শৈবতীর্থ তারকেশ্বর সম্বন্ধে আমরা কতটুকু জানি? নানা কিংবদন্তি এবং 'মোহন্ত-এলোকেশী সম্বাদ' জাতীয় কিছু টুকরো কথা ছাড়া ওই জায়গাটি সম্বন্ধে আমাদের অধিকাংশের জ্ঞানগম্যি অত্যন্ত সীমিত। অথচ এই বাংলাতেই, কলকাতা থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে ওই ঐতিহাসিক স্থানটি। সেই অভাব পূরণ করে, আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার প্রকরণ মেনেও অত্যন্ত সাবলীল গদ্যে রচিত হয়েছে আলোচ্য বইটি। 'লেখকের কথা' এবং রূপক সামন্তের লেখা একটি অত্যন্ত মূল্যবান 'মুখবন্ধ'-র পর এতে স্থান পেয়েছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়~ ১. জনশ্রুতি ও কাহিনির আড়ালে তারকেশ্বর; ২. তারকেশ্বর আবিষ্কারের প্রকৃত কাল নির্ণয়; ৩. অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তারকেশ্বরের মোহান্ত পরম্পরা; ৪. এলোকেশী হত্যা-মামলা ও তারকেশ্বর; ৫. তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলন; ৬. সত্যাগ্রহ-পরবর্তী তারকেশ্বর; ৭. তারকেশ্বর মন্দির ও জনপদ পরিচিতি। এই বইটির ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, লেখার ভাষা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল, অথচ প্রমিত— অনেকটা জনপ্রিয় সংবাদপত্রের ফিচারের মতোই। অথচ তথ্য বা ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণে কোথাও সত্যের সঙ্গে আপোষ করেননি লেখক। ফলে বইটি পড়া শুরু করলে ছুটে চলতেই শেষ অবধি। সঙ্গী হয় এই বাংলার ইতিহাস, নানা চরিত্র, আর সময়। দ্বিতীয়ত, কোনোরকম স্বকপোলকল্পিত ভাষ্য বা অনুমানের ওপর নির্ভর করেননি লেখক। বরং তাঁর দ্বারা উল্লিখিত প্রতিটি তথ্য বা বিশ্লেষণের সমর্থনে তথ্যসূত্র নির্দেশ করা হয়েছে। এই নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একে মডেল হিসেবেই নেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, বইয়ে প্রচুর আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে— যাদের অনেকগুলোই দুষ্প্রাপ্য। একইভাবে, অধুনা দুষ্প্রাপ্য বহু নথি ও দলিলের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হয়েছে এতে। স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আগে পাঠকের কাছে এদের পরিবেশন করে লেখক আমাদের ঋণী করে রাখলেন। চতুর্থত, বাংলার ইতিহাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অবদান পাঠ্যবইয়ে স্থান পায় না (আলিপুর বোমার মামলা নিয়ে একটি অনুচ্ছেদ বাদ দিলে)। কিন্তু তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রসঙ্গে তাঁকে স্বমহিমায় এবং যথাযথ বাদ-বিবাদের মাধ্যমে পেয়ে খুব-খুব ভালো লাগল। এমন চমৎকার একটি বইয়েও কিছু-কিছু প্রাচীন বানান (কাহিনী) এবং কিছু মুদ্রণ-প্রমাদ রয়ে গেছে। তবে এতে বর্ণ-সংস্থাপনের কাজটি ভারি চমৎকার হয়েছে, যার ফলে কঠিন বিষয়ও সহজ-পাঠ্য হয়। তারকেশ্বর-কে নিয়ে এই বইটি সত্যিই অসাধারণ। আশা রাখি যে এভাবেই লেখক মেদিনীপুর এবং হুগলীর নানা ঐতিহাসিক স্থানের স্বরূপ তথা ইতিহাসকে বিস্মৃতি ও গালগল্পের ধুলোমাটির আড়াল থেকে উদ্ধার করবেন। তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
বইয়ের নাম 'প্রসঙ্গ তারকেশ্বর', তাই প্রচ্ছদে তারকেশ্বর মন্দিরের ছবি রয়েছে। স্বাভাবিক! আসল কারিকুরী রয়েছে তারকেশ্বরের ছবির পৃষ্ঠভূমিতে। কালীঘাটের পটের ধরণে আঁকা বেশ ক'টি চিত্র যেগুলোর মুখ্য থিম হল এলোকেশী হত্যা। বইয়ের বিষয় এবং প্রসঙ্গের সঙ্গে প্রচ্ছদটি মানানসই।
সাতটি অধ্যায়, কালপঞ্জী, গ্রন্থ তালিকা ইত্যাদিতে বইটি বিভক্ত। লেখক অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে নানান জনশ্রুতি এবং লোককথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা তারকেশ্বরের কাহিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন কিংবা বলা ভালো উনি প্রতিটি তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। উনি পাঠকের উপর নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে, পাঠককে সাহায্য করেছেন সত্যিটা বুঝে নিতে।
নানান কল্পকাহিনি, অলৌকিক কথার মাঝে হারিয়ে যাওয়া তারকেশ্বরের কাল-নির্ণয় করা যে কতটা কঠিন, সেইটা এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় পড়লেই বোঝা যায়। কাজটি আরও কঠিন হয়েছে তারকেশ্বরের মোহান্তদের বদান্যতায়।
নাম মোহান্ত, কিন্ত তাঁদের মোহের যে কিছুই অন্ত হয়নি, সেটির সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অধ্যায় জুড়ে। শেষ অধ্যায়ে রয়েছে মন্দির এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের পরিচিতি পর্ব।
যে কোনও নন-ফিকশনের উচিত, আমার মতে, নিরপেক্ষভাবে সব তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরা উচিত। পাঠকের দায়িত্ব সেই সমস্ত তথ্যের ভিতর থেকে নির্যাসটুকু তুলে নেওয়ার, সত্যটা বুঝে নেওয়ার। এই কাজটি লেখক সুনিপুণভাবে করেছেন। সহজ ভাষায়, অহেতুক জটিলতা ছাড়া উনি সব তথ্য ইত্যাদি, রেফারেন্সের সঙ্গে সাজিয়েছেন।
যে কোনও মন্দির বা ধার্মিক স্থল নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে বেশ কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়, যার মধ্যে মুখ্য হল সেই স্থান ঘিরে থাকা নানান অলৌকিক কাহিনির জাল। লেখক সেই জাল সরানোর চেষ্টা না করে, জালগুলির সাহায্যে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেছেন।
একটাই অনুযোগ, পৃষ্ঠ সংখ্যা ২২৫এ শ্রী জগন্নাথ আশ্রম মহারাজের ইস্তফার পিছনে কারা দায়ী, সেই অংশটুকু লেখক সযত্নে বর্জন করেছেন কেন? বইয়ের ক'পাতা বাড়ত?