জনশ্রুতি। লোকগাথা। পুরাণ। মহাকাব্য। জল্পনা। অলৌকিকতা। ভারতের ধর্মস্থানগুলিকে ঘিরে আবহমান কাল ধরে আবর্তিত অজাগতিক কাহিনি। কখনও বাস্তবের পাশে এসে বসে পৌরাণিক শাস্ত্রের কোনও এক অলীক চরিত্রের পরাবাস্তব পরিণতি। কখনও ইতিহাসের হাত ধরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সুতোয় ভারসাম্য রচনা করে যুগ-যুগান্ত ধরে কথিত কাহিনিমালা। কোনটা ইতিহাস আর কোনটা পুরাণ? কোন গল্পের আড়ালে আছে সত্যের নথি আর কোথায় রয়েছে লৌকিক কল্পনা? ভারতের মন্দিরের স্থাপত্য থেকে প্রতিষ্ঠাপর্ব, নির্মাণ থেকে ধ্বংস, মিথ অথবা সত্যকাহিনির এরকম বিস্ময়কর সহাবস্থান বৈচিত্র্যময় পথ চলার পরিচায়ক।
ভারত বাস করে ধর্মীয় গল্পকথায়। ভারতের ধর্মস্থানগুলি সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি প্রাচীন মন্দির অথবা তীর্থক্ষেত্র কিংবা ধর্মস্থানের সঙ্গে মিশে থাকে এক অমোঘ অনুষঙ্গ। তার নাম রহস্য! সেই একঝাঁক রহস্যকে খুঁজতে চেয়েছে এই গ্রন্থ। গবেষণায় নয়, পর্যটনে…
"ভাঙা দেউলের দেবতা, তব বন্দনা রচিতে ছিন্ন বীণার তন্ত্রী বিরতা— সন্ধ্যাগগনে ঘোষে না শঙ্খ তোমার আরতিবারতা তব মন্দির স্থিরগম্ভীর ভাঙা দেউলের দেবতা।" 'ভগ্ন মন্দির' কবিতার এই লাইনগুলো পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিত্যক্ত, জীর্ণ এক দেবালয়— যা বহু রহস্য বুকে নিয়ে অপেক্ষায় আছে ভক্ত বা কৌতূহলী কোনো মানুষের জন্য। কিন্তু ভক্ত ও লোভী, ক্ষমতাবান ও অসহায়— সব মানুষের গুঞ্জনে, হুঙ্কারে, অথবা ওঙ্কারে প্রতিনিয়ত কেঁপে ওঠা মন্দিরেও কি রহস্য থাকে? থাকে! আর তেমনই কিছু রহস্যের টানে লেখক নিজের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস, মিথ ও সন্দেহ মিশিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন পাঁচটি অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবালয়ের কথা। এই বইয়ে আছে~ ১. মিস্ট্রির আড়ালে; ২. পুরী: রহস্যময় রত্নভাণ্ডার; ৩. রহস্য-ডায়েরি: পুত্তাপুর্তি; ৪. পাথর দেবতা রহস্য; ৫. বেনারস: একটি জাদুবাস্তব; ৬. উজ্জয়িনী: মহারাজা মহাকাল; * অ্যালবাম। লেখা যেমন স্বাদু, লেখার ভঙ্গি তেমনই রুদ্ধশ্বাস। এগুলো পড়তে গেলে গম্ভীর ইতিহাস আর কলহাস্যময় বা ক্রন্দনরত বাস্তব নিজেই যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্ভগৃহ হয়ে হাতছানি দেয়। তারই ফলে ভক্তি, বিশ্বাস, অর্থনীতি, ক্ষমতা, বাঁচার আকুলতা, আর সব ছাপিয়ে একটা প্রবল 'এক্স-ফ্যাক্টর' আকর্ষণ— এতে একেবারে টাপুরটুপুর হয়ে যায় বইটি। শুধু কয়েকটি অতৃপ্তি থেকেই গেল৷ এই 'মিস্ট্রি'-গুলোর কোনো সমাধান তুলে ধরলেন না লেখক! ফলে "অন্তরে অতৃপ্তি রবে" ভাবেই বইটা শেষ হল। শুদ্ধ মুদ্রণ ও বর্ণ-সংস্থাপন বইটি পড়তে সাহায্য করেছে। পার্থপ্রতিম দাসের প্রচ্ছদটিও ভারি সুন্দর লেগেছে। ভ্রমণ আর গল্পের যুগপৎ আকর্ষণ উপেক্ষা করতে চাইলে আলাদা কথা। তা না হলে কিন্তু এই বই একেবারে অবশ্যপাঠ্য বলেই আমার মনে হয়।