মানব মণ্ডলের প্রসঙ্গ তারকেশ্বর নিছক কোনও মন্দির বা তীর্থস্থানকে ঘিরে লেখা ধর্মীয় বিবরণ নয়—এটি বাংলার আধ্যাত্মিক মাটি থেকে উদ্ভূত ইতিহাস, কিংবদন্তি, স্থাপত্যচেতনা ও শৈবসংস্কৃতির এক অনুপম ঐতিহ্যনির্মাণ। এই গ্রন্থ যেন এক palimpsest, যেখানে পুরাণ ও প্রামাণ্য দলিল একসাথে লিপিবদ্ধ হয়েছে—একদিকে আছে “श्रद्धावान् लभते ज्ञानम्” (Shraddhāvān labhate jñānam—Only the faithful gain knowledge), অন্যদিকে ইতিহাসের শৃঙ্খলিত অন্বেষা।
লেখক শুরু থেকেই এমনভাবে পাঠককে টেনে নেন যেন একজন ritual guide—এক অলৌকিক অথচ মাটির গন্ধমাখা আলোয় ভিজিয়ে দেন বাস্তব জগতের সমস্ত নিস্তরঙ্গতাকে। যেন চোখের সামনে জেগে ওঠে সেই রামনগরের গভীর বনাঞ্চল, যেখানে এক অনাথ পাথরখণ্ড, এক মনোযোগী কপিলা গরু, এবং এক নির্জন তপস্যায় নিমগ্ন যোগী—এই ত্রয়ীর মাধ্যমে গড়ে ওঠে এক চিরন্তন শৈবতীর্থের ভিত্তি।
“History is not the past. It is the present.” এই কথাটি যেন এখানে কুর্নিশ জানায় অতীত ও আধুনিকতার মেলবন্ধনকে। মানব মণ্ডলের বর্ণনায় অলৌকিকতা নিছক আস্থা নয়, এক ধরনের archaeology of faith—যেখানে কল্পনাও প্রমাণের স্থান পায়। তিনি অলৌকিকতাকে ত্যাগ না করে ইতিহাসের সমান্তরালে স্থাপন করেন—“যেখানে মেঘের গর্জন শোনা যায়, আবার মাটির চাষের ঘ্রাণও লেগে থাকে।”
এই গ্রন্থে তারকেশ্বর শুধু এক তীর্থ নয়, এক ভূ-ঐতিহ্য, এক locus sanctus। “Tirthaṁ yatra saṅgamo bhavati— where sacred confluences occur”—এই কথার মতোই, এখানে আধ্যাত্মিকতা, লোককথা, রাজনীতি, সমাজসংস্কার, স্থাপত্য আর আচার মিলেমিশে গড়ে তোলে এক বহমান জনপদের আত্মচিত্র।
সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিক হল মানব মণ্ডলের প্রাঞ্জল অথচ সংবেদনশীল ভাষা। তাঁর লেখায় আছে একধরনের নীরব সম্মান, এক reverential detachment, যা কোনও ধর্মীয় আহ্লাদ নয়, বরং সাহিত্যের দৃষ্টিতে দ্রষ্টার চোখ। পাঠক অনুভব করেন—এই শুধু কোনও মন্দিরের কথা নয়, বরং এক জনপদের আত্মার কথা; যেখানে দেবতা আছেন, ইতিহাসও আছে, এবং রয়েছে মানুষ—যাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছে এই পুণ্যভূমি।
বিষ্ণুদাস, ভারামল্ল, মুকুন্দ ঘোষ ও মায়াগিরি—এই চারটি নাম যেন তারকেশ্বর তীর্থের চারটি দিকচক্রবাল। তাঁরা কেউই শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় বন্দী নয়, আবার নিছক কিংবদন্তির ধোঁয়াটে পটচিত্রও নন। তাঁদের প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছেন বিশ্বাসের প্রতীক, সাহসিকতার আলেখ্য, দৈনন্দিন জীবনের অলৌকিক স্পন্দন এবং তপস্যার ভিত্তিস্তম্ভ।
বিষ্ণুদাস—অযোধ্যা থেকে বিতাড়িত এক নিষ্কলুষ ভক্ত—বাংলার মাটিতে এসে যাঁর জীবনে ঘটে baptism by fire, অগ্নিপরীক্ষা, যাঁর বিশ্বাসে আঁচ লাগে শরীরে, সমাজে, সর্বস্বে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের আগুনেই জন্ম নেয় মহাদেবের আত্মপ্রকাশের প্রথম আভাস। “Where there is fire, there is forging,”—এই বেদবাক্যের মতোই বিষ্ণুদাসের দগ্ধ কাহিনি গড়ে দেয় প্রথম পাথর, যেখান থেকে শৈবতীর্থের ভিত্তি রচিত হয়।
তাঁর ভাই, রাজা ভারামল্ল, শাসনের ছায়া থেকে উঠে এসে পরিণত হন এক আধ্যাত্মিক সংবেদনায় সিক্ত রাজারূপে। যিনি বুঝেছিলেন—“A true ruler does not build kingdoms, but sanctuaries of the soul.” স্বপ্নাদেশের আদেশে রাজ্য নয়, মঠ নির্মাণে ব্রতী হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর রাজনীতি ধীরে ধীরে গলে যায় ধর্মনিষ্ঠা ও নির্লোভ সেবায়, যা বাংলার ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।
এই দুটি আধ্যাত্মিক রেখার মাঝে এসে দাঁড়ান মুকুন্দ ঘোষ, এক গোশালার দায়িত্বে নিযুক্ত সাধাসিধে মানুষ। কিন্তু তাঁর চোখেই ধরা পড়ে সেই অলৌকিক ঘটনা—কপিলা গরুর স্তন থেকে নিরবধি দুধ ঝরে পড়ছে এক কালো শিলার উপর। মানব মণ্ডল এই ঘটনার মধ্যে খুঁজে পান divine recognition of place, যেখান থেকে পবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভূমিতে। মুকুন্দ ঘোষ যেন সেই “seer among the simple”—যিনি পরিশ্রমের মধ্যেই ঈশ্বরের প্রভা দেখতে পান।
অবশেষে, মায়াগিরি—উত্তরাখণ্ড থেকে আগত এক নিবেদিত সন্ন্যাসী। তপস্যার নির্জনতায় লীন, অলৌকিক শক্তিতে বলীয়ান, তিনি হলেন প্রতিষ্ঠার আধ্যাত্মিক আর্কিটেক্ট। তাঁর শিষ্য মনমুকুন্দের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিস্ময়কর ঘটনাগুলি আজও কিংবদন্তির শরীর হয়ে বাংলার বিশ্বাসজগতে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু মানব মণ্ডল যেভাবে তাঁর চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন, তাতে মায়াগিরি কেবল অলৌকিকতার বাহক নন, বরং সেই গুরু—“योगः कर्मसु कौशलम्”—যিনি কর্মের মধ্যেই যোগের সিদ্ধি খোঁজেন, এবং মঠের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জনগণের কল্যাণে, নিজের মহিমা প্রচারে নয়।
এই চার চরিত্রের অন্তর্জালেই মানব মণ্ডল এক শৈবতীর্থের নির্মাণগাথা রচনা করেন, যেখানে ইতিহাস ও পুরাণ, অলৌকিকতা ও যুক্তি, শাসন ও সাধনা—all blend in what can only be called a sacred ecology of place. তিনি কোনো দিককে একতরফা ভাবে জাহির করেন না; বরং এক এমন narrative architecture গড়ে তোলেন, যা “यत्र योगेश्वरः कृष्णो यत्र पार्थो धनुर्धरः”—এই গীতার বাণীর মতোই, কর্ম ও যোগ, রাজা ও ঋষি, যুক্তি ও বিশ্বাস—সবকে একে অপরের পরিপূরক করে তোলে।
এইজন্যেই ‘প্রসঙ্গ তারকেশ্বর’ নিছক একটি মন্দিরকেন্দ্রিক বিবরণ নয়, এটি বাংলার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ভূগোলের প্রাণরসায়ন। এখানে ভূখণ্ড নয়, বিশ্বাসই ভূগোল রচনা করে।
তারকেশ্বর মন্দির বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যচর্চার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, বিশেষত বাংলার ‘চালা’ রীতির স্থাপত্যধারার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলার চালা মন্দিরশৈলী মূলত গ্রামীণ কুটিরের ছাদ থেকে অনুপ্রাণিত—যেখানে ছাদ দুটি ঢালু অংশে বিভক্ত হয় এবং রিকাবি-আকৃতিতে ছাদ গঠন করে। এই কাঠামো বাংলা মন্দিরশিল্পে এক আদিম এবং আত্মিক দ্যোতনার জন্ম দেয়—যাতে বাস্তুশিল্প ও ধর্মাচারের অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটেছে।
তারকেশ্বর মন্দিরের ছাদেও দেখা যায় আটচালা রীতিরই নিদর্শন।
মানব মণ্ডল এই দিকটি নিছক স্থাপত্যশাস্ত্রের পরিভাষায় নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, এই মন্দিরশৈলী কোনও স্থাপত্যকারের একক কল্পনার ফসল নয়—বরং বহুসাংস্কৃতিক, বহুস্তরীয় স্থানীয় ইতিহাস ও বিশ্বাসের গাঁথা, যা “bricks carry the memory of the people”—এই দর্শনের মোক্ষম উদাহরণ।
এই বইয়ের একটি অসামান্য মৌলিকত্ব হচ্ছে তারকেশ্বর মন্দিরের নির্মাণকাল সংক্রান্ত লেখকের গবেষণা। ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নতুন আলোকে পরিবেশন করেছেন লেখক। পাঠককে অনুরোধ করবো এই অংশটির গভীর অনুধাবনের জন্য।
রাজা ভারামল্লের রাজত্বকালে এবং মায়াগিরি মহারাজের প্রভাবাধীন সময়ে মঠের পরিকল্পনা এবং মন্দির নির্মাণে একটি স্থিতধী, তপস্যামূলক স্থাপত্যের রূপ নেওয়া শুরু করে। মঠ এবং মন্দিরের মধ্যকার spatial relationship—অর্থাৎ পবিত্রতার কেন্দ্র ও সাংগঠনিক পরিসরের মধ্যে সম্পর্ক—তারকেশ্বর মন্দিরের এক অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। মানব মণ্ডলের লেখায় এই দিকটি একেবারে স্পষ্ট: তিনি দেখান, কেবল এক পূজার স্থান নয়, বরং এটি ছিল জনসমাজে ধর্ম ও সংস্কৃতি পরিচালনার কেন্দ্র, একটি আধ্যাত্মিক nerve centre।
তারকেশ্বর মন্দিরকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকবিশ্বাস, যেমন দুধপুকুরের জলে আরোগ্যশক্তি আছে, অথবা শিবলিঙ্গটি স্বয়ম্ভূ—এসব বিশ্বাস নিছক অলৌকিকতায় ডুবে থাকা কোনও প্রথাগত কাহিনি নয়। মানব মণ্ডল এই বিশ্বাসগুলিকে সমাজ-মনস্তত্ত্বের প্রেক্ষিতে খতিয়ে দেখেন। তাঁর বিশ্লেষণ বলে:
"বিশ্বাস একসময় মাটি ছুঁয়ে ওঠে, আর মাটি ছুঁয়ে যে বিশ্বাস জন্মায়, তা কখনও মিথ্যে হয় না—সে ইতিহাসের গ্রন্থিতে না থাকলেও লোকজ মেধার পরতে তা চিরঞ্জীব।"
দুধপুকুর নামের পুকুরটির প্রসঙ্গই ধরা যাক। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই পুকুরের জলে গা ভিজিয়ে বহু রোগ সেরে যায়—বিশেষত চর্মরোগ। এই ধারণা কেবল ভক্তির আবেগ নয়, বরং এক প্রকার পবিত্র ভৌগোলিক চিহ্নায়ন, ��া বাংলার তীর্থসংস্কৃতির বিশেষ দিক। মানব মণ্ডল লেখেন যে এই ‘healing narrative’ আসলে মানুষের শরীর ও ভূখণ্ড—দুটোর মধ্যেই এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করে।
মন্দিরটি এক সময়ে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ছিল, পরে ধাপে ধাপে জনবসতি গড়ে ওঠে। মঠ প্রতিষ্ঠার পরে তা হয়ে ওঠে জনজীবনের এক কেন্দ্রস্থল। মঠের ধারায় দশনামী শৈব সম্প্রদায়ের মহন্তদের নিয়োগ এবং উত্তরাধিকার চালু হয়, যা বাংলা ও উত্তর ভারতের আধ্যাত্মিক সংযোগের সেতুবন্ধনে অবদান রাখে।
মঠ ও মন্দির মিলিয়ে যে স্থাপত্যিক-সাংস্কৃতিক পরিসর গঠিত হয়েছে, তা আজকের বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থনগরীতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে লক্ষ লক্ষ ভক্ত যে ‘কাঁওরী যাত্রা’ করে তারকেশ্বরে এসে গঙ্গাজল ঢালেন শিবলিঙ্গের মাথায়—তা কেবল এক তীর্থে উপস্থিতি নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক কাফেলা, যা ‘faith in motion’ এর সবচেয়ে মোক্ষম নিদর্শন।
সার কথা হল, মানব মণ্ডলের প্রসঙ্গ তারকেশ্বর শুধু মন্দিরের ইতিহাস নয়, এটি এক নির্মাণ-ভিত্তিক ধর্মীয় ভূগোলের রূপরেখা। স্থাপত্য, ভৌগোলিক স্মৃতি, জনশ্রুতি ও বিশ্বাস—সব মিলে তারকেশ্বর হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র, যেখানে বাংলার শৈবচেতনা মূর্ত হয় ইটে, দালানে, জলাশয়ে, এবং মানুষের প্রাণে।
এটি সেই তীর্থ, যেখানে স্থাপত্য শুধু শৈল্পিক নয়—স্মারক; শুধু ভক্তির নয়—ভূমিপুজার এক মূর্ত প্রতিমা।
সবচেয়ে অনন্য যে দিকটি বইটিকে অন্য ধর্মীয়-বিষয়ক গ্রন্থের তুলনায় আলাদা করে তোলে, তা হল এর বৃহত্তর সামাজিক ব্যাখ্যার পরিসর। প্রসঙ্গ তারকেশ্বর কেবল একটি তীর্থস্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তির কাহিনি নয়—এটি বাংলার সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও সংস্কারবোধের এক অন্তর্দৃষ্টি, যেখানে বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়, সতীদাহ, বহু বিবাহ—এইসব ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ অনায়াসে মিশে যায় শিবপূজার ধূপ-ধুনোর গন্ধে।
মানব মণ্ডল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন, কীভাবে তৎকালীন হুগলি অঞ্চলে সতীদাহের মতো নির্মম কুসংস্কার, কিংবা বহু বিবাহের সামাজিক চাপ, নারীর ওপর নিপীড়নের প্রতীক হয়ে উঠেছিল—যার বিরুদ্ধে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বেদির মতো উচ্চারণ ও রামমোহনের প্রত্যয় ছিল এক তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ। এই বৃহত্তর পটভূমি পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে, তীর্থস্থান কেবল ভক্তির আশ্রয় নয়—তা এক রাজনৈতিক, নৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংঘাত ও পরিবর্তনের মঞ্চ।
এইজন্যই তারকেশ্বর এখানে আর কেবল একজন 'তীর্থনাথ' নন—তিনি হয়ে ওঠেন এক নীরব প্রতিবাদীর প্রতীক, এক নির্মল আশ্রয়ের কেন্দ্র যেখানে লোকশ্রুতি আর সামাজিক চেতনা একই ব্রহ্মসূত্রে বাঁধা।
এবং এই সর্বজনীনতার ভাব, এই জনগণতান্ত্রিক তীর্থচেতনা যেন নবজন্ম লাভ করে ১৯৭৭ সালের “বাবা তারকনাথ” সিনেমায়—যা একসময় ঘরে ঘরে দেবতার মতো অভিভাবকের চেহারা নির্মাণ করেছিল। এই সিনেমা কেবল তারকেশ্বরের মাহাত্ম্য প্রচার করেনি, বরং তাকে আধুনিক বাঙালি মানসের এক আধ্যাত্মিক নায়ক হিসেবে পুনঃস্থাপন করেছিল। মানব মণ্ডল সেই প্রভাবকেও তাঁর বইয়ে স্থান দিয়েছেন—এই সিদ্ধান্তই বলে দেয়, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শুধুই পৌরাণিক নয়, সাংস্কৃতিক; শুধুই অতীতমুখী নয়, উত্তরাধুনিক।
সারাংশে, এই অংশটি বইয়ের সেই মণিকোঠা, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ ও সিনেমা—সব একসূত্রে গাঁথা হয়ে উঠেছে ‘তারকনাথ’-এর এক বিস্তৃত প্রতিমূর্তি।
এই বই পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হয়— মানব মণ্ডল নিছক কোনও প্রথাগত ধর্মগ্রন্থের রচয়িতা নন। তিনি যেন এক wandering sage, এক পাণ্ডিত্যসম্পন্ন তীর্থযাত্রী, যিনি শৈবতীর্থের পথ ধরে হাঁটছেন—পিছনে রেখে যাচ্ছেন ইতিহাসের ছায়া, লোকসংস্কৃতির গীতধ্বনি, এবং একটি জাতির বিশ্বাস-ভিত্তিক অভিযাত্রার দীর্ঘ অনুরণন। তাঁর গদ্য না অতিরঞ্জিত ভক্তিসোচ্ছ্বাসে ভরা, না নির্মম নৈর্ব্যক্তিকতায় আচ্ছন্ন; বরং তা “śraddhāvān labhate jñānam”—এই বাণীর মতোই এক মৃদু শ্রদ্ধায় ভেজা, এক অতীতচেতনায় পূর্ণ, তথ্য ও অনুভবের এক বিরল ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে থাকা ভাষিক স্মারক।
এই বইয়ের আরও একটি অনন্য কৃতিত্ব হল—এটি সাহসের সঙ্গে ইতিহাসকে স্পর্শ করে, ভক্তির অন্ধকারে না হারিয়ে বরং ইতিহাসের আলোয় দাঁড়িয়ে সোজাসাপটা কথা বলে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ এলোকেশী কাণ্ড সংক্রান্ত পর্যালোচনা। বহু পাঠকের মতো লেখকও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই কুখ্যাত ঘটনা ১৮৭৪ সালে নয়, ঘটেছিল ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। তথ্যের নিরিখে তিনি উল্লেখ করেছেন নিখিল সরকার ওরফে শ্রীপান্থ-এর রচিত “মোহন্ত-এলোকেশী সম্বাদ” নামক গ্রন্থকে, যা সম্ভবত এ বিষয়ে প্রথম তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণী কাজ। পরবর্তীতে বহু লেখক, উপন্যাসিক ও গবেষক এই কাণ্ডকে নানাভাবে চিত্রিত করেছেন।
কিন্তু মানব মণ্ডলের কাজ শুধু পুনরাবৃত্তি নয়—তিনি এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেছেন তাঁর নিজস্ব গবেষণালব্ধ দৃষ্টিতে, বিশেষত তাঁর লেখা “প্রসঙ্গ তারকেশ্বর” গ্রন্থে, যার পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালে, প্রজ্ঞা পাবলিকেশন থেকে। এই সংস্করণে তিনি এলোকেশী হত্যা সংক্রান্ত অনুপুঙ্খ তথ্য, নির্ভরযোগ্য উৎস ও উপযুক্ত রেফারেন্স সহ বিশ্লেষণ করেছেন—যা কেবল একটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে না, বরং পাঠককে মনে করিয়ে দেয়, তীর্থস্থান কখনও কখনও হয়ে ওঠে সমাজের শুদ্ধি ও বিকারের সংঘর্ষস্থলও।
এই দিক থেকেই “প্রসঙ্গ তারকেশ্বর” হয়ে ওঠে faith-সেন্টার্ড কিন্তু fact-চালিত এক গবেষণাগ্রন্থ। এক কথায়, মানব মণ্ডল আমাদের শুধু শিব-লিঙ্গের পূজার আচার শেখান না, বরং আমাদের বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সংকটের এক ত্রিমাত্রিক উপলব্ধির দিকে নিয়ে যান।
তারকেশ্বর, শ্রাবণ, গঙ্গাজল, বাঁক-কাঁধে বহন, দুধপুকুর, নরবলি, শাস্ত্রীয় তপস্যা—সব মিলিয়ে প্রসঙ্গ তারকেশ্বর হয়ে ওঠে এক প্রজ্বলিত সংবেদনপুঞ্জ, এক চলমান তীর্থযাত্রার অন্তর্যাত্রার মানচিত্র। মানব মণ্ডলের এই গ্রন্থ যেন “যত্র धर्मঃ, तत्र जयः”—যেখানে সত্য আর সংস্কৃতি হাতে ধরে হাঁটে, আর ইতিহাস ও জনবিশ্বাস সেখানে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে ওঠে বাংলার শৈব-আত্মার গীত।
এই বই শুধু কোনও তীর্থস্থান নয়, কোনও দেবদেবীর কাহিনি নয়—এ এক মাটি ও মানুষের মিলিত স্মারক। এটি তীর্থ যেমন, তেমনি তত্ত্ব—এটি পুরাণ যেমন, তেমনি পুরাকথার পার হয়ে আসা একটি আত্ম-অন্বেষণের সারণি।
শ্রাবণের প্রতিটি সোমবারে যখন হাজারো বাঁকধারী গঙ্গাজল বহন করে এসে পাথরের লিঙ্গে ঢেলে দেয় জল, তখন তারা শুধু মহাদেবকে সন্তুষ্ট করতে আসে না—তারা নিজেদের বিশ্বাস, ক্লেশ, প্রেম, কল্পনা, এবং স্বপ্ন—all poured into that one act of devotion। এবং সেই মুহূর্তটিকে ধরে রাখে এই বই। যেন “हर हर महादेव” ধ্বনি শুধু কানে নয়, হৃদয়ের অন্দরেও প্রতিধ্বনিত হয়।
“श्रद्धावान् लभते ज्ञानम्।” — এই শাস্ত্রবাক্যের প্রতিধ্বনি যেন ছড়িয়ে থাকে বইয়ের পাতায় পাতায়। তথ্যপ্রমাণের দৃঢ়তা আর লোকবিশ্বাসের মায়াবী আলোয় গড়া এই গ্রন্থে নেই কূপমণ্ডুকতা, নেই অতিপ্রাকৃতের ঠেকানো ঢাক। আছে এক নিঃশব্দ বজ্রনিনাদ—যা পাঠকের মনের অন্তরতম স্থানে ধাক্কা দেয়।
এটি সেই গ্রন্থ, যা ভক্ত পড়বে পদতলে মাথা রেখে, গবেষক পড়বে নোটবই পাশে নিয়ে, আর সাধারণ পাঠক—সে অনুভব করবে যেন এক দীর্ঘ ট্রেনজার্নির মতো, জানালার ধারে বসে থাকা এক অলৌকিক দৃশ্যপট তার চোখের সামনে ছায়াপাত করছে।
এটা কোনো সামান্য বই নয় — এ এক 'পুণ্যজলপূর্ণ বাঁক', যা পাঠকের ভেতর দিয়ে বইতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।
“শিবং শংকরমীশানং”—তাঁরই অনুগ্রহে লেখা এই কাহিনি, তাই এটি শুধু অতীত নয়, এটি এক শাশ্বত চলমানতা, এক “living legend”, যা শ্রাবণের প্রত্যেক সোমবারে আবা��� নতুন করে বাঁচে, হাঁটে, গেয়ে ওঠে...
এবং ঠিক সেই কারণেই, প্রসঙ্গ তারকেশ্বর শেষ হয় না—এটি একটি অনন্ত আরাধনার সূচনা।
শৈবতীর্থ তারকেশ্বর সম্বন্ধে আমরা কতটুকু জানি? নানা কিংবদন্তি এবং 'মোহন্ত-এলোকেশী সম্বাদ' জাতীয় কিছু টুকরো কথা ছাড়া ওই জায়গাটি সম্বন্ধে আমাদের অধিকাংশের জ্ঞানগম্যি অত্যন্ত সীমিত। অথচ এ��� বাংলাতেই, কলকাতা থেকে মাত্র ষাট কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে ওই ঐতিহাসিক স্থানটি। সেই অভাব পূরণ করে, আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার প্রকরণ মেনেও অত্যন্ত সাবলীল গদ্যে রচিত হয়েছে আলোচ্য বইটি। 'লেখকের কথা' এবং রূপক সামন্তের লেখা একটি অত্যন্ত মূল্যবান 'মুখবন্ধ'-র পর এতে স্থান পেয়েছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়~ ১. জনশ্রুতি ও কাহিনির আড়ালে তারকেশ্বর; ২. তারকেশ্বর আবিষ্কারের প্রকৃত কাল নির্ণয়; ৩. অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তারকেশ্বরের মোহান্ত পরম্পরা; ৪. এলোকেশী হত্যা-মামলা ও তারকেশ্বর; ৫. তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলন; ৬. সত্যাগ্রহ-পরবর্তী তারকেশ্বর; ৭. তারকেশ্বর মন্দির ও জনপদ পরিচিতি। এই বইটির ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, লেখার ভাষা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল, অথচ প্রমিত— অনেকটা জনপ্রিয় সংবাদপত্রের ফিচারের মতোই। অথচ তথ্য বা ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণে কোথাও সত্যের সঙ্গে আপোষ করেননি লেখক। ফলে বইটি পড়া শুরু করলে ছুটে চলতেই শেষ অবধি। সঙ্গী হয় এই বাংলার ইতিহাস, নানা চরিত্র, আর সময়। দ্বিতীয়ত, কোনোরকম স্বকপোলকল্পিত ভাষ্য বা অনুমানের ওপর নির্ভর করেননি লেখক। বরং তাঁর দ্বারা উল্লিখিত প্রতিটি তথ্য বা বিশ্লেষণের সমর্থনে তথ্যসূত্র নির্দেশ করা হয়েছে। এই নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একে মডেল হিসেবেই নেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, বইয়ে প্রচুর আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে— যাদের অনেকগুলোই দুষ্প্রাপ্য। একইভাবে, অধুনা দুষ্প্রাপ্য বহু নথি ও দলিলের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হয়েছে এতে। স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার আগে পাঠকের কাছে এদের পরিবেশন করে লেখক আমাদের ঋণী করে রাখলেন। চতুর্থত, বাংলার ইতিহাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অবদান পাঠ্যবইয়ে স্থান পায় না (আলিপুর বোমার মামলা নিয়ে একটি অনুচ্ছেদ বাদ দিলে)। কিন্তু তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রসঙ্গে তাঁকে স্বমহিমায় এবং যথাযথ বাদ-বিবাদের মাধ্যমে পেয়ে খুব-খুব ভালো লাগল। এমন চমৎকার একটি বইয়েও কিছু-কিছু প্রাচীন বানান (কাহিনী) এবং কিছু মুদ্রণ-প্রমাদ রয়ে গেছে। তবে এতে বর্ণ-সংস্থাপনের কাজটি ভারি চমৎকার হয়েছে, যার ফলে কঠিন বিষয়ও সহজ-পাঠ্য হয়। তারকেশ্বর-কে নিয়ে এই বইটি সত্যিই অসাধারণ। আশা রাখি যে এভাবেই লেখক মেদিনীপুর এবং হুগলীর নানা ঐতিহাসিক স্থানের স্বরূপ তথা ইতিহাসকে বিস্মৃতি ও গালগল্পের ধুলোমাটির আড়াল থেকে উদ্ধার করবেন। তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
বইয়ের নাম 'প্রসঙ্গ তারকেশ্বর', তাই প্রচ্ছদে তারকেশ্বর মন্দিরের ছবি রয়েছে। স্বাভাবিক! আসল কারিকুরী রয়েছে তারকেশ্বরের ছবির পৃষ্ঠভূমিতে। কালীঘাটের পটের ধরণে আঁকা বেশ ক'টি চিত্র যেগুলোর মুখ্য থিম হল এলোকেশী হত্যা। বইয়ের বিষয় এবং প্রসঙ্গের সঙ্গে প্রচ্ছদটি মানানসই।
সাতটি অধ্যায়, কালপঞ্জী, গ্রন্থ তালিকা ইত্যাদিতে বইটি বিভক্ত। লেখক অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে নানান জনশ্রুতি এবং লোককথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা তারকেশ্বরের কাহিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন কিংবা বলা ভালো উনি প্রতিটি তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। উনি পাঠকের উপর নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে, পাঠককে সাহায্য করেছেন সত্যিটা বুঝে নিতে।
নানান কল্পকাহিনি, অলৌকিক কথার মাঝে হারিয়ে যাওয়া তারকেশ্বরের কাল-নির্ণয় করা যে কতটা কঠিন, সেইটা এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় পড়লেই বোঝা যায়। কাজটি আরও কঠিন হয়েছে তারকেশ্বরের মোহান্তদের বদান্যতায়।
নাম মোহান্ত, কিন্ত তাঁদের মোহের যে কিছুই অন্ত হয়নি, সেটির সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অধ্যায় জুড়ে। শেষ অধ্যায়ে রয়েছে মন্দির এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের পরিচিতি পর্ব।
যে কোনও নন-ফিকশনের উচিত, আমার মতে, নিরপেক্ষভাবে সব তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরা উচিত। পাঠকের দায়িত্ব সেই সমস্ত তথ্যের ভিতর থেকে নির্যাসটুকু তুলে নেওয়ার, সত্যটা বুঝে নেওয়ার। এই কাজটি লেখক সুনিপুণভাবে করেছেন। সহজ ভাষায়, অহেতুক জটিলতা ছাড়া উনি সব তথ্য ইত্যাদি, রেফারেন্সের সঙ্গে সাজিয়েছেন।
যে কোনও মন্দির বা ধার্মিক স্থল নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে বেশ কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়, যার মধ্যে মুখ্য হল সেই স্থান ঘিরে থাকা নানান অলৌকিক কাহিনির জাল। লেখক সেই জাল সরানোর চেষ্টা না করে, জালগুলির সাহায্যে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরেছেন।
একটাই অনুযোগ, পৃষ্ঠ সংখ্যা ২২৫এ শ্রী জগন্নাথ আশ্রম মহারাজের ইস্তফার পিছনে কারা দায়ী, সেই অংশটুকু লেখক সযত্নে বর্জন করেছেন কেন? বইয়ের ক'পাতা বাড়ত?