শান্তনু বসু রচিত ফলতা থেকে পলাশি গ্রন্থে মূলত পলাশির যুদ্ধের ব্যাপারে নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধ জিতে নিয়ে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের গতিমুখ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল ইংরেজরা। ‘বণিকের মানদণ্ড দেখা দিয়েছিল রাজদণ্ডরূপে।’ কেমন করে ঘটে গেল এই নাটকীয় পট পরিবর্তন? এরই বর্ণনা করা হয়েছে ফলতা থেকে পলাশি বইয়ে।
১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন। ক্লাইভের বাহিনীর সামনের সারি থেকে দুশো গজ দূরে পুকুরের ধারে একটা ঢিবির উপরে চারটে কামান বসিয়ে জনা পয়তাল্লিশ ফরাসি গোলন্দাজকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন মসিয়ে সিনফ্রে। ঠিক তার পিছনে মাইল দেড়েকের মধ্যে রয়েছে নবাবের শাহি তাঁবু। তার অলিন্দে বসে দূরবিন চোখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন উদ্বিগ্ন সিরাজদ্দৌলা।
জন্ম ১৯৭৩ সালের ২৬ জানুয়ারি, উত্তর ২৪ পরগনা জেলায়। বাবা সরোজকুমার বসু। মায়ের নাম অনিমা বসু। স্কুলের পাঠ, বারাসত প্যারীচরণ সরকার রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে। তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ববিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। নাটক রচনা দিয়ে লেখালেখি শুরু। প্রথম মৌলিক নাটক ‘রিয়েলিটি' প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। এই নাটকের জন্য জাতীয় স্তরে একটি একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের পুরস্কার পান। পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে লেখকের অনেকগুলি কিশোর উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি স্বেচ্ছাচারী। তিনি উদ্ধত। তিনি সিদ্ধান্তহীনতার দাস। কিন্তু তিনি স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব, সিরাজদৌল্লা। গতকালই পড়া শেষ হল লেখক শান্তনু বসুর "ফলতা থেকে পলাশি"। ১৭৫৬তে সিরাজ যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তাড়িয়ে ছাড়লেন ফলতা অব্দি আর নিজে কোলকাতার দখল নিয়ে তার নাম দিলেন আলিনগর; এই কাহিনীর সূচনা ঠিক সেই প্রেক্ষাপট থেকে আর কাহিনীর শুরুতে চোখে পড়ে কোলকাতা থেকে ফলতায় পালিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্দশার বিবরণ। কোম্পানি কোলকাতা ছাড়া হওয়ার পর থেকে এক সুদীর্ঘ অপেক্ষা করে বসে থাকে, কবে তাদের উদ্ধার করতে মাদ্রাজ কাউন্সিল থেকে কোম্পানি বাকি সেনাদের পাঠাবে। চোখেমুখে তাদের এক প্রবল উৎকন্ঠা, আর কি কোনোদিনও তারা ফেরত যেতে পারবে কোলকাতায়! এই উৎকন্ঠার মধ্যে কাহিনীতে এসে পড়েন তরুণ হেস্টিংস, সাহেবদের কাছে জনপ্রিয় সদ্য উঠতি মুনশি নবকৃষ্ণ, কোলকাতার ব্যাবসায়ী নকু ধর, আলিনগরের মহারাজা মানিকচাঁদ, মিঃ হলওয়েল, মিঃ ড্রেকের মতো চরিত্ররা। কোম্পানির এই দুর্দশার পাশাপাশি আরো এক কাহিনী বিস্তার করছে ফলতা থেকে কয়েকশো মাইল উত্তরে, মুর্শিদাবাদে। সেখানে তখন কোলকাতা ফতেহ করার খুশিতে মশগুল নবাব সিরাজদৌল্লা, যার কাহিনী ঘিরে প্রবেশ ঘটেছে প্রেমিকা লুৎফন্নিসা, বিশ্বস্ত বন্ধু মোহনলাল, দরবারের উপস্থিত মীরজাফর, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, রায়দুর্লভের মতো চরিত্রের। তবে ঐতিহাসিক এইসকল চরিত্রের পাশাপাশি কালের প্রেক্ষাপটে লেখক বেশ সুন্দরভাবে তৈরি করেছেন লরেন্স, হীরামন, খুশবু বাই, বশিরের মতো কাল্পনিক চরিত্রদের। তবে পাশাপাশি বিস্তার করা ইংরেজ আর নবাবের কাহিনী দুটি আরো টানটান হয়ে ওঠে যখন মাদ্রাজ থেকে কোম্পানিকে উদ্ধার করতে হাজির হন কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ আর তার সেনাবাহিনী। এরপর ফলতা থেকে সৈন্যদের মধ্যে আবারও শক্তি সঞ্চয় করে বজবজের দুর্গ দখল, কোলকাতা ও ফোর্ট উইলিয়াম পুনরুদ্ধার, তারপর সেখান থেকে চন্দননগরে ফরাসীদের আক্রমণ হয়ে একেবারে ২৩শে জুন ১৭৫৭তে পলাশীর যুদ্ধ- কোম্পানির সমগ্র কাহিনী গড়িয়েছে ভাগীরথীর জলের মতোই। তবে এ যেন কোম্পানির গল্প নয়, এ গল্প স্বয়ং ক্লাইভেরই। এই গল্পের সাথে শাখানদীর মতো এসে মিশেছে ফরাসীরা, স্বয়ং নন্দকুমার, উমিচাঁদ ইত্যাদি ব্যাক্তিরাও। অন্যদিকে নবাবের কাহিনীর জল গড়িয়েছে পুর্ণিয়ায় তার নিজের ভাই শওকত জঙ্গ-কে পরাজিত করার পর ক্রমাগত কোম্পানি আর নিজেরই দরবারে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের ক্রমাগত মানসিক চাপ সৃষ্টি করা এবং শেষে পলাশীর যুদ্ধ।
কাহিনী সবিস্তারে একটা লেখায় সম্ভব নয়। তবে "ফলতা থেকে পলাশী"-তে লেখক ১৭৫৬ থেকে ১৭৫৭, মাত্র এক বছরের কাহিনী যে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই অনবদ্য। বিশেষ করে পলাশীর মতো এরকম একটা ষড়যন্ত্রে কার ভূমিকা ঠিক কতটা, তার বিশদ বিবরণ লেখক এনেছেন তার সাহিত্যগুণে। তবে এরকম একটা ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্রে ঘসেটি বেগমের মতো চরিত্র মাত্র একটি অধ্যায়ে দেখে মন ভরেনি। তাছাড়া কাল্পনিক চরিত্রগুলো লেখক সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুললেও গোটা কাহিনী জুড়ে তাদের গুরুত্ব খুবই নগন্য। তবে নবাবের ত্রিবেণীতে আসার পর তার সাথে তরুণ সাধক রামপ্রসাদের সাক্ষাৎ হওয়াটা বেশ চমৎকার লেগেছে। আর সবশেষে উপন্যাসের অন্তিম অংশটি লেখক ঠিক যে স্থানে শেষ করেছেন, তা শুধু অনবদ্যই নয়; বেদনাদায়কও। পড়া শেষের পর মনে হল, একেবারে সঠিক স্থানে শেষ হল কাহিনী; কোথাও কোনো বাড়তি নেই। সব মিলিয়ে "ফলতা থেকে পলাশি" পলাশির যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে অসাধারণভাবে ব্যাক্ত করেছে কাহিনীর আঙ্গিকে, কোনো গুরুগম্ভীর রেফারেন্সে ঠাসা প্রবন্ধের আকারে নয়। তাই যাদের পলাশির প্রাককথন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে, তারা অবশ্যই একবার পড়ে দেখতে পারেন "ফলতা থেকে পলাশি"।
বাংলার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে এই কাহিনী। ইতিহাসাশ্রিত, তবে পাঠ্যবইয়ের মতো নীরস নয়, বরং সুন্দর গল্পচ্ছলে এক বছরের ইতিহাস কথন।
পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো যেন কোনো fast-paced thriller পড়ছি, এত দ্রুত একসাথে এত ঘটনা ঘটছে। কলকাতা - ফলতা - চন্দননগর - হুগলী - কাশিমবাজার - পলাশী - মুর্শিদাবাদ - সব এক সূত্রে বাঁধা।
সবেচয়ে বেশী যেটা ভালো লাগলো তা হলো লেখকের নিরপেক্ষ লেখনী। যা ঘটনা ঘটেছে সেটাই বলেছেন, কোনো অতিরঞ্জন নয়, কাউকে নায়ক বা খলনায়ক নয় - প্রত্যেকেই এই কাহিনীর কুশীলব।
অতীতে টাইম-ট্রাভেল করে এলাম, অনেক অজানা তথ্য জানলাম। আরও একটু চোখ ফুটলো ।
সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় এইভাবে ইতিহাসের গল্প বলার জন্য লেখককে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা!