গল্প শুনতে কে না ভালোবাসে? আমিও আপনাদের গল্প শোনাবো। এক আদি ঢাকার গল্প। সে শহর গড়ে উঠেছিলো গঙ্গা বুড়ির তীরে৷ কত রাজশক্তি রাজ করে গেল এই শহরের বুকে৷ এই শহর নিজেই শোনায় সেসব গল্পের গুঞ্জন৷ সেই গুঞ্জনের ডাকে গল্পে গল্পে আমার পথের হলো শুরু। কী গল্প শুনবেন? বাংলাবাজারের ইতিহাস, নাকি হারিয়ে যাওয়া সেই লোহারপুলের ফিসফাস? শুনি টগবগিয়ে ইংরেজবাবু চালিয়ে যায় ঘোড়া৷ আহা! হোয়াট এ গ্র্যান্ড এরিয়া! এবার গঙ্গা বুড়িও খুলে বসলো গল্পের ঝাঁপি, শুনিয়ে গেল তার কিংবদন্তি। গল্পের ডানা মেলেছে জিনেট ভান ত্যাসেল নবাবি চালে, সে গল্প শোনায় গণিউর রাজা রাজকীয় হালে৷ পুরান ঢাকা নিজেই যে এক মহাগল্প! এই ঢাকার অলিগলিতেই লুকিয়ে আছে অজস্র গল্প৷ গল্পে গল্পে শোনাবো আপনাদের পুরান ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি৷ তো আসুন, গল্প শোনা যাক।
সাহিত্যের আঁতুড়ঘর বাংলাবাজারের কথা বলি, বেচারাম দেউরীর নান্নার মোরগ পোলাও এর কথা বলি, বিখ্যাত সেই বাকরখানি নাস্তার কথাই বলি কিংবা লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বাহাদুর শাহ পার্ক, রূপলাল হাউজ যার কথাই বলি; কমন বিষয় হিসেবে চলে আসে একটা জিনিসই। বায়ান্ন বাজার তিপ্পান গলির সেই পুরান ঢাকা। রুপে, শিল্পে, আভিজাত্যে পুরান ঢাকা আমাদের দেশের মানুষের কাছে আলাদা একটা জায়গা করে আছে। সেই পুরান ঢাকা নিয়েই নিজের স্মৃতিচারণ করে গল্পে গল্পে আস্ত একটা বই লিখে ফেলেছেন আশিক সারওয়ার। বইয়ের নাম ‘গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা’। আর আজকে আমার এই পোস্ট পেপার ভয়েজার থেকে আগস্ট ২০২২ এ প্রকাশিত হওয়া বই ‘গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা’ নিয়ে।
কিছু কিছু বই থাকে যেগুলোর জনরা নিরুপণ করা বেশ মুশকিল। ‘গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা’কেও আমার কাছে এমনই একটি বই মনে হয়েছে। মোটাদাগে এটাকে Memoir বা স্মৃতিকথা মূলক বই বলা চলে যেখানে লেখকের স্মৃতি, আবেগের সাথে উঠে এসেছে পুরান ঢাকার নানা ইতিহাস। সাথে ছিলো বিশেষ বিশেষ জায়গার দারুণ কিছু ছবি। দারুণ বলার কারণ হলো, ছবির ক্ষেত্রে লেখক শুধু নিজের চোখকেই ব্যবহার করেননি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত ছবি তিনি পাঠকদের জন্য নিবেদন করেছেন বইতে। ওখানে যেমন শতবর্ষ আগের তোলা ছবিও ছিলো, তেমন ছিলো চার্লস ডয়লির স্কেচও। বই পড়তে জানা গেছে ঢাকা কেন্দ্রের কথা, উঠে এসেছে গেন্ডারিয়া, ধোলাইখালের সুদিনের কথা। এসেছে জিনেট ভান তাসেল নামক এক আমেরিকান স্বপ্নবিলাসী তরুণীর আকাশ ছোঁয়ার গল্প।
কিন্তু এত এত উপাদান থাকা সত্ত্বেও পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে আশিক সারওয়ার বইটির লেখক হিসেবে ব্যর্থ। তিনি একজন লেখক হবার যাত্রায় শামিল হয়েছেন কিন্তু নিজের লেখার পাঠক সম্ভবত হয়ে উঠতে পারেননি। আমার এ ধারণার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে, তার লিখনশৈলী। কোন একটা ঐতিহাসিক স্থানের বর্ণনায় একজন লেখকের যে পরিমাণ শব্দের দখল থাকা উচিত, বইটা পড়ে আমার মনে হয়েছে আশিক সারওয়ারের তা একদমই নেই। যে কারণে একই শব্দ ঘুরে ফিরে বারবার এসেছে বইতে। উদাহরণস্বরুপ : ১১০ পৃষ্ঠার বইতে ‘ভাবালুতা’র মত শব্দ এসেছে ২০ বারের মত (এই শব্দের আধিক্য দেখে ১৩ বার পর্যন্ত আমি নিজেই গুনেছি)। তিনি এই শব্দের প্রতি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন, জায়গায় বেজায়গায় এ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু পাঠক হিসেবে প্রতি ৩-৪ পাতার মাঝে (মাঝে মাঝে পাশাপাশি ২ পাতায়, পরপর দু’ লাইনেও এ জিনিস আছে) এ শব্দ দেখতে আমার একদমই ভালো লাগেনি। এরকম আরো দুয়েকটি শব্দ ছিলো (যেমন : খেরো খাতা) যেগুলো নিঃসন্দেহে পাঠক হিসেবে আমাকে বিরক্ত করেছে।
ওদিকে একজন লেখক হিসেবে ইতিহাসের ছোঁয়া আছে এমন বইতে সাল তারিখ নিয়ে সতর্ক থাকার যে বিষয়টি থাকে সেটিতে উনি মনোযোগ দেননি। যে কারণে রাজধানী হিসেবে ঢাকার জন্ম সাল কখনো বলা হয়েছে ১৬০৮, কখনো আবার ১৬১০। এটাকে মুদ্রণপ্রমাদ হিসেবে চালিয়ে দেয়া যেত কিন্তু যেখানে বইটা ঢাকার ইতিহাস নিয়ে সেখানে রাজধানী হিসেবে ঢাকার জন্মসাল ভুল করাটাকে সাধারণ মুদ্রণপ্রমাদ বলা গেল না বলে আমি দুঃখিত।
তবে সবচেয়ে যে কাজটা উনি খারাপ করেছেন তা হচ্ছে ‘দেখতে দেখতে চলে এলো ১৯৮৩ সাল। ক্ষমতায় জেঁকে বসেছে বিশ্ববেহায়া।’ লাইনটা লিখে। এখানে বিশ্ববেহায়া বলে উনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বুঝিয়েছেন। হ্যাঁ, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিতর্কিত ভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন, আরো হয়তো করেছেন অনেক খারাপ কিছু তবে তা সত্ত্বেও একটি অরাজনৈতিক বইতে ‘বিশ্ববেহায়া’র মত শব্দ কেন ব্যবহার করলেন তা আমার বোধগম্য হলো না। পরের লাইনেই বলেছেন, তার সরকার ছাত্রদের মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়েছে, যে কারণে সে বছর থেমে যায় বইমেলা। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্ববেহায়া শব্দটা বইয়ের ভাষা বলে মনে হলো না। আর রাজনৈতিক দিক থেকে বলতে গেলে, বিশ্ববেহায়া শব্দটা ব্যবহার করার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ ক্যান্ডিডেট আমাদের দেশেই আছে।
এছাড়াও বইতে ব্যবহার করেছেন কিছু অলেখক সুলভ শব্দমালা। যেমন : ‘আশিক ভাই, গোল তালাব পুকুর দেখবো; গুগল ম্যাপ, স্ট্রিট ভিউতে ছবি দেখে আমার মাথায় বি*চি উঠে গেছে।’ মানে, সিরিয়াসলি? বন্ধু-বান্ধবের সাথে কথা বলার সময় আমরা অনেক কিছুই বলি। তাই বলে তাই কি হুবুহু বইতে তুলে ধরতে হবে? এটা যদি একটা ফিকশন বই হতো, কোন চরিত্র কোন একটা সিচ্যুয়েশনে এটা বলছে; ব্যাপারটা যদি এমন হতো, আমি একদমই কিছুই মনে করতাম না। কিন্তু নন-ফিকশন একটা বইতে আতিশয্য বোঝাতে এই বাক্য ব্যবহার করাটা আমার কাছে সুইটেবল মনে হয়নি।
আর আছে জায়গায় জায়গায় বর্ণনার দূর্বলতা। ঢাকা কেন্দ্রের ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘ঢাকার জীবন্ত ইতিহাসের অভিভাবক আমাদের যেন তার খেয়ালি ডাকে ডাকছে। সেই ডাকে সাড়া না দেই কীভাবে? ঘুরে ঘুরে দেখছি এক কিংবদন্তি ঢাকার চিত্র। এই পাঠাগারে আছে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য-সংক্রান্ত সাত হাজারের ওপরে বই।’ ওয়েট, এখানে পাঠাগার কোত্থেকে আসলো? কথা তো হচ্ছিলো, মাওলা বখশ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের, যার আন্ডারে আছে ১০ শয্যা বিশিষ্ট চক্ষু হাসপাতাল। হ্যাঁ, এই ট্রাস্টের আন্ডারে পাঠাগার থাকতেই পারে। তবে সে পাঠাগারের ব্যাপারে আগে কিছু না এসে দুম করে যখন ‘এই পাঠাগার’ চলে আসে তখন একটু অবাকই লাগে। আবার আরেক জায়গায় লেখা আছে, ‘এই জলবিহীন ঢাকায় মৎস অধিদফতর প্রকৃতির এক নিদারুণ রসিকতা।’ মৎস অধিদফতর তো আমার জানামতে প্রকৃতি বানায়নি। তাহলে এই লাইনটা আসলে কি ছিলো?
এরকম বেশ কিছু ভুলে ভরা বই ‘গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা’। বইটা পড়ে আমার যেটা মনে হলো, তা হলো লেখক আশিক সারওয়ার পুরান ঢাকা নিয়ে বেশ অবসেসড, যেটা হওয়া মোটেও খারাপ কিছু না। তবে এই অবসেশনই তাকে বইয়ের এই ভুলগুলো চোখে পড়তে বাধা দিয়েছে। তাই শুরুতে যে লাইন বলেছি, আশিক সারওয়ার একজন লেখক হবার যাত্রায় শামিল হয়েছেন কিন্তু নিজের লেখার পাঠক সম্ভবত তিনি হয়ে উঠতে পারেননি।
কাব্যের মতো থাকা শহর আজ রূপহীন, বর্ণহীন। গঙ্গাবুড়ির এ শহরে আগেও টাকা উড়ত, এখনো টাকা ওড়ে। টাকার ভারে নুয়ে পড়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য। কিন্তু হারিয়ে যায় কি?
চারশত বছরের পুরনো এ শহরের গল্পও বেশ পুরনো। বরঞ্চ তারচেয়েও আগে থেকে ঢাকা গল্প লিখছে। এক একটি বিস্ময়কর সেসব গল্প। যে সব গল্পের রোমাঞ্চে না ডুবে থাকা যায় না। কত রাজা-প্রজা, সাহেব-নবাবদের পায়ের ধুলোয় এই ঢাকা প্রাণ ফিরে পেয়েছে, তার খবর কে রাখে? সেই সব গল্প তো রূপকথার মতো শোনায়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তা নিছক-ই কল্পনা।
এই কল্পনাকে স্মৃতির পাতায় একে ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাস জানানোর এক ছোট্ট প্রয়াস লেখক আশিক সরওয়ারের। লিখেছেন "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা"র মতো একটি বই। যেখানে তিনি খুলে দিয়েছেন নিজের স্মৃতি। নিজেকে বর্ণনা করেছেন। সেই সাথে পুরান ঢাকার সাথে তার পথচলায় শামিল করেছেন আমাদেরও। ইতিহাস কথা বলে। সেই ইতিহাস যেন গল্প বলেছে আশিক সরওয়ারের কলমে আর তার অভিজ্ঞতায়। কী ছিল সেসব গল্পে?
"ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত" - এই একটি বাক্য ছোটোবেলা থেকে মুখস্ত করেনি, এমন শিশু পাওয়া খুব দুষ্কর। সেই বুড়িগঙ্গার পাড়ে গড়ে ওঠা ঢাকা আজ বিবর্ণ, ধূসর। আর বুড়িগঙ্গা? রূপ, যৌব�� হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে জানান দিচ্ছে অন্তিমলগ্নের। এই বুড়িগঙ্গার ইতিহাস কেমন ছিল? অনেক মিথ, কিংবদন্তির জন্ম এ বুড়িগঙ্গাকে নিয়ে। সেগুলোর অনেক কিছুই জানান দেয়, "গল্পে গল্পে পুরাণ ঢাকা" বইটি।
এছাড়াও বইটিতে আছে বাংলাবাজারের ইতিহাস। বইপড়ুয়াদের জন্য বাংলাবাজার একটি আদর্শ জায়গা। যেখানে লেখক, পাঠক, প্রকাশকদের মিলনমেলা বসে। এই বাংলাবাজারের ইতিহাস কী? বইয়ের বিশাল এই ব্যস্ততম জগৎ তৈরির পেছনের গল্প জানতে হবে না?
কিংবা মঙ্গলাবাসের গল্প? ঢাকা শহরের অনেক প্রাচীন স্থাপনা আর নেই। হয় বেহাত হয়ে নতুন কোনো গল্পের সাক্ষী, অথবা সংরক্ষণের অভাবে প্রাণহীন হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। মঙ্গলাবাস তার ঐতিহ্য হারিয়ে আজ ছাত্রাবাস। ছোটো কাটরা, বড়ো কাটরা শেষ সময়ের অপেক্ষায়। একই অপেক্ষায় পাগলা সেতুর শেষ অবয়ব বা শঙ্খনিধিদের ঐতিহ্য।
লেখক বইয়ে 'রোজ গার্ডেন প্যালেস' নামের হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন। আমার বাসার থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। কলেজ জীবনে বহুসময় আড্ডায় ব্যয় করেছি সে জায়গায়। ছবি তোলার নেশায় ঢু মেরেছি। সে স্মৃতি কি ভোলা যায়? লেখকের লেখায় সেই স্মৃতিগুলো মানসপটে জেগে উঠছিল বারবার। কিংবা ঢাকা কেন্দ্র। করোনার সময়কালে তখন ঢাকা কেন্দ্র বন্ধ। তারপরও যোগযোগ করে চলে গিয়েছিলাম "কিংবদন্তির ঢাকা" বইটি হস্তগত করার জন্য। সেখানেই এক বিশাল বাংলার ইতিহাস জানতে পারি। "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" বইয়ে সেই ইতিহাস তুলে ধরেছেন লেখক।
লেখকের লেখায় উঠে এসেছে গেন্ডারিয়া, ধোলাইখালের মতো জায়গা ও তাদের ইতিহাস। যেই ইতিহাসের গল্পে চমকে যেতে হয়। এত ঐতিহ্যবাহী ছিল আমাদের ঢাকা! যেই ঢাকার প্রেমে একবার মজলে আর কোনোকিছুর দিশা থাকত না। আর আজ? লেখকের লেখায় সেসব এলাকায় গল্প পড়ে আমিও স্মৃতির পাতাতে হারিয়ে যেতাম। বাসার কাছে থাকার সুবাদে সেসব জায়গায় কম যাওয়া যে হয়নি।
লেখক বর্ণনা করেছেন গোল তালাবের ইতিহাস। "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" বইতে আরও আছে বিবি মরিয়ম কামানের খোঁজ। এর পেছনের ইতিহাস, কিংবদন্তি লিখেছেন লেখক। এছাড়াও আছে গোলাপ শাহ মাজারের পেছনের গল্প। আছে ঢাকাইয়া কুটির সেই ইতিহাস। ঢাকাইয়াদের বিশেষ ভাষার সেই ইতিহাসের গল্প জানতে হবে না?
এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ আমার কাছে একজন বিদেশিনীর গল্প। জিনেট ভান তাসেল নামের সেই বিদেশিনীর শখ ছিল আকাশ ছোঁয়ার। সেই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন বিভোর সেই নারীর পা পড়েছিল ঢাকার বুকে। নবাবদের খামখেয়ালীর বসে আর ঢাকাবাসীকে বিনোদন দিতে প্রস্তুত জিনেট। কিন্তু.... শেষ পরিণতি মানতে পারবেন তো?
এছাড়াও নানান ইতিহাস, গলিঘুপচি পার করে লেখক গল্প বলে গিয়েছেন। সেই গল্পে বিমোহিত হতে হয়। হারিয়ে যেতে পুরনো সে ঢাকার খোঁজে। যেই ঢাকার বুকে একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ত, আজ সেই ঢাকায় শুধুই হতাশা।
আশিক সরওয়ারের লেখা প্রথমবার পড়লাম। লেখকের লেখনী, ভাষাশৈলী, শব্দচয়নে মুগ্ধ হতে হয়। গল্প বলার ছলে লেখক শুধু নিজের অভিজ্ঞতা-ই বর্ণনা করেছেন আর দিয়ে গিয়েছেন এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" কোনো প্রামাণ্য দলিল নয়, লেখকের যাত্রাপথে তার সাথে সঙ্গী হওয়া কেবল। লেখক ঢাকাকে নিয়ে এক কাব্য রচনা করেছেন। যে কাব্যে উঠে এসেছে ঢাকার শুরু থেকে, নানান ঐতিহ্যের উপকরণ।
"গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" বইয়ে বানান ভুল ছিল না বললেই চলে। শেষের দিকে কিছু মুদ্রণ প্রমাদ লক্ষ্য করেছি। তেমন দুয়েকটা বাক্য গঠনে অসঙ্গতি ছিল। এছাড়া প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বাঁধাই, সম্পাদনা সব ছিল একশয়ে একশ। অভিযোগ করার কোনো জায়গা নেই।
"এই শহর, জাদুর শহর প্রানের শহর ঢাকারে...."
জাদুর শহর আজ নিজেকে হারিয়ে খুঁজছে। প্রাণের শহর আজ প্রাণহীন। ঢাকা যে বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। যেই ঢাকার গল্পে বিস্ময়, বিমুগ্ধতা! সেই ঢাকা আজ হারিয়েছে তার রঙ হারিয়ে বর্ণহীন। চারশ' বছরের পুরনো শহর যেন মাথা নুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। একসময় হয়তো দাঁড়িয়ে থাকার ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলবে প্রাচীন এ নগরী। তখন কেবল গল্পে বা কোনো উপন্যাসে ঢাকাকে পাওয়া যাবে। আর তখনকার প্রজন্ম মনে করবে বাস্তবে নয়; কল্পনায় কিংবা রূপকথার গল্পে এমন এক শহর ছিল। যাকে ঢাকা নামে ডাকা হতো......
গতবছর যে ক'টা বইয়ের নাম টাইমলাইনে বেশ ঘুরেছে "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" তার একটি। পেপার ভয়েজার আয়োজিত এক প্রতিযোগিতার সুবাদে বইটি আমার হস্তগত হয়। ঢাকা নিয়ে লেখা হয়েছে বিস্তর। বইটির কোন এক পাতার হিসেব অনুযায়ী ঢাকা কেন্দ্রেই আছে এ নিয়ে প্রায় ৩.৫ হাজার বই। তবে এই বই কেন বেছে নেবেন? আচ্ছা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে একটু বইটিতে ডুব দেয়া যাক।
বইটির একটা বিশেষত্ব চোখে লেগেছে। সেটা হলো বইয়ের গল্পটা বলার ঢং এ বৈচিত্র্য ছিল। শহরে পায়ে পায়ে চলতে চলতে লেখক বলতে চেয়েছেন পুরানো ঢাকার অলি, গলির গল্প। কখনো ফিরেছেন লেখকের শৈশবে। আবার কখনো ইতিহাসের ভেলায় চেপে তারও বেশি অতীতে। বর্তমান, নিকট অতীত ও দূরবর্তী অতীতের ফ্রেমে গল্প বলার ঢংয়ে পুরাতন ঢাকার কিছু এলাকা, কিছু ঐতিহ্য, গুটি কয়েক স্থাপত্যের কথায় মূলত এই বইয়ের প্লট।
বইটির প্রোডাকশন বেশ ভালো। কাগজের মান খুবই উন্নত। যারা ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে একদমই কিছু জানেন না অল্প সময়ে কিছু জানতে পারবেন বইটি থেকে। বেশ কিছু পুরানো আমলের ছবির ব্যবহার বইটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।
লেখক তার পরিচিতিতে বলেছেন লেখকের পরিচয় তার লেখাতে। লেখক সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন কিছু চমকপ্রদ শব্দ ব্যবহার করে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের। কিছু অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার ভালো লেগেছে, আবার কিছু শব্দ (যেমন স্বপ্নশীল) আদৌ বাংলা শব্দভাণ্ডার আছে কিনা সন্দেহ জেগেছে। শব্দ নিয়ে অতিরিক্ত কারিকুরি কিছু স্থানে লেখকের কথাকে দুর্বোধ্য করেছে। লেখায় বারবার জীবনানন্দকে আনাটা কেমন জানি আরোপিত ঠেকছিল। কয়েকটি শব্দের অতিব্যবহার বিরক্তি জাগাচ্ছিল। ১০০ পাতার ছোট বইয়ে যেমন ভাবালুতা শব্দটা গুণেছি ১৫ বার। কিছু বিতর্ক তৈরি করার মতো শব্দের ব্যবহারও লেখক করেছেন। মুদ্রণ প্রমাদ চোখে লেগেছে বেশ ক'বার। তিন সময়ের ফ্রেমিং বইটাতে একটা সমস্যার তৈরি করেছে কখনো মনে হচ্ছিল কোন ভ্লগের স্ক্রিপ্ট পড়ছি, কখনোবা স্মৃতিকথা। গল্প বলার ধরণটা ভিন্ন বটে তবে সবার মনে ধরবে কিনা তা একটা বড় প্রশ্নই।
সত্যি বলতে কি এ বছরের প্রথম পড়া বইটিতে আমি হতাশ। পড়ে মনে হলো না অতীত সময়কে দেখতে পেয়েছি, না পেলাম বর্তমানকে। তবে শেষ দিকে লেখক গুছিয়ে এনেছিলেন তবে সেটা পড়ার অভিজ্ঞতায় খুব একটা প্রভাব ফেলে নি। ঢাকা সম্পর্কে যারা একদমই নতুন তারা হয়তো বইটি পড়ে আনন্দ পাবেন।
পুরান ঢাকা ভ্রমণ নিয়ে বর্তমান সময়ের তরুন কোনো লেখকের বই প্রথম পড়লাম।আড্ডা দেয়ার ছলে পুরান ঢাকার অনেকগুলো জায়গার বিবরণসহ ইতিহাস রয়েছে এই বইয়ে।উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোর সংগৃহীত ছব��ও রয়েছে। পুরান ঢাকা নিয়ে লেখকের আরো দুইটি বই বের হবে বলে লেখক এই বইয়ে উল্লেখ করেছেন। সূচীপত্র থাকা দরকার ছিলো বইয়ে। পুরান ঢাকা নিয়ে ভালো একটি বই।
আমার কাছে ভাল লেগেছে।কিন্তু আমার মনে হয় আরো ইন্টারেস্টিং কিছু বিষয় লেখক আনতে পারতো।আমি মূলত ইতিহাস পছন্দ করিনা তবে পুরান ঢাকার মেজর বিষয় ছিলো আরো সেগুলি নিয়ে সিকুয়েল আসলে খুশি হবো।আমি মূলত গল্প কাহিনী আশা করেছিলাম। যাই হোক এমন বই নতুন পড়া সে হিসেবে বোর হইনি।ইতিহাস বিষয় হলেও লেখকের উপস্থাপনা ভাল ছিল।শুভ কামনা🌸
বই- গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা লেখক - আশিক সারওয়ার প্রকাশনী - পেপার ভয়েজার মূদ্রিত মূল্য - ৩০০৳
বই পর্যালোচনা-
বেটা রিডার হিসাবে আশিক ভাইয়ের বই পড়া হল৷ এবার প্রথম কোন বই প্রকাশের আগেই বই নিয়ে পাঠ্যনুভূতি জানাতে পারছি৷ "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" পড়তে গিয়ে আমি ঘুরেছি লেখকের সাথে পুরান ঢাকার বায়ান্নো বাজার তেপান্ন গলিতে৷ আমার বড় হওয়াতে ঢাকার এই অংশেই, তাই পুরান ঢাকা নিয়ে আমার একটু অন্য রকম আবেগের জায়গা৷
প্রথম গল্পটি নিয়ে যদি বলতে যাই তাহলে বলতে হয় গল্পটির উপস্থাপনায় মৌলিকত্ব ছিল৷ আশিক ভাই নিশ্চয় ম্যাগপাই মার্ডাস থেকে কিছু ইন্সপারেশন নিয়েছেন৷ এবং এই রকম পার্টান আরেক গল্পেও লক্ষ্য করেছি৷ বইয়ের ভেতর বইয়ের প্রচার, প্রকাশনা শিল্প নিয়ে হালকা ধারনা দেওয়া এবং সহ প্রকাশক তন্ময় ভাইয়ের উপস্থিতি গল্প কে প্রাণবন্ত ও বাস্তব করে তুলেছে। যেন আমি কোন মুভি দেখছি হলে বসে৷ মঙ্গলের খোঁজে পুরান ঢাকার অলিগলিতে এমনই একটা গল্প। যেখানে ইতিহাস, হাস্যরস, ঢাকাইয়া সংস্কৃতি এক সাথে উঠে এসেছে৷
এরপর আসতে হয় "বাংলাবাজারের ইতিহাস" গল্পটির ব্যাপারে৷ ভেবে অবাক হই এতদিন বাংলাবাজারে আমরা পদচারনা কখনও এর ইতিহাসের ডাক সে ভাবে অনুভব করেনি৷ এত ডিটেইলস বর্ণনা এবং উপস্থাপনা ছিল একজন পাঠক হিসাবে আমাকে চিন্তার গভীরে নিয়ে গেছে৷
"পড়ন্ত বিকেলে রোজ গার্ডেন প্যালেস" এই গল্পটিতে লেখকের বাউন্ডুলে স্বভাব উঠে এসেছে৷ একেবারে তার যাযাবর চরিত্রের সাথে খাপ খেয়ে গেছে যেন৷ কি ভাবে হুটহাট ঘুরতে চলে যেতে হয় এবং এক-দুই ঘন্টার একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে যে ভ্রমণ, ইতিহাস ও প্রকৃতির মিতালির স্মিফোনি তৈরি করা যায় এই গল্পটা না পড়লে জানা হতো না৷
এমন আরও গল্পের সমন্বয়ে "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা"র পান্ডুলিপি পড়ে আমার মিশ্র অনুভূতি হয়েছে৷ বইটিকে ঠিক ভ্রমণ বই বললে এর প্রতি অবিচার হয়ে যাবে৷ যেহেতু আশিক ভাই ভ্রমণ জনরা নিয়ে লিখেন সবাই ধরে নেন তিনি এই জনরার বাহিরে লিখেন৷ এই বইটাও তার পুণ্ড্রবর্ধনের স্মৃতিকথার মত ভ্রমণ,ইতিহাস, কিংবদন্তি, ঢাকাইয়া সংস্কৃতির এক যৌগিক মিশ্রণ৷
পান্ডুলিপি পড়ে আমার ভালো লেগেছে৷ আশা করি পাঠকের কাছে বইটি সাড়া ফেলবে
This entire review has been hidden because of spoilers.
এই নগরের অলিতেগলিতে যত গল্প আছে, পুরো দেশেও হয়তো তা নেই।
বলছি Ashik Sarwar রচিত "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" বইটির কথা। ওনাকে অনেকে ট্রাভেলার ও ভ্রমণকাহিনী লেখক হিসেবে চিনলেও তিনি তার লেখার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন "পুন্ড্রবর্ধনের স্মৃতিকথা" বইটিতে। ওই বইটি পড়ার পর থেকেই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম "গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা" বইটির জন্য। যদিও হাতে পেয়েছি বেশ কিছুদিন আগেই তবে ব্যস্ততার কারনে একটু দেরীতেই পড়া হলো।
গল্পের পটভূমি হিসেবে বলা যায় লেখকের নতুন প্রকাশনীর যাত্রা ও তার বাংলাবাজারে বিচরণ। সেই সাথে উঠে এসেছে লেখকের স্কুল পালানো দিনগুলো আর তার বিখ্যাত নদীর পাড়ের বাড়ির কথা। বইটিকে আপনি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে না দেখে যদি মনে করেন বাড়ির উঠানে বসে দাদুর কাছে কিসসা শুনছেন তাহলে খুব ভালো মতো উপভোগ করতে পারবেন। গল্প বুড়ো হিসেবে আশিক ভাইয়ের তুলনা মেলা ভার। কি আছে বইটিতে? গ্রান্ড এরিয়া, ধোলাইখাল, ভজহরি লজ, লোহারপুল, পাগলা পুল, ডিস্ট্রিলারি রোড, বিবি মরিয়াম কামান আর আমাদের ঢাকার প্রান, আমাদের বুড়ি মা, বুড়িগঙ্গার গল্প। আমার পুরান ঢাকায় বসবাস প্রায় ২৪ বছর ধরে, অলিগলির প্রায় সবই চেনাজানা। সেই আমিই দেখলাম আরে এটা তো জানতাম না, এই গল্প তো শুনা হয়নি আগে! কি বিচিত্র সেসব ঘটনা, হাওয়ার বেলুনের ঘটনা তো পুরাই নতুন ছিল আমার জন্য।
সর্বোপরি খুবই সাবলীল ভঙ্গিতে লেখা একটা চমৎকার বই মনে হয়েছে আমার কাছে, ১১২ পৃষ্ঠার বইটি একবসায় পড়ে ফেলার মতো। এখন অপেক্ষায় আছি "গল্পে শেষ হয়নি পুরাণ ঢাকার" বইটার জন্য।
আমার শশুড়বাড়ি পুরান ঢাকা৷ পুরান ঢাকা নিয়ে এত ইতিহাস আছে, এত গল্প আছে তা হয়তো লেখকের বই না পড়া হলে জানা হতো না৷ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি পরের বইয়ের জন্য৷
গঙ্গা বুড়ির তীরে গড়ে উঠা সেই শহর, বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির 'ঢাকা'; যার গল্পের মত ইতিহাস নিয়ে অনেকগুলো বই সংগ্রহে আছে। আদি ঢাকার গ্র্যান্ড এরিয়া বা গেন্ডারিয়া, ফরাসিদের গোড়াপত্তন করা ফ্রেঞ্চগঞ্জ বা ফরাশগঞ্জ, সনাতন বাবুর পুত্র শ্যামবাবুর বাজার বা শ্যামবাজার, নবাবদের বাগানবাড়ি বা শাহবাগ -আরো কত গল্প, কিন্তু আদতে নিরেট সত্য!
পড়ছি 'গল্পে গল্পে পুরান ঢাকা', লেখক আশিক সারওয়ার, প্রকাশক নটিলাস; চমৎকার লেখনীতে গল্পচ্ছলে ইতিহাস বর্ণনা করেছেন; বইপ্রেমীদের জন্য রিকমেন্ডেশন রইলো।