'এল ডোরাডো ট্রিলজি'-র প্রথম বই এল ডোরা���োর রেশ টেনে দ্বিতীয় বইয়ের সূচনা। যেখানে আয়ান, হ্যামিলটন, টরেসকে নিয়ে কাহিনির শুরু হলেও শেষ হয়েছে হাজার বছর পূর্বে গিয়ে। যেখানে ছিল দেব-দেবীদের ছড়াছড়ি, ছিল তাদের বেঁচে থাকার লড়াই, শক্তির উৎসের জন্য সাধারণ মানুষদের উপর টর্চার, যুদ্ধ, ছিল মানব হ ত্যার মতো ঘৃণ্য বর্বরতা। সর্বোপরি ছিল একটি শহর। সোনার শহর, এল ডোরাডো!
এল ডোরাডোতে দেখা যায় আয়ান ও হ্যামিলটন ডোরাডো শহরে যায়। সেখানে তারা একটি অর্ব পায়। যাকে স্মৃতি অর্ব বলে। যেখানে হাত রেখে চোখ বন্ধ করলে অনায়াসে হারিয়ে যাওয়া যায় বহু বছর পূর্বের ইতিহাসে। মৃদিতা, মিহান, নিসা, মিকা, শাহিনদের সময়ে।
◾ক্যালিদিয়া রাজ্য—
যা বর্তমান পৃথিবীতে এক অভিশপ্ত শহর হিসেবে বিবেচিত হলেও বহুবছর পূর্বে তা ছিল সাধারণ মানুষ ও দেবতাদের আবাসস্থল। যেখানে থাকতো দেবতা মিথিয়াস, দেবতা প্রমিথিউস, দেবী লিলিয়া, দেবী ফিলোরা, দেবী লামিসা, দেবতা মিনহা, দেবী নিয়ায়া, অপদেবতা হেমলিথসহ আরো অনেকে। এদের মধ্যে সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যাওয়া কিছু দেব-দেবীও ছিলেন। যারা কিনা সাধারণ মানুষের প্রেম, ভালোবাসা, ভয়, প্রার্থনার অভাবে একসময় পাথরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আর কখনই জেগে উঠেননি। কিন্তু দেবতাদের পাথরে পরিণত হওয়ার কারণ কি? এর পেছনে কি আছে অন্য কোন রহস্য?
ক্যালিদিয়া রাজ্যে গত ১০০ বছর আগে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় সে যুদ্ধের বলি হয় লেসিথ গ্রাম। গ্রামটি হয়ে যায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন। বেঁচে থাকে হাতেগোনা কয়েকশো মানুষ। আর এ যুদ্ধের জন্য দায়ী করা হয় অপদেবতা হেমলিথকে। যে কিনা কোনো এক অজানা কারণে দেবতা প্রমিথিউসের বাহিনীকে বারেবারে পরাজিত করতে চায়। কিন্তু কি সে কারণ? কেন ভাইয়ে ভাইয়ে এ শত্রুতা?
লেসিথ রাজ্য ধ্বংস হওয়ার ১০০ বছর পর আবারো মেউকদের আক্রমণ! আর এবার মৃদিতা, মিকা, নিসা, মিহান আর শাহিনদের গ্রাম দিনাসে করা হয়েছে আক্রমণটা। যে আক্রমণে মিহান হারিয়েছে মৃদিতাকে আর নিসা হারিয়েছে তার মা ও মিকাকে। কিন্তু মৃদিতা আর নিসা কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? তাদের কি ফিরে আসার কোনো উপায় নেই?
ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসে অধিনায়ক সিকলাস, সহ-অধিনায়ক ম্যানিয়া, অধিনায়কের সহযোগী জিনা। এরা সকলেই ক্যালিদিয়া রাজ্যের মানুষদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতেও সদা প্রস্তুত। এরপর আরো কয়েক দফা আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ আর যুদ্ধ চলতেই থাকে। যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে বইয়ের শেষ কয়েক পৃষ্ঠায়। কিন্তু এতো যুদ্ধের শুরুটা কোত্থেকে? মানুষদের উপর দেবতাদের এতো কিসের লড়াই? ক্ষোভের নাকি বেঁচে থাকার?
◾বইটা না পড়লে বোঝা দায় বইটায় ঠিক কি কি আছে! এ বইটায় ফ্যান্টাসির চেয়েও মিথলজির ছোঁয়া বেশি ছিল। এছাড়াও ছিল মারাত্মক থ্রিল, রহস্য। যে রহস্যের সমাধান শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে হয়েছিল। সিরিজের প্রথম বইয়ের থেকে এ বইটাই বেশি ভালো লেগেছে। সাধারণত এমন সিরিজ পড়তে গেলে প্রথম আর শেষটাই বেশি ভালো লাগে। আর মাঝেরটা মনে হয় লেখকরা খেই হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু এ সিরিজটা তার বিপরীত। বরং আমাকে বইয়ের গভীরে আরো বেশি করে টেনে নিয়েছে।
বইটিতে ছিল দারুণ দারুণ সব টুইস্ট। একটা হজম করতে না করতেই আরেকটা হাজির। শেষদিকে টুইস্টের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছিল আর আমি হা করে সবটা হজম করছিলাম। যাকে শত্রু ভেবে ঘৃণা করছিলাম তার কাজকর্মের মাঝে আর কোনো ভুল দেখতে পারছিলাম না। যাকে সাধু মনে হচ্ছিল সেই হয়ে যাচ্ছিল আসল ভিলেন। মানে সবটা হজম করতে একটু কষ্টই হয়েছে।
কালকে শেষ করলেও তার রেশ আজও কাটেনি। বরং কোথাও একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। যে ফাঁকা জায়গাটা মিকা আর মৃদিতার হারিয়ে যাওয়ায় তৈরি হয়েছিল, সেটা পূরণ হয়ে গেলেও সিকলাস আর ম্যানিয়ার এ ফাঁকা জায়গাটা পূরণ হওয়ার নয়। একটা আক্ষেপ রয়ে গেলো। এতগুলো বছর একসাথে কাটিয়েও ম্যানিয়া কেন কিছুই বুঝতে পারলো না? কেন বুঝতে পারলো না সিকলাসের চোখের শেষ চাহনি! কেন জিনাকে সবটা বুঝিয়ে দিতে হলো! জিনার কথা উঠলেও খারাপ লাগা কাজ করে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বোধহয় একেই বলে! কিন্তু এদের প্রত্যেকেই নিজেদের ভালোবাসার থেকেও রাজ্য, রাজ্যের মানুষদের বড় করে দেখেছে। প্রতিটি মহৎ প্রাণ!
◾এতো ভালোলাগার মাঝেও আমার কিছু প্রশ্ন জাগলো মনে। যারা বইটি পড়েননি তারা এইটুকু এড়িয়ে যাবেন।
১. মিহানের বাবা রাত করে কোথায় যেতো? বুঝলাম সে দেশকে বাঁচানোর জন্য সেদিন মিথ্যে বলেছিল। কিন্তু তার রাত করে বের হওয়া, বিজয় উৎসবে অনুপস্থিত থাকার কোনো কারণ দর্শানো হয়নি।
২. সিকলাসের মা সিয়ারা কি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন নাকি কোনো দেবী? সাধারণ মানুষ হয়ে থাকলে সে কিভাবে একজন দেবতার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলে একজন সন্তানের মা হয়ে গেলেন? যেখানে সিকলাসই তার বাবার বর্ম গাঁয়ে দিয়ে টিকতে পারে না, সেখানে সিয়ারা কি করে দিব্যি বেঁচে আছে?
৩. একজায়গায় দেখা যায় দাউস ম্যানিয়াকে ইনডিরেক্টলি পছন্দ করে সেটা বোঝায়। সিকলাসও উপস্থিত থেকে সবটা দেখে। আর দূর থেকে তাদের এ খুনসুটি দেখে দেবতা মিথিয়াস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আর তখনই তার কাঁধে হাত রাখে দেবতা মিনহা। আর বলে, 'এটাই একমাত্র উপায়।
কিসের কথা বলা হয়েছে এখানে? কোন উপায়ের কথা বলা হয়েছে? বুঝতে পারিনি।
৪. শেষদিকে সিকলাস মিথিয়াসের বর্ম পরে একে একে প্রমিথিউসসহ যোদ্ধা দেবতার সকলকে শেষ করে। কিন্তু শেষদিকে আরো কিছু যোদ্ধা দেবতাদের দেখা যায়। শেষ মুহূর্তে এ যোদ্ধা দেবতারা আসলো কোত্থেকে? যারা সাগর পারে যায় এবং পাথরে পরিণত হয়?
আরো কিছু প্রশ্ন আছে। এ মুহূর্তে মাথায়ই আাছে না। যেহেতু সিরিজের আরেকটা বই বাকি আছে, তাই এ প্রশ্নগুলোর উত্তর সেখানেও পেতে পারি। তবুও এখানে টুকে রাখলাম যেন ভুলে না যাই। আর যদি তৃতীয় বইয়ে এ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা না থাকে, তবে লেখক সাহেবের কাছে অনুরোধ, আপনি ক্লিয়ার করে দিবেন।
◾সবশেষে বলতে চাই, বইটি নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই আমার। পছন্দের বই হয়ে গেল এটি। লেখকের লেখনী দারুণ। ঠিক সময়ে পাঠকদের মনে হাজারো প্রশ্নের সৃষ্টি করেছেন তিনি। আর সেই প্রশ্নের উত্তর বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত একটা একটা করে বলে দিয়েছেন। কোথাও মনে হয়নি অতিরিক্ত কিছু এড করা হয়েছে। বরং মনে হয়েছে এর থেকে ভালো করে লিখা সম্ভবই নয়।
তবে বানান নিয়ে অভিযোগ আছে। বেশ অনেকগুলো বানান ভুল পেয়েছি। কিছু কিছু বাক্য আছে যেগুলো কয়েকবার করে পড়ে তারপর বুঝতে হয়েছে। তাই মাঝে মাঝে থামতেও হয়েছিল। এছাড়া বাকিসব ঠিকঠাক।
বই- এল ডোরাডো কার্স
লেখক- আমিনুল ইসলাম
প্রকাশনী- নয়া উদ্যোগ
পৃষ্ঠা সংখ্যা- ২৭২
মূল্য- ৫০০ টাকা