আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনায় অলক্ষ্যে যুক্ত হয়ে পড়ল কয়েকজন মানুষ। লোকলজ্জায় গুটিয়ে গেছে হামলাকারীদের পরিবার। যার লাশ আনতে যাবে তারা সে আত্মীয়, নাকি জঙ্গি? শাহরিয়ারকে দাফন করার ইচ্ছায় সাফা ছুটে মরছে। ভাইবোনের আবেগের বন্ধন তাদের। শাহরিয়ারের সঙ্গে আরেক সুতোয় বাঁধা দিলরুবা, দিলরুবার সঙ্গে শফি। বিপরীত এ বন্ধন আবেগের, উপলব্ধির, দায়ের। শফি গৃহশিক্ষক। নিত্য সে তরুণদের উন্মোচিত মন দেখতে পায়। শফি কল্পনাজীবীও। দেখতে পায়, ভূগোল আর ইতিহাস পেরিয়ে কার কার যে আশনাই জীবন্ত হয়ে আছে তার চারপাশের মানুষের মনের গভীরে। দুনিয়াজুড়ে ছড়ানো সেই মাকড়সার জালে একেকটা মানুষ আটকে আছে পোকার মতো। কার দায়ই-বা নিতে পারে সে, নিছক তার কল্পিত চরিত্র আবু ইসহাককে মুক্তির অস্পষ্ট এক পথ দেখিয়ে দেওয়া ছাড়া?
Shaheen Akhtar is the author of six short story collections and four novels. She has also edited the three-volume Soti O Swotontora: Bangla Shahitye Nari, about the portrayal of women in Bengali literature, and Women in Concert: An Anthology of Bengali Muslim Women's Writings 1904-1938.
Akhtar's second novel Talaash won the Best Book of the Year Award for 2004 from Prothom Alo, the largest-circulation daily newspaper in Bangladesh. The English translation of the novel was published by Zubaan Books, Delhi, India in 2011.
Novels:
1. Palabar Path nei (No Escape Route), Mowla Brothers, 2000
2. Talaash (The Search), Mowla Brothers, 2004
3. Shokhi Rongomala, Prothoma, 2010
4. Moyur Shinghashon (The Peacock Throne), Prothoma, 2014
হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ-কাণ্ড নিয়ে দেশের প্রথম বড় ক্যানভাসের কাজটি পাওয়া গেলো প্রিয় ঔপন্যাসিক শাহীন আখতারের ‘এক শ এক রাতের গল্প’ উপন্যাসে।
বলে নেওয়া ভালো, ওই ঘটনার ঠিক বর্ণনা-সুলভ রচনা নয় শাহীনের উপন্যাস, তিনি বরং ধরতে চেয়েছেন ঘটনার পরে মূলত আততায়ীদের হতবুদ্ধি হয়ে যাওয়া পরিবারের গল্পদের। চেয়েছেনঃ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া যে ছেলেরা টিভি আর সংবাদপত্রে ‘নিহত জঙ্গি’ হয়ে ফিরে এলো, সেই সব বাড়ির কয়েকটি মানুষকে আবিষ্কার করতে।
কাজটা কঠিন ছিলো। কারণ ‘হাজার চুরাশির মা’ আমাদের মাঝে ব্রতী চ্যটার্জীর জন্য যে মায়া তৈরি করে, শাহীনকে কাজ করতে হয়েছে তার উলটো দিকে। শাহরিয়ার জামাল কিংবা বাদশা মিয়ার বেছে নেওয়া সেই রাস্তাকে অবিরাম তিরস্কার করতে করতে শাহীন উপন্যাসে এনেছেন আরব্য রজনী; একশো এক রাতের যে গল্পে উঠে আসে ক্রুসেড, ফিলিস্তিনের শরণার্থী, গান্ধী আর আলী ভাইদের ১৯৩০-এর ইতিহাস আর একুশ শতকে সিরিয়াগামী যুবকের মোহভঙ্গ।
বিস্তারিত লিখবো পরে। আপাতত কেবল এইটুকু স্বীকার করি, সিনেমার মতো কাছের-হয়েও-দূরের ওই সময়টার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে এসেছিলো মাঝের কয়েক বছরে, শাহীনের উপন্যাস পাঠককে সেই ডুবে যাওয়া শহরে আবার ফিরিয়ে নিলো।
গল্পটা দুই সময়রেখা ধরে এগিয়েছে। বর্তমান সময়রেখায় আছে শাহরিয়ার নামের এক জঙ্গী, হোলি আর্টিজানের মতো কোনো স্থানে হামলা এবং শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর তার বোন, পরিবার, প্রেমিকা এর যে পরিণাম ভোগ করে তার গাঁথা।আরেক সময়রেখায় আছে শফি মোহাম্মদ বর্ণিত এক শ এক রাতের গল্প; যে গল্প মুসলমানদের ক্রুসেড থেকে শুরু হয়ে বর্তমান শরণার্থী সমস্যায় এসে ঠেকেছে। বাংলাদেশে জঙ্গীবাদকে উপজীব্য করে লেখা কোনো উপন্যাস এর আগে পড়িনি(আদৌ লেখা হয়েছে কি?) গল্প শুরুই হয়েছে শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর। কীভাবে তার পুরো পরিবারের ওপর তার জঙ্গী পরিচয় প্রভাব ফেলেছে,তার সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পরিবারের মনোভাব কী,কীভাবে তারা পুরো পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে তা নিয়ে গল্প এগিয়েছে। ভালো বা মন্দের বাইনারিতে সীমাবদ্ধ না রেখে গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন লেখিকা; তাদের চোখ দিয়ে তাদের অন্তর্জগৎ চষে বেড়িয়েছেন। শফি মোহাম্মদের বলা গল্প প্রথমে ইতিহাসের নিরস কচকচানিতে পরিণত হলেও এই অংশই ধীরে ধীরে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এবং মুসলমানদের উত্থান পতনের পরিক্রমায় তাদের সাধারণ মনস্তত্ত্ব বোঝারও একটা প্রয়াস রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান সময়রেখার গল্প হয়ে গেছে কিছুটা বিবর্ণ ও পরিণতিহীন। যে জোরালো সম্ভাবনা নিয়ে উপন্যাসটি শুরু হয়েছিলো তার সবটা পূরণ না হলেও শাহীন আখতারের বিষয়বস্তু নির্বাচন, সততা ও গল্পের প্রাসঙ্গিকতার জন্য "এক শ এক রাতের গল্প" গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীতে অনেক কিছু বিশ্বাসের উপর টিকে আছে। তার মাঝে ধর্মীয় বিশ্বাস অন্যতম। আমি সৃষ্টিকর্তাকে যদি চোখ বন্ধ করে প্রকৃতির মাঝেই খুঁজি তবে তিনি প্রকৃতিতে বিরাজমান। নির্ভর করছে স্রষ্টাকে আমি কীভাবে পেতে চাচ্ছি অথবা তার জন্য আমি কতটা পথ হাঁটতে রাজি আছি তার উপর।
"এক শ এক রাতের গল্প" শুরু হয়েছে একটি পরিবার যখন আবিষ্কার করে তাদের পরিবারের একজন সদস্য 'মে-ফ্লাওয়ার" রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় নিহত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো তাদের সেই পরিবারের সেই সদস্যটি সেই জঙ্গিদের একজন, যে নিজেও আত্মঘাতী হয়েছে হামলা চালানোর পরে। গল্পের নায়ক সে নিজে। শুরুতে যে শহীদ হয়েও সারা উপন্যাস জুড়ে তার অস্তিত্ব। এই বইটিতে যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে তা হলো, যারা সেই হামলায় অংশ নিয়েছিলো তাদের পরিবারের চিত্র। আপন মানুষ যখন এরকম নৃশংস ঘটনায় জড়িয়ে গিয়েছে সেখানে তাদের মুখ লুকাতে হয় অথবা পুত্রকেও অস্বীকার করা লাগে। তবে কিছু মানুষ সেই পথ ধরেই হাঁটে যে পথে হেঁটে তাদের কাছের মানুষগুলো তাদের নিজ গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে। তাদের বিশ্বাস এই পথেই মিলবে মুক্তি। কিন্তু এমন মুক্তি তো নিরীহ মানুষদের কাম্য নয়। যেখানে আপনি লক্ষ্য পৌঁছাতে গিয়ে খুন করে ফেলছেন আরো দশটা মানুষকে।
এবার বলি শফির কথা। তার ছাত্র ছিলো সেই হামলায় জঙ্গিদলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। মৃত্যুর পরেও সেই ছাত্র তার জীবনে ফিরে আসে বারবার। মৃত্যুর আগে তাকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেনি বলে আক্ষেপ করেন বারবার। রাত নামলে ছাত্রকে সে শোনায় ক্রুসেডের গল্প। সুলতান সালাউদ্দিনের উদারতার গল্প। আর এই ভাবেই গল্প ডালপালা ছড়িয়ে আমাদের নিয়ে যায় তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে।
উপরের লেখা থেকে বোঝা যাচ্ছে গল্প দুইটি সময়রেখাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। একটি বর্তামান তো অন্যটি অতীত। শফির বলে যাওয়া ইতিহাসই অতীত। প্রথমে প্রথমে এই বলে যাওয়া ইতিহাসকে বিষাদ ঠেকলেও পরে তা হয়ে ওঠে বেশ ভালো একটা মাধ্যম। যেটা উপভোগ্যও বটে। মাধ্যম বললাম এইজন্য যে, এর মধ্যে দিয়ে লেখিকা গল্পে গল্পে ইতিহাসের বয়ান দিয়ে গিয়েছেন। দেশীয় প্রেক্ষাপটে এইরকম কাজ আগে হয়েছে কিনা জানি না। তবে এই লেখা আমার কাছে প্রথমে বেশ দুর্বোধ্য ঠেকছে বলা যায় খানিকটা কঠিনও। যার কারণ হিসাবে বলতে হয় ইসলাম ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা এবং ক্রুসেড নিয়ে জ্ঞান না থাকা। তবে তা কাটিয়ে নিলে বেশ ভালো ভাবেই শেষ করেছি।
❝আসলে কি তারা জীবিত, যাদের গা থেকে মরা মানুষের গন্ধ ছড়ায়?❞
কখনো কি শুনেছেন, মৃত ব্যক্তি কথা বলে! জ্বি,হ্যাঁ! শাহীন আখতারের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ❝ এক শ এক রাতের গল্প❞ পড়লে এমনটাই মনে হবে- মর্গে পড়ে থাকা লাশের জন্য একটি পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। লাশটি আর কারও নয়, একজন আত্মঘাতী হামলাকারী জঙ্গির - যে এক রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে হত্যা করে নিরীহ কিছু মানুষকে। গল্পটির শুরু কিন্তু এখানে নয়। হঠাৎ করে একরাতের মধ্যে পরিবারটি হয়ে যায় সমাজের চোখে অস্পৃশ্য, ঘটনার অভিঘাত সামলাতে না পেরে, মৃত্যুবরন করে ছেলেটির বাবা। আর সবদিক সামলে প্রিয় ছোট ভাইয়ের লাশের জন্য ছুটতে থাকে সাফা মরিয়ম।
কখনো কি আমরা ভেবে দেখি, একজন বিপথগামী জঙ্গি তার পরিবারের উপর কি দুর্গতি নিয়ে আসে? ছোট একটি পরিবার ছিল সাফা মরিয়মের, বাবা, মা আর ছোট ভাই শাহরিয়ার, যাকে সে স্নেহ করে অনেকটা মায়ের মতো। মেধাবী ছেলে শাহরিয়ার, হঠাৎ তার মনে শহিদ হবার ঝোক চাপে, গোপনে সে যোগ দেয় সন্ত্রাসী সংগঠনে- ছয় মাস আগে সে নিখোঁজ হয়। একদিন পরিবারের সবাই তাদের প্রানপ্রিয় ছেলেকে আবিষ্কার করে টেলিভিশনের পর্দায় নিউজ চ্যানেলের হেডলাইনে- যার ধাক্কা সামলাতে পারেন নি জামাল আহমেদ, শাহরিয়ারের বাবা। তার মা ও শোক করতে ভুলে যান, স্তব্ধ হয়ে পাগলপ্রায় হয়ে যান। কিন্তু বড়বোন সাফা মরিয়ম একা যুদ্ধ চালিয়ে যায়, ভাইয়ের লাশ দাফনের যুদ্ধ। যত কিছুই হোক না কেন, ভাই তো ভাই-ই। ছেলের লাশের জন্য মা- মেয়ের শোকগাথা উ��ন্যাসে যোগ করেছে অন্য এক মাত্রা। মা, সাবেরা বেগমের জবানিতে তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ স্পষ্ট হয়ে ধরা পরে পাঠকের কাছে, ❝আমি ছেলের গায়ের গন্ধ পাই,আমার দুধের গন্ধ। এত বছর পরও গন্ধটা বিশুদ্ধ, টাটকা। মর্গের বন্ধ দেরাজে থেকেও গন্ধটা নষ্ট হয় নাই।❞
উপন্যাসের কাহিনি এগিয়েছে একটু ভিন্নভাবে। সাফা মরিয়ম জামাল, মৃত শাহরিয়ারের বড় বোন- তার জবানিতে ফুটে উঠেছে তার ভাইয়ের জীবনের বিভিন্ন দিক, কখনো তা মাতৃস্নেহ, কখনো একটু অভিমান- কিন্তু তার ভাইকে সে ভুলতে পারে না, যত বড়ই অপরাধ করুক না কেন! অন্য দিকে আছে দিলরুবা মেহবুবা- শাহরিয়ারের প্রাক্তন প্রেমিকা, গত হওয়া সম্পর্ক যেন তার উপর চেপে আছে জগদ্দল পাথরের মতো, সেও উত্তর খোঁজে - কেন সেই আধুনিক ছেলেটি সেই অন্ধকার জগতে পা বাড়ালো। আরেকজন আছেন শফি মোহাম্মদ, এক স্বাপ্নিক যুবক- যে রাত জেগে গল্প বলে- সুলতান সালাঊদ্দিন এর আমলের, মধ্য ইউরোপের ক্রুসেড যেন হানা দেয় তার আঙ্গিনায়। কখনো সে গল্প বলে সিরিয়ার বিপন্ন এক তরুনের- কখনো নিজেকে গন্ডির মধ্যে আটকে রাখে তার এক মৃত ছাত্রের ভয়ে, যে নিহত হয়েছে শাহরিয়ারের সাথেই একই অভিযানে।সাথে আছে আমীরন, যে স্বপ্ন দেখে সিরিয়াতে গিয়ে যুদ্ধ করার, তার মৃত ভাইয়ের মতো। অন্যদিকে আছে এক মায়ের চাপা আর্তনাদ, অভিমান তার ছেলের উপর- "মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। কই,ছেলে তো এর মূল্য দিল না! একবার পা ছুয়েও বলে গেল না,মা আমি যাই!"
"ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না, কিন্তু কখনো কখনো এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়"- মার্ক টোয়েন মর্গে পড়ে থাকা এই লাশের কি হবে পরিণতি? আর তাদের পরিবারের, যারা জীবিত থেকেও মৃত! শফি মোহাম্মদ কি তার গল্পগুলো বলে যেতে পারবে আরব্য রজনীর এক হাজার রাতের মতো? অতীতের সাথে কি বর্তমানের সহিংসতার কোনো যোগসূত্র খুজে বের করতে পারবে সে?
বইয়ের নামঃ এক শ এক রাতের গল্প লেখকঃ শাহীন আখতার প্রকাশনীঃ প্রথমা প্রকাশকালঃ ২০২২ পৃষ্ঠা ঃ ২১৭ মলাট মূল্য ঃ ৪২০ টাকা রেটিংঃ ৯/১০
ব্যক্তির গল্প থাকে, স্থানের গল্প থাকে। তাই গল্প থাকে জাতির, গল্প থাকে সম্প্রদায়ের। কখনও না কখনও সেই গল্প শুনিয়ে মানুষকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়। কিন্তু গল্প কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা অনেক বড় ব্যপার। গল্প অনেকটাই ওই ছুরির মতো—ডাক্তারের হাতে গেলে এক রকম ব্যবহার, ডাকাতের হাতে অন্য রকম। আবার একজন সাধারণ মানুষ চাইলে সেটাকে যে কোনোভাবে ব্যবহার করতে পারে। গল্পের ক্ষেত্রে ব্যপারটা আরও মারাত্মক। গল্পকে অস্ত্র করে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, মরেও যেতে পারে।
আরব্য রজনীর শেহেরজাদে বেঁচে ছিলেন গল্পের আড়ালে। একইভাবে গল্পকে ঢাল করে বহু মানুষ বহু সময় নানা জিনিস হাসিল করেছে। একটা সময় আমরা অবাক হতাম যে মানুষকে এভাবে বদলে ফেলা যায় কী করে? গল্পের সাহায্যে কাজটা কঠিন কিছু নয়। ‘এক শ এক রাতের গল্প’ আমাদের সে রকমই অনেকগুলো গল্পের সন্ধান দেয়। তবে সেই সন্ধানের মধ্যেও থাকে অনেক কিছু অস্পষ্ট। অনেক কিছু ইঙ্গিতে বলা হয়। কেননা সব কথা বলা যায় না।
হোলি আর্টিজান হামলার পর থেকে এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে কিন্তু তারপর কেমন যেন বিষয়টা ভুলে যাওয়া হলো। আমরা আসলে সবকিছুই ভুলে যাই। যেমন ভুলে গেছি হোলি আর্টিজানের এক যুগ আগে এই দেশেই পটকার মতো বোমা ফুটেছিল। দুটো বিষয়ের যোগ আছে কিন্তু সেই যোগসূত্র ধরে সমস্যার সমাধান করতে চাননি কেউ। সমাধান তো দূর বিষয়টা নিয়ে তলিয়ে ভাবার মতো কিছু লোক আছে বিশ্বাস করি কিন্তু কোনো প্রকাশ ছিল না।
সাহিত্যিকের দায় বলে কিছু আছে কিনা সে আলাপে যাবো না তবে আমি বিশ্বাস করি তার অলিখিত এক দায়িত্ব হলো সময়টা ধরে রাখা। সে কাজটা খুব কঠিন কিছু না, কঠিন হলো যা চোখের সামনে নেই সময়ের সেই বিষয়গুলোকে তুলে আনা। ‘এক শ এক রাতের গল্প’ সে কাজটিই করে। হোলি আর্টিজানের হামলার ঘটনা, তাদের সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কে আমরা শুনেছি আর তারপর আলোচনা করার চেষ্টা করেছি ‘কেন তারা জঙ্গি হলো?’, যদিও কিছু হাইপোথিসিস ছাড়া পাওয়া যায়নি কিছু। আমরা মৃতদের আত্মার শান্তি তার তাদের পরিবারের প্রতি সমব্যথী হয়েছি। কিন্তু শাহীন আখতার সেই পুরনো বিষয়ে না গিয়ে দেখতে চাইলেন হামলাকারীদের পরিবারের অবস্থা।
ভাইয়ের লাশ নিয়ে দাফন করতে বোনের ছোটাছুটি থেকে শুরু করে এই গল্প আমাদের নিয়ে যায় কিছু পেছনের গল্পে। দিলরুবা মেহবুবা, সাফা মরিয়ম জামাল থেকে শুরু করে এই গল্প যখন শফি মোহম্মদে যায় তখনও মনে হয় হামলা পরবর্তী সময়ে জঙ্গিদের পরিবারের আনন্দ বেদনার কাব্য হয়েই থাকবে, কিন্তু শফি মোহাম্মদে গিয়ে শাহিন আখতার এই সময়ের সমান্তরালে নিয়ে আসেন কয়েকশ বছরের গল্প। ক্রুসেড থেকে শুরু করে সেই গল্প ভ্রমণ করে এসে থেকে এই ভূখণ্ডে। আর তখনও ছোট ছোট সেই গল্পগুলোর মধ্য দিয়ে আমিরন, সবুজ পাখি, শাহরিয়ার কিংবা শফির ছাত্রের মনের ভেতরে লাভা উদ্গিরনের মেকানিজমগুলো জানা যায়।
শাহীন আখতারের এই উপন্যাস জটিল, বড় বেশি জটিল। ‘ইসলামের ইতিহাসের’ এমন কিছু ঘটনা তিনি এনেছেন যা সম্পর্কে আগে থেকে জানা না থাকলে মূল গল্পের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে যায়। আর জানতে গেলে অনেক থেমে থেমে পড়তে হয়। ফের আইএস কিংবা শাহরিয়ারদের সাথে সেই পুরনো গল্পের সম্পর্ক কী সেটা বুঝতে আসলে মগজে কিছু চিন্তা থাকতে হয়। বিগত কয়েক বছরে কিছু মানুষ আমাদের কতটা ভেতরে ঢুকে গেছে, ঢুকে গিয়ে ইতিহাস আর সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে কতো কী প্রতিস্থাপন করেছে শাহীন আখতার তা সরাসরি না বলেও মোদ্দা কথাটা বলেছেন। ভাবনার জায়গা রেখে আমরা যারা সেই সময় আলোচনা করতাম, এই বই আমাদের সেই আলোচনার পাশে তাই চলে আসে অনায়াসে।
আমাদের আশেপাশে আমাদের দেখার বাইরে বহুকিছু চলতে থাকে। আমরা টের পাই না। শয়ে শয়ে ফেসবুক পেইজে ইমানী কথা থেকে শুরু করে পথের মধ্যে ইমানী জোশ কিংবা… না, এই বইয়ে সরাসরি এই কথা বলা নেই। কিন্তু কদর্য সময় তৈরি করার জন্য চলতে থাকা গল্পের কথা আছে।
শাহীন আখতারের লেখা "এক শ এক রাতের গল্প" আমার জানামতে হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার উপর লেখা প্রথম উপন্যাস।
এখানে তিনি ভিক্টিমদের গল্প তুলে ধরেননি। তুলে ধরেছেন সেই সব জঙ্গিদের গল্প। আরো স্পষ্ট করে বললে, তারা নিহত হওয়া পরবর্তী তাদের পরিবার গুলোর চিত্র।
সেই চিত্রে দেখতে পাই শাহরিয়ার জামাল অপু নামের এক জঙ্গিকে। যার মা বোনের হাহাকার। বোনের তার লাশের জন্য আবেদন। মর্গের দুয়ারে-দুয়ারে ঘুরে বেড়ানো।
জাভেদ, তুষার নামের অন্য জঙ্গিদের পরিবারের গল্প ও উঠে আসে অপুর বোন সাফার মাধ্যমে। তীক্ষ্ণ কুয়াশা আর ঘোরতর অন্ধকার এক হতাশায় প্রতিটি পরিবার। লেখিকা আমাদের এই পরিবার গুলোর প্রতি একধরণের সহমর্মিতা অনুভতি তৈরি করতে চেয়েছেন। বেশ খানেকটা সফলও হয়েছেন।
যদিও বইটির নাম দেয়া হয়েছে শফি নামের এক বই পড়ুয়া যুবক এর প্রতি রাতে বলে যাওয়া গল্প থেকে। যে জাভেদকে শুনাত ক্রুসেড, সালা���দ্দিন, মহাত্মা, আলী ভাইদের গল্প। এ গল্পে আমরা ঘুরে আসব শত সহস্র বছরের ইতিহাসে।
শাহীন আখতারের ভাষা কাব্যিক। সুন্দর রূপকল্প সৃষ্টিতে পারদর্শী। তার শব্দে প্রচুর ফারসি আরবি শব্দ ব্যবহার করেছেন। অনেক জায়গায় এত বেশী রুপকের ব্যবহার মূল গল্পের গতিশীলতা নষ্ট করেছে। অবশ্য গল্পের কাহিনী সেরকম কিছুই নেই। এটা শুধু এই পরিবারগুলোর অন্তর্দন্দ্ব এর গল্প আর শফির বলে যাওয়া ইতিহাসমালা।
বইটি পড়ে আমার ক্ষীণ সন্দেহ, বইটি কি আসলেই আমার মত পাঠকদের জন্য লেখা?
নাকি প্রতিযোগিতায় পুরষ্কারের জন্য লেখা..!
উদ্দেশ্য যেমনি হোক বইটি দ্বিতীয়বার কেউ পড়বে বলে মনে হয় না।