'তিনজন' নিঃসন্দেহে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে সাহসী এবং উচ্চাভিলাষী একটা কাজ। গল্পটা শুরু হয় এক যুবকের নিত্যদিনের কার্যকলাপ দিয়ে। অথবা বলা যেতে পারে একজন হিপোক্রেট গোছের সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেটেড যুবকের মাথায় চলতে থাকা চিন্তাভাবনা নিয়ে, সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা যা নিয়ে স্বভাবতই মানুষজন কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে, এবং আমিও লিখতে অস্বস্তি বোধ করছি। সুতরাং ধরে নিতে পারেন আপনিও পড়ার সময় বেশ অস্বস্তি বোধ করবেন৷ সেক্ষেত্রে বইটা পড়ার/কেনার আগে অবশ্যই ভেবে দেখবেন তিনবার।
এরপর আস্তে আস্তে মানুষের খুব সহজাত প্রবৃত্তিগুলো, অনুভূতিগুলো একে একে আসতে থাকে লেখায়। কীভাবে নস্টালজিয়ায় ফেঁসে সামনে আগাতে নিজেদেরকে নিজেরাই বাঁধা দেই, কীভাবে ছোটখাটো ভুলের জন্য নিজের সত্তাকে মনে মনে চাবুক মেরে রক্তাক্ত করে ফেলি অথচ বড় ভুলগুলোর বেলায় অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে নিজেদেরকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করি, কীভাবে এখনকার জেনারেশন যেকোনো সমস্যাকে 'ইমোশনাল ক্রাইসিস' বা 'এক্সিসটেনশিয়াল ক্রাইসিস' সিল মেরে চিন্তাগুলোকে পোষ মানানোর চেষ্টা করি।
ভয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া খুব কমন একটা ব্যাপার। সিনেমায় এই দৃশ্য বহুবার দেখা হয়েছে, বইয়ে আরো বেশিবার পড়া হয়েছে। সেই ভয়ের অনুভূতি বোঝাতে লেখক লিখেছেন, "সরতে সরতে রাফায়েত দেয়ালে পিঠ ঠেকালো। দেয়ালের সিমেন্টে ঠান্ডা লাগলো পিঠের চামড়ায়। এই দৃশ্যটা আগে ও সিনেমায় বহুবার দেখেছে। তখন বোঝেনি মানুষ ভয় পেলে কেন এমন করে। এবার বুঝলো। আসলে এই কাজটা প্রতিরক্ষার কৌশল হিসাবে যথেষ্ট ভালো, সব বিপদকে চোখের সামনে রাখা যায়।"
অসহায়ত্ব আরেকটা চেনাপরিচিত অনুভূতি। সেটার বেলায় লেখা হয়েছে, "সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব যেন ওকে ধাক্কা দিয়ে নিজের বুক থেকে সরিয়ে দিয়েছে, পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে রাফায়েত তার গভীর রহস্য বুঝবার যোগ্য নয়।"
লেখক ওয়াসি আহমেদের কথার সূত্র ধরে বলতেই হয়, তিনজন বইতে লেখক ক্যারেক্টারগুলোকে দিয়ে অনেক প্যাচাল পাড়াইছেন। আর এই প্যাচালগুলোই বইয়ের বেস্ট পার্ট। সেই প্যাচালগুলোর মধ্যে ছিলো, আলবেয়্যার কাম্যু-র বর্নিত এবসার্ডিজম, আর সেই এবসার্ডিজম এর সাথে ব্যাটম্যান কমিকসের কোন চরিত্র কীভাবে মিলে যায়। সেখানে ছিলো একজন সাধারন মানুষ আর একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য - একজনের কাছে গোলাপ ফুল তার প্রিয়জনের মন পাওয়ার মাধ্যম, আরেকজনের কাছে মহাবিশ্বের সৌন্দর্য্য নতুন করে চেনার মাধ্যম। কখনোবা কথা হয়েছে বিজনেসগুলো কীভাবে কস্ট আর একাউন্টেবিলিটি কমিয়ে কনজিউমারিজমের ঘাড়ে সব সমস্যা চাপিয়ে দেওয়ার ধান্দায় থাকে। আধুনিক লেখাগুলো কীভাবে সিনেমা হতে চাইছে আর শিল্পীরা কীভাবে সমালোচনা-নির্ভর শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ছে তা নিয়ে বিস্তর আলেচনা ছিলো। আরো অনেক প্যাচাল ছিলো যা বরাবরের মতোই আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। লেখকের সাম্প্রতিক সময়ের বইগুলোর মতো এখানেও ফিলোসোফিক্যাল ডেপথ ছিলো।
কাহিনীর বিচারে 'তিনজন' পুরোপুরি জনরা ফিকশন না, লিটারেরি ফিকশনের ছোয়াটাই বেশি। বইটার প্রথম দিকে যতটা উপভোগ করছিলাম শেষে গিয়ে সেটা পুরোপুরি বহাল থাকেনি। শেষের দিকে তাড়াহুড়ো স্পষ্ট। তিনজনের গল্পে তিন জনের ক্যারেক্টার আর্কও যেন ঠিক পূর্ণতা পেলো না। লেখক একজনকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তবুও, জার্নিটা উপভোগ করেছি নিঃসন্দেহে।
"সাধারণ মানুষ লাল গোলাপ দেখলে ভাবে এটা আমার প্রেমিকার সুন্দর লাগতে পারে। তার কাছে প্রেমিকার আনন্দটা জরুরি, ফুল হচ্ছে সেই পর্যন্ত পৌঁছানোর পথমাত্র। কবি জিজ্ঞেস করে-এই গোলাপের লাল যদি হ্রদের পানিতে দেখা যেতো তাহলে কেমন হতো? যদি ডালে ফুটতো সন্তান বড়ো হবার গর্বমেশানো বিষণ্ণতা, মেঘের ওপর যেভাবে মন ছবি বসাতে পারে সেভাবে যদি বসাতে পারতো কংক্রিটের দেয়ালের ঝুলে থাকা পলেস্তারায়, যদি নতুন একধরনের একাকীত্ব আবিষ্কার করা হয় তবে সেটার নাম কী হবে?"
শুরুটা চমৎকার, কিন্তু শেষে এসে মিইয়ে গেল যেন। পরিধি আরেকটু বড় হতেই পারত, তাহলে খুব সম্ভবত পূর্ণতা পেত। তানজীম রহমান টান টান অ্যাকশনধর্মী লেখা থেকে সরে এসেছেন, তবে ফিলোসফিক্যাল লাইনগুলো আমার বেশ লেগেছে। সবার ভাল লাগবে কিনা আমি সন্দিহান, বেশিরভাগ মানুষই গল্পে বিশ্বাসী, ফিলোসফি তে না। কয়েকটা অ্যানালজি দুর্দান্ত লেগেছে, যেমন, ব্যাটম্যান ও কামুর টা। বইয়ের প্রোডাকশন খুবই বাজে, আদী প্রকাশনের প্রোডাশনের দিকে নজর দেয়া উচিত।
বিনোদন আর দর্শনের চমৎকার ককটেল। আজকের যুগেও যে আসলেই এত দার্শনিক চিন্তা ভাবনা করে কিছু মানুষ শুইতে যায়, অফিস করে, পর্ণ দেখে, বিয়ে করে, কফি খায়, ভয় পায়, কবিতা লেখে এসব ভাবতেই ভালো লাগে। বেশ লাগলো বইটা।
গল্পটা দুজনের হতে পারতো। কিন্তু হয়ে গেছে তিনজনের। প্রাইম এবং একইসাথে রহস্যময় সংখ্যা তিন। আমি, তুমি, সে। ক্রিস্টান ধর্মের হোলি ট্রিনিটি। ওয়ান, টু, থ্রি.... গো।
তিনজনের লেখক তানজীম রহমানের নিরীক্ষাধর্মি লিখালিখির সাথে অনেকের পরিচয় আছে। যাদের তানজীমের রাইটিং এর সাথে এখন পর্যন্ত দেখা-পরিচয় হয় নি, কিন্তু তাঁরা রিডার হিসেবে কৌতুহলী তাদেরকে তানজীম রহমানের বইগুলি পড়তে রেকমেন্ড করছি। কেন করছি? বলছি তৃতীয় প্যারায়।
প্যারার কথাই যখন আসছে তখন রাফায়েতের কথা চলে আসে। আমাদের সমাজে প্রায় ট্যাবু একটি বিষয় হলো মানুষের যৌন জীবন। সামাজিক ভাবে আধা ঢাক আধা গুড় অবস্থায় থাকা সেক্স সম্পর্কে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মাঝে কাজ করে নানান রকমের ডিলেমা।
রাফায়েতও এসব ডিলেমার বাইরের কেউ নন। বরং নার্সিসিস্ট প্যারেন্টিং, অতিরক্ষণশীল চিন্তাচেতনার শিকার একজনের মধ্যে যখন প্রাকৃতিক এই অনুভুতির সৃষ্টি হয় তখন সে কী কী ভাবতে পারে এবং কীরকম এলোমেলো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে পারে তা লেখক তাঁর কল্পনাশক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে ছাপার অক্ষরে নামিয়ে এনেছেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে রাফায়েত তো শুধু একজন, বাকীরা কই? আছে, রুদ্রা আছে। অদ্ভুত এ মেয়ে ঠিক কী কারণে রাফায়েতের মতো ���লায়নপর, ভিতু একজনের প্রতি আগ্রহের চেয়ে একটু বেশি দেখাচ্ছে?
ঘটনাচক্রে রাফায়েতের বিভিন্ন গোপন অভ্যাসের সাথে এদেশের বিশাল সংখ্যক প��রুষ নিজেকে হয়তো কিছুটা রিলেট করতে পারবেন। সেক্সুয়ালি ডিপ্রাইভড একজনের সামনে যখন মেঘ না চাইতে জল চলে আসে তখন অসম্ভব এবং আজব কাজ করতে পর্যন্ত সে রাজি হয়ে যেতে পারে।
'তিনজন' এ পপ কালচারের অনুসারীরা পেয়ে যেতে পারেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনের এবং চিন্তার খোরাক। কমিক্সের লিজেন্ডারি চরিত্র ব্যাটম্যান এবং তাঁর ভিলেনদের নিয়ে আলবেয়ার ক্যামুর অ্যাবসার্ড ম্যান আইডিয়ার যে সমিল দেখানো হয়েছে তা ইন্ট্যারেস্টিং। তাছাড়া ঘটনাচক্রে পাঠক ট্রিট হিসেবে পেতে পারেন বিভিন্ন বই, টিভি সিরিজ, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সমসাময়িক অঘটন-ঘটন-পটিয়সী কাজকারবারের প্রতি হাল্কা নডের দেখা।
তানজীম রহমানের লিখা আসলে চোখে চোখে পড়ার নয় শুধুমাত্র। বরং মনে একটা ছাপ রেখে যায়। প্রতিটি মানুষ বুঝে, না বুঝে যেসব দার্শনিক প্রশ্ন এবং প্যারাডক্সের মুখোমুখি একান্ত অনিচ্ছায় হয়ে যায়, সেগুলির দেখা লেখকের লিখালিখির মধ্য দিয়ে হেঁটে কিংবা ছুটে আসলে সচেতন পাঠকের উপলব্ধির রাডারে ধরা পড়তে পারে।
তানজীম রহমান আমার মতে থ্রিলার মেন্টর মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের প্রকাশনায় রাইটিং ক্যারিয়ার শুরু করা বেশ কিছু সফল তরুণদের মাঝে খুব সম্ভবত সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট রাইটার। তিনি যখন লিখেন কয়েক স্তরে লিখেন। পাঠকের জন্য কিছু ছেড়ে দেন। আবার নিজের কাছে কিছু রেখে দেন। আবার সেই তানজীমই মানব চিন্তার সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনেক বিষয়-আশয় সাহিত্যমান ঠিকঠাক রেখে সহজে লিখতে পারেন।
মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের নিয়ে একদম মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচে লেখক যেভাবে আলাপ করেছেন তা প্রশংসার দাবী রাখে।
তাছাড়া এই উপন্যাসে কিছু বিখ্যাত মানুষজনের ক্যামিও আছে।
আর আছে জাদু। ক্যাওস ম্যাজিক।
এতসবকিছুর মাঝে লেখক তানজীম রহমান অত্যন্ত সাহসী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক নভেল রচনা করেছেন। প্রতিনিয়ত নিজ কাজ নিয়ে লেখকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাকে রীতিমত নানামুখি রিস্কের মধ্যেও ফেলে দিতে পারে।
তিনজনে আছে মানুষের মধ্যকার প্রচন্ড যৌনহিংসার আখ্যান, আছে জাদু, আছে উত্তরসত্যের যুগে ভেঙে পড়া নৈতিকতা থেকে উদ্ভুত ধূসর থেকে ধূসরতর মনস্তত্ত্বের দেখা, তানজীমের জ্যামিতিক কল্পনাশক্তির হাত ধরে।
উপন্যাসের শুরুটা যেরকম অগ্নিময় ছিলো, শেষের দিকে এসে একটু ছন্দপতন হয়েছে কি? এন্ডিং কি একটু রাসড?
নাকি তানজীম রহমানের কাছ থেকে তাঁর পাঠকের প্রত্যাশা প্রায় সব সময় একটু বেশি হয়?
বই রিভিউ
নাম : তিনজন লেখক : তানজীম রহমান প্রচ্ছদ : ওয়াসি আহমেদ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৪ প্রকাশক : আদী প্রকাশন রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
আমি সম্ভবত এই বইয়ের টার্গেট অডিয়েন্স নই। এই বই থেকে আমার নেয়ার কিছুই নেই। না পড়লেও কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি হতো না। তানজীম ভাই ভালো লেখেন, সেই সুবাদে পড়ে যাওয়া।
না, বইটাকে খারাপ বলছি না। প্রথমেই যেমন বলেছি, আমি টার্গেট অডিয়েন্স নই।
প্রচ্ছদটা অসাধারণ। বইটা হাতে তুলে নিতে ওটাই প্রলুব্ধ করেছিল।
ইন্টারেস্টিং বেশ। অনেক রকম দার্শনিক কথাবার্তা পেলাম, নানারকম বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা পেলাম। একেকটা দৃশ্যপটে চরিত্রগুলোর ডেপথ বোঝা গেলো, কতরকম চিন্তা করতে পারে একটা মানুষ সেসব বোঝা গেলো। এইরকম টপিক নিয়ে বই লিখে লেখক বেশ সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন বলাই যায়। তবে শেষটা আরো গোছানো হতে পারতো। ঠুস করে শেষ হয়ে গেলো।
বেশ ভাল লেগেছে, তানজীম রহমানের লেখা আমার কাছে অনেক ভাল লাগে, তার কারন এক্সপেরিমেন্ট, প্রত্যেকটা বইয়ে ভিন্ন কিছু করার ইচ্ছা,প্রচেষ্টা সবশেষে সফল। এই বইয়ের মাঝে থাকতেই মনে হচ্ছিলো "মাইডাস টাচ" ছাড়া প্রোপার এন্ডিং সম্ভব না। তবে দিনশেষে হতাশ হয় নি।
This book introduces a new Tanzim Rahman. His writing style feels different from his previous works, and honestly, I kinda liked this version of him. The characters are interesting and very relatable, making it easier to connect with their journey. Plus, the book is compact and well-written — not unnecessarily stretched like many other books.
The Bad Stuff
Maybe I'm confused about the genre, but the story didn't hit me as much as I expected. One of my biggest issues was the misplaced backstories. It felt like they were creating a wall between the main timeline, constantly breaking the flow of the story. There were several moments when I genuinely wanted to quit reading, but the only reason I kept going is because of Tanzim Bhai — one of my most favourite writers.
Overall Verdict
I'll give 3/5 to Tinjon. The concept is great, but the writing style wasn't exactly for me. However, this is just the beginning of this new Tanzim Rahman. I'm pretty sure the upcoming books will be more interesting — and we'll get to see more of this experimental side of him.