বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ! আমাদের সাধের আর গর্বের গণতন্ত্র! নাগরিকের রায়ে জয়ী একদল মানুষ— শাসনদণ্ড হাতে তুলে নেয়। বিরোধীরা থাকে অন্যদিকে। কিন্তু কখন যেন গণতন্ত্র বদলে যায় সার্কাসে। ট্রাপিজের খেলা। কে যে কখন কার হাত বা পা ধরে ঝুলে পড়ে বোঝা দায়। আর থাকে সার্কাস সুন্দরী, তার লাস্যময়ী রূপের মোহজাল ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। শেষ পর্যন্ত আমজনতার বরাতে লবডঙ্কা। এই সবকিছুর ছবি একটু তির্যকভাবে আঁকা হয়েছে এই উপন্যাসে।
উল্লাস মল্লিকের জন্ম ১৯৭১ হাওড়া জেলায়, গাছগাছালি দিঘি ঘেরা এক শান্ত গ্রামে।বাবা সমরসিংহ মল্লিক, মা গীতা মল্লিক। একটু বড় হয়ে সপরিবারে চলে আসেন হাওড়া জেলারই আর এক চমত্কার গ্রাম কেশবপুরে।বাবা ছিলেন সেখানকার বিশিষ্ট শিক্ষক। স্নাতক হবার পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু।চাকরি ছেড়েছেন; পেশা বদলেছেন।দুষ্টুমির বাল্যকৈশোর, অনিশ্চিত কর্মজীবন, চেনা-অচেনা, ভাল-মন্দ বাছবিচার না করেই মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, অদ্ভুত সব ঘটনা আর স্নিগ্ধ প্রকৃতি তাঁর লেখা জুড়ে।মনে আনন্দ আর রসবোধ নিয়েই বেঁচে থাকতে চান। ২০০০ সালে লেখালিখির শুরু।বিভিন্ন বছরে ‘দেশ’ হাসির গল্প প্রতিযোগিতায় বিজয়ী।একডজন উপন্যাস, দেড়শোর বেশি গল্প আর রম্যরচনা লিখেছেন।
২০২২ সালে অনেকগুলো উপন্যাস আর গল্প সংকলন পড়লাম, যাত্রাপালা এই বছর এর এখনো অব্দি পড়া সেরা। না এটা কোনো থ্রিলার বা অতি-অলৌকিক বিষয়বস্তুর উপর লেখা টানটান উত্তেজনা পূর্ণ উপন্যাস না। হ্যাঁ ঠিকই বলেছি আমি, উল্লাস মল্লিক বাবুর লেখা যাত্রাপালা নিখাদ বাস্তব সময়ের হাস্যরস সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ব্যঙ্গ উপন্যাস। এই পেজ এর এক ফলোয়ার আমাকে সাজেস্ট করেন উল্লাস বাবুর লেখা পঞ্চাশটি গল্প পরে দেখার জন্য, বইটি আমি কোনো ফরমাটেই জোগাড় করে উঠতে পারিনি, তাই হাত এর সামনে ১৪২৯ এর আনন্দলোক এই পেয়ে গেলাম যাত্রাপালা, আর সত্যি আমিই অবাক হয়ে গেলাম পড়ে কেন এতদিন উল্লাস বাবুর লেখা আমি পড়িনি?
পটভূমি - গল্পের নায়ক চঞ্চল মন্ডল। চঞ্চল এর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘর ছাড়েন, চঞ্চল তার মা আর বোন, এই সংসার চালানোর জন্য চঞ্চল বাসরুটে পকেটমারির কাজ শুরু করে, কিন্তু একদিন ধরা পরে বেধড়ক গণপিটুনি খায় আর মার খাওয়া সেই অবস্থায় তার সাথে পরিচয় হয়, রাজ্যের এখনকার বিরোধী 'ফুলকপি' দলের নেতা খোকা ঘোষ এর সাথে, চঞ্চল কে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, রুলিং পার্টি বাঁধাকপি দল এর বিরুদ্ধে। চঞ্চল এর পকেটমারির কারণে মার খাওয়ার ঘটনা কে মিথ্যে ভাবে পরিকল্পনা করে প্রচার করা হয়, তিনি নাকি এক অবলা নারীকে বাঁধাকপি দল এর কিছু দুষ্কৃতী থেকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছেন এবং নিজে মার খেয়েছেন। রাতারাতি চঞ্চল হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সেনসেশন, তার এই ঘটনাকে নাট্যরূপ দিয়ে তৈরী হয় যাত্রাপালা শ্বাপদ এর মুখে সতী। এই যাত্রাপালায় নায়ক চঞ্চল নিজেই, প্রতিবার সেই সত্যি কে শ্বাপদ (দুষ্কতী) দের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসে, এই যাত্রাপালা নারী নির্যাতন এর সিন এ ভিলেন এর পার্ট এ অভিনয় করার জন্য দলের উপরতলা থেকে সুপারিশ আসা নিয়ে কোন্দল পর্যন্ত শুরু হয়ে যায়। বাঁধাকপি আর ফুলকপি পার্টির লড়াই, বিভাজন, কোন্দল, নোংরা রাজনীতি আর তারসাথে সুবিধাভোগী পার্টি মেম্বার দেড় পদের প্রতি লোভ সবকিছুই এই ১৩৬ পাতার উপন্যাস এ তুলে ধরেছেন লেখক ব্যঙ্গ বিদ্রুপের দ্বারা। তার সাথে বুঝিয়েছেন মানুষ হিসেবে চঞ্চল মন্ডল এর পরিবর্তন, পকেটমার থেকে নির্বাচন এ জয়ী হয়ে ফুলকপি পার্টির হয়ে মুখ্যমন্ত্রী। এই যাত্রায় মানুষ হিসেবে চঞ্চল কতটা পরিবর্তন হলো? সেটাই হলো লেখার মূল বিষয়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
পলিটিকাল স্যাটায়ার, রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখা একটি অসামান্য উপন্যাস। এখানে বাঁধাকপি হলো রুলিং পার্টি, আর তার মুখমন্ত্রী বোকা বোস। ফুলকপি বিরোধী পার্টি, বিরোধী নেতা খোকা ঘোষ। আর আছে মটরশুঁটি দল, মটরশুটির যেমন অনেকগুলি দানা থাকে, এই দল টিও অনেক গুলি দল এর সংঘটিত ফ্রন্ট। ব্যঙ্গ বিদ্রুপের এর মাধ্যমে লেখক অনেক সিরিয়াস সত্য ঘটনাকেই খুব সাবলীল ভাবে বলে গেছেন, পড়ে দারুন মজা পেয়েছি, লেখক এর লেখা ঝরঝরে, টানটান লেখনীতে এতটাই মুগ্ধ থাকবেন বুঝতেও পারবেন না উপন্যাস কখন শেষ হতে চললো। একটি সাধারণ পকেটমার থেকে রাজনৈতিক সেনসেশন চঞ্চল মন্ডল এর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা প্রচন্ড ইন্টারেষ্টিং অবশ্যই পড়ে দেখবেন, আর আমি উল্লাস বাবুর আরও কয়েকটা বই জোগাড় করি পরবর্তী লেখার জন্য।
চাঁদে ভারতের রোভার চলছে, তাতে ধরা পরেছে যে চন্দ্রপৃষ্ঠের অল্প গভীরে গেলেও তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণী নানা ভাষায় বিজ্ঞানীরা সেসব প্রদেশের টিভি চ্যানেলে আলোচনা করছেন। আর বাংলা সংবাদ চ্যানেলে খালি সস্তার রাজনীতি।
বাংলা সিরিয়ালের তো কথাই নেই।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাঙালিরা সাহসী ও ভালো কিছু করতে পারে, সেই বিশ্বাসটাই চলে যাওয়ার পথে।
সেই সময়ে এই উপন্যাসটা পড়লাম। না, এই উপন্যাসের জোরে চাঁদে যাওয়াও হবে না, আবার বঙ্গদেশের অর্থনীতির হালও ফিরবে না। কিন্তু এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনো মানুষ এরকম লিখতে পারেন ভেবেও ভালো লাগছে।
ভালো লাগল পড়ে। নি:সন্দেহে ভালো উপন্যাস। নতুনত্ব আছে। বিনোদন আছে। খানিক গভীরতা আছে। লিখনশৈলী ভালো, উদ্ভাবনী। রূপকগুলি উদ্ভাবনী, সরেস, ও হাস্যরসোদ্রেককারী।
কিছু কিছু বহুব্যবহৃত ক্লিশে এড়ানো যায়নি। ঔপন্যাসিক পর্বাতারোহণের সময়ে কিছু প্রত্যাশিত উপত্যকায় আপতিত হয়েছেন।
এ উপন্যাস পড়লে সময় নষ্ট হবে না, এ কথা হলফ করে বলতে পারি।