শোনা যায় পীর মোমেনশাহ্-র নামেই ময়মনসিংহ। অবিভক্ত বাংলার সবচেয়ে বড় জেলা ছিলো ময়মনসিংহ। পূর্ববঙ্গ গীতিকার সিংহভাগ রচিত হয়েছিলো এই জেলায়। অপরূপ সেই গীতিকা-কাহিনির চরিত্রদের বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসা নিয়ে এই আখ্যান।
Amar Mitra (Bengali: অমর মিত্র (born 30 August 1951) is an eminent writer in Bengali living in Kolkata, West Bengal, India. A student of chemistry, he has been working for the Land Reforms Department of The Government of West Bengal. He was awarded with Sahitya Akademi Award for his novel Dhurbaputra (Bengali: ধ্রুবপুত্র) in 2006. He has also received the Bankim Puraskar from Government of West Bengal for his novel, Aswacharit (Bengali: অশ্বচরিত) in 2001, kAtha award for his short story 'Swadeshyatra' in the year 1998, Mitra O Ghosh award in the year 2010, Sharat puroskar in the year 2018 and edited the new generation Bengali Webzine Bookpocket.net and Katha Sopan, a Bengali literary Magazine. He participated in the First forum of Asian countries' writers held in Nur Sultan city, Kazakhstan in September 2019 and was present in the inaugural session presided by the hon'ble President Of Kazakhstan. Awarded with 2022 O' Henry prize for his short story, The Old man of Kusumpur (গাঁওবুড়ো). He is the first Indian language recipient of O' Henry prize for short fiction. His novel Dhapatir Char has been translated in to English and published by Penguin Random House, in their vintage section.
মোমেনশাহী উপাখ্যান লেখক- অমর মিত্র দে'জ পাবলিশার্স পৃষ্ঠা- ৩২৫ টি
প্রথম পর্ব: "পাতাল-আন্ধার বৃত্তান্ত"
[মুলত এই প্রথম পর্বে ১২৮০ সালের দিকের রাজা জানকীনাথ ও কমলা রানীর আখ্যান ও ১৫৯৪ সালের পরে ক্ষমতায় আসা সোমেশ্বর পাঠকের কথা উঠে এসেছে।]
সোমেশ্বরী কলোনীতে এই মোমেনশাহী উপাখ্যানের যাত্রা শুরু। যে সোমেশ্বরী কলোনী কলকাতায় অবস্থিত। এবং সেখানে বসবাস করতে এসেছিলো সোমেশ্বরী নদীর তীরবর্তী মানুষ যারা কলকাতায় অভিবাসন নিয়েছিলো! সেখানে কমলা সায়র নামে একটি দিঘিও ছিলো। যখন নগরায়নের ছোবল পড়া শুরু হয়েছে তখনই এ আখ্যানের যাত্রা শুরু। সুধীন্দ্র তার স্ত্রী কুমুদিনীর অনুপ্রেরণায় মোমেনশাহী আখ্যান লিখতে শুরু করে। যেখানে কমলা রানির পালা এর পেছনের প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতা পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিপুল সোম যিনি ছিলেন সুধীন্দ্রের প্রতিবেশী এবং তার পূর্ব পুরুষ ছিলো ময়মনসিংহের রাজা জানকীনাথের পারিষদ। বিপুল সোমের 'সোম' উপাধি এসেছে 'সোমেশ্বরী'(নদী) শব্দ থেকে। যা সম্মানসূচকভাবে দিয়েছিলেন সেই রাজা।
খবরিয়া বানেশ্বর যে মুলত একজন সাংবাদিক (যাকে খবরিয়া নামে সম্মোধন করা হচ্ছে) সে কমলা রানির সময়কালে খবর ফেরী করে বেড়িয়েছে। এবং অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে আবির্ভূত হন এক সময়ে!
গণকঠাকুর ত্রিলোচন, চিকন গয়লানি, লীলাময়ী(অথৈচন্দর), সুবুদ্ধ, প্রবুদ্ধ এরা সবাই কমলা রানির সাথে কোনো না কোনো ভাবে সম্পর্কযুক্ত! ত্রিলোচন যার পেশা গণনা করা, তিনি গণকঠাকুর হিসেবেও পরিচিত। সে কমলার বিয়ের আগে তালুকদার কন্যা কমলার ভাগ্য গণনা করতে যায় এবং কমলাকে বিয়ে করার লোভে পড়ে। যদিও ইতোমধ্যে বৃদ্ধ ত্রিলোচনের এক ষোড়শী বউ রয়েছে যার নাম লীলাময়ী। (লীলাময়ীর আবার প্রেমিক ছিলো যার নাম অথৈচন্দর) চিকন গয়লানির সহায়তায় কূট চক্রের সাহায্য নিলেও সফল হয় না গণকঠাকুর। বরং বৃদ্ধা চিকন গয়লানি ও ত্রিলোচন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। অন্যদিকে তালুকদার কন্যা কমলার বিয়ে হয় রাজা জানকীনাথের সাথে। এবং কমলা রানি বনে যায়। আবারও চিকন গয়লানির কূটচালের অংশ হিসেবে কমলারানি রাজাকে সায়র খনন করতে পরোচিত করে। এবং সায়র খনন করা হলে সায়রে জল উঠছিলো নাহ্। অবশেষে কমলারানি নিজে আত্মাহুতি দিলে সায়রে জল আসে। এই গল্পের মধ্যেই অনেক ছোট ছোট প্লট আছে যেগুলো বিভিন্ন পার্শ্ব চরিত্র নিয়ে কথা বলে(যেমন-সুবু্ধ, প্রবুদ্ধ) এবং বহেরাতলী গ্রাম, আইথর গাঁ সহ বেশ কিছু জায়গার আখ্যান তুলে এনেছেন লেখক পাঠকের কাছে। শেষ পর্যায়ে আবার বর্তমান সময়ে ফিরে আসে সুধীন্দ্র ও কুমুদিনীর কাছে। এসময়ে কুমুদিনী মারা যায় এবং সুধীন্দ্র নিরুদ্দেশ হয়! বিপুল সুধীন্দ্র এবং তার লিখিত মোমেনশাহী উপাখ্যানের পেছনে ছুটতে ছুটতে চলে আসে বাংলাদেশে।
দ্বিতীয় পর্ব: "লীলাবতী, খবরিয়া ও আয়না বিবির বৃত্তান্ত"
[এ পর্বে বিপুলের বাংলাদেশ আগমন, অতীন সরকারের সাথে সাক্ষাৎ ও নতুন উপাখ্যান জানা, ১৭৭০ এর হাজংদের নিয়ে এসে হাতি খেদা কাজে নিয়োগ, ব্রিটিশ সরকারের হাতি খেদা আইনে নাক গলানো, বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯২৫ এ মনি সিং কর্তৃক হাতি খেদা পরিবর্তনে টঙ্ক প্রথা ও তারপর টঙ্ক প্রথার বিরোধীতা স্পষ্ট হয়ে আসে)
ইমতিয়াজ আলী চন্দ্রকুমার(একজন সাংবাদিক বা খবরিয়া) এবং বিপুল সোমের পরিচয় হয় এয়ারপোর্টে যখন বিপুল বাংলাদেশে আসে। এসে ইমতিয়াজ আলীর হাত ধরে বিপুল পৌঁছায় নেত্রকোনা এবং অতীন সরকারের সাথে দেখা করে। এখানে আবার নানা নতুন উপাখ্যানের কথা জানতে পারে বিপুল সোম। নেত্রকোনা আসার আগে আয়না বিবি নামে একজনের সাথে পরিচয় হয় বিপুল ও ইমতিয়াজ আলী চন্দ্রকুমারের যে আয়না বিবির আরেক কাহিনী পরবর্তীতে জানা যায়। সুসঙ্গ রাজা, সোমেশ্বর রাজার বিভিন্ন ব্যাপার আবারও পাঠকের সামনে ফুটে ওঠে। একই সাথে পাঠক পরিচিত হয় হাতি খেদা আন্দোলনের সাথে। যে হাতি খেদা আন্দোলন ছিলো ব্যাপক বিখ্যাত! হাজং সম্প্রদায়কে নিশুল্ক জমি দিয়ে হাতি ধরার বা খেদার কাজ দিয়েছিলো রাজা কিন্তু পরবর্তীতে হাজংরা হাতি ধরতে চাইতো নাহ্। কেননা এতে অনেক ঝুঁকি ছিলো এবং খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিলো। একইসাথে তারা বুঝতে পারে গারো পাহাড়ের সম্পদ এই হাতি। তারা এই সম্পদ ক্ষয়ে যেতে দিতে চায় নাহ্। আসবে মনি সিংহ এর নাম। যে রাজার ভাগনে হয়েও রাজা নয় বরং হাজংদের পাশে দাঁড়ায়। আসবে কেষ্ট হাজং এর কথা। এরপর হাতি খেদার বদলে আসে টঙ্ক প্রথা। যার মূল কথা জমিতে চাষ কোহ বা না হোকরাজাকে টঙ্কের ধান বা টাকা দিতেই হবে। একইসাথে এ পর্বে চম্পানগরে ত্রিলোচন ঠাকুর ও চিকন গয়লানির সংসারকে পাঠক দেখতে পারে। এবং লীলাময়ী নামে আরেকজনের পিছনে বিয়ের আশায় ঘুরবে ত্রিলোচন! একইসাথে আসবে অথৈচন্দ্রের কথা! অতীন, নীতিন, সুস্থির চন্দ্র, বিনু বৈরাগীর মতো বর্তমান সময়ের মানুষ গুলোর জীবনকেও যাপন করতে দেখবে পাঠক। আবার প্রাচীনকালের মানব গোমস্তা মহেশ্বরের কথাও উঠে আসবে একই সময় ও সুরে। যে ছিলো বিপুল সোমের পূর্বপুরুষ ও রাজার গোমস্তা। যাকে সোমেশ্বর রাজা সিমসাং নদীর পরিবর্তিত নাম সোমেশ্বরী নামানুসারে উপাধি দেন সোম। এভাবে আখ্যান সামনে এগোয়!
তৃতীয় পর্ব: "বুনো হাঁসের উড়াল"
[এ পর্বে টঙ্কের বিরোধিতা, ময়মনসিংহের কালেক্টর ব্যাস্টিন সাহেবের নিপীড়ণ, হাজংদের টঙ্ক বিরোধী আন্দোলন, কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে গিয়ে মাতা রাশিমনির শহিদ হওয়া সহ সে সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট চিত্রিত হয়েছে]
সুবুদ্ধ প্রবুদ্ধ এ পর্যায়ে আবার চলে আসে রূপকথার মতো! তারা আসে কুয়াশা থেকে এবং শেষে কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। এই দুজন মানুষকে এ উপন্যাসে এমন ভাবে দেখানে হয়েছে যা পুরোটা অতিলৌকিক! ময়মনসিংহের ঐ অঞ্চলে পুরাতন অনেক মানুষ মাঝে মধ্যে জীবন্ত হয়ে সামনে আসে আবার চলে যায় এই বিশ্বাসের চূড়ান্ত উদাহরণ এ দুজন! এই কাল্পনিক দুটো চরিত্রের সাথে মিশে যায় রুমি ঝুমি নামে দু বোন যারা অতীনও বিপুলের সাথে মিলে একসাথে মোমেনশাহী উপাখ্যান শোনে এবং বিতর্কে লিপ্ত হয়। এই দুটো চরিত্রও পুরোপুরি কাল্পনিক তবে এদের মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছান লেখক। সুবুদ্ধ ও প্রবুদ্ধ কে পিঠা খাওয়াতে চাও দিয়ে শুরু হয় এরপর আসে গারো পাহাড়ের দূর্গের কথা। যেখানে গারো পাহাড়ের কুয়াশার মাঝে গারো রাজা বাস করে এবং সোমেশ্বর পাঠক গারো রাজাকে সরিয়ে এ অঞ্চলে রাজ করে। এক পর্যায়ে এই দু রাজার মিলন দেখা যায়! সে আরেক রূপকথা(!) এদের এ ব্যাপারের সাথে সমান্ চলে হাজংদের হাতি খেদা আন্দোলনের পরে টঙ্ক আন্দোলন। মনি সিং যে আন্দোলনের মুল হোতা! এই টঙ্ক আন্দোলন দমন করার জন্য মরিয়া হয় ব্রিটিশ সরকারের নিযুক্ত ময়মনসিংহের সে সময়ের কালেক্টর ব্যাস্টিন সাহেব। সেই নির্যাতনের সময় কালের আগে বাংলায় ঘটে গেছে ১৯৪৩ এর মনন্তর। বাস্টিন সাহেব নিপীড়নের রূপ বর্ণনার জন্য পাঠকের সামনে লেখক নিয়ে আসেন আরেক আখ্যান। যেখানে ব্ল্যাঙ্কি নামের এক ডেমনকে কল্পনা করা হয় যে নিপীড়ন ও নির্যাতন চালাতে পটু। অতীত কতগুলো ইতিহাসকে সামনেও আনা হয়। তবে ব্ল্যাঙ্কি যখন আসে গারো পাহাড়ের আশেপাশে এ জায়গার সৌন্দর্যে সে মুগ্ধ হয় এবং নিপীড়নের পরিবর্তে সে সাবধান করে হাজংদের। এরপর চিত্রিত হয় মাতা রাশিমনির হত্যা, কুমুদিনী ধর্ষণ চেষ্টা ও মিলিটারির বর্বরতা। এভাবে পরবর্তীতে গল্প এগোয় ভারতের স্বাধীনতার দিকে। পরবর্তী সময়ে পিশাচ ব্ল্যাঙ্কি তার বিকট রূপ পরিবর্তন করে ��েলে এবং পরিযায়ী হাঁসের রূপ গ্রহণ করে। এবং সে শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চল থেকে উড়াল দেয় উত্তরে! এভাবেই সমাপ্তি হয় "মোমেনশাহী উপাখ্যান" এর।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
ময়মনসিংহ বিশেষ করে নেত্রকোনা নিয়ে একটা টান করতো হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে। এই বই কিছুটা তৃষ্ণা মিটিয়েছে। তবে ইতিহাসের তুলনায় রূপকথা ও অতিলৌকিকতা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। তবে তা পাঠককে তৃপ্তই করে। তবে বইয়ে লেখকের ভাষা বর্ণনার ধরন অনেক জটিল। নতুন পাঠকের বিরক্তির উদ্রেক অবশ্যম্ভাবী, এবং পড়ার গতি অনেক কমে যাবে এমন ধরনের লেখার ধরন! [আমার নিজের অনেক সময় লেগেছে অভ্যস্ত হতে] নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষা পুরোপুরি লেখক ধারণ করতে পারেননি। নেত্রকোনার মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তা আরও বেশি উপলব্ধি করেছি। সব মিলিয়ে "মন্দ নহে... খাঁটি সোনা বটে" তবে খানিকটা খাদ বোধহয় রয়েই গেছে।
This entire review has been hidden because of spoilers.