বিষবৈদ্য ত্রিলোক আথুরী এবং তাঁর শিষ্য সনাতনের সঙ্গে আমার আলাপ হয় আনন্দমেলা-র পাতায়। দেড় দশক পেরিয়েও সেই আলাপ ও তজ্জনিত শিহরন মনে থেকে গেছিল। কিন্তু সেই গল্পটা পড়ার উপায় ছিল না... এতদিন অবধি। এইবার বিষবৈদ্যের সেইসব অভিযান— যাদের ছোবল একেবারে নিউরোটক্সিনের মতো করে মাথায় পৌঁছে যায় পড়া-মাত্র— আমাদের কাছে ফিরে এল এই ঝকঝকে হার্ডকভারের মধ্য দিয়ে। কী-কী লেখা আছে এই বইয়ে? "কিছু কথা" শীর্ষক অংশে লেখক এই গল্পদের উৎস নিয়ে লিখেছেন। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কল্পকাহিনির ছাত্রদের জন্য অত্যাবশ্যক পাঠ হিসেবে সেখানে তিনি এই কাহিনিদের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনাও করেছেন। তারপর এসেছে এই ক'টি লেখা~ ১. বিষবৈদ্য ২. উড়ন্ত মৃত্যুর দেশে ৩. কালীয় ৪. উ থ্লেন ৫. হরলালের ছোবল ৬. জোর্মুখেন্দ্র ৭. সিংহিকা অভিযান সবার শেষে রয়েছে "এক নজরে বিষবৈদ্য" শীর্ষক একটি অংশ, যাতে এই চরিত্রদের এযাবৎ প্রকাশিত যাবতীয় অ্যাডভেঞ্চারের নাম, তাদের কালানুক্রম, সর্বোপরি বিষবৈদ্যের ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষধি ও আয়ুধের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। এই অংশটি পড়ার পরেই যদি কোনো পাঠক "দোর্দোবুরুর বাক্স", "মৃত্যুদূত", "পঙ্খীলালের গুহা", "নিবাত কবচ অভিযান"— এ-সবের দিকে হাত না-বাড়ান, তাহলে বলতেই হয় যে তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন (আমি হইনি কিন্তু!)। গল্পগুলো নিয়ে আর আলাদা করে কী বলব? রোমাঞ্চের সঙ্গে আমাদের এই মস্ত বড়ো দেশটার ইতিহাস, ভূগোল, নানা কিংবদন্তি, আর কল্পনার অবাধ উড়ান— সব মিশিয়ে লেখা এইসব আখ্যান রাবড়ি বা গরম শিঙাড়ার সঙ্গেই তুলনীয়— মানে অতুলনীয়। যাঁরা এখনও এদের পড়েননি, আলোর গতিতে সেই ত্রুটি সংশোধনে তৎপর হোন। বইটির ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য-কৃত প্রচ্ছদ দুরন্ত, ভেতরে জয়ঢাক গ্রাফিক্স-এর হেডপিস্ আর পার্থ দাশের অলংকরণগুলোও দারুণ। ছাপাও অত্যন্ত পরিষ্কার। তবে বইটিতে কিছু মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ল (একই পাতায় নিতু ও নীতু ছাপা হয়েছে), যাদের পরবর্তী সংস্করণে শুধরে নেওয়া দরকার। সব মিলিয়ে একটি "মা কসম!" লেভেলের বই। এখন আর আনন্দমেলা পড়া পোষায় না। কিন্তু এই বইটি পড়ে সত্যিই মনে হল, পুজো শুরু হয়ে গেল।
'বিষবৈদ্য' - রহস্য, বিজ্ঞান ও অতিপ্রাকৃতের সন্ধিক্ষণে
"The world is full of obvious things which nobody by any chance ever observes." — Arthur Conan Doyle
রহস্য ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে রচিত দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের ‘বিষবৈদ্য’ বইটি পাঠকদের এমন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে বিজ্ঞান ও লোকবিশ্বাসের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এটি এক অনন্য বৈজ্ঞানিক থ্রিলার, যা একদিকে জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়, অন্যদিকে রহস্যের কুয়াশায় পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে।
"Truth is stranger than fiction, but it is because Fiction is obliged to stick to possibilities; Truth isn’t." — Mark Twain
বইটির কাহিনি শুরু হয় এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যেখানে বিষক্রিয়ার ধরনটি প্রচলিত বিষের তালিকায় পড়ে না। মূল চরিত্র, এক মেধাবী বিজ্ঞানী, এই রহস্যের সমাধানে নেমে পড়েন এবং ক্রমশ এক গভীর ষড়যন্ত্রের সন্ধান পান। লেখক এখানে সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সঙ্গে প্রাচীন লোককথা, ভেষজবিদ্যা এবং অপরাধ বিশ্লেষণকে দক্ষতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।
"It is the unknown we fear when we look upon death and darkness, nothing more." — J.K. Rowling
‘বিষবৈদ্য’-র অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল এর ভৌতিক আবহ। যদিও এটি মূলত এক বিজ্ঞান-ভিত্তিক রহস্যগল্প, তবুও লেখক স্থানীয় লোককাহিনির সাহায্যে একটি অতিপ্রাকৃত অনুভূতির সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষত, বইটির মধ্যভাগে এক অচেনা গ্রামের বর্ণনা ও তার অধিবাসীদের গোপন বিশ্বাস পাঠকের মনে গা ছমছমে অনুভূতি সৃষ্টি করে।
"The measure of intelligence is the ability to change." — Albert Einstein
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের লেখা বরাবরই বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচায়ক। ‘বিষবৈদ্য’ বইটিতেও তিনি একই ধারা বজায় রেখেছেন। বিষবিদ্যা, প্রাণরসায়ন এবং দেহতত্ত্বের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি কেবল রহস্যের জট ছাড়াননি, বরং বিজ্ঞানের প্রতি পাঠকদের কৌতূহলও বাড়িয়েছেন। এটি নিছক একটি থ্রিলার নয়, বরং বিজ্ঞানের এক মনোমুগ্ধকর যাত্রা।
"Every solved mystery creates two new questions." — Agatha Christie
বইটির শেষে, যদিও রহস্যের সমাধান হয়, তবুও পাঠক নতুন নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হন। গল্পের প্রতিটি চরিত্র একটি গভীরতা বহন করে, এবং তাদের প্রতিক্রিয়ায় মানব মনের জটিলতা স্পষ্ট হয়। লেখক সমাপ্তিতে এমন একটি মোড় এনেছেন, যা পাঠককে বই শেষ হওয়ার পরেও ভাবতে বাধ্য করে।
শেষে যা বলার থাকে:
"A mind needs books as a sword needs a whetstone, if it is to keep its edge." — George R.R. Martin
‘বিষবৈদ্য’ শুধুমাত্র রহস্যপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং বিজ্ঞানে আগ্রহী পাঠকদের জন্যও এক দারুণ অভিজ্ঞতা। এটি একাধারে রহস্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও অতিপ্রাকৃতের মিশেলে গঠিত এক অনন্য গ্রন্থ। দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য তার স্বভাবসুলভ গবেষণা ও কল্পনাশক্তিকে একত্রিত করে এমন একটি সৃষ্টি করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে রহস্য ও বিজ্ঞানের সংযোগ ঘটানোর ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
আপনি যদি এমন একটি বই খুঁজে থাকেন, যা পড়ার পরও মনের ভেতর বহু প্রশ্ন ও কৌতূহল জাগিয়ে রাখবে, তাহলে ‘বিষবৈদ্য’ অবশ্যই আপনার জন্য।
মাইরি বলছি এই জিনিসের কোনো পাঠ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। স্রেফ বলতে পারি, এই বই এবং এই পুরো সিরিজটা না পড়লে আফসোস করবেন আপনারা। যারা পড়েননি, পড়ে ফেলুন। জলদি।