংবদন্তির পরিচয় মেলে! লাইব্রেরিতে অকারণ বই হাতাহাতি করতে যেয়ে একদিন চোখ আটকে গেলো একটা বইয়ে। প্রচ্ছদে একজন নারীর ছবি৷ মুখটা অল্প বাঁদিকে ঘুরানো। কপালে বেশ বড় একটা টিপ, মাথায় চূড়ো করে বাঁধা খোপা, বেশ কিছু চুল খোলা ছড়িয়ে আছে পিঠের উপর৷ গলায় বেশ বড় একটা মালা (বই পড়ে জানতে পারি এটা রুদ্রাক্ষের মালা) নামটা পড়ে চমকে উঠি! নভেরা আহমেদ! ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে বই লিখেছেন হাসনাত আবদুল হাই। নভেরা বইটা ঠিক কতোটুকু ফিকশন আর কতোটুকু নন-ফিকশন সে প্রশ্ন তোলা থাকুক। লেখক কখনও নভেরার জবানীতে, কখনও বা সাক্ষাৎকারের ভঙ্গীতে বা কখনও থার্ড পার্সনের ভঙ্গীতে পুরোটা বই লিখে গেছেন।
নভেরা আহমেদ অন্যতম রহস্যময় এক ব্যক্তিত্ব। সেই রহস্যের কিছুটা নিজের তৈরী আর কিছুটা বন্ধু বা পরিচিতদের বয়ানে তৈরী৷ এভাবেই ধীরে ধীরে কিংবদন্তীতুল্য এক মিথে পরিণত হয়েছেন তিনি৷ সময়ের চেয়ে যথেষ্ট এগিয়ে এই নারী অজানা কারণে ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি থাকা অবস্থাতেই পারি জমান দেশের বাইরে৷ প্রথমে লাহোর, সেখান থেকে লন্ডন অতঃপর প্যারিস। সেই যে গেলেন আর ফিরে তো এলেন-ই না, পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। কাজেই আপদমস্তক অপরিচিতা কিন্তু আধুনিক এই ভাস্করের কৈশোর কিংবা যৌবনকাল অর্থাৎ ভাস্কর হওয়াকালীন সময়টুকু বা ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকার মুহূর্তটুকু জানবার জন্য লেখক অবলম্বন করলেন ভিন্ন এক কৌশল। নভেরা আহমেদ যার যার সংস্পর্শে এসেছিলেন, খুঁজে খুঁজে তাদের বের করে সাক্ষাৎকার নিয়ে, বই-পত্র পড়ে টুকরো টুকরো ভাবে একটা চিত্র দাঁড় করিয়েছেন। আর সবার মুখে শোনা সেই এলোমেলো ছবিগুলোকে তার লেখকসুলভ কল্পনা মিশিয়ে জোড়া দিয়ে সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য এই কাহিনির৷ ভাস্কর নভেরা আহমেদের আত্মজীবনী, বোহেমিয়ান এক শিল্পীর গল্প৷
লেখক নভেরা সম্পর্কে জানবার জন্য যার কাছেই গেছেন, সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, একবার যে নভেরাকে দেখেছে তার পক্ষে সেই নারীকে ভোলা কঠিন। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, আধুনিকা, স্বাধীনচেতা, শিল্প-সংস্কৃতি সমঝদার, কিছুটা বাউন্ডুলে প্রকৃতির, একরোখা আর লোকের কথায় মোটেও পাত্তা না দেয়া এই নারী তখন শুধু বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান কেন, গোটা উপমহাদেশেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৬/১৭ বছর বয়সে একবার বিয়ে হয় তার, কারও কারও মতে বিয়ের পরদিনই বিবাহ বিচ্ছেদ করেন তিনি কারও মতে তার সংসারের মেয়াদ বড়জোর মাস ছয়েক। হঠাৎ ঝোঁক উঠল ভাস্কর্য নিয়ে পড়বার৷ ১৯৫০ এর দিকে একলা একটা বাঙালী মেয়ে ছুটলো লন্ডনে পড়াশোনার আকাঙ্ক্ষায়, তা-ও ভাস্কর্যের মতো বিষয় নিয়ে। বলাই বাহুল্য সেটা তখনকার জন্য খুবই বিরল একটা ঘটনা। পড়াশোনাকালে পরিচয় হয় শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে। চিনতে পেরেছেন তাকে? হ্যা, শহীদ মিনারের স্থপতি হিসেবে যাকে চিনি, সেই হামিদুর রহমান। দুই শিল্পীর মাঝে গড়ে উঠে গভীর সম্পর্ক। একসাথে নানান জায়গায় ঘুরতেও যান৷ পরিবার ছাড়াও অন্যান্যরা ধারণা করেন, এবার বোধহয় ঘর বাঁধবেন তারা। কিন্তু না, পড়াশোনা শেষে কাজে জড়িয়ে পড়েন তারা। পাবলিক লাইব্রেরির ম্যুরাল তৈরীসহ আরও অন্য কাজে৷ কথিত আছে, শহীদ মিনার নকশায় হামিদুর রহমানের সাথে সমান অবদান আছে তারও। কিন্তু কেন তার নাম আর উচ্চারিত হয় না-সে প্রশ্নের উত্তর রহস্যই রয়ে গেছে। এ ঘাট ও ঘাটের জল খেয়ে কিছুটা থিতু হলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। যেখানে গান-বাজনা, শিল্প সংস্কৃতির পুরো ব্যাপারটাই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে যথেষ্ট চুলকানি উদ্রেককারী বিষয়, সেই পশ্চিম পাকিস্তানেই আয়োজিত হলো তার প্রথম ভাষ্কর্য প্রদর্শনী। দিন যায়.. অজানা কারণে প্রচন্ড হাসিখুশি এই স্বতস্ফুর্ত মানুষটার মাঝে ভর করতে থাকে বিষণ্ণতা। লাহোর থেকে লন্ডন, অতঃপর প্যারিস। সেই প্যারিস, যেখানে সব শিল্পী, ভ্রমণপিয়াসীদের হাতছানি দিয়ে ডাকে আয়.. আয়.. আয়.. নভেরা অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব। প্রচন্ড রকমের ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী৷ আজ যারা নারীবাদ প্রচার করে, তার প্র্যাক্টিস তিনি করে গেছেন বহু বছর আগেই। তার কাজে, চিন্তায় সব মিলিয়ে ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। হয়তো সেসব কারণে ভুলও বুঝেছে অনেকে। মাসুদ রানার মতো তিনি সবাইকে টেনেছেন কিন্তু বাঁধনে জড়াননি।
হাসনাত আবদুল হাই প্রায় বিস্মৃতির অতল থেকে টেনে এনেছেন অসম্ভব গুণী এই শিল্পীটিকে৷ পুরোপুরি না হোক, মোটামুটি হলেও ব্যক্তি নভেরা বা ভাষ্কর নভেরার একটা চিত্র পাই এই বই থেকে। অর্ধেক মানবী আর অর্ধেক কল্পনার ফসল-'নভেরা'
বই-নভেরা
লেখক-হাসনাত আবদুল হাই
#happy_reading
#বই_হোক_অক্সিজেন
ঐ এক লাইনে কি আর সেই কিংবদন্তির পরিচয় মেলে! লাইব্রেরিতে অকারণ বই হাতাহাতি করতে যেয়ে একদিন চোখ আটকে গেলো একটা বইয়ে। প্রচ্ছদে একজন নারীর ছবি৷ মুখটা অল্প বাঁদিকে ঘুরানো। কপালে বেশ বড় একটা টিপ, মাথায় চূড়ো করে বাঁধা খোপা, বেশ কিছু চুল খোলা ছড়িয়ে আছে পিঠের উপর৷ গলায় বেশ বড় একটা মালা (বই পড়ে জানতে পারি এটা রুদ্রাক্ষের মালা) নামটা পড়ে চমকে উঠি! নভেরা আহমেদ! ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে বই লিখেছেন হাসনাত আবদুল হাই। নভেরা বইটা ঠিক কতোটুকু ফিকশন আর কতোটুকু নন-ফিকশন সে প্রশ্ন তোলা থাকুক। লেখক কখনও নভেরার জবানীতে, কখনও বা সাক্ষাৎকারের ভঙ্গীতে বা কখনও থার্ড পার্সনের ভঙ্গীতে পুরোটা বই লিখে গেছেন।
নভেরা আহমেদ অন্যতম রহস্যময় এক ব্যক্তিত্ব। সেই রহস্যের কিছুটা নিজের তৈরী আর কিছুটা বন্ধু বা পরিচিতদের বয়ানে তৈরী৷ এভাবেই ধীরে ধীরে কিংবদন্তীতুল্য এক মিথে পরিণত হয়েছেন তিনি৷ সময়ের চেয়ে যথেষ্ট এগিয়ে এই নারী অজানা কারণে ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি থাকা অবস্থাতেই পারি জমান দেশের বাইরে৷ প্রথমে লাহোর, সেখান থেকে লন্ডন অতঃপর প্যারিস। সেই যে গেলেন আর ফিরে তো এলেন-ই না, পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। কাজেই আপদমস্তক অপরিচিতা কিন্তু আধুনিক এই ভাস্করের কৈশোর কিংবা যৌবনকাল অর্থাৎ ভাস্কর হওয়াকালীন সময়টুকু বা ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকার মুহূর্তটুকু জানবার জন্য লেখক অবলম্বন করলেন ভিন্ন এক কৌশল। নভেরা আহমেদ যার যার সংস্পর্শে এসেছিলেন, খুঁজে খুঁজে তাদের বের করে সাক্ষাৎকার নিয়ে, বই-পত্র পড়ে টুকরো টুকরো ভাবে একটা চিত্র দাঁড় করিয়েছেন। আর সবার মুখে শোনা সেই এলোমেলো ছবিগুলোকে তার লেখকসুলভ কল্পনা মিশিয়ে জোড়া দিয়ে সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য এই কাহিনির৷ ভাস্কর নভেরা আহমেদের আত্মজীবনী, বোহেমিয়ান এক শিল্পীর গল্প৷
লেখক নভেরা সম্পর্কে জানবার জন্য যার কাছেই গেছেন, সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, একবার যে নভেরাকে দেখেছে তার পক্ষে সেই নারীকে ভোলা কঠিন। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, আধুনিকা, স্বাধীনচেতা, শিল্প-সংস্কৃতি সমঝদার, কিছুটা বাউন্ডুলে প্রকৃতির, একরোখা আর লোকের কথায় মোটেও পাত্তা না দেয়া এই নারী তখন শুধু বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান কেন, গোটা উপমহাদেশেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৬/১৭ বছর বয়সে একবার বিয়ে হয় তার, কারও কারও মতে বিয়ের পরদিনই বিবাহ বিচ্ছেদ করেন তিনি কারও মতে তার সংসারের মেয়াদ বড়জোর মাস ছয়েক। হঠাৎ ঝোঁক উঠল ভাস্কর্য নিয়ে পড়বার৷ ১৯৫০ এর দিকে একলা একটা বাঙালী মেয়ে ছুটলো লন্ডনে পড়াশোনার আকাঙ্ক্ষায়, তা-ও ভাস্কর্যের মতো বিষয় নিয়ে। বলাই বাহুল্য সেটা তখনকার জন্য খুবই বিরল একটা ঘটনা। পড়াশোনাকালে পরিচয় হয় শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে। চিনতে পেরেছেন তাকে? হ্যা, শহীদ মিনারের স্থপতি হিসেবে যাকে চিনি, সেই হামিদুর রহমান। দুই শিল্পীর মাঝে গড়ে উঠে গভীর সম্পর্ক। একসাথে নানান জায়গায় ঘুরতেও যান৷ পরিবার ছাড়াও অন্যান্যরা ধারণা করেন, এবার বোধহয় ঘর বাঁধবেন তারা। কিন্তু না, পড়াশোনা শেষে কাজে জড়িয়ে পড়েন তারা। পাবলিক লাইব্রেরির ম্যুরাল তৈরীসহ আরও অন্য কাজে৷ কথিত আছে, শহীদ মিনার নকশায় হামিদুর রহমানের সাথে সমান অবদান আছে তারও। কিন্তু কেন তার নাম আর উচ্চারিত হয় না-সে প্রশ্নের উত্তর রহস্যই রয়ে গেছে। এ ঘাট ও ঘাটের জল খেয়ে কিছুটা থিতু হলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। যেখানে গান-বাজনা, শিল্প সংস্কৃতির পুরো ব্যাপারটাই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে যথেষ্ট চুলকানি উদ্রেককারী বিষয়, সেই পশ্চিম পাকিস্তানেই আয়োজিত হলো তার প্রথম ভাষ্কর্য প্রদর্শনী। দিন যায়.. অজানা কারণে প্রচন্ড হাসিখুশি এই স্বতস্ফুর্ত মানুষটার মাঝে ভর করতে থাকে বিষণ্ণতা। লাহোর থেকে লন্ডন, অতঃপর প্যারিস। সেই প্যারিস, যেখানে সব শিল্পী, ভ্রমণপিয়াসীদের হাতছানি দিয়ে ডাকে আয়.. আয়.. আয়.. নভেরা অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব। প্রচন্ড রকমের ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী৷ আজ যারা নারীবাদ প্রচার করে, তার প্র্যাক্টিস তিনি করে গেছেন বহু বছর আগেই। তার কাজে, চিন্তায় সব মিলিয়ে ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। হয়তো সেসব কারণে ভুলও বুঝেছে অনেকে। মাসুদ রানার মতো তিনি সবাইকে টেনেছেন কিন্তু বাঁধনে জড়াননি।
হাসনাত আবদুল হাই প্রায় বিস্মৃতির অতল থেকে টেনে এনেছেন অসম্ভব গুণী এই শিল্পীটিকে৷ পুরোপুরি না হোক, মোটামুটি হলেও ব্যক্তি নভেরা বা ভাষ্কর নভেরার একটা চিত্র পাই এই বই থেকে। অর্ধেক মানবী আর অর্ধেক কল্পনার ফসল-'নভেরা'
বই-নভেরা
লেখক-হাসনাত আবদুল হাই
#happy_reading
#বই_হোক_অক্সিজেন
December 17, 2020
নভেরা আহমেদ নামে একজন ভাস্কর আছেন(সাধারন জ্ঞানের বই থেকে প্রথম শুনি ) এবং টুকটাক জানার পর মনে মনে একটা থিওরি এসে পড়ে যে বাংলাদেশের শহীদ মিনারের নকশা মূলত নভেরা আহমেদের করা এবং এ নিয়ে কোন একটা রহস্য আছে এবং অভিমান করে দেশ ত্যাগের সাথে এই ঘটনার একটা সংশ্লিটতা আছে। এরপর থেকে উনাকে জানার একটা আগ্রহ হয়েছিল।
বইটা বেশ আগ্রহ ভরে নিয়েছিলাম- বুঝতে পারিনি এইটা কি উপন্যাস নাকি বাস্তব গল্প, লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী এইটা জীবনমুখী উপন্যাস। কিনত পড়তে পড়তে বাস্তব ই মনে হচ্ছিল। পরিশিষ্টে দেখলাম বইটি প্রকাশের পর নভেরা আহমেদের বড় বোনও অনেকগুলো আপত্তি তুলে ধরেছেন কোন এক পত্রিকায়, লেখকও প্রতি-উত্তর দিয়েছেন। বই এর গঠন আমার জন্য খুবই বিরক্তিকর লেগেছে, কোথাও ফার্স্ট পারসন, কোথায় সেকেন্ড পার্সন হিসেবে বর্ণনা যা পাঠের মসৃণতাকে বিভ্রান্ত করেছে। খাপছাড়া এক ধরনের বই পড়লাম। লেখন পদ্ধতি নিয়েও অনেক আলাপ হয়েছে বইটি প্রকাশের পর তা বুঝতে পারলাম বইয়ের শেষে।
বইটা বেশ আগ্রহ ভরে নিয়েছিলাম- বুঝতে পারিনি এইটা কি উপন্যাস নাকি বাস্তব গল্প, লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী এইটা জীবনমুখী উপন্যাস। কিনত পড়তে পড়তে বাস্তব ই মনে হচ্ছিল। পরিশিষ্টে দেখলাম বইটি প্রকাশের পর নভেরা আহমেদের বড় বোনও অনেকগুলো আপত্তি তুলে ধরেছেন কোন এক পত্রিকায়, লেখকও প্রতি-উত্তর দিয়েছেন। বই এর গঠন আমার জন্য খুবই বিরক্তিকর লেগেছে, কোথাও ফার্স্ট পারসন, কোথায় সেকেন্ড পার্সন হিসেবে বর্ণনা যা পাঠের মসৃণতাকে বিভ্রান্ত করেছে। খাপছাড়া এক ধরনের বই পড়লাম। লেখন পদ্ধতি নিয়েও অনেক আলাপ হয়েছে বইটি প্রকাশের পর তা বুঝতে পারলাম বইয়ের শেষে।
September 17, 2020
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা স্থপতি নভেরা আহমেদকে নিয়ে হাসনাত আব্দুল হাই'য়ের এক্সপেরিমেন্টাল একটা কাজ "নভেরা"। প্রচলিত আত্মজীবনীর ধাঁচ থেকে বেরিয়ে অন্য একটা ঢংয়ে নভেরার গল্পটাই বলেছেন লেখক। কিন্তু নানান কারণে গল্প বলার ধরনটা খুব একটা স্পর্শ করতে পারলো না। উপন্যাসের চেয়ে "সাপ্লিমেন্টারি বই" হিসেবেই যেন বেশি মানানসই।
April 25, 2022
হাসনাত আবদুল হাই জনপ্রিয় একজন লেখক; অনেক বিষয়ের উপরই তিনি বাংলা ভাষায় বই লিখেছেন, অর্জন করেছেন বহু সাহিত্য পুরষ্কার। নভেরা আহমেদের জীবনীকে অবলম্বন করে তাঁর একটা লেখা লিখবার চেষ্টা সেজন্য অবশ্যই সাধুবাদ পাবার দাবিদার। কিন্তু মাঝে মাঝে বইটা পড়তে একটা স্ক্রিনপ্লের মত, কখনো কখনো একটা আত্মজীবনী, আবার বাকিটা সময় অগোছালো একটা উপন্যাসের মত লেগেছে। এই অগোছালো ভাবটা পুরো বইটা জুড়েই ছিল, যেটা আমাকে এতোটাই বিরক্ত করেছে যে ৯০ পাতা পর্যন্ত পড়বার পর বইটার বাকিটুকু পড়ে সময় নষ্ট করার আর ইচ্ছে হয়নি- শুধু চোখ বুলিয়ে গিয়েছি। কেন এরকম অগোছালো করে লেখা, তা বুঝবার জন্য লেখকের কাছেই যাই। বইটির শেষাংশে আবদুল হাই লিখেছেন,
"মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির স্মৃতিচারণা থেকে 'নভেরা' আহমেদ সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি, তা তাঁর জীবনের অনেক অধ্যায় সম্পর্কেই আমাকে অজ্ঞ রেখেছে। এখানে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে, হয়ত স্বাভাবিকভাবে যতটুকু ব্যবহৃত হতো তাঁর চেয়ে বেশিই কল্পনা এসেছে। এর ফলে যদি বাস্তবতা থেকে বিচ্যুতি ঘটে থাকে, তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে পারি এটা তো উপন্যাস, জীবনী বা ইতিহাস নয়, কথাসাহিত্যিকের এটুকু স্বাধীনতা আছেই।... 'নভেরা' উপন্যাস লিখতে গিয়ে এই মনোভাব কাজ করেছে, আমি প্রধান চরিত্রের যে ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছি একজন স্বাধীনচেতা, সাহসিকা, আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্না, আপসহীন শিল্পী হিসেবে, তাঁর সমর্থনে ঘটনাগুলি সাজিয়েছি এবং পাত্রপাত্রীদের অবতারণা করেছি। যদি আরও তথ্য পাওয়া যেত, যা দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে পাইনি, তাহলে উপন্যাসটি আরও ঘটনাবহুল হতো, আরও কিছু চরিত্রের ভূমিকা থাকতো অথবা যেসব চরিত্র এসেছে, তারা আরো মেদমাংসে পরিণত হতে পারতো। নভেরা আহমেদ সম্পর্কে দেশের মানুষের নির্লিপ্তি, কতৃপক্ষের ঔদাসীন্য বেশ মোটা দাগের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ানোর ফলে তাঁর ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে তথ্য-সংকট তো বটেই, সেই সঙ্গে তাঁর শিল্পকর্মের সহজলভ্যতাও লেখার জন্য বিশেষ অন্তরায়। "নভেরা" প্রকাশের পরও পরিস্থিতির তেমন হেরফের হয়েছে বলে মনে হয়না।"
আরেকটা বিরক্তিকর ব্যাপার হলো, নভেরার বিয়ে কতদিন টিকেছে কি টিকেনি, কোন ছেলের সাথে মিশল কি মেশেনি, লিভ-টুগেদার করার ব্যাপারে আত্মীয়-স্বজনেরা কি ভেবেছে, পাড়ার লোকে কি বলেছে- বইটি জুড়ে এসব অহেতুক মশলার ছড়াছড়ি ছিল, যা আমাকে একদমই আকর্ষণ করতে পারেনি। এখানে কতটুকু ফ্যাক্ট, কতটুকু লেখকের কল্পনাপ্রসূত ফিকশন- তা নির্ণয় করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এজন্যই পুরো বইটা আরো বেশী কনফিউজিং লেগেছে। নভেরাকে নিয়ে দেশ ও দশের নির্লিপ্তিটাকে দূর করবার উদ্দেশ্য যদি সত্যি থেকে থাকে, তবে বইটাকে কি অন্য কোনোভাবে সাজানো যেতনা?
স্কাল্পট্রেস নভেরা আহমেদের কাজের ইন্সপিরেশনের উৎস নিয়ে, তার ছেলেবেলাটা তার চরিত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে, তার কাজ বাংলার সর্বস্তরের জনতাকে সেইযুগে কতটুকু টাচ করেছে কি করেনি, এদেশকে নিয়ে তার কোনো স্বপ্ন বা কোনো ক্ষোভ ছিল কিনা, সেইটে আমার জানার প্রবল ইচ্ছে ছিল আমার। ইচ্ছেটি হয়ত পূরণ হবার আর কোনো উপায় রইল না, কেননা নভেরা কোনো আত্মজীবনী লিখে যান নি। কিন্তু এসবের বদলে বইটি পড়ে নভেরা আহমেদ সম্পর্কে কতগুলো assumption কেবল দাঁড় করাতে পারলামঃ
1. নভেরা ঠিক ডাউন-টু-আর্থ টাইপের ব্যক্তিত্ব হয়ত ছিলেন না। উড়ু উড়ু একটা উদ্দেশ্যহীন, রেস্পন্সিবিলিটিহীন একটা জীবন যেন ছিল তার। I didn't quite understand what was her cause to fight for, to live for. Artists don't just exist- they live for something meaningful. নভেরা তার জীবনে অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন কিসে, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
2. নভেরাকে "নভেরা" করে তুলেছে কোন দিকটা, তাও ঠিক পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। নভেরার চলাফেরা পিকিউলিয়ার ফ্যাশন সেন্সের বাইরেও তার ব্যক্তিত্বের নিজস্ব একটা গভীরতা আছে। সেই গভীরতাটুকু ঠিক ঠাউরে উঠতে পারলাম না। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, She was so busy proving to others that she was "not like other girls", that she didn't quite have the time to formulate her own unique identity. হতে পারে, বয়স মাত্র ১৬-১৮ ছিল তখন তার, ওই বয়সের একটা মেয়ে কতটুকুই বা জীবন সম্পর্কে ভাবতে ও বুঝতে শিখেছে? বইটি পড়ে মনে হয়েছে নভেরার বেড়ে উঠার সময়টাতে তাকে দারিদ্র্যের করাঘাতে পড়তে হয়নি; সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতিমনা এমন একটি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা যেখানে হয়ত তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অন্যান্য আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা থেকে বেশ শেল্টারড ছিলেন। ফ্রান্সে বেড়িয়ে, কতক সিমন দ্য বিভুয়া পড়ে এবং সেইকালের বোহেমিয়ান ফ্রেঞ্চ তরুণদের সাথে উঠবস করে বাস্তবতা শেখা অসম্ভব। ফ্রেঞ্চ সংস্কৃতির অনেককিছুই নভেরা খুব পছন্দ করতেন- ফ্রেঞ্চ স্ট্রিটফ্যাশন, ফ্রেঞ্চ ফেমিনিস্ট লিটারেচার ইত্যাদি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল- কিন্তু কেন পছন্দ ছিল, তা ঠিক কানেক্ট করতে পারিনি। আর কখনো পারবও বলে মনে হয়না, কেননা নভেরা কোনো আত্মজীবনী লিখে যান নি।
3. বইটির ভাষ্যমতে, নারী স্বাধীনতা নিয়ে সচেতন নভেরাই কিন্তু তার জীবনের অনেকটা সময় পুরুষদের উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল থেকেছেন, এর-ওর থেকে চেয়েচিন্তে নির্বিকার পার করে দিয়েছেন। আর্থিক অনটনে তাকে ছোটবেলা থেকে সেভাবে কখনো পড়তে হয়নি, বড়কালে পড়লেও খুব দ্রুতই কোনো না কোনোভাবে কারোর উপর নির্ভর করে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন- যেটাকে অনেকটা পরজীবীর মত বেঁচে থাকা বলা যায়, যা তার নিজের নারী স্বাধীনতার আদর্শের ঠিক বিপরীত। ব্যাপারটা আমার কাছে ironic মনে হয়েছে।
4. রিলেশনশীপে বাউন্ডারি থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। শুরু থেকেই পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, নভেরা হামিদুলের প্রতি সেরকম আবেগ-অনুভূতি কাজ করত না। কিন্তু তারপরও বছরের পর বছর লোকটাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে গেলেন, যেটা খুব সহজেই এড়ানো যেত যদি প্রথমেই তিনি তার উদ্দেশ্যটা খোলাসা করে নিতেন।
এগুলো স্রেফ assumption হিসেবেই রয়ে যাবে বাকিটা জীবন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, নভেরা নিজেও হয়ত চান নি তাঁকে নিয়ে কোনো ফ্যাকচুয়াল জীবনী লেখা হোক। আলোআঁধারির আড়ালে প্রাইভেট একটা জীবন কাটাবার ইচ্ছা থেকেই হয়ত- কে জানে? বইটার নাম রাখা উচিৎ ছিলঃ "হয়ত নভেরা"
"মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির স্মৃতিচারণা থেকে 'নভেরা' আহমেদ সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি, তা তাঁর জীবনের অনেক অধ্যায় সম্পর্কেই আমাকে অজ্ঞ রেখেছে। এখানে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে, হয়ত স্বাভাবিকভাবে যতটুকু ব্যবহৃত হতো তাঁর চেয়ে বেশিই কল্পনা এসেছে। এর ফলে যদি বাস্তবতা থেকে বিচ্যুতি ঘটে থাকে, তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে পারি এটা তো উপন্যাস, জীবনী বা ইতিহাস নয়, কথাসাহিত্যিকের এটুকু স্বাধীনতা আছেই।... 'নভেরা' উপন্যাস লিখতে গিয়ে এই মনোভাব কাজ করেছে, আমি প্রধান চরিত্রের যে ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছি একজন স্বাধীনচেতা, সাহসিকা, আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্না, আপসহীন শিল্পী হিসেবে, তাঁর সমর্থনে ঘটনাগুলি সাজিয়েছি এবং পাত্রপাত্রীদের অবতারণা করেছি। যদি আরও তথ্য পাওয়া যেত, যা দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে পাইনি, তাহলে উপন্যাসটি আরও ঘটনাবহুল হতো, আরও কিছু চরিত্রের ভূমিকা থাকতো অথবা যেসব চরিত্র এসেছে, তারা আরো মেদমাংসে পরিণত হতে পারতো। নভেরা আহমেদ সম্পর্কে দেশের মানুষের নির্লিপ্তি, কতৃপক্ষের ঔদাসীন্য বেশ মোটা দাগের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ানোর ফলে তাঁর ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে তথ্য-সংকট তো বটেই, সেই সঙ্গে তাঁর শিল্পকর্মের সহজলভ্যতাও লেখার জন্য বিশেষ অন্তরায়। "নভেরা" প্রকাশের পরও পরিস্থিতির তেমন হেরফের হয়েছে বলে মনে হয়না।"
আরেকটা বিরক্তিকর ব্যাপার হলো, নভেরার বিয়ে কতদিন টিকেছে কি টিকেনি, কোন ছেলের সাথে মিশল কি মেশেনি, লিভ-টুগেদার করার ব্যাপারে আত্মীয়-স্বজনেরা কি ভেবেছে, পাড়ার লোকে কি বলেছে- বইটি জুড়ে এসব অহেতুক মশলার ছড়াছড়ি ছিল, যা আমাকে একদমই আকর্ষণ করতে পারেনি। এখানে কতটুকু ফ্যাক্ট, কতটুকু লেখকের কল্পনাপ্রসূত ফিকশন- তা নির্ণয় করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এজন্যই পুরো বইটা আরো বেশী কনফিউজিং লেগেছে। নভেরাকে নিয়ে দেশ ও দশের নির্লিপ্তিটাকে দূর করবার উদ্দেশ্য যদি সত্যি থেকে থাকে, তবে বইটাকে কি অন্য কোনোভাবে সাজানো যেতনা?
স্কাল্পট্রেস নভেরা আহমেদের কাজের ইন্সপিরেশনের উৎস নিয়ে, তার ছেলেবেলাটা তার চরিত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে, তার কাজ বাংলার সর্বস্তরের জনতাকে সেইযুগে কতটুকু টাচ করেছে কি করেনি, এদেশকে নিয়ে তার কোনো স্বপ্ন বা কোনো ক্ষোভ ছিল কিনা, সেইটে আমার জানার প্রবল ইচ্ছে ছিল আমার। ইচ্ছেটি হয়ত পূরণ হবার আর কোনো উপায় রইল না, কেননা নভেরা কোনো আত্মজীবনী লিখে যান নি। কিন্তু এসবের বদলে বইটি পড়ে নভেরা আহমেদ সম্পর্কে কতগুলো assumption কেবল দাঁড় করাতে পারলামঃ
1. নভেরা ঠিক ডাউন-টু-আর্থ টাইপের ব্যক্তিত্ব হয়ত ছিলেন না। উড়ু উড়ু একটা উদ্দেশ্যহীন, রেস্পন্সিবিলিটিহীন একটা জীবন যেন ছিল তার। I didn't quite understand what was her cause to fight for, to live for. Artists don't just exist- they live for something meaningful. নভেরা তার জীবনে অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন কিসে, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
2. নভেরাকে "নভেরা" করে তুলেছে কোন দিকটা, তাও ঠিক পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। নভেরার চলাফেরা পিকিউলিয়ার ফ্যাশন সেন্সের বাইরেও তার ব্যক্তিত্বের নিজস্ব একটা গভীরতা আছে। সেই গভীরতাটুকু ঠিক ঠাউরে উঠতে পারলাম না। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, She was so busy proving to others that she was "not like other girls", that she didn't quite have the time to formulate her own unique identity. হতে পারে, বয়স মাত্র ১৬-১৮ ছিল তখন তার, ওই বয়সের একটা মেয়ে কতটুকুই বা জীবন সম্পর্কে ভাবতে ও বুঝতে শিখেছে? বইটি পড়ে মনে হয়েছে নভেরার বেড়ে উঠার সময়টাতে তাকে দারিদ্র্যের করাঘাতে পড়তে হয়নি; সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতিমনা এমন একটি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা যেখানে হয়ত তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অন্যান্য আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা থেকে বেশ শেল্টারড ছিলেন। ফ্রান্সে বেড়িয়ে, কতক সিমন দ্য বিভুয়া পড়ে এবং সেইকালের বোহেমিয়ান ফ্রেঞ্চ তরুণদের সাথে উঠবস করে বাস্তবতা শেখা অসম্ভব। ফ্রেঞ্চ সংস্কৃতির অনেককিছুই নভেরা খুব পছন্দ করতেন- ফ্রেঞ্চ স্ট্রিটফ্যাশন, ফ্রেঞ্চ ফেমিনিস্ট লিটারেচার ইত্যাদি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল- কিন্তু কেন পছন্দ ছিল, তা ঠিক কানেক্ট করতে পারিনি। আর কখনো পারবও বলে মনে হয়না, কেননা নভেরা কোনো আত্মজীবনী লিখে যান নি।
3. বইটির ভাষ্যমতে, নারী স্বাধীনতা নিয়ে সচেতন নভেরাই কিন্তু তার জীবনের অনেকটা সময় পুরুষদের উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল থেকেছেন, এর-ওর থেকে চেয়েচিন্তে নির্বিকার পার করে দিয়েছেন। আর্থিক অনটনে তাকে ছোটবেলা থেকে সেভাবে কখনো পড়তে হয়নি, বড়কালে পড়লেও খুব দ্রুতই কোনো না কোনোভাবে কারোর উপর নির্ভর করে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন- যেটাকে অনেকটা পরজীবীর মত বেঁচে থাকা বলা যায়, যা তার নিজের নারী স্বাধীনতার আদর্শের ঠিক বিপরীত। ব্যাপারটা আমার কাছে ironic মনে হয়েছে।
4. রিলেশনশীপে বাউন্ডারি থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। শুরু থেকেই পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, নভেরা হামিদুলের প্রতি সেরকম আবেগ-অনুভূতি কাজ করত না। কিন্তু তারপরও বছরের পর বছর লোকটাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে গেলেন, যেটা খুব সহজেই এড়ানো যেত যদি প্রথমেই তিনি তার উদ্দেশ্যটা খোলাসা করে নিতেন।
এগুলো স্রেফ assumption হিসেবেই রয়ে যাবে বাকিটা জীবন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, নভেরা নিজেও হয়ত চান নি তাঁকে নিয়ে কোনো ফ্যাকচুয়াল জীবনী লেখা হোক। আলোআঁধারির আড়ালে প্রাইভেট একটা জীবন কাটাবার ইচ্ছা থেকেই হয়ত- কে জানে? বইটার নাম রাখা উচিৎ ছিলঃ "হয়ত নভেরা"
This entire review has been hidden because of spoilers.
April 8, 2020
নভেরা - বাংলাদেশের ১ম মহিলা ভাস্কর, আধুনিক, স্মার্ট, স্বাধীনচেতা। এমন একজনের জীবনকাহিনীর সাথে পরিচিত হতে পারে ভালো লেগেছে। উপন্যাসে অবশ্য নভেরার জীবনোপলব্ধি কিংবা তার শিল্প-ভাবনাগুলো পরিমাণে বড্ড কম। বরং তার মেক-আপ আর রুদ্রাক্ষের মালার কথা এসেছে বারংবার। যে নভেরা কখনও “লোকে-কী-বলে”-কে পাত্তা দেয়নি, তার গল্পই কী না বলা হয়েছে “লোকে-কী-বলে” ছাঁচে! এটাই বোধ হয় এ বইয়ের সবচেয়ে বড় পরিহাস।
April 27, 2021
ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি আমাদের শহীদ মিনারের স্থপতি হামিদুর রহমান। কিন্তু এই শহীদ মিনারের ডিজাইন করেছিলেন হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদ দুজন মিলে, কিন্তু নভেরা আহমেদের কথা কোথাও নেই। ফেসবুকে নভেরা আহমেদকে নিয়ে একটা লেখা পড়ে কৌতুহল থেকেই বইটা পড়া। তিনি সম্ভবত এই উপমহাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর ছিলেন। হাসনাত আব্দুল হাই এর লেখা বই পড়ে নভেরা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া গেলেও, তার জীবন যাপন এবং চালচলন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। তার পরিচিতদের মতে তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, সংস্কৃতিমনা এবং ভীষণ মেধাবী, দশ জনের মধ্যে চোখে পড়ার মতো। তবে জীবনের শেষ সময়টা তিনি অনেকটা স্বেচ্ছায় নির্বাসনের মতো করে কাটিয়েছেন নিজের স্বপ্নের শহর প্যারিসে। বইটা আহামরি কিছু মনে হয়নি আমার কাছে, তবে যারা নভেরা আহমেদের সম্পর্কে জানতে চান তারা বইটা পড়ে দেখতে পারেন।
Read
December 2, 2019শহীদ মিনারের ভাস্কর কে – ছোটবেলা থেকে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে হামিদুর রহমানেরই নাম জানি। কিন্তু যদি বলি শুধু হামিদুর রহমান না, আরও একজন তাঁর সাথে ছিল তাহলে হয়তো প্রথমে থমকে যেতে হয়। কিন্তু এটাই সত্য, সেদিন হামিদুর রহমানের সাথে যিনি যৌথভাবে শহীদ মিনার নির্মাণের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি হলেন নভেরা আহমেদ। কিন্তু তাঁর নাম আমরা শুনি না কেন? এইতো সেদিন (২০১৫) মারা গেলেও কেন তাঁর সম্পর্কে আমরা এত কম জানি? কেমন করে তিনি যুক্ত হলেন ভাস্কর্যের মতো এত ভিন্নধরনের বিষয়ের সাথে? প্রথম মহিলা ভাস্কর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দিনগুলো কেমন ছিলো? পাকিস্তানের মতো এত রক্ষণশীল সমাজে কেমন করে তিনি সামনে আসলেন? যদি আপনার মনে এই প্রশ্নগুলো এসে থাকে তাহলে আপনার প্রশ্নের জবাব দিতেই হাজির হয়েছেন হাসনাত আবদুল হাই তাঁর ‘ নভেরা ‘ বইটি নিয়ে।
বইটাকে কোনো একটা ক্যাটাগরিতে ফেলা মুশকিল। এটা কি জীবনী নাকি উপন্যাস সেটা নিয়েও একটা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু সে যাই হোক, বইটাকে যে এক হারিয়ে যাওয়া এক অসাধারণ শিল্পীকে, জেদি সংবেদী তরুণীকে বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে এনেছে সেটা বলাই বাহুল্য। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এক যন্ত্রণা জর্জর শিল্পীর আর্তিকে তিনি তুলে ধরেছেন, অসাধারণ চরিত্রচিত্রণ কুশলতায় হারিয়ে যাওয়া নভেরাকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
নভেরার কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসা থেকে শুরু করে, তাঁর শিল্পীসত্ত্বার পরিচয়, উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে লন্ডন গমন, তারপর কাজের জন্য করাচি, নাচের জন্য বম্বে , ব্যাংকক গমন হয়ে বইটা শেষ হয়েছে ফ্রান্সে স্বেচ্ছা নির্বাসন নেওয়ার ঘটনায়। আর এই মাঝেই এক সাহসী, সংবেদনশীল, বোহেমিয়ান এক নভেরাকে পাই আমরা যিনি যেমন একদিকে সেই পঞ্চাশের দশকেই মঞ্চে নজরুলগীতিকে ফিউশন করে তার সাথে নেচে সবাইকে অবাক করেন আবার তিনি রক্ষণশীল পাকিস্তানে সরকারি পর্যায়ে ভাস্কর্যকে মূলধারায় নিয়ে আসেন সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আবার কখনো বা যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে যুদ্ধরত ভিয়েতনাম যান অসীম সাহসের সাথে। তিনিই পারেন সেই সময়েই বন্ধুকে লিঙ্গভেদে বিচার করতে, তিনিই মুখের উপর না বলতে পারেন সবাইকে। তিনি যে তাঁর যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর চলনে, কথায়, চিন্তায়, কাজে।
আজীবন তিনি নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছিলেন এক রহস্যের জালে, সবাইকে এক অমোঘ আকর্ষণে কাছে টানলেও কাউকেই জড়িয়ে ফেলেননি নিজের সাথে। নিজের কৈশোরের বিয়ের যন্ত্রণাকে ভুলতেই হয়তো আর কখনো বিয়ে করেননি তিনি, তাইতো ভীষণভাবে বন্ধু হয়েও হামিদুর রহমান বা এস. এম. আলী বা পোলানস্কিরা হতাশ হয়েছেন তাঁর ব্যবহারে। আবার শিল্পের শহর ফ্রান্সে নির্বাসনে গিয়েও নিজেকে আরেক রহস্যে আবৃত করেছেন, কেউ আর সেভাবে খুঁজে পায়নি তাঁকে। আসলেই এক রহস্যমানবী তিনি!
তো আসুন জানি সেই রহস্যময়ীকে!
বইটাকে কোনো একটা ক্যাটাগরিতে ফেলা মুশকিল। এটা কি জীবনী নাকি উপন্যাস সেটা নিয়েও একটা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু সে যাই হোক, বইটাকে যে এক হারিয়ে যাওয়া এক অসাধারণ শিল্পীকে, জেদি সংবেদী তরুণীকে বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে এনেছে সেটা বলাই বাহুল্য। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এক যন্ত্রণা জর্জর শিল্পীর আর্তিকে তিনি তুলে ধরেছেন, অসাধারণ চরিত্রচিত্রণ কুশলতায় হারিয়ে যাওয়া নভেরাকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
নভেরার কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসা থেকে শুরু করে, তাঁর শিল্পীসত্ত্বার পরিচয়, উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণে লন্ডন গমন, তারপর কাজের জন্য করাচি, নাচের জন্য বম্বে , ব্যাংকক গমন হয়ে বইটা শেষ হয়েছে ফ্রান্সে স্বেচ্ছা নির্বাসন নেওয়ার ঘটনায়। আর এই মাঝেই এক সাহসী, সংবেদনশীল, বোহেমিয়ান এক নভেরাকে পাই আমরা যিনি যেমন একদিকে সেই পঞ্চাশের দশকেই মঞ্চে নজরুলগীতিকে ফিউশন করে তার সাথে নেচে সবাইকে অবাক করেন আবার তিনি রক্ষণশীল পাকিস্তানে সরকারি পর্যায়ে ভাস্কর্যকে মূলধারায় নিয়ে আসেন সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আবার কখনো বা যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝতে যুদ্ধরত ভিয়েতনাম যান অসীম সাহসের সাথে। তিনিই পারেন সেই সময়েই বন্ধুকে লিঙ্গভেদে বিচার করতে, তিনিই মুখের উপর না বলতে পারেন সবাইকে। তিনি যে তাঁর যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর চলনে, কথায়, চিন্তায়, কাজে।
আজীবন তিনি নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছিলেন এক রহস্যের জালে, সবাইকে এক অমোঘ আকর্ষণে কাছে টানলেও কাউকেই জড়িয়ে ফেলেননি নিজের সাথে। নিজের কৈশোরের বিয়ের যন্ত্রণাকে ভুলতেই হয়তো আর কখনো বিয়ে করেননি তিনি, তাইতো ভীষণভাবে বন্ধু হয়েও হামিদুর রহমান বা এস. এম. আলী বা পোলানস্কিরা হতাশ হয়েছেন তাঁর ব্যবহারে। আবার শিল্পের শহর ফ্রান্সে নির্বাসনে গিয়েও নিজেকে আরেক রহস্যে আবৃত করেছেন, কেউ আর সেভাবে খুঁজে পায়নি তাঁকে। আসলেই এক রহস্যমানবী তিনি!
তো আসুন জানি সেই রহস্যময়ীকে!
June 12, 2024
জীবনীভিত্তিক এই উপন্যাস পড়ে একাধারে কয়েকটা অনুভূতি কাজ করেছে, তবে সবচেয়ে তীব্রভাবে মনে যে প্রশ্ন এসেছে তা হচ্ছে 'কেন?'
নভেরা প্রথম বাঙালি মহিলা ভাস্কর, নভেরা বহিমিয়ান, নভেরা সময়ের চেয়ে অগ্রগামী। নভেরা স্বপ্ন দেখেছিল গতানুগতিক ধারার বাইরে যেয়ে, নভেরা গড়তে চেয়েছিল বৃহৎ কিছু; তার ভষায়, 'লার্জার দ্যান লাইফ'। তবে কেন এই প্রতিভা আজ "ফেড আউট"? নভেরার শ'খানেক ভাস্কর্যের মাঝে অর্ধেকেরও কম কেন সংরক্ষণ করা হলো, কেন অধিকাংশ নয়?
১৯৫৭ -তে বাঙলার আরেক অগ্রদুত চিত্রকর হামিদুর রহমানের সঙ্গী হয়ে নভেরা আহমেদ শহীদ মিনার প্রজেক্টের যে কাজ শুরু করেছিল তা কেন ও কিভাবে বদলে গিয়েছিল পরবর্তী ডিজাইনে? আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে কেন শহীদ মিনারের ইতিহাসের সাথে নভেরার নাম ছিল না এবং এখনো নেই! সেই মডেলের কোন তৈলচিত্র বা জেরক্স কপি কিছুই কেন ইন্টারনেটের এত বড় যুগে সংরক্ষিত নয়?
নভেরা একটা সময় পর অবশ্যই আড়ালে চলে গেছে নিজের চেনা মানুষ থেকে, জগত থেকে, তবে সে তো ছিল পৃথিবীর বুকে ২০১৫ পর্যন্ত, কেন তবে তার কাজের সংরক্ষণ হলো না? তার এক আত্নীয়ের ক্ষোভ তাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়, "ট্রেডিশনের প্রতি এত অবহেলা কেন এই দেশে? বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর অথচ তার কাজগুলো অযত্ন, অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথায় কোথায় আছে তাও কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। মিউজিয়াম, শিল্পকলা একাডেমী রয়েছে কেন?"
বর্তমান সময়ে নভেরার চরিত্র নিয়ে কথা বলার লোকের এবং তাদের সময়ের অভাব নেই, অথচ একজন শিল্পী নভেরা আহমেদের কাজের বা শিল্পের সংরক্ষণ বা সংরক্ষণের চেষ্টার সময় নেই, ব্যাপারটা দুঃখজনক। ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাইকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেওয়া উচিত প্রথম এই মহিলা ভাস্কর যেন একেবারেই মুছে না যায় ইতিহাসের পাতা থেকে সেই প্রচেষ্টার জন্য৷ নভেরা আহমেদকে চেনা মানুষ কম বলেই কল্পনা ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের সংমিশ্রণে 'নভেরা' - জীবনীমূলক উপন্যাস সৃষ্টি। এই উপন্যাসের তথ্য উপস্থাপন এবং এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক ও দ্বিমত থাকলেও, উপন্যাসটি উপভোগ্য।
পরিশিষ্ট:
১৯৮৭ তে নভেরা আহমেদের কাজিন, মি. রাশিদ কাজের সুত্রে প্যারিসে গেলে কাঠখড় পুড়িয়ে ঠিকই খুঁজে বের করেছিলেন পছন্দের বোন নভেরাকে। ওয়াকিং স্টিক পাশে রেখে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকা বৃদ্ধ এই ভাস্করকে তার ভাইটি সেদিন শুধুই দেখেছিল, আলাপ করেনি। এর পেছনে কারণ হিসেবে বলা তার খুব ভারি একটা উপলব্ধি মনকে সাড়া দেয়- "I wanted her to fade away with dignity. She was a proud woman."
Yes, indeed she was a proud woman but maybe we are not proud enough as a nation to hold her creation.
...
"What Novera is doing now will take us a long time to understand – she is that kind of an artist."
নভেরা প্রথম বাঙালি মহিলা ভাস্কর, নভেরা বহিমিয়ান, নভেরা সময়ের চেয়ে অগ্রগামী। নভেরা স্বপ্ন দেখেছিল গতানুগতিক ধারার বাইরে যেয়ে, নভেরা গড়তে চেয়েছিল বৃহৎ কিছু; তার ভষায়, 'লার্জার দ্যান লাইফ'। তবে কেন এই প্রতিভা আজ "ফেড আউট"? নভেরার শ'খানেক ভাস্কর্যের মাঝে অর্ধেকেরও কম কেন সংরক্ষণ করা হলো, কেন অধিকাংশ নয়?
১৯৫৭ -তে বাঙলার আরেক অগ্রদুত চিত্রকর হামিদুর রহমানের সঙ্গী হয়ে নভেরা আহমেদ শহীদ মিনার প্রজেক্টের যে কাজ শুরু করেছিল তা কেন ও কিভাবে বদলে গিয়েছিল পরবর্তী ডিজাইনে? আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে কেন শহীদ মিনারের ইতিহাসের সাথে নভেরার নাম ছিল না এবং এখনো নেই! সেই মডেলের কোন তৈলচিত্র বা জেরক্স কপি কিছুই কেন ইন্টারনেটের এত বড় যুগে সংরক্ষিত নয়?
নভেরা একটা সময় পর অবশ্যই আড়ালে চলে গেছে নিজের চেনা মানুষ থেকে, জগত থেকে, তবে সে তো ছিল পৃথিবীর বুকে ২০১৫ পর্যন্ত, কেন তবে তার কাজের সংরক্ষণ হলো না? তার এক আত্নীয়ের ক্ষোভ তাই যুক্তিযুক্ত মনে হয়, "ট্রেডিশনের প্রতি এত অবহেলা কেন এই দেশে? বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর অথচ তার কাজগুলো অযত্ন, অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথায় কোথায় আছে তাও কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। মিউজিয়াম, শিল্পকলা একাডেমী রয়েছে কেন?"
বর্তমান সময়ে নভেরার চরিত্র নিয়ে কথা বলার লোকের এবং তাদের সময়ের অভাব নেই, অথচ একজন শিল্পী নভেরা আহমেদের কাজের বা শিল্পের সংরক্ষণ বা সংরক্ষণের চেষ্টার সময় নেই, ব্যাপারটা দুঃখজনক। ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাইকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেওয়া উচিত প্রথম এই মহিলা ভাস্কর যেন একেবারেই মুছে না যায় ইতিহাসের পাতা থেকে সেই প্রচেষ্টার জন্য৷ নভেরা আহমেদকে চেনা মানুষ কম বলেই কল্পনা ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের সংমিশ্রণে 'নভেরা' - জীবনীমূলক উপন্যাস সৃষ্টি। এই উপন্যাসের তথ্য উপস্থাপন এবং এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক ও দ্বিমত থাকলেও, উপন্যাসটি উপভোগ্য।
পরিশিষ্ট:
১৯৮৭ তে নভেরা আহমেদের কাজিন, মি. রাশিদ কাজের সুত্রে প্যারিসে গেলে কাঠখড় পুড়িয়ে ঠিকই খুঁজে বের করেছিলেন পছন্দের বোন নভেরাকে। ওয়াকিং স্টিক পাশে রেখে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকা বৃদ্ধ এই ভাস্করকে তার ভাইটি সেদিন শুধুই দেখেছিল, আলাপ করেনি। এর পেছনে কারণ হিসেবে বলা তার খুব ভারি একটা উপলব্ধি মনকে সাড়া দেয়- "I wanted her to fade away with dignity. She was a proud woman."
Yes, indeed she was a proud woman but maybe we are not proud enough as a nation to hold her creation.
...
"What Novera is doing now will take us a long time to understand – she is that kind of an artist."
March 21, 2022
বইটা, হতাশ করলো অনেক।
হাতে তুলে নেওয়ার মূল কারন ছিল শহীদ মিনার ও নভেরার মধ্যকার সম্পর্ক আবিষ্কার। কিন্তু কেন কে জানে, সম্ভবত বিতর্ক এড়াতেই, লেখক খুব সযত্নে এড়িয়ে গেছেন সেই অংশটুকু। তারচেয়ে বরং উঁকি দিয়েছেন নভেরার বেডরুমে, মেক আপ রুমে। অপার্থিব, অবাস্তব এক চরিত্র করে তোলার দিকেই যেন মনযোগ ছিল বেশি, যে মেক আপে নিজেকে সুন্দরী বানিয়ে রাখে, আর প্রয়োজনে এই পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে বিছানা পালটে যায়...
লেখন ভঙ্গীটাকে লেখক হয়তো খুব ইউনিক কিছু ভেবেছেন, কিন্তু সেটাও বিরক্ত করেছে খুব বেশিই।
নভেরাকে জানতে হলে এই বই পড়ার প্রয়োজন নেই, আমার মনে হয়।
হাতে তুলে নেওয়ার মূল কারন ছিল শহীদ মিনার ও নভেরার মধ্যকার সম্পর্ক আবিষ্কার। কিন্তু কেন কে জানে, সম্ভবত বিতর্ক এড়াতেই, লেখক খুব সযত্নে এড়িয়ে গেছেন সেই অংশটুকু। তারচেয়ে বরং উঁকি দিয়েছেন নভেরার বেডরুমে, মেক আপ রুমে। অপার্থিব, অবাস্তব এক চরিত্র করে তোলার দিকেই যেন মনযোগ ছিল বেশি, যে মেক আপে নিজেকে সুন্দরী বানিয়ে রাখে, আর প্রয়োজনে এই পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে বিছানা পালটে যায়...
লেখন ভঙ্গীটাকে লেখক হয়তো খুব ইউনিক কিছু ভেবেছেন, কিন্তু সেটাও বিরক্ত করেছে খুব বেশিই।
নভেরাকে জানতে হলে এই বই পড়ার প্রয়োজন নেই, আমার মনে হয়।
February 15, 2019
Her character and lifestory are beautifully in harmony with her revolutionary works
August 21, 2020
নভেরার মতো লেখকও উপন্যাসে একটু বেশি রঙ দিয়ে ফেলছে। নাইলে বর্ণনা, লেখা সবই ভালো।
August 19, 2020
'নভেরা আহমেদ' নামের বইটা পড়তে গিয়ে আমি ভুলে 'নভেরা' পড়ে ফেলসি। মানে ভুলে ঠিক বই পড়ে ফেলসি আরকি।
শুরুতে বইটা একটা অংশ পর্যন্ত পড়ে বার বার মেরুদন্ড দিয়ে একটা বিরক্তির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। কোনো এক জ্ঞানী গুনী মানুষ হবেন, বইটা সম্পর্কে লিখে গেছেন, "full of speculation viewed through the male-gaze." শুনেই আপনা আপনি বলে উঠলাম, ঠিক ঠিক! পড়ার মাঝে বার বার খালি মনে হচ্ছিল, এসব লোকের থেকে নেওয়া ইন্টারভিউ বই এর মাঝে দিতে গেল কেন! এগুলো কেটে কুটে দিলেই তো পারতেন।
বইয়ের অর্ধেক গিয়ে পড়া প্রায় ছেড়েই দিতাম, মাঝে ডায়রি টাইপ(এসবের আলাদা নাম আছে কিনা আমার জানা নেই) লেখাগুলি না থাকলে।
শেষ অংশে লেখকের বক্তব্য পড়ে উনার উপর সম্মানটা অনেকখানি বেড়ে গেল। কেনই বা ইন্টারভিউ গুলি দিসেন, আর কেন ডায়রি টাইপ লেখাগুলো দিসেন, শেষে এসে হালকার উপর মাথা দিয়ে ঢুকল। লেখক যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করতে পারসেন, সেটা দিয়ে আসলে খুব সম্ভবত এর চেয়ে ভালোভাবে এই বই লেখা সম্ভব ছিল না। বরং উনি বোধ হয় ইন্টারভিউ গুলো আরও ফিল্টার করে টরে একটু ভদ্র অবস্থায় এনে তারপর লিখসেন। পুরো সময় কয়েকবারই খেয়াল হচ্ছিল, এখানে বাকিদের বলা অনেক হাবিজাবি কথা থাকলেও, উনার করা একটা কটু মন্তব্যও নেই। বরং ঐ ডায়রি টাইপ লেখা দিয়ে উনি আরও নভেরাকে উঁচুতে নিয়ে গেসেন।
এখনো এসে নভেরাকে নিয়ে ঘাটতে গেলে কোনো তথ্য তেমন একটা পাওয়া যায় না। 'ইনার গেজ' আর 'শহিদ মিনার' ছাড়া উনার জীবনের বেশিরভাগ তথ্যই ঘোলাটে। সেখানে এই ব্যক্তি ১৯৯৫(বা এর আগে পিছে হবে) এটা লিখে গেছেন। অনেক কিছুই হয়তোবা ক্রস চেক করার সুযোগ হয় নাই। ইন্টারভিউগুলো ছাড়া আর তেমন কোনো রিসোর্সই বোধ হয় ছিল না। লেখাটা বের হউয়ার পর ভাল যা হইসে, সেটা হলো, কয়েকজন কিছু তথ্য হয় তো ঠিক ঠাক করে দিসে। সেটাও অবশ্য একদমই কম। দু একজন।
ওহ! পুরা বইয়ে সবচেয়ে ভাল ব্যক্তি, জয়নুল আবেদিন। বাকি অর্ধেকই "কি আর বলব! ওরম মেয়ে আগে দেখি নি। "এখানে পোশাকের বর্ণ্না শুরু..." " দলের লোক। কেমনটা যেন!
উনি যা লিখসেন, সব সত্যি বা সব মিথ্যা এমনটা না। স্টিল, উনার লেখা আরও পড়া দরকার। হাজার হোক, উনি বলসেন, উনি তো আর ঐতিহাসিক নন!
শুরুতে বইটা একটা অংশ পর্যন্ত পড়ে বার বার মেরুদন্ড দিয়ে একটা বিরক্তির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। কোনো এক জ্ঞানী গুনী মানুষ হবেন, বইটা সম্পর্কে লিখে গেছেন, "full of speculation viewed through the male-gaze." শুনেই আপনা আপনি বলে উঠলাম, ঠিক ঠিক! পড়ার মাঝে বার বার খালি মনে হচ্ছিল, এসব লোকের থেকে নেওয়া ইন্টারভিউ বই এর মাঝে দিতে গেল কেন! এগুলো কেটে কুটে দিলেই তো পারতেন।
বইয়ের অর্ধেক গিয়ে পড়া প্রায় ছেড়েই দিতাম, মাঝে ডায়রি টাইপ(এসবের আলাদা নাম আছে কিনা আমার জানা নেই) লেখাগুলি না থাকলে।
শেষ অংশে লেখকের বক্তব্য পড়ে উনার উপর সম্মানটা অনেকখানি বেড়ে গেল। কেনই বা ইন্টারভিউ গুলি দিসেন, আর কেন ডায়রি টাইপ লেখাগুলো দিসেন, শেষে এসে হালকার উপর মাথা দিয়ে ঢুকল। লেখক যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করতে পারসেন, সেটা দিয়ে আসলে খুব সম্ভবত এর চেয়ে ভালোভাবে এই বই লেখা সম্ভব ছিল না। বরং উনি বোধ হয় ইন্টারভিউ গুলো আরও ফিল্টার করে টরে একটু ভদ্র অবস্থায় এনে তারপর লিখসেন। পুরো সময় কয়েকবারই খেয়াল হচ্ছিল, এখানে বাকিদের বলা অনেক হাবিজাবি কথা থাকলেও, উনার করা একটা কটু মন্তব্যও নেই। বরং ঐ ডায়রি টাইপ লেখা দিয়ে উনি আরও নভেরাকে উঁচুতে নিয়ে গেসেন।
এখনো এসে নভেরাকে নিয়ে ঘাটতে গেলে কোনো তথ্য তেমন একটা পাওয়া যায় না। 'ইনার গেজ' আর 'শহিদ মিনার' ছাড়া উনার জীবনের বেশিরভাগ তথ্যই ঘোলাটে। সেখানে এই ব্যক্তি ১৯৯৫(বা এর আগে পিছে হবে) এটা লিখে গেছেন। অনেক কিছুই হয়তোবা ক্রস চেক করার সুযোগ হয় নাই। ইন্টারভিউগুলো ছাড়া আর তেমন কোনো রিসোর্সই বোধ হয় ছিল না। লেখাটা বের হউয়ার পর ভাল যা হইসে, সেটা হলো, কয়েকজন কিছু তথ্য হয় তো ঠিক ঠাক করে দিসে। সেটাও অবশ্য একদমই কম। দু একজন।
ওহ! পুরা বইয়ে সবচেয়ে ভাল ব্যক্তি, জয়নুল আবেদিন। বাকি অর্ধেকই "কি আর বলব! ওরম মেয়ে আগে দেখি নি। "এখানে পোশাকের বর্ণ্না শুরু..." " দলের লোক। কেমনটা যেন!
উনি যা লিখসেন, সব সত্যি বা সব মিথ্যা এমনটা না। স্টিল, উনার লেখা আরও পড়া দরকার। হাজার হোক, উনি বলসেন, উনি তো আর ঐতিহাসিক নন!
October 13, 2022
'নভেরা' শিল্পের প্রতীক।
'নভেরা' হাসনাত আবদুল হাইকে আমার কাছে সবশ্রেষ্ঠ লেখক রুপে স্থাপিত করেছে। আমি বইটা একমাস ধরে পড়ছি শুধু এর সৌন্দর্যের জন্য। আমি দশ পৃষ্ঠার বেশি কোনদিন পড়েনি। আমার কাছে মনে হতো, যদি শেষ হয়ে যায় আমি নভেরার মত সৌন্দর্য দেখার অধিকার হারিয়ে ফেলবো।
বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর নভেরা। যাকে কেউ হয়ত চিনে না আমাদের নতুন প্রজন্ম। যিনি ছিলেন, সমাজের এক বিদ্রোহের প্রতীক। মানুষ কে কি বললো তা শোনা তার ধাঁতে ছিল না। তার সংস্পর্শে কারা না এসেছে। জয়নুল আবেদীন, এস এম সুলতান, হামিদুর রহমান থেকে মু্র্তজা বশির, আলাউদ্দীন আল আজাদ এছাড়া এস.এম আলী সবার জীবনে নভেরা ছিল অদ্ভুত। শামসুর রহমানকে বাদ দিলে তো হবে না সুন্দর নভেরাকে বলা। তিনি বলেছেন, তোমার মুখের দিকে তাকালে প্রেমে পড়ে যাব। তিনি নভেরা মুচকি হাসতেন। আর আলাউদ্দীন আজাদ তো নভেরা আর হামিদুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন, তৈইশ নম্বর তৈলচিত্র!
নভেরাকে নিয়ে পড়া মানে বাংলার ভাস্কর্য, শিল্প, আর্ট জানা যায় সম্পূর্ণ রুপে। শিল্প কী তা নভেরা না পড়লে জানতাম না। শিল্পের ভাসা ভাসা জ্ঞান দিয়ে শিল্প আর শিল্পীকে জানা বোকামী। জীবনে যে নারীর কাছে শিল্পই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপাদান।
ভারতীয় পরিচালক শাহিদ লতিফ ও ইসমাত চুগতাই এর বর্ণনা মন্ত্রমুগ্ধ। তারা নভেরা ভারত নাট্যম শিখার যে অদ্ভুত নভেরাকে দেখেছেন তা বিরল।
এছাড়া কুমিল্লায় নভেরা ঘুরা ফেরা যখন পড়েছি মনে হয়েছে আমি তার আপন কেউ। রাণী দিঘির পাড়ে তার চলাফেরা, পদাচরণ যেন আমাকে ঐ মাটির সান্নিধ্যে গড়ে তোলা এক শিল্পীর তৃপ্তি দেয়। আমি যেন নভেরার পদ চিহ্নে হেঁটে বেড়াচ্ছি। একজন মহৎ শিল্পীর সাথে যেন কথা হচ্ছে। তিনি নেই, কিন্তু তার স্মৃতি আমাকে আঁকড়ে আছে।
"নভেরা' বই নিয়ে মনে হয় না কারো কোন প্রশ্ন থাকবে। লেখক এত নান্দনিকভাবে গবেষণা করে লিখেছেন যে কেউ সমলোচনা করতে পারবে না। তবে সুস্পষ্ট ও জোরালো সমলোচনা কেউ করতে পারলে সাধুবাদ জানাব। এই বই সবার পড়া উচিত। শিল্পের মহিমা জানতে হলে।
'নভেরা' হাসনাত আবদুল হাইকে আমার কাছে সবশ্রেষ্ঠ লেখক রুপে স্থাপিত করেছে। আমি বইটা একমাস ধরে পড়ছি শুধু এর সৌন্দর্যের জন্য। আমি দশ পৃষ্ঠার বেশি কোনদিন পড়েনি। আমার কাছে মনে হতো, যদি শেষ হয়ে যায় আমি নভেরার মত সৌন্দর্য দেখার অধিকার হারিয়ে ফেলবো।
বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর নভেরা। যাকে কেউ হয়ত চিনে না আমাদের নতুন প্রজন্ম। যিনি ছিলেন, সমাজের এক বিদ্রোহের প্রতীক। মানুষ কে কি বললো তা শোনা তার ধাঁতে ছিল না। তার সংস্পর্শে কারা না এসেছে। জয়নুল আবেদীন, এস এম সুলতান, হামিদুর রহমান থেকে মু্র্তজা বশির, আলাউদ্দীন আল আজাদ এছাড়া এস.এম আলী সবার জীবনে নভেরা ছিল অদ্ভুত। শামসুর রহমানকে বাদ দিলে তো হবে না সুন্দর নভেরাকে বলা। তিনি বলেছেন, তোমার মুখের দিকে তাকালে প্রেমে পড়ে যাব। তিনি নভেরা মুচকি হাসতেন। আর আলাউদ্দীন আজাদ তো নভেরা আর হামিদুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন, তৈইশ নম্বর তৈলচিত্র!
নভেরাকে নিয়ে পড়া মানে বাংলার ভাস্কর্য, শিল্প, আর্ট জানা যায় সম্পূর্ণ রুপে। শিল্প কী তা নভেরা না পড়লে জানতাম না। শিল্পের ভাসা ভাসা জ্ঞান দিয়ে শিল্প আর শিল্পীকে জানা বোকামী। জীবনে যে নারীর কাছে শিল্পই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপাদান।
ভারতীয় পরিচালক শাহিদ লতিফ ও ইসমাত চুগতাই এর বর্ণনা মন্ত্রমুগ্ধ। তারা নভেরা ভারত নাট্যম শিখার যে অদ্ভুত নভেরাকে দেখেছেন তা বিরল।
এছাড়া কুমিল্লায় নভেরা ঘুরা ফেরা যখন পড়েছি মনে হয়েছে আমি তার আপন কেউ। রাণী দিঘির পাড়ে তার চলাফেরা, পদাচরণ যেন আমাকে ঐ মাটির সান্নিধ্যে গড়ে তোলা এক শিল্পীর তৃপ্তি দেয়। আমি যেন নভেরার পদ চিহ্নে হেঁটে বেড়াচ্ছি। একজন মহৎ শিল্পীর সাথে যেন কথা হচ্ছে। তিনি নেই, কিন্তু তার স্মৃতি আমাকে আঁকড়ে আছে।
"নভেরা' বই নিয়ে মনে হয় না কারো কোন প্রশ্ন থাকবে। লেখক এত নান্দনিকভাবে গবেষণা করে লিখেছেন যে কেউ সমলোচনা করতে পারবে না। তবে সুস্পষ্ট ও জোরালো সমলোচনা কেউ করতে পারলে সাধুবাদ জানাব। এই বই সবার পড়া উচিত। শিল্পের মহিমা জানতে হলে।
July 2, 2023
"অন্যের অনুসরণ স্বাভাবিক, তবে অনুকরণ করতে যেও না। সর্বাঙ্গে অরিজিন্যাল হওয়া মুশকিল, কারু-না-কারু প্রভাব থাকেই । ঐতিহ্যের কাছে আমরা সবাই ঋণী । কিন্তু এরি মধ্যে স্বকীয়তা অর্জন করতে হবে, নিজের স্টাইল বার করতে হবে। এটাই অগ্নিপরীক্ষা ।"--- জ্যাকব এপস্টিন।
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর নভেরা আহমদ। তিনি ছিলেন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক, স্বাধীনচেতা,স্বতন্ত্র ও বোহেমিয়ান। তিনি নিজে যা পছন্দ করতেন তাই করতেন,এক জায়গায় বেশিদিন থাকতেন না।লন্ডন-ফ্লোরেন্স-ব্যাংকক-ঢাকা-প্যারিস , এগুলো ছিল তার নিয়মিত যাতায়াতের কেন্দ্র।প্রতি যাত্রায় তার সফরসঙ্গী হিসেবে অনেককেই দেখা যায়।প্রত্যেকেই নভেরার প্রতি আসক্ত হয়ে তার জন্য অনেক কিছুই করে। নভেরার সাথে প্রত্যেকের সম্পর্ক অনেক অন্তরঙ্গ। কিন্তু নভেরা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য– তিনি সবাইকে আকর্ষণ করেন কিন্তু সম্পর্কে জড়ান না।ফলে নভেরাকে দেখা যায় জীবনের শেষ সময়গুলোতে লোকচক্ষুর আড়ালে দুর্বিষহ দিন যাপন করতে। স্বাধীনচেতা নভেরার ছিল শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাচের প্রতিও ছিল তার ভালোবাসা।তা সত্ত্বেও নভেরাকে অর্থকষ্টে থাকতো হতো প্রায়।
বিস্মৃত নভেরাকে আবিষ্কার করতে লেখক সাহায্য নিয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের যারা নভেরার গুণগ্রাহী ও কাছের মানুষ ছিলেন।তা সত্ত্বেও নভেরাকে পুরোপুরি তুলে ধরতে লেখককে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
এছাড়া জীবনীভিত্তিক উপন্যাস হওয়ায় এই কাজ অনেক বেশি দুরুহ ছিল।
শহীদ মিনার নির্মাণে নভেরার অবদান নিয়ে কোনো কিছুই উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেন নি। এছাড়া নভেরার ভাস্কর্যগুলোর কিছু চিত্র বইয়ের সাথে থাকলে বিস্মৃত নভেরা আরো অনেক বেশি বাস্তবিক মনে হতো।
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর নভেরা আহমদ। তিনি ছিলেন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক, স্বাধীনচেতা,স্বতন্ত্র ও বোহেমিয়ান। তিনি নিজে যা পছন্দ করতেন তাই করতেন,এক জায়গায় বেশিদিন থাকতেন না।লন্ডন-ফ্লোরেন্স-ব্যাংকক-ঢাকা-প্যারিস , এগুলো ছিল তার নিয়মিত যাতায়াতের কেন্দ্র।প্রতি যাত্রায় তার সফরসঙ্গী হিসেবে অনেককেই দেখা যায়।প্রত্যেকেই নভেরার প্রতি আসক্ত হয়ে তার জন্য অনেক কিছুই করে। নভেরার সাথে প্রত্যেকের সম্পর্ক অনেক অন্তরঙ্গ। কিন্তু নভেরা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য– তিনি সবাইকে আকর্ষণ করেন কিন্তু সম্পর্কে জড়ান না।ফলে নভেরাকে দেখা যায় জীবনের শেষ সময়গুলোতে লোকচক্ষুর আড়ালে দুর্বিষহ দিন যাপন করতে। স্বাধীনচেতা নভেরার ছিল শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাচের প্রতিও ছিল তার ভালোবাসা।তা সত্ত্বেও নভেরাকে অর্থকষ্টে থাকতো হতো প্রায়।
বিস্মৃত নভেরাকে আবিষ্কার করতে লেখক সাহায্য নিয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের যারা নভেরার গুণগ্রাহী ও কাছের মানুষ ছিলেন।তা সত্ত্বেও নভেরাকে পুরোপুরি তুলে ধরতে লেখককে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
এছাড়া জীবনীভিত্তিক উপন্যাস হওয়ায় এই কাজ অনেক বেশি দুরুহ ছিল।
শহীদ মিনার নির্মাণে নভেরার অবদান নিয়ে কোনো কিছুই উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেন নি। এছাড়া নভেরার ভাস্কর্যগুলোর কিছু চিত্র বইয়ের সাথে থাকলে বিস্মৃত নভেরা আরো অনেক বেশি বাস্তবিক মনে হতো।
August 4, 2023
হাসনাত আব্দুল হাইয়ের নভেরা খালি মেকআপ করে, কেমন একটা ব্যাপার, বইটা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম। প্রতি অধ্যায়েই এক দুইবার করে এমন অসংখ্যবার এসেছে তথ্যটা। এই তথ্যটির আধিক্যে হাসিও পেয়ে যায় সিরিয়াস হতে চাওয়া সব মুহূর্তে।
চেনা মানুষদের ছাড়া ছাড়া ভাষ্যে ভাস্কর নভেরার একটা ছবি তুলে ধরার যে চেষ্টা, সেটা নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। নভেরার শিল্পী সত্তাকে এক্সপ্লোর করতে গিয়ে তার পাখি স্বভাব ছিল, এই ন্যারেটিভ এস্টাবলিশ করেছেন হাসনাত আব্দুল হাই। এই চরিত্রটি রহস্যময়ী কেন, তার ব্যাখ্যায় যেন বলছেন - 'এমনিই!' সেই গভীরে ডুব দিতে পারেন নাই, এর কারণ হতে পারে বইটির গঠন প্রক্রিয়া। নন-লিনেয়ার, এতে সমস্যা নেই, কিন্তু সকলেই একই রকম কথা বলছে একজন মানুষকে নিয়ে, তো সে সব কথা আর ওসব লোকজনের না, যেন মনে হয় মূল চরিত্রটিকে নিয়ে লেখকের নিজস্ব ধারণা অন্যদের মুখে বসিয়ে দিচ্ছেন।
কিন্তু, এসব দুর্বলতা নিয়েও বইটি পেজ টার্নার। পঞ্চাশ ষাটের দশকের ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লার কালচারাল এট্মস্ফেয়ারের একটা ঝাপসা ছবি চোখে ভাসে। ভেসে ওঠে ঐ সময়ের পারি, ফ্লোরেন্স আর যুদ্ধাক্রান্ত ভিয়েতনাম, ব্যাংকক। পড়তে বেশ লাগে।
আর শেষের তিনটি অধ্যায়ে এ বই আশ্চর্য এক বিষণ্ণতায় মন ভার করে দেয়। বিশেষ করে শেষটা। পুরো বইয়ে যতটা নভেরা নেই, শুধুমাত্র শেষের তিন অধ্যায়ে তারচেয়ে অনেক বেশি করে আছে মনে হয়। সেই দৃশ্যটা, পারির এক কাফেতে বিষণ্ণ মলিন হয়ে তার বসে থাকাটা ভুলতে পারব না হয়ত, জীবনের কাছে পরাজয় না মেনে নেয়ার অহমে ক্লান্ত, একাকী, তার সেই একাকীত্বকে কেউ ছুঁতে পারবে না।
চেনা মানুষদের ছাড়া ছাড়া ভাষ্যে ভাস্কর নভেরার একটা ছবি তুলে ধরার যে চেষ্টা, সেটা নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। নভেরার শিল্পী সত্তাকে এক্সপ্লোর করতে গিয়ে তার পাখি স্বভাব ছিল, এই ন্যারেটিভ এস্টাবলিশ করেছেন হাসনাত আব্দুল হাই। এই চরিত্রটি রহস্যময়ী কেন, তার ব্যাখ্যায় যেন বলছেন - 'এমনিই!' সেই গভীরে ডুব দিতে পারেন নাই, এর কারণ হতে পারে বইটির গঠন প্রক্রিয়া। নন-লিনেয়ার, এতে সমস্যা নেই, কিন্তু সকলেই একই রকম কথা বলছে একজন মানুষকে নিয়ে, তো সে সব কথা আর ওসব লোকজনের না, যেন মনে হয় মূল চরিত্রটিকে নিয়ে লেখকের নিজস্ব ধারণা অন্যদের মুখে বসিয়ে দিচ্ছেন।
কিন্তু, এসব দুর্বলতা নিয়েও বইটি পেজ টার্নার। পঞ্চাশ ষাটের দশকের ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লার কালচারাল এট্মস্ফেয়ারের একটা ঝাপসা ছবি চোখে ভাসে। ভেসে ওঠে ঐ সময়ের পারি, ফ্লোরেন্স আর যুদ্ধাক্রান্ত ভিয়েতনাম, ব্যাংকক। পড়তে বেশ লাগে।
আর শেষের তিনটি অধ্যায়ে এ বই আশ্চর্য এক বিষণ্ণতায় মন ভার করে দেয়। বিশেষ করে শেষটা। পুরো বইয়ে যতটা নভেরা নেই, শুধুমাত্র শেষের তিন অধ্যায়ে তারচেয়ে অনেক বেশি করে আছে মনে হয়। সেই দৃশ্যটা, পারির এক কাফেতে বিষণ্ণ মলিন হয়ে তার বসে থাকাটা ভুলতে পারব না হয়ত, জীবনের কাছে পরাজয় না মেনে নেয়ার অহমে ক্লান্ত, একাকী, তার সেই একাকীত্বকে কেউ ছুঁতে পারবে না।
July 15, 2020
ছোটবেলায় ছুটির দিনে সাময়িকীতে বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে একটি লেখা পড়েছিলাম- রুদ্রাক্ষের মালা পরিহিত এক রহস্যময়ী নারীর ছবি আর সাথে তার অসুস্থতার কল্পিত বর্ণনা পড়ে সেই রাতে কেমন ভয় ভয়ই লেগেছিল! এরপর পত্রিকায় অল্পস্বল্প লেখা দেখেছি বোধহয়- উনার মৃত্যু নিয়েও... আর এই অনেক দিন বাদে আজ হঠাৎ ফেসবুকে একটি রিভিউ দেখে হাসনাত আবদুল হাই রচিত 'নভেরা' উপন্যাসটি পড়া হয়ে গেলো! লেখক বেশ ভিন্ন আঙ্গিকে এবং যথেষ্ট গবেষণা করে, 'অর্ধেক মানবী আর অর্ধেক কল্পনা'র মিশেলে আমাদের শহীদ মিনারের অন্যতম নকশাকারের জীবনী তুলে ধরেছেন। আর একটা ব্যাপার ভালো লেগেছে- উনার বোহেমিয়ান জীবন নিয়ে লেখক কোনো রগরগে বর্ণনা করেননি, সাবলীল ও জীবন্তভাবেই কথকদের বর্ণনায় লন্ডন, করাচি, ব্যাংকক, ফ্লোরেন্স থেকে প্যারিসের কাহিনী উঠে এসেছে। আর যতোটুকু জানলাম, সত্যিই উনার মতো এতো সিনেমাটিক চরিত্র তো বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার নয়...ভালোমন্দ, খাপছাড়া পাগলামি আর সৃষ্টিশীলতা সবকিছুর মিশেলেই সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকের এক অভূতপূর্ব, মোহনীয় বাঙালি নারী চরিত্র তিনি...
March 18, 2020
কি অদ্ভুত ভালোলাগায় পূর্ণ একটা চরিত্র 'নভেরা'। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর! স্বাধীনচেতা, সাহসী, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন, খেয়ালী একটা মেয়ে যে কিনা শিল্পের ব্যাপারে ছিল আপোষহীন, নিঃস্বার্থ। যত পড়ছিলাম বইটা মনে হচ্ছিল কেন আরো আগে জানলাম না নভেরাকে। সেই পঞ্চাশের দশকে অবিভক্ত পাকিস্তানে এই বাঙ্গালি মেয়ে যে তেজোদৃপ্ত ভূমিকায় নিজেকে তুলে ধরেছিল ভিন্ন আঙ্গিকে তাকে কি আজো আমরা মর্যাদা দেবার যোগ্যতা অর্জন করেছি? বোধহয় করিনি।
বইয়ের লেখায় সময়ের বেশ অসামঞ্জস্য ছিল। কতবার পরের কথাগুলো আগে চলে এসেছে! সাক্ষাতকারের মত করে লেখা এই বইতে কোন চরিত্র ঘটনা বর্ণনা করছে তা বুঝতেও সময় লেগেছে অনেক। কিন্তু এত বুঁদ হয়ে ছিলাম নভেরাতে, যেন এত বছর পরেও সে সমানভাবে আকর্ষণ করছে সেই আগের মতই।
বইটা শেষ করে মনে হল কেন এত ছোট্ট বইটা? কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল? তবে শেষ হয়ে গেলেও 'নভেরা'কে জানার আরো ইচ্ছা যে লেখক জাগ্রত করে গেলেন, সেটা কি করে মেটাব তাই ভাবছি।
বইয়ের লেখায় সময়ের বেশ অসামঞ্জস্য ছিল। কতবার পরের কথাগুলো আগে চলে এসেছে! সাক্ষাতকারের মত করে লেখা এই বইতে কোন চরিত্র ঘটনা বর্ণনা করছে তা বুঝতেও সময় লেগেছে অনেক। কিন্তু এত বুঁদ হয়ে ছিলাম নভেরাতে, যেন এত বছর পরেও সে সমানভাবে আকর্ষণ করছে সেই আগের মতই।
বইটা শেষ করে মনে হল কেন এত ছোট্ট বইটা? কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল? তবে শেষ হয়ে গেলেও 'নভেরা'কে জানার আরো ইচ্ছা যে লেখক জাগ্রত করে গেলেন, সেটা কি করে মেটাব তাই ভাবছি।
September 17, 2022
অসাধারণ!
বইটা পড়তে অনেকটা সময় মনে হয়েছে ডকুমেন্টারি দেখছি, নভেরা আহমেদ এর আশেপাশে যারা ছিলেন তারা স্মৃতিচারণা করছেন, আবার কখন মনে হয়েছে নভেরার আত্মকথা।
She was different, She was Modern, She was a free Bird!
বইটা পড়তে অনেকটা সময় মনে হয়েছে ডকুমেন্টারি দেখছি, নভেরা আহমেদ এর আশেপাশে যারা ছিলেন তারা স্মৃতিচারণা করছেন, আবার কখন মনে হয়েছে নভেরার আত্মকথা।
She was different, She was Modern, She was a free Bird!
April 24, 2020
নভেরা রা সবযুগেই সম্ভবত বিরাজমান
December 21, 2025
Artistic License has distracted.
August 2, 2017
সত্যিকার অর্থে 'rebel' বলতে যা বোঝায় নভেরা আহমেদ ছিলেন তারই উদাহরণ।শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর নয় তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ।কিন্তু এটা আমাদের ব্যর্থতা আমরা গুণীদের সম্মান দেই তারা মারা যাওয়ার পর।জীবিত থাকতে নভেরা আহমেদ যে শহীদ মিনারের নকশার দাবিদার তা আমরা জানতামও না।সবসময় শুধু হামিদূর রহমানের নামই নেওয়া হয়েছে।উনার নাম কেন নেই হয়ে গিয়েছিল তার উত্তর কিন্তু কারো কাছে নেই।হয়তো অসাধারণ বলেই সাধারণ মানুষরা তাকে কদর করতে পারে নি। অধিকাংশ কালোত্তীর্ণ শিল্পই যেমন ট্র্যাজেডির পরতে গড়া নভেরা আহমেদের মত অসাধারণ শিল্পীর জীবনও যেন এক ট্র্যাজেডিই বলা চলে। এই বইটিকে ঠিক উপন্যাস বলা চলে না আবার ডকুমেন্টরীও বললেও যেন ভুল হয়।কাহিনীর অগ্রগতি সুন্দর তবে আরো তথ্যবহুল হলে ,বিশেষ করে উনার কাজ নিয়ে লিখা থাকলে আরও ভালো লাগত।বিচিত্র এক অভিমানী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ শিল্পীর বিচিত্র জীবন সম্পর্কে এতটুকু জেনে যেন মন ভরলো না ।তবে সাবলীল এবং চমক জাগানোর মত বই তাতে সন্দেহ নেই ।
July 30, 2013
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে হাসনাত আব্দুল হাই এর জীবনীমুলক উপন্যাস। অকপট লেখনীশক্তি প্রকাশ পেয়েছে এই বইতে। কিছু তথ্যপ্রমাদ আছে, যা কুমুম হক বিচিত্রায় চিঠি দিয়ে বিবরণী দিয়েছিলেন। এই বইয়ের শেষে সেই চিঠি এবং লেখকের উত্তর সংযোজন করা আছে। বাংলাদেশের নারীমুক্তির উত্থান সম্পর্কে 'নভেরা' একটি অসাধারণ উপন্যাস।
লেখক গল্পের স্বার্থে বইতে প্রচুর শিল্পকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন। কিছু অংশ পরে বর্ণনাগুলো অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। তবে নাটকীয়তা আনবার জন্য লেখক কিছু অংশে ক্যামেরা শট এর বর্ণনার মাধ্যমে দৃশ্য এঁকেছেন। এই উপন্যাসের জন্য সম্ভবত একটি খুবই প্রয়োজনীয় মাত্রা যোগ হয়েছে এর মাধ্যমে।
লেখক গল্পের স্বার্থে বইতে প্রচুর শিল্পকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন। কিছু অংশ পরে বর্ণনাগুলো অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। তবে নাটকীয়তা আনবার জন্য লেখক কিছু অংশে ক্যামেরা শট এর বর্ণনার মাধ্যমে দৃশ্য এঁকেছেন। এই উপন্যাসের জন্য সম্ভবত একটি খুবই প্রয়োজনীয় মাত্রা যোগ হয়েছে এর মাধ্যমে।
May 24, 2018
Novera Ahmed - the amazing artist, couldn't be described better.
একজন অসাধারণ প্রতিভাবান, অভিমানী, উন্নত চিন্তার অধিকারী শিল্পীকে দুই মলাটের মাঝে নিয়ে আসার অনবদ্য এক চেষ্টা করেছেন লেখক।
যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ এই বইয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশের সেরা এক শিল্পীর জীবনের অনেক জানা-অজানা অধ্যায়। কখনো কখনো নভেরার সাথে গল্পও পাড়ি জমিয়েছে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন পরিবেশে। আর সব মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক সৃষ্টি।
একজন অসাধারণ প্রতিভাবান, অভিমানী, উন্নত চিন্তার অধিকারী শিল্পীকে দুই মলাটের মাঝে নিয়ে আসার অনবদ্য এক চেষ্টা করেছেন লেখক।
যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ এই বইয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশের সেরা এক শিল্পীর জীবনের অনেক জানা-অজানা অধ্যায়। কখনো কখনো নভেরার সাথে গল্পও পাড়ি জমিয়েছে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন পরিবেশে। আর সব মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক সৃষ্টি।
January 10, 2017
Although not a very high quality writing, but it will certainly make the readers curious about Novera, the first woman sculptor of Bangladesh.
Displaying 1 - 28 of 28 reviews





























