এই ধারাবিবরণীমূলক কথকতার পরতে পরতে বিছানো রয়েছে ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর অন্যান্য অনেক উপন্যাসের মতোই এটিও তন্নিষ্ঠ গবেষণার ফসল। তবে লেখকের মতে এটি শেষ পর্যন্ত একটি প্রেমের উপন্যাস।
প্রচ্ছদ এঁকেছেন - দেবব্রত ঘোষ বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়-কে।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর জন্ম ২৪ আগস্ট, ১৯৫১ সালে উত্তর কলকাতায়। রসায়নে বিএসসি (সম্মান), বাংলায় এমএ, সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা করেছেন। লেখকজীবন শুরু করেন সত্তর দশকে। প্রথম দিকে কবিতা লিখলেও থিতু হয়েছেন গল্প ও উপন্যাসে। তাঁর লেখা গল্পের সংখ্যা প্রায় ৩৫০। প্রথম উপন্যাস ‘চতুষ্পাঠী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। পাঠক মহলে সাড়া ফেলেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ এবং কলাম কিংবা রম্যরচনাতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর রচিত ‘হলদে গোলাপ' উপন্যাসটি ২০১৫ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ‘অবন্তীনগর' উপন্যাসের জন্য ২০০৫ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার, সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, গল্পমেলা, ভারতব্যাস পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সাহিত্যের বাইরে তিনি গণবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
"চতুষ্পাঠী ", "জলের উপর পানি"র আগের পর্ব, আমার পড়া সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটা। স্বভাবতই প্রত্যাশা বেশি ছিলো, সঙ্গে ভয়ও। এবারও গল্প শুরু হয়েছে অনঙ্গমোহনকে দিয়ে। টোলের পণ্ডিত, দেশভাগ যাকে পথে বসিয়েছে, অভাব যার সমস্ত দর্পচূর্ণ করেছে, সেই অনঙ্গমোহন আর তার পরিবারকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষের রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক।প্রামাণ্য, কারণ নিরন্তরভাবে জীবন বয়ে চলে। শত অপমানের পর, ছোট ছোট পতনের পর, প্রিয় মানুষের মৃত্যুর পর, প্রবল ঘূর্ণিপাকের পর - স্বপ্নময় কোথাও থামেন না। বাস্তবে ঘটে যাওয়া প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নির্বিকারভাবে উপস্থাপন করেন লেখক - নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে, চরিত্রগুলোকে দোষেগুণে জীবন্ত মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে। ব্যক্তিগতভাবে তৃপ্তি পেয়েছি, অনঙ্গমোহনের মতো ক্রমাগত পরাজিত হতে থাকা মানুষ স্বধর্মে স্থিত থাকতে পেরেছেন শেষ পর্যন্ত। বিলুর বাংলাদেশে আগমন ও পিতৃপুরুষের ভিটায় যাত্রার অংশটা উপন্যাসের গতি কমিয়ে দিয়েছে। নোয়াখালীতে ঘটে যাওয়া ছেচল্লিশের দাঙ্গা ও সেখানকার পরিস্থিতি,একাত্তরের ঘটনাপ্রবাহ বোঝাতে লেখক সরাসরি ইতিহাস বর্ণনা করেছেন এবং বিভিন্ন আলাপের সূচনা করেছেন যা অনায়াসে ভিন্ন পথে উপস্থাপন করা যেতো। তবে লেখকের আকাঙ্ক্ষা যা ছিলো ( যেমন -পুরো উপমহাদেশের রাজনৈতিক চিত্র অংকন, আপামর হিন্দু মুসলিমের মনস্তত্ত্ব বয়ান, নির্মোহ বিশ্লেষণ) তা পূরণে এসব বর্ণনা সহায়ক। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা যে সাধারণ ভুলগুলো করে থাকেন তা স্বপ্নময় করেননি, তিনি যথার্থই গবেষণা করে প্রতিটা বিষয় তুলে ধরেছেন। কিছু তথ্যগত ও শব্দগত ভ্রান্তি থেকে গেছে অবশ্য (মোহাজেরদের বলা হয়েছে মুজাহির, "বন্দী শিবির থেকে"কে বলা হয়েছে শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ)। উপন্যাসের উপসংহার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ও বহুস্তরবিশিষ্ট। দেশত্যাগের অভিঘাতে, সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় অনঙ্গমোহনকে অনেককিছু মেনে নিতে হয়েছে, একে একে ভুলতে হয়েছে আজন্ম লালিত বদ্ধমূল বিশ্বাস। সেই ধারায় চলতে চলতে অঞ্জলি আর বিলু এবার স্বেচ্ছায় যেখানে পৌঁছায়, সেখানে পৌঁছানো এখন আমাদের বড় প্রয়োজন। প্রয়োজন, কারণ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, উপমহাদেশ এবার যে বিভেদের মুখোমুখি তা ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের। যবনিকাপাতের অংশটুকু রীতিমতো অভাবনীয় ও অনবদ্য। চতুষ্পাঠীর মতোই "জলের উপর পানি" ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করবে।
প্রথমেই স্বীকার্য, গত কুড়ি বছরে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্য আমি খুব বেশি পড়িনি। তাই সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের হালচাল আমি খুব ভালো জানিনা। পূজাবার্ষিকীর কল্যাণে আগে নিয়মিত সুচিত্রা ভট্টাচার্য, বাণী বসু কিংবা সুনীল-শীর্ষেন্দু পড়তাম। কে জানতো, এইসকল আনন্দবাজারীয় ধনুর্ধরদের পাশাপাশি, আমার মতো অনেক বে-খবর পাঠকের অগোচরে, অসামান্য সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছেন দু-একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক। এদের মধ্যে স্বপ্নময় চক্রবর্তী, খুব সম্ভবত, সৃষ্টির উৎকর্ষতার দিক দিয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
স্বপ্নময়কে আমি চিনতাম মূলত ছোটোগল্পের লেখক হিসেবে। একটাই উপন্যাস পড়েছিলাম, "চতুষ্পাঠী"— এবং পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সাপ্তাহিক "রোববার" পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার সময়ে "হলদে গোলাপ" উপন্যাসটি বিচ্ছিন্নভাবে পড়তে গিয়ে বুঝেছি, বৃহৎ আকারের উপন্যাস রচনাতেও স্বপ্নময়ের কব্জি যথেষ্ট চওড়া। বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে "হলদে গোলাপ" একটি মাইলস্টোন। কিন্তু স্বপ্নময়ের ম্যাগনাম ওপাস যদি বলতে হয়, আমার মতে "হলদে গোলাপ" নয়, সেটা অবশ্যই "জলের উপর পানি"।
আমরা যখন কোনো মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশি, সেই মানুষটার একটা মানসিক অবয়ব তৈরি হয় আমাদের মনে। সেই মানুষটার ব্যাপারে একটা ধারণা তৈরি করি আমরা। তার সঙ্গে নিজের পছন্দ-অপছন্দ সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করি। দুজনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়। ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার আদানপ্রদান করার পরিসর তৈরি হয়। কিন্তু একদিন যদি হঠাৎ বুঝতে পারি, মানুষটিকে যেমনটা চিনতাম সে আদৌ সেরকম নয়। একদিন যদি মনে হয়, কে এই মানুষটা? এর সঙ্গেই কি মিশেছি এতদিন! আয়না ভেঙে গিয়ে প্রতিচ্ছবি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের চেতনার উতরাই সিঁড়িতে।
ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষরা যখন তাদের আজন্মের বাসভূমি ত্যাগ করে নতুন দেশে পদার্পণ করে, তাদের মনে অনেকটা একইরকম চিন্তার উদয় হয়। বহুদিনের পরিচিত ভূখণ্ডের যে-প্রতিচ্ছবি তারা হৃদয়ে লালন করে এসেছে জন্মাবধি, সেটা ভেঙে ছত্রখান হয়ে যায়। নিজের পুরাতন জগৎকে মনে হয় স্বপ্ন। নিজের সত্তাকে মনে হয় অচেনা। অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকা একটা সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে সে ভাবতে থাকে, যা চিনেছি যা বুঝেছি যা দেখেছি যা মেনে এসেছি এতদিন, সবই কি তবে ভ্রম? সবই কি ভুল? সাঁকোর দুলুনি ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে।
দেশভাগ এবং উদ্বাস্তুজীবন নিয়ে কথকতা বাংলা সাহিত্যে অসংখ্যবার করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অতি সমৃদ্ধ একটা অংশ জুড়ে রয়েছে অগণিত ছিন্নমূল মানুষের অশ্রুবাষ্প, বিষাদকুয়াশা। পঁচাত্তর বছর পূর্বের দেশভাগের ক্ষতচিহ্ন আজও রয়ে গেছে বাঙালিজাতির সম্মিলিত মননে। তাই সমাজসচেতন কথাসাহিত্যিক এতযুগ পরেও দেশভাগের বিপন্নতার মধ্যে থেকে খুঁজে নেন তাঁর উপন্যাসের রসদ, তাঁর সৃষ্টির প্রেরণা। এই উপন্যাসটি লেখার জন্যে যে-বিশদ গবেষণা করেছেন স্বপ্নময়, দুই বাংলা ব্যাপী যে-বর্ণময় পটভূমির বিস্তার করেছেন, তা আমাকে বিস্মিত করেছে। "মুগ্ধ করেছে" বলতে পারতাম, কিন্তু যন্ত্রণার কোরাকাগজে মুগ্ধতার জলছাপ ফুটে ওঠেনা।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা অদৃষ্টের হস্তক্ষেপে দেশভাগ হয়নি। দেশভাগ হয়েছিলো মুষ্টিমেয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সীমাহীন অপদার্থতার কারণে। দেশভাগ বিষয়ক কিছু পড়তে গেলে আমি খুব অবাক হই। ঈশ্বর নাকি অসীম ক্ষমতার অধিকারী। ঈশ্বরের ক্ষমতা কি মানুষের চেয়েও বেশি? ঈশ্বর কি পারেন নিজের অহংকে তৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে? ঈশ্বর কি পারেন ধর্মের নামে মানুষের পশুপ্রবৃত্তির বগলে সুড়সুড়ি দিতে? আমার মস্তিষ্কে দামামার মতো বাজতে থাকে— এই দেশভাগ হওয়ার কথা ছিলো না। এই দেশভাগ আটকানো সম্ভব ছিলো। খুব নিশ্চিতভাবে সম্ভব ছিলো। সত্যিই কি সম্ভব ছিলো?
হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং একাত্মবোধ নিয়ে কতো ভাবনা ছড়িয়ে আছে। মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান, মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দু তাহার প্রাণ। স্বাধীনতাপূর্ব অবিভক্ত বাংলাদেশের আর্থসমাজব্যবস্থায় হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্কের যা-কিছু বিবরণ আমি শুনেছি/ পড়েছি, তার পরে এই ধরণের ছড়াকে ছেলেভুলানো ছড়া বলে মনে হয়। যদি একই বৃন্তে দুটি কুসুম হতো, তবে মুসলমানদের খেতে দেওয়ার জন্যে আলাদা থালা-বাটি-গ্লাসের ব্যবস্থা রাখতে হতো না। আলাদা হুঁকো-তামাকের ব্যবস্থা রাখতে হতো না। একে অপরের অন্দরমহলে অবাধ প্রবেশ করার "অধিকার" থাকতো। উঠোনে দাঁড়ালে সেই মাটি কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ফেলে দেওয়া হতো না। এই চূড়ান্ত অপমানজনক সহাবস্থান যখন দীর্ঘদিন যাবৎ চলতে থাকে, এবং সেই সঞ্চিত অপমানরাশি যদি একদিন ভিসুভিয়াসের মতো লাভা উদগীরণ করে, তবে কাকে দায়ী করবো? মানুষকে? রাজনীতিবিশারদকে? নাকি স্বয়ং ঈশ্বরকে?
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর এই উপন্যাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি অনেক অপ্রিয় সত্যিকথাকে পরিত্যক্ত কুয়োর গভীর থেকে উঠিয়ে এনেছেন। দেশভাগ-বিষয়ক সাহিত্যের স্বাভাবিক রোমান্টিসিজমকে বজায় রেখেও তিনি উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বুনে দিয়েছেন তিক্ত প্রশ্নের বীজ। মানুষ মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করেনি। মানুষই তৈরি করেছে মানুষের নিয়তি। সেই নিয়তির কুঠারের আঘাতে মানুষ হারিয়েছে নিজের প্রাণ, নিজের প্রতিবেশী, বন্ধু, আত্মসম্মান, মনুষ্যত্ব, মান ইজ্জত, ভিটে মাটি, পুকুর দীঘি, দীঘির জলে প্রতিবিম্বিত আকাশের চাঁদ, ভোরের পাখির কূজন, বিকেলের চন্দনচর্চিত হাওয়া, সন্ধ্যার নিবিড় কুহেলিকা, একত্রে মিশে যাওয়া শঙ্খের ধ্বনি আর আজানের আহ্বান। নির্নিমেষ স্তব্ধতা।
লাল জামা গায়ে নীল জামা গায়ে এই রাজা আসে ওই রাজা যায় জামা কাপড়ের রঙ বদলায় দিন বদলায় না।
দিন কিন্তু বদলায়। চেনা মানুষকে হঠাৎ একদিন অচেনা মনে হয়। হারিয়ে যায় বিশ্বাস। আমরা নিজেরাও হারিয়ে ফেলি নিজেকে। ভাবি, আর কি কাউকে বিশ্বাস করতে পারবো কোনোদিন? তবু আবার বিশ্বাস জন্মায় অন্য মানুষের প্রতি। আস্থার জলসিঞ্চনে আবার গড়ে ওঠে নতুন সম্পর্ক। ঠিক যেমন ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়া মানুষের দল নতুন মাটিতে আবার ছড়িয়ে দ্যায় শেকড়। আবার বাঁধে বাসা। গাছতলায় মাথার উপরে উন্মুক্ত আকাশ থেকে হোগলার আচ্ছাদন। সেখান থেকে ঢেউটিনের চাল। সেখান থেকে পাকা ছাদ। নতুন দেশের নাগরিকত্ব। নতুন দেশের নতুন কিসিমের ভাষা। নতুন আশা। নতুনভাবে দাঁড়াতে শেখা। নতুন ইতিহাস। এ এক আশ্চর্য উপাখ্যান শুনিয়েছেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। চরৈবেতি চরৈবেতি শনৈঃ শনৈঃ চরৈবেতি। ইয়ার মিনিং নি বুইঝলেন আইজ্ঞা?
এটা আমার পড়া স্বপ্নময় চক্রবর্তীর প্রথম উপন্যাস। এবং এতেই উনি আমার অত্যন্ত প্রিয় সাহিত্যিকদের মধ্যে একজন হয়ে উঠলেন। এর আগে "হলদে গোলাপ" অনেকবার পড়ব মনে করলেও আজ অবধি পড়া হয়ে ওঠেনি। এই বইটা আমাকে Recommend করেছিলেন Arupratan দাদা, উনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাকে এমন একটা অপূর্ব বই Suggest করার জন্য।
এই উপন্যাসে ভারতীয় ভূখণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক যুগের কথা বলা হয়েছে যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যত নির্ধারিত হয় গুটিকয়েক মানুষের কথায়, তাদের কলমের আঘাতে এবং নিজেদের উদ্দেশ্যমূলক চিন্তায়। কী নেই এই বইয়ে? কৈলাশ দেবনাথ নামে একটি চরিত্রের বর্ণনায় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কথা এসেছে। তিনি প্রথমে নেতাজিকে সমর্থন করেছিলেন, তারপর কংগ্রেস ঘেঁষা কমিউনিস্ট পার্টির দিকে ঝোঁকেন। তিনি দেশের ইতিহাসকে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন মহাকাব্যিক রূপে। কেন বাংলা ভাগ হলো তার জন্য তিনি বিভিন্ন তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ নিয়ে ভাবতে থাকেন। তারপর দাঙ্গা ও দেশভাগ হয়। ওপার থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষদের বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম চলতে থাকে। এরপর আসে বিহারের দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধ, জরুরি অবস্থা, নকশাল আন্দোলন, বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা, মরিচঝাঁপি এবং অতি সম্প্রতি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা। গল্পগুলো বিভিন্ন ঔপন্যাসিক চরিত্রের দ্বারা বলা হলেও যা লেখা হয়েছে তা সঠিক।
মূল চরিত্র অনঙ্গমোহন চতুস্পতি কীভাবে একজন আচার্য থেকে একজন চায়ের দোকানদারে পরিবর্তিত হয়েছিলেন, কীভাবে তার বিধবা পুত্রবধূ তার মৃত স্বামীর কাজের জায়গায় আপস করেছিলেন এবং তার যুবক ছেলে এবং বৃদ্ধ শ্বশুরের দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কীভাবে অনঙ্গমোহনের নাতি বিপ্লব ওরফে বিলু কঠিন সময়ে পরিবারকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত রাজনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে দূরে রেখে পড়াশুনো করার পর বিভিন্ন ধরনের কাজ করার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত সরকারি দফতরে উচ্চ পদে চাকরিতে যোগদান করে, সেসব গল্প বলার মাঝে বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস আলোচিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল অনঙ্গমোহনকে জায়গা দিয়েছিল যাতে তিনি চায়ের দোকান খুলতে পারেন। তার জন্য তাকে টাকা দিতে হবে না। কিন্তু চায়ের দাম ও নেওয়া যাবে না। শহীদ বেদিতে ফুল দেওয়ার জন্য একটি ভিন্ন দলের কাছ থেকে তাকে অনুরোধ করা হয়। কারণ তার প্রয়াত নাতজামাইকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। অনঙ্গমোহন অজুহাত দিয়েছিলেন যে ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ছিল বলে গুলি খেয়েছে, সে শহীদ নয়। তবে এসব কথা শুনতে চায় না দলটি। এই গোষ্ঠীর বিপরীত হল আবার সেই গোষ্ঠী যারা দোকানটি খোলার জন্য সহায়তা করেছিল। অনঙ্গমোহন উদ্বিগ্ন ছিলেন যে তিনি যদি শহীদ বেদীতে ফুল দেন তবে তবে ওপর গোষ্ঠী দোকানটি ধ্বংস করে দিতে পারে। হরেকৃষ্ণ কোঙ্গারের বক্তৃতা শুনে তাকে উদ্বাস্তুদের প্রতি আগ্রহী হিসেবে মনে করেন তিনি। যে সব হকার অতিকষ্টে দিন চালায় তাদের থেকেও কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পাঁচ টাকা করে নিয়ে থাকেন। অনঙ্গমোহন টাকা দিতে অস্বীকার করায় তার দোকানটি ভাঙচুর করা হয়। কিছু লোক ব্যঙ্গাত্মকভাবে মন্তব্য করে যে বামুনদের কীসে অভাব রয়েছে। তাদের তো তিন ফুঁ। শাঁখে ফুঁ, কানে ফুঁ, এবং উনুনে ফুঁ। অর্থাৎ পুজো করে, মন্ত্র দিয়ে, রান্না করে তারা জীবিকা অর্জন করে। অনঙ্গমোহনের পরিবার এই জিনিসগুলি সহ্য করছিল কারণ তারা তাদের থামাতে নিরুপায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উত্তর কলকাতার দোকানপাট ও খুপরি বাড়িটি তাদের ছেড়ে দিতে হয়। তার যথাসর্বস্ব দিয়ে দমদমের এক নবনির্মিত উদ্বাস্তু কলোনিতে একটি দখলদারী জমি কেনে সে।
অনঙ্গমোহন সহ উদ্বাস্তু কলোনির প্রত্যেকের জন্য, তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার লোক নির্ধারণ করা একটি চিন্তার বিষয় হয়। কলোনির বাসিন্দারা ভিন্ন ভিন্ন দলের পক্ষ নিতে থাকে। বিভিন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দল জোট বেঁধে নেতৃত্ব দিতে থাকে। বামফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত একক সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ভোট জেতে। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ, বিপ্লব ওরফে বিলুর সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অনঙ্গমোহনের নাতনি এবং বিধবা পুত্রবধূ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। তাদের মুখের দিকে চেয়ে বিলু সব রাজনীতি এড়িয়ে চলে। ফলে স্বার্থপর সুবিধাবাদ তকমা তার গায়ে লাগে। রান্না করার সময়, বিলুর মা অঞ্জলি তার মৃত স্বামীর কাছে মনে মনে পরিবারের প্রতিদিনের উত্থান-পতনের বর্ণনা দেন। এই কল্পনার সাহায্যে অনেক কষ্ট অপমান উপেক্ষা করতে থাকেন উনি। এদেশে নকশাল আন্দোলন ও জরুরি অবস্থা শুরু হয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সমাজবিরোধী ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত অসংখ্য অপরাধের জন্য নকশালদের দায়ী করা হয়। বিলু ভাবতে থাকে, তাদের কি সমাজবিরোধী আখ্যা দেওয়া উচিত? কারণ সমাজের যা অবস্থা তাতে সমাজের বিরোধিতা করাই উচিত। ফলে ‘সমাজবিরোধী’ শব্দটিকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করা অনুচিত। পরিবর্তে, সমাজবিরোধীদের সমাজের অনিষ্টকারী হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
বিলু চাকরির সন্ধানে একটি পাড়ায় প্রবেশ করলে সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য ও সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে আটক করে। তার বাড়িতে তল্লাশির সম���় বিলুর একটি ডায়েরির সন্ধান পায় পুলিশ। পুলিশ এই ডায়েরি পড়ে জানতে পারে যে বিলু এইসব কাজ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। যাইহোক, বিলু কিছু ভুল বুঝে তার ডায়েরিতে একটি সন্দেহ লিপিবদ্ধ করেছিল। সমর্থনযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই, পুলিশ বিলুর বন্ধু বরুণ অর্থাৎ রুনুকে আটক করে। অনঙ্গমোহন যখন রুনুকে লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন, তখন পুলিশি হামলার সময় তিনি মাথায় আঘাত পান এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রুনুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ধরনের ঘটনা তখন সাধারণ ছিল। উপন্যাসে রয়েছে তার ছায়া। নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কমবয়সী যুবকদের দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী আত্মীয়দের সাথে থাকতে পাঠানো হয়েছিল। যারা এরকম আত্মীয়ের বাড়ি যেতে পারেনি শুধুমাত্র সন্দেহের বশে তাদের আটক করে পুলিশ। বিলু পরবর্তীকালে আবহাওয়া দফতর যোগ দেয়। সেই সূত্রে, লেখক বর্ণনা করেছেন কীভাবে আবহাওয়া ক��জ করে এবং ঘটনাক্রমে উল্লেখ করেছেন যে আবহাওয়াকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা অসম্ভব কারণ একটি এলাকায় একটি ছোট ঘটনার প্রভাবে অন্য অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফল হতে পারে। ফলস্বরূপ, যুদ্ধের সময়ও, মতবিরোধপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। এর অন্য কোন বিকল্প নেই। আবহাওয়া দপ্তরের কর্মচারীরা তাই সর্বত্র বন্ধু। এরপর বিহার ও মরিচঝাঁপির দাঙ্গা নিয়ে আলোচনা হয়। দেশভাগের ক্ষত কতটা বিস্তৃত ছিল তা দেখানোর জন্য লেখক যতটা সম্ভব চরিত্রগুলো তৈরি করেছেন। বিলুর অবাঙালি মুসলিম পরিবারের মেয়ে উজমার সাথে পরিচয় হয়, যারা বিহার দাঙ্গার কারণে পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল। আমরা দুজন মানুষের সাথে দেখা করি, যারা দুটি দাঙ্গার স্মৃতিতে উদ্বিগ্ন। বিলুর মা প্রাথমিকভাবে একজন মুসলিম পুত্রবধূকে পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের নিপীড়নের স্মৃতির কারণে গ্রহণ করা কঠিন বলে মনে করেন, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন যে একজন ব্যক্তি হিসাবে সে কীরকম তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম কখনো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। এরপরে বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং ভারতে বিজেপির আরোহণের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়।
বাবরি মসজিদ দাঙ্গার সময় উজমা গর্ভবতী হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তার অনাগত সন্তানকে দাঙ্গার কবলে পড়ে হারিয়েছিলেন। এর দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এত রয়েছে যে এটি বিলু ও উজমার গর্ভধারণের ক্ষমতাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে তারা একটি অনাথ শিশুকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিলুর মা আশা করেন সন্তানের মধ্যে তার গৃহদেবতা নারায়ণের প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাবেন। তাই গঙ্গায় নারায়ণ শিলা ভাসিয়ে দেন তিনি। এরই মধ্যে উন্নয়নের ঢেউ ধ্বংস করে দিয়েছে অনঙ্গমোহন ও কৈলাস দেবনাথের স্মৃতিসৌধ। বইয়ের শেষে, মনে হয় যে দুটি আদর্শবাদী চরিত্রের আত্মা তাদের নিজস্ব স্মৃতিস্তম্ভের পতনে বিষণ্ণ নয় বরং একটি নতুন প্রজন্মের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। অনেক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা সত্ত্বেও এবং নিজে ব্রাহ্মণ ও মুসলমানদের দ্বারা নিপীড়িত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও একজন মুসলিম মেয়েকে গৃহবধূ এবং পরিচয় ছাড়াই এক অনাথ শিশুকে বিলুর দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা আশার ঝলক দেখে। তারা নিজেদের বলে যে এই শিশুরাই ভারতের ভবিষ্যৎ।
যেহেতু ধর্ম দেশভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তাই বিভিন্ন জাতির ধর্ম ও রীতিনীতি নিয়ে, বিভিন্ন প্রসঙ্গে এবং বিভিন্ন চরিত্রদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা উঠে এসেছে। মানব ইতিহাস জুড়ে ধর্ম কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তার একটি বিবরণ পাওয়া যায় এখানে। তাদের অনুসারীদের সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করার জন্য, ধর্মীয় গুরুরা বিভিন্ন ধর্মের সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর এই সব ধর্মে আচার অনুষ্ঠানই মূল উপজীব্য বিষয় হয়ে ওঠে। যা ধর্মগুলির মূল লক্ষ্য থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিচ্যুত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা ছাড়াও অসংখ্য ছোটখাটো বিষয় রয়েছে পুরো উপন্যাস জুড়ে। উদাহরণস্বরূপ, দমদম বিমানবন্দরের পুরো প্রেক্ষাপট, এখন বিলুপ্ত বাঙালি সংস্কৃতি, লোক উল্লেখযোগ্য। অনঙ্গমোহন পুরো বই জুড়ে অনেক সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। যা অর্থবহ এবং আনন্দদায়ক বাগ্মিতা প্রদান করে। একটি শ্লোকের প্রসঙ্গে আশা যাক। এই শ্লোক ব্যাখ্যা করে কেন সর্বদা তর্কের বাইরে থাকা ভাল। "কৃতং মৌনং কোকিলৈজলদাগমে/ দর্দুরা যত্র বক্তারস্ত্রত মৌনং হি শোভনম”। এ থেকে উপসংহারে আসা যায় যে কোকিল বর্ষাকালে গান গায় না কারণ পাখিদের কিচিরমিচির করার সময় এটি করা তার পক্ষে অশোভন। এই শ্লোকটি আজও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
পাঠকের চিন্তাভাবনা কেমন তা লেখক স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। সংগ্রাম এবং কষ্টের দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা সহ্য করা পাঠকের পক্ষে যথেষ্ট কঠিন। এতে মননশীলতা ব্যাহত হয়। জীবনে বাস্তবতা গতিশীল। মানুষের মধ্যে একটি অন্তর্নির্মিত প্রবণতা আছে বেদনা এবং কষ্টের মধ্যে আনন্দ খুঁজে বের করার। অতএব, লেখকের এই গুরুতর উপন্যাসেও লুকিয়ে আছে আনন্দ। তিনি অনায়াসে এবং নিপুণভাবে গম্ভীর কথার মধ্যে রসের জগৎ খুঁজে দিতে পারেন। জীবনটা এমনই। এই দুর্বিষহ কলোনি জীবনেও, কিশোর কিশোরীরা প্রেমে পড়া শুরু করে।
সব শেষে বলি, স্বপ্নময় চক্রবর্তী আগে কখনো পড়িনি, কিন্তু এই একটা বই পড়েই মনে হল, তার লিখনিশক্তির জন্যই বারে বারে উনার বই পড়তে আসা যায়। তবে আমার মনের পুষ্টি জোগানোর মতো যথেষ্ট উপাদান আমি তার লেখায় পেয়েছি।
বিশাল মানে বিশা-আ-আ-ল পরিসর নিয়ে লেখা। দেশভাগ আসলেই অনেক কষ্টের। যেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সে সময় মানুষগুলো গেছেন.. দেশভাগ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা - এসব বই পড়লে নিজের কপালকে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা হয়। বইটা একদিকে ভালো ছিলো কিন্তু মাঝে মাঝে ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে কটকটা ইতিহাস তুলে ধরেছে! পড়তে ভালো লাগছিল না সেটা। এন্ডিং সুন্দর ঠিক আছে কিন্তু শেষদিকে এসে মনে হচ্ছিল উপন্যাস তার গতি হারিয়েছে। যাই হোক ওভারঅল ভালো।
কিছু কিছু বই আছে যেগুলো পড়লে খুব অস্বস্তি বোধ করি। অনুভূতি এক দুই কথায় প্রকাশ করা যায় না, আবার একগাদা লিখতেও হাত কাঁপে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের বুকে যে কাটাছেঁড়া হয়েছিল সেই ব্যথাটা আজও ফিরে পাই এমন স্বপ্নময় লেখার মাধ্যমে।
নতুন কোনো গল্প নেই, তবুও লেখক পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে যা বের করলেন তার স্বাদ মুখে ও মগজে লেগে থাকবে বহুদিন। বইটা পড়ার পর মনে হলো, এ বছরে আমার পড়া সেরা বই কোনটা? "চায়ের কাপে সাঁতার", "নুন চা" নাকি "জলের উপর পানি"?
এই দীর্ঘ উপন্যাস অনেক বড় সময়কাল জুড়ে লেখা একটি পরিবারের তিন পুরুষের কাহিনী এখানে লিপিবদ্ধ তবে শুধু এই তিন পুরুষ নয়, তাঁদের জীবনী প্রবাহে অন্তর্গত সকল চরিত্রদের নিয়েই এই উপন্যাস। উপন্যাসের নাম দেখেই হয়তো বুঝতে পারছেন এটার পটভূমি দেশভাগ তথা বাংলা ভাগ। কিন্তু শুধু ভাগেই যে থেমে থাকে না সেই সঙ্গে "আমরা কারা, সর্বহারা" দের জীবনযাত্রা আর তৎকালীন বাংলা (পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গ) রাজনীতি সঙ্গে দেশীয় রাজনীতি মিলেই যে ভীষণ রাজনৈতিক টালমাটাল সেটাই উপন্যাসের এক অংশ। আর এক অংশে সেই তিনপুরুষ যেখানে রয়েছে পন্ডিত অনঙ্গোমোহন চক্রবর্তী, তাঁর পুত্র এবং তাঁর প্রপৌত্র বিপ্লব ওরফে বিলু। উপন্যাসের চরিত্র গুলো বড়ই আকর্ষণীয় করে তুলেছেন লেখক। সেই সমকালীন বাঙালি উদ্বাস্তু পরিবারের যে রেখাচিত্র লেখক এঁকেছেন তা এক কথায় অনবদ্য বললেও কম হয়।
পন্ডিত অনঙ্গমোহন একজন সংস্কৃত শিক্ষক, ছেলের মৃত্যুর পর তাঁর জীবন যেন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাঁর জীবনের মূল্যবোধ নিজেকে অসৎ উপায়ে সংস্কৃত কে প্রয়োগে বাঁধা দেয় আবার সেই সময়ের ইংরেজি শেখার যুগে সংস্কৃত যে একেবারেই মূল্যহীন সেটি মেনে নিতেও তাঁর বড় কষ্ট কিন্তু ওই যে পেটের জ্বালা বড় জ্বালা সেই কারণেই বিধবা পুত্রবধূর শ্লেষ মূলক কথা শুনেও তাঁকে এক সময় বিষ ভেবেও ক্ষুধা নিবৃত্তি করতেই হয়। অপরদিকে তাঁর বিধবা পুত্রবধূ স্বামীর চাকরি পেয়ে, নিজের সম্মান উপেক্ষা করেও কোনো রকমে পরিবারটি চালিয়ে যাচ্ছে শুধু কোনো এক সুদিনের দিকে চেয়ে। এক্ষেত্রে বিলুর চরিত্রটা বড়ই তাৎপর্য পূর্ণ, নতুন কলেজের বসন্তের হওয়া সঙ্গে সমকালীন কমিউনিস্ট আর নকশাল পিরিয়ডের রাজনীতি লেখক দারুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর একমাত্র বিলু এই পরিবারের দিকে তাকিয়েই সকল রাজনৈতিক টিপ্পনী, বিলাসিতা কিংবা বলতে গেলে রাজনৈতিক আদর্শের থেকে ঘা ঝেড়ে নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ পালন করার মধ্যে চরিত্রটির বিবর্তন লেখকের লেখনীতে পাঠক কে এক জায়গায় বসিয়ে রাখবে।
সর্বোপরি একটি চরিত্র যার নাম কৈলাস দেবনাথ , যিনি এই উপন্যাসের প্রাণভোমরা বলা চলে (ব্যক্তিগত মতামত), তিনি যেন দেশ ভাগের পটভূমির এক অবিচ্ছেদ্য নায়ক যার চোখের সামনে '৪৬ এর নোয়াখালির দাঙ্গা, কংগ্রেস থেকে কমিউনিস্ট দের উত্থান, নেহুরু আর জিন্নার নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিস্থাপনের এক জীবন্ত দলিল যেন কৈলাস দেবনাথ স্বয়ং নিজেই। তাঁর "ছিন্নমূল" কাব্য সেই জীবন্ত দলিলের সাক্ষ্য বহন করে। হয়তো তিনি ব্যতীত এই উপন্যাস লেখক নিজেও ভাবতে পারেন না।
এই উপন্যাসের একটা দারুন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, লেখক সম্পূর্ণ দেশ ভাগ থেকে শুরু করে তার গোড়ার কথা, দেশ ভাগের ফলে আগত উদ্বাস্তুদের জীবনযাত্রা, সাথে সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসকে যেভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন শুধু বাঙালি নয় বিহার, পাঞ্জাব, ত্রিপুরা এই সমস্ত রাজ্য গুলি যারা দেশভাগের দ্বারা প্রভাবিত সবটাকে একটি বইয়ের মাঝে এনে বহু গবেষণার ফসল কে এক জায়গায় করেছেন তাঁতে সাহিত্যের একাডেমি পুরস্কারটি যথার্থই প্রাপ্য।
তবে একটা কথা না বললেই নয় শুধু দেশ ভাগ নয়, উপন্যাসের নাম করণের মধ্যে দিয়েই বোঝা যাচ্ছে যে ধর্ম ভিত্তিক যে পরিসর লেখক তুলে ধরেছেন সেটা এক কথায় বলতে গেলে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ এই বিষয়ে। এতো বিস্তৃত কাজ আগে কোনো জায়গায় হয়েছে বলে আমার মনে হয় না, বিশেষ করে উপন্যাসের শেষের পরিধিতে বিলু, উজমা আর তাদের মধ্যস্থ সম্পর্কের যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়ন চোখে পড়ে ধর্মের ভিত্তি কে কেন্দ্র করে সেটা উপন্যাসের নামকরণ সার্থক করছে। এই উপন্যাসটা পড়ার আগে যদি চতুস্পাঠি উপন্যাস (বিলুর বাবার উল্লেখ এইখানেই বেশি পায়া যায় জলের উপর পানির থেকে) টা পড়ে নেওয়া জরুরি তাতে অনঙ্গমোহনের চরিত্রটিকে আর কাছ থেকে জানতে পারবেন, কৈলাস দেবনাথের মতোই এই চরিত্রটিও দ্বিতীয় অপরিহার্য চরিত্র বলে আমার মনে হয়। c
"জলের উপর পানি না পানির উপর জল বল খোদা, বল খোদা, বল"― গৌতম ঘোষ পরিচালিত 'মনের মানুষ' চলচ্চিত্রে শাহযাদ ফিরদাউস এর গানের প্রথম চরণ থেকেই এই উপন্যাসের নামকরণ করা হয়েছে "জলের উপর পানি"। বইটি ২০২৩-এ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পায়।
এই উপন্যাসের শুরুটা মূলত " চতুষ্পাঠী" উপন্যাস থেকে। চতুষ্পাঠীর বিস্তার ঘটেছে এই উপন্যাসে এসে। চতুষ্পাঠীর চরিত্র গুলো ব্যাপৃত হয়েছে " জলের উপর পানি" তে এসে।
চতুষ্পাঠীর সংস্কৃত মাস্টারমশায় কাব্যবিশারদ অনঙ্গমোহন ভট্টাচার্য। ১৯৪৮ সালে সপরিবারে জন্মভূমি বাংলাদেশ ত্যাগ করে প্রফুল্লনগর কলোনিতে আসেন। সেখানে প্রথমে তিনি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। তারপর কলোনিতে বসবাস শুরু করেন। এখানে কেউ সংস্কৃতের কদর বোঝে না তাই কেউ সংস্কৃত পড়তেও চায় না। নিরুপায় হয়ে অন্নসংস্থানের জন্য চায়ের দোকান খুলে বসেন। অনঙ্গবাবুর নাতি বিপ্লব যার ডাক নাম বিলু। ছোট থেকে সে দাদুর আদর্শে বড় হয়েছে। মেধাবী ছাত্র চিন্তায় আধুনিক । কলোনিজীবন কখনই তার নয়। সে চায় এই গন্ডি ছেড়ে মুক্ত হয়ে ঘুরতে।
অসংখ্য চরিত্র নিয়ে এই উপন্যাস। কাহিনি বিস্তার এর সাথে সাথে কিছু চরিত্র থেকে গেছে শেষ পর্যন্ত বাকিগুলো মাঝ পথেই পথ হারিয়েছে। তবে চতুষ্পাঠীর শেষ থেকে এর কাহিনি শুরু হলেও মূলত দেশ ভাগ, সাম্প্রতিক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, তেভাগা আন্দোলন ও ভারতছাড় আন্দোলন ও স্থান পেয়েছে। মূল কাহিনি দেশ ভাগ ও তার পরবর্তী দেশ ও মানুষের জীবন চিত্র নিয়ে। ছেড়ে আসা দেশ ও সেখানের স্মৃতি মনের মধ্যে রেখে নতুন করে জীবন শুরু লড়াই লড়তে গিয়ে জীবনকে নতুন করে জানা। দেশভাগ ও পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। সেই সাথে ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব যেমন স্থান পেয়েছে তেমনি ছিন্নমূল মানুষদের মনস্তত্ত্বের একটা অদ্ভুত দিক এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
অসংখ্য চরিত্র নিয়ে বিশাল বিস্তৃত এক উপন্যাস তাই মন শান্ত করে সময় নিয়ে পড়তে হবে এই উপন্যাস। ব্যস্ততা অস্থির মানসিকতা নিয়ে এই উপন্যাস পড়ার দরকার নাই। দেশভাগ নিয়ে দারুণ কিছু উপন্যাস আছে এটাও তার মধ্যে একটা।
কিছু বইয়ের রিভিউ হয় না। কি করে রিভিউ দেবো বলুন, যখন না দেখা, কেবল পড়া আর সোনা সময়টার মধ্যে হঠাৎ করে নিজেকে খুঁজে পাই?
ধরুন এই ২০২৫ এর সকালে উঠে ব্রাশ করে, মোবাইল ১০ টা নোটিফিকেশন চেক করলেন, তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে পেলেন এক পুরোনো রেললাইনের ধারে। ছোট ছোট ঘরকে ব্যাঙের ছাতা বলে মনে হয়। আর কত মানুষ। ভাষার রকম বাহারে মাথা ঘোরে।
তাদের এই জীবন গুলোর বাইরেও তাঁদের একটা জীবন ছিল। তা কেবলই এখন ছিলোর পাতায়। তা কিছুটা গর্বের বাকিটা পুরোটাই ক্ষতের।
বইটা রিভিউ করতে পারিনা, কারণ নিজের জীবন হারিয়ে ফেলি বই এর পাতায়। মাধুর জন্য কান্না পায়। কৈলাশ দেবনাথের জন্য কষ্ট লাগে। বিলুকে হঠাৎ রাগ ধরে।
দেশভাগ, ছিন্নমূলের কথা আগেও পড়েছি। কিন্তু তা কেবলই পড়েছি একটি বা কয়েকটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের। কিন্তু জলের উপর পানিতে স্বপ্নময় চক্রবর্তী কিছু বাদ রাখেননি। তৎকালীন (1950-1980এবং আরো আগের ও পরের) রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন ভাবে এনেছেন, বাধ্য হয়েছি নিজেকে গুলিয়ে ফেলতে।
জলের উপর পানি লেখক : স্বপ্নময় চক্রবর্তী প্রকাশনা : দে'জ মূল্য : ৬০০ টাকা।।
বছরের ২৪ নম্বর বই,২০২৩ সালের একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত, পছন্দের লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী এর লেখা একটি অসামান্য উপন্যাস "জলের উপর পানি"।। চতুষ্পাঠী এই বছর পড়া আমার সবচেয়ে পছন্দের উপন্যাস তাই তার পরবর্তী পার্ট জলের উপর পানি নিয়ে প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল।।
এই সুদীর্ঘ উপন্যাস অনেক বড় সময়কাল ধরে লেখা একটি পরিবারের তিন পুরুষের ইতিহাস।। অনঙ্গমোহন ভট্টাচার্য্য তার ছেলে জগদীশ ভট্টাচার্য্য, অনঙ্গমোহন এর প্রপৌত্র বিপ্লব ভট্টাচার্য্য।। আমাদের উপমহাদেশের জীবন এলোমেলো করে দেওয়া দেশভাগ এবং পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে লেখা এই উপন্যাসে এসেছে কলোনি জীবনের নিবিষ্ট শব্দচিত্রাবলি।। লেখক মূল চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে বুনেছেন কলোনি জীবনের সমস্ত রোজনামচা।। বিলু চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন নকশাল আন্দোলন, প্রথম বামফ্রন্ট সরকার, উদ্বাস্তুদের জীবনযাত্রা, সমকালীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মরিচঝাঁপি, বিহার, পাঞ্জাব, ত্রিপুরা, মধ্যপ্রদেশ এই সমস্ত রাজ্যগুলির উপর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ফলাফল।।
এই উপন্যাসে বিশদে এবং বিষাদে বর্ণিত হয়েছে বাংলার নাথ সম্প্রদায়ের ব্যথা, নমঃশূদ্রদের ব্যথা এবং বিহারের ভূমিচ্যুত মুসলমান উদ্বাস্তুদের কথাও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে।। এই ধারাবিবরণীমূলক কথকতার পরতে পরতে বিছানো রয়েছে ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব।। প্রবহমান কাহিনি-উপকাহিনির ভিতরে দক্ষ নৈপুণ্যে বুনেছেন অনেক অজানা তথ্য।। কাহিনীর পরতে পরতে এসেছে বিভিন্ন চরিত্ররা, ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব।। এই আলোচনায় একটি চরিত্রের বিষয়ে না বললেই নয় তিনি হলেন, কৈলাস দেবনাথ।। তিনি দেশভাগ সময়কালের একমাত্র প্রামাণ্য দলিল যিনি নিজের চোখে নোয়াখালির ৪৬ এর দাঙ্গা, কংগ্রেস থেকে কমিউনিস্টদের উত্থান, নেহেরু ও জিন্নার নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এর ফলাফল দেশভাগ দেখেছেন।। তাঁর লেখা ছিন্নমূল কাব্যগ্রন্থ জীবন্ত এক দলিল।।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর অন্যান্য অনেক উপন্যাসের মতোই এটিও তন্নিষ্ঠ গবেষণার ফসল, তবে লেখকের মতে এটি শেষ পর্যন্ত একটি প্রেমের উপন্যাস।। ছিন্নমূল মানুষ এর ঘুরে দাঁড়ানোর উপন্যাস, আবার থিতু হয়ে বাসা বাঁধার উপন্যাস, আবার নতুন ইতিহাস লেখার উপন্যাস।। বিলু আর উজমা আলাদা আলাদা পটভূমি থেকে উঠে এসে যেন উপন্যাসের শেষে এটাই দেখায় যে, দিন বদলায়।। যেমন করে অন্ধকারের পর আবার সূর্য ওঠে।।
⭐⭐ পাঠ প্রতিক্রিয়া -
দেশভাগ এবং উদ্বাস্তুজীবন নিয়ে গল্প, উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বহুবার লেখা হয়েছে।। বাংলা সাহিত্যের অতি বিস্তৃত অংশ জুড়ে রয়েছে অগণিত ছিন্নমূল মানুষের ইতিহাস।। তবে এই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে প্রথমেই যেটা খুব ভালো লেগেছিল এবং আমাকে অবাক করেছিল, সেটা হল; যেভাবে স্বপ্নময় চক্রবর্তী বিশদ গবেষণা করেছেন এবং সেই গবেষণার ফলাফল আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেই ভাষায়।। কী বাকি রেখেছেন তিনি তার এই উপন্যাসে, ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে ও বাবরি মসজিদ ও রাম মন্দির সমস্যা ১৯৯২ সালের।। এইসব তথ্য বহুল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঘটনার মধ্যে দিয়ে লেখক যেভাবে দর্শন, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব তুলে ধরেছেন তা এক কথায় অনবদ্য।। একজন সমাজবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে লেখক দেখেছেন এবং লিখেছেন উদ্বাস্তু জীবনের বহুমুখী প্রবাহ।। এই উপন্যাস শুধু মাত্র দেশ ভাগের ফলে আক্রান্ত মানুষদের নয়, এই উপন্যাস সকল ভারতবাসীর যারা প্রতিক্ষণে চেষ্টা করে চলেছেন সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার, উপন্যাসের শেষের পরিধিতে বিলু আর উজমা সম্পর্কের যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন চোখে পরে ধর্ম কে ভিত্তি করে সেটাই এই উপন্যাসের পরিধি এবং পরিসরকে সার্থক করেছে।। শেষ করবো উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্র অনঙ্গমোহন এর উদ্ধৃত একটি লেখা দিয়ে
"ধর্ম-মোহ এক মানব কালিমা। আমাদের কালিমা মুক্তি ঘটবেই। ... বিশ্বাস করি, তপ্ত অঙ্গার ভূমির দিকে, শূন্য গর্ভখাদের দিকে যে পথ যায়, শেষ পর্যন্ত সে পথে যামুনা আমরা, কিন্তু চলতেই থাকবো। পথভ্রষ্ট হলেও চলা থামে না। সুতরাং হে রোহিত, সামনে চলো।"
অসংখ্য চরিত্র নিয়ে বিস্তৃত বিশাল একটি উপন্যাস তাই অবশ্যই মন শান্ত করে পড়তে হবে, ব্যস্ততা ও অস্থির মানসিকতা নিয়ে এই উপন্যাস পড়লে হবে না।। এই উপন্যাস বাংলাসাহিত্যে এটি একটি অবশ্যপাঠ্য উপন্যাস যদি এখনো না পড়ে থাকেন তাহলে আজই পড়া শুরু করুন।।
হলদে গোলাপ -এর পর থেকে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর লেখার অনুরাগী হয়েছিলাম। তার পরে পরে কিনে ফেললাম চতুষ্পাঠী, পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ, অবন্তীনগর। সাদা কাক, আনন্দবাজারে আগেই পড়েছিলাম। অসাধারণ সব লেখা। ওনার লেখা পড়লে 'মানুষ চেনা দায়' মানুষ চেনা যায়, হয়ে যায়। এই আধুনিক সময়েও ওনার লেখায় বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগকে বেশ গভীর ভাবেই অনুভব করা যায়।
এই উপন্যাসের কথায় আসতে গেলে কিছুই বলার প্রয়োজন নেই আবার পাতার পর পাতা লেখা যায়। দ্বিতীয় কাজটা লেখক এই উপন্যাসের দ্বারা আগেই করে রেখেছেন তার পরে আর কিছু লেখাটা ধৃষ্টতা। নারায়ন সান্যাল যে মানুষের কথা তাঁর 'বকুলতলা পি এল ক্যাম্প', 'অরণ্যদণ্ডক' লিখে গেছিলেন আর সেই লেখায় বড় সাহেব ঋতব্রতকে বলেছিলেন "না, যা দেখবে শুধু তাই নয়। যা দেখলে না চর্মচক্ষে - কিন্তু দেখতে পাওয়া যায় মনের চোখ দিয়ে, তাও লিখ।" চক্রবর্তী মহাশয় সেই ধারায় তাঁর জ্ঞান, লেখনী যোগ করেছেন সাবলীলভাবে।
অনঙ্গমোহন আর বিলু, দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র মনে হলেও আসল প্রোটাগনিস্ট এখানে নিপীড়িত মানুষ ও তার দেশ। তবুও আমার মতে এই বই দর্শনের, নৃতত্ত্বের, ধর্মচারণের, রাজনীতির, সমাজনীতির, মানবিকতার, ভালোবাসার। এই বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে এক মহাউপন্যাস 'জলের উপর পানি'।