“মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরি পাড়ায় পাড়ায়। কোথাও বিধুর ময়রার দোকান। পিঁড়ি। বেঞ্চি পাতা, মাছি মন্ডা খায়… ধুলোয় ঈশ্বর কোটি গুটিসুটি বাদামী কুকুর। লোভের লালায় মজি সারাদিন। লীলা হয় কী সঘন রসে- মোদক একাকী ভাবে ভিয়েনের পড়ন্ত বয়সে।” (কবিতা: পাক) বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়— এই নামটির সঙ্গে আমার যৎসামান্য পরিচয় ছিল এমনই সব অপার্থিব-লেভেলের কবিতার রচয়িতা হিসেবে। তারপর কী হইতে কী হইয়া গেল। ধ্যানবিন্দু থেকে প্রকাশিত “সদানন্দনের পথ এবং অন্যান্য” নামক একটি শীর্ণকায় বই, যাতে কল্পবিজ্ঞানেরই গল্প ছিল, পড়ে মাথাটা স্রেফ খারাপ হয়ে গেল। কে লিখেছে এইসব আক্ষরিক অর্থে বিশ্বমানের গল্পগুলো? ব্লার্ব দেখে আবিষ্কার করলাম, সেটির রচয়িতা ইনিই, মানে এই কবিই। এ কী করে সম্ভব? তাঁরই লেখা আর একটা কবিতা একদিন চোখে পড়ে গেল~ “দুইটি উড়ন্ত চাকতি শূন্য থেকে অধিবৃত্ত পথে এসেছিল কাছাকাছি। পরস্পর নাভিবিন্দু হতে দূরত্ব যখন প্রায় সুনিশ্চিত শূন্য অভিমুখে সহসা নীলাভ এক…কী যে হল বিদ্যুৎ ঝিলিকে! অতঃপর অপসারী— যেরকম হয়ে থাকে…ক্রমে দু’জন দু’মুখে আর মহাকর্ষ বলের নিয়মে কোটি আলোবর্ষ পারে দেশ ও কালের অন্য দিকে আরেক উড়ন্ত চাকতির সাথে দেখা চকিত ঝিলিকে।” (কবিতা: শুভদৃষ্টি) মেনে নিলাম, হ্যাঁ, এমনটা সত্যিই সম্ভব। এই সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন হওয়ার পাশাপাশি কল্পনা আর বিজ্ঞানও এই মানুষটির করায়ত্ত। ইনিই পারেন! কেমন পারেন, তার আরও একঝাঁক নিদর্শন হাতে এল এই সুমুদ্রিত, অলংকরণ-বর্জিত অথচ অসম্ভব রুচিশীল প্রচ্ছদে শোভিত হার্ডকভারটির মাধ্যমে।
এ-কথা কোথাও লেখা হয়নি, তবে এই বইয়ের সব লেখাই শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য রচিত বলেই মনে হয়েছে। সত্যজিতীয় কনভেনশন মেনে সবক’টি লেখা থেকেই নারী চরিত্র সযত্নে বাদ দেওয়া হয়েছে। একটি নিতান্ত কেঠো, কেজো ভূমিকা-র পর এতে প্রথমে এসেছে এই গল্পগুলো: - ১. ফ্লোরিন মণ্ডলের তৃতীয় গ্রহে; ২. হাত; ৩. ২০৮৪; ৪. ঘোরানো সিঁড়ি; ৫. ভুতুড়ে বাঁক; ৬. অনুসরণ; ৭. একটি বিস্ফোরণের পরে; ৮. ম্যানোলিয়ার মূর্তি। এদের রচনাকাল বা প্রথম প্রকাশ সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। পড়তে গিয়ে লেখার ধাঁচ এবং বিষয়বস্তু থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় অবশ্য। থিম বা পরিবেশনের দিক দিয়ে এই গল্পগুলোকে ঠিক বৈপ্লবিক বলা চলে। অদ্রীশ বর্ধন, জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার, বিমল কর প্রমুখ রচয়িতা আটের দশকে এইসব থিম নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। এও স্বীকার্য যে এই থিমগুলোর অনেক-অনেক পরিণত ও পরিশীলিত প্রয়োগ আমরা পাই ‘সদানন্দনের পথ…’ গ্রন্থের বিভিন্ন গল্পে। তাছাড়া এই পর্যায়ের একাধিক লেখায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞান ও দর্শনকে যেভাবে দেখার চেষ্টা হয়েছে, সেটা… বেশ অস্বস্তিকর। ডগলাস অ্যাডামসের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে ‘২০৮৪’-কে যদিও বা নিই, ‘একটি বিস্ফোরণের পরে’ রীতিমতো চাপে ফেলে দেয়। এরপর এই বইয়ে এসেছে এই ক’টি উপন্যাস~ ১) রইল বাকি এক; ২) সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ; ৩) পারপিচুয়াল মেশিন; ৪) নিমো-পয়েন্ট অভিযান ১; ৫) নিমো-পয়েন্ট অভিযান ২। লেখাগুলো পড়লেই আমাদের ছোটোবেলায় কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান পত্রিকার পূজাসংখ্যায় প্রকাশিত বিভিন্ন রোমহর্ষক কল্পকাহিনির কথা মনে পড়ে। এগুলোতে অ্যাডভেঞ্চারের মোড়কে বিজ্ঞানের নানা তথ্য, তত্ত্ব, পর্যবেক্ষণের উপযোগিতা ইত্যাদি পরিবেশন করে তাতে গুপ্তধন উদ্ধার বা অনুসন্ধানের উত্তেজনাকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন মাত্রা, ভিন্ন সময়, ভিন্ন প্রযুক্তি— সবকিছুই এতে চালিকা-বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে পড়তে গিয়ে আবারও মনে হয়, নারী চরিত্র বর্জনের অদ্ভুত প্রবণতা গল্পগুলোকে লঘু এবং নিতান্ত নশ্বর করে দিয়েছে। ভাববার খোরাকের বদলে এরা রাশি-রাশি সংলাপ আর চরিত্রদের মধ্যে বাদানুবাদই শুধু জুগিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে মনে হয়, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগুলো ওয়ার্ক-ইন-প্রোগ্রেস। বিশ্বদেব তাঁর অপার্থিব ‘সদানন্দন’-স্তরে যাওয়ার পথে এগুলো রচনা করেছিলেন। তবে পথের ধূলায় ফেলে দেওয়ার মতো জিনিস এরা মোটেই নয়। গত শতাব্দীতে বাঙালির কল্পবিজ্ঞান-চর্চার উৎকৃষ্ট নিদর্শন হিসেবে সাহিত্যে এবং পাঠের ক্ষেত্রে এদের অপরিসীম মূল্য আছে। কল্পবিজ্ঞানের অনুরাগী হলে অবশ্যই অনুরোধ করব এই বইটিকে পড়তে। প্রকাশক উৎসাহী হয়ে দ্বিতীয় খণ্ড আনলে আমাদের সবারই লাভ, তাই না? অলমিতি।