এই কাহিনি আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের। মিশরের সিংহাসনে তখন রানি হাতসেপসুত। মহাসমুদ্রের ওপারে ভারতে তখন গড়ে উঠছে ছোটো ও বড়ো নানা রাজ্য। বিস্মৃতির ধুলোর তলায় লুকিয়ে পড়া সভ্যতার জন্য হাহাকারের পাশাপাশি নতুন জ্ঞান, বিশেষত প্রযুক্তিরও বিকাশ ঘটছে সেখানে। এই দুই দেশ তথা সভ্যতার মধ্যে সংযোজক হয়ে উঠল বিজ্ঞানের সাধক এক দুঃসাহসী যুবক। ঋগ্বেদ থেকে পুরাণ তাকে ঋষি নামে চিনলেও এই কাহিনিতে তার আরাধ্য হল বিজ্ঞান, আর তপস্যা হল মানবকল্যাণ।
তার নাম অগস্ত্য!
নতুন বিদ্যার অন্বেষণে মিশরে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়েছিল এক রোমহর্ষক ঘটনার সঙ্গে। তার মাধ্যমেই সে পেয়েছিল নিজের জীবনসঙ্গিনী— মেধা ও প্রজ্ঞায় অতুলনীয়া ইরতেনসেনু-কে। তাকে নিয়ে দেশে ফিরেছিল সে। কিন্তু...
মিশরের আকাশে ঘনাল মহা সংকটের মেঘ। নিছক রানি বা রাজার প্রতিনিধি নন, সাক্ষাৎ ফারাও হাতসেপসুত সাহায্য চাইলেন তাঁদের। সাগরপাড়ি দিল অগস্ত্য, ইরতেনসেনু, আর অগস্ত্যের সবচেয়ে বড়ো ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু তথা অসামান্য নাবিক উপল।
তারপর কী হল?
হাতসেপসুত তথা মিশর কি রক্ষা পেল সংকট থেকে?
কোন রহস্য লুকিয়ে আছে অগস্ত্যের অতীতে, যা সে কোনোমতেই প্রকাশ করতে চায় না?
নীলনদের সঙ্গে কি কোনো এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেছে ভারতের এক হারিয়ে যাওয়া নদী?
এই নিয়েই লেখা হয়েছে আলোচ্য উপন্যাসটি।
এর ভালো দিক কী-কী?
প্রথমত, লেখনী অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার। 'সম্ভ্রান্তশালী' টাইপের এক-আধটা বেয়াড়া শব্দ, বাক্যগুলোকে 'যে-সে' দিয়ে লেখার সামান্য প্রবণতা বাদ দিলে এমন আধুনিক ও সাবলীল লেখা পড়েও আরাম।
দ্বিতীয়ত, গল্প একেবারে শ্বাসরোধী। মোট সাতাশটি অধ্যায়ের প্রতিটিই এমন যে একটি শেষ হওয়ামাত্র অন্যটি শুরু করতে হয়। ছেড়ে রাখলে রীতিমতো বদহজম-জনিত বুকজ্বালা হতে থাকে। একেবারে শেষ করে মনে হয়, শান্তি হল!
তৃতীয়ত, পুরাণের বিনির্মাণ বা ইতিহাসের নব ব্যাখ্যার বাইরেও এই লেখাতে সত্যিকারের ইতিহাস আছে। কিন্তু তার উপস্থিতি এমনভাবে দেখা দিয়েছে যা মনকে ক্লান্ত করে না; বরং অধিকতর পাঠে উৎসাহী করে তোলে। সত্যিকারের ভালো ফিকশন কিন্তু ঠিক এভাবেই পাঠকের মনে পরশমণি ছুঁইয়ে যায়।
চতুর্থত, পাঠককে রোমাঞ্চিত বা ভীত করার পরিবর্তে এই লেখা একটি জীবনবোধের সন্ধান দেয়। তা সত্য, অসত্য এবং অর্ধসত্যের চিরন্তন দ্বন্দ্বের কথা বলে— যার আগুনে দগ্ধ হয় মানুষের বিবেক এবং চেতনা। তা বিজ্ঞানের সম্ভাবনা ও সম্ভাব্যতার কথা বলে। ইতিহাসের অনেক নীরস তথ্যকে "যদি এমন হত..."— জাতীয় প্রশ্নের আকার দেয় এটি। সর্বোপরি এই লেখা বলে, প্রতিটি কুসুমেই কীটের সম্ভাবনা থেকে যায়; আবার গরলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অমৃতের ইশারা।
এর খারাপ দিক কী-কী?
এটি এমনিতে ইতিহাস-নির্ভর, বিজ্ঞান-আধারিত আখ্যান। কিন্তু এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু'টি ঘটনার সম্পূর্ণ অলৌকিক ব্যাখ্যা তথা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ওটুকুই দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা টুকরোর মতো অস্বস্তি তৈরি করল।
সামগ্রিকভাবে বলব, এটি নিঃসন্দেহে পড়ার মতো, উপভোগ করার মতো এবং ভাববার মতো একটি লেখা।
ভরসা রাখি যে মিশর এবং ভারতের এমন আরও সম্ভাব্য সংযোগ ধরা পড়বে লেখকের হাতে। তাঁর সেই লেখারা হয়তো নতুন করে আমাদের ভাবাবে, নতুন চোখে ইতিহাসকে দেখাবে।
তাঁর উদ্দেশে শুভেচ্ছা রইল।