ইজানামি আর ইজানাগি...নাম দুটো জানা আছে তো? কিংবা আমাতেরাশু ও শুশানো-ও? নেই, থাক না জানলেও অসুবিধে নেই কোনো। জানাবার জন্য আমরা তো আছিই! সূর্যোদয়ের দেশ নামে অধিকতর খ্যাত জাপান, এশিয়ার হাতেগোনা কয়েকটি প্রভাবশালী দেশের মাঝে অন্যতম। স্বভাবতই, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও তারা পিছিয়ে নেই; আর যেখানে রয়েছে সুপ্রাচীন সভ্যতা, সেখানেই রয়েছে পৌরাণিক কাহিনি! জাপানের পুরাণ নিয়ে এদেশে খুব একটা কাজ হয়নি। বললেই চলে। অথচ দেশটির পুরাণ যেমন আকর্ষণীয় তেমনই আকৃষ্ট করার মতো। সেই ঘাটতি পূরণ করার জন্যই বিবলিওফাইলের নিবেদন এই বই... জাপানের পুরাণ: কামি পর্ব। বইটিতে পাঠকরা পাবেন জাপানের পুরাণ অনুসারে সৃষ্টিতত্ত্ব, জাপানি-কামিদের পরিচয়, তাদের নিয়ে প্রচলিত গল্পগাথা এবং বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশের ইতিবৃত্ত। বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকছে জাপানের অধিবাসীদের উদ্ভাবনকুশলতার প্রমাণ স্বরূপ ‘ইয়োকাই অনুক্রমণিকা’!
জন্ম সিরাজগঞ্জে, ১৯৮৮ সালে। এসএসসি. পাশ করেন আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে, এইচএসসি-রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ থেকে। এরপর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সমাপ্ত করে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ থেকে। বর্তমানে কর্মরত আছেন কক্সবাজার জেলায়।
লেখালেখি শখের বসে, অনুবাদ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রথম প্রকাশিত বই আদী প্রকাশন থেকে-ট্রল মাউন্টেন। সেই সাথে রহস্য পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখি।
জাপান হলো পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। জাপানকে প্রায়শই "উদীয়মান সূর্যের দেশ" বলে অভিহিত করা হয়। সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে জাপান যেমন আকর্ষণীয় তেমনই বর্ণিল। সেই সাংস্কৃতিতে এখনো দেখা মেলে সুপ্রাচীন সভ্যতার পৌরাণিক প্রভাবের।
জাপানের পুরাণ বইটি সেই সব জনপ্রিয় পৌরাণিক নানান সব তথ্য, ঘটনা নিয়েই লেখা প্রথম বই- কামি পর্ব, যেখানে উঠে এসেছে জাপানের পুরাণ অনুসারে সৃষ্টিতত্ত্ব, উল্লেখযোগ্য দেবদেবীদের পরিচয়, কামি ও সম্রাট যুগ এবং শেষের দিকে এসে নানান সব ইয়োকাই অনুক্রমিকা। সেই সাথে পরবর্তীতে আসবে বীর পর্ব ও ইয়োকাই পর্বও।
বেটা রিডার হওয়ার সুবাদে বইটা আগেই পড়ে ফেলেছি আমি। বইটা পড়তে গিয়ে একদম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত খুব আগ্রহ নিয়েই পড়েছি। এবং বলতেই হই যে বইটা খুবই উপভোগ্য লেগেছে যার একটা অন্যতম কারণ লেখক মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ'র উপস্থাপনা। লেখক প্রতিটি বিষয় এনেছেন ধাপে ধাপে, পুরাণের কাহিনি গুলো উপস্থাপন করেছেন ফিকশনের মতো করে যার ফলে পড়তে গিয়ে বোরিং লাগেনি। সেই সাথে দিয়েছেন অনেক শব্দের ফুটনোট। তবে অন্যান্য পুরান-মিথ এই যেমন গ্রিক, মিশর কিংবা নর্স পুরান গুলো পড়তে গিয়ে ঠিক যতটা গোছালো এবং সমৃদ্ধ লাগে ঠিক ততটা সমৃদ্ধ বলা যায় না জাপানের পুরাণকে।
জাপানের পুরান বইটা পড়তে গিয়ে খেয়াল করেছি যে জাপানের বর্তমান সংস্কৃতি, দৈনন্দিন জীবনযাপনের সাথে তাদের পুরান জড়িয়ে আছে ওতোপ্রোতো ভাবে, সভ্যতার এতকাল পরে এসেও যা এখনও চোখে ধরা দেয়। সেই সাথে চৈনিক সভ্যতা এবং ভারতীয় সভ্যতার খুব কাছেই অবস্থান বলে জাপানের পুরাণের মাঝে স্থান করে নিয়েছে বেশ কিছু দেবদেবী, গল্পও। এবং কি গ্রিক মিথলজিরও বেশ কিছু পরিচিত দেবদেবী, গল্পেরও মিল পেয়েছি।
বইটিতে পুরানের ফাঁকে ফাঁকে ব্যবহৃত হয়েছে নানান সব ছবি যার কোনোটাতে যেমন দেখানো হয়েছে কোনোএক দেবদেবীকে কিংবা কোনোটাতে দেখানো হয়েছে পৌরাণিক কাহিনির বিশেষ কোনো ঘটনার ছবি যা বইটি পড়তে গিয়ে উপভোগের মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
বইটি পড়তে গিয়ে ভালো লাগার ভীড়েও জাপানিদের নাম গুলো বেশ বাঁধা সৃষ্টি করেছে, অবশ্য নাম নিয়ে এমন ভোগান্তি আমার নতুন নয়, এর আগেও জাপানি বেশকিছু থ্রিলার পড়তে গিয়ে এমনটায় ভুগেছি, তবে বইটির লেখায় যখন ডুবে যাবেন তখন সবকিছুই আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
বইটার প্রোডাকশন কোয়ালিটি চমৎকার, ভিতরের ছবিগুলোও দারুন এসেছে। প্রচ্ছদটাও দারুণ হলেও আমার নামলিপিটা ভালো লাগেনি এর অন্যতম একটা কারণ হলো বইয়ের নামটা ঠিকভাবে চোখে না লাগা, এক্ষেত্রে নামলিপিটা বোল্ড করলে আরো ভালো হতো তবে প্রচ্ছদের অন্যান্য উপাদান বিশেষ করে জাপানের পতাকারও ব্যবহারটা সত্যি চমৎকার লেগেছে।
Yōkai are not just monsters; they are mirrors of human fear, desire, and imagination. ~ Zack Davisson (modern folklorist and translator of Japanese mythic literature).
উক্তিটি দেখে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন, বইয়ের নাম জাপানের পুরাণ: কামি পর্ব অথচ আমি কী না রিভিউয়ের শুরুতেই ইয়োকাই নিয়ে উক্তি দিলাম! চলুন, আরেকটু অবাক করার মতো আরেকটা তথ্য দিই... চারশত বইয়ের অর্ধেকটা মানে দুইশত পৃষ্ঠাই ইয়োকাইদের নিয়ে বর্ণিত... এখন মূল রিভিউয়ের শুভারম্ভ করা যাক।
প্রথম অধ্যায় তথা সৃষ্টিতত্ব শুরুর আগে বিভিন্ন অলৌকিক সত্তাদের সাথে পরিচয় করানো হয়। ( যেমন: কামি, ওনি, কাপ্পা, ইয়োকাই...) এমনই এক অলৌকিক সত্তা হচ্ছেন কামি। কামি আসলে কারা? কামি বলতে মূলত বোঝায় ঐশ্বরিক সত্তা কিংবা আত্মা থেকে উৎসারিত ক্ষমতা। এই শব্দটি দ্বারা ক্ষমতাকেও বোঝায় যা মানুষের অথবা ঐশ্বরিক কাজের কারণে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা বস্তুতে জড়ো হতে পারে, আবার সেই ব্যক্তি বা বস্তু থেকে সরেও যেতে পারে। এমনকী কামি বলতে সমষ্টিগত উপাস্যের পাশাপাশি বোঝানো হয় ব্যক্তিগত কিংবা পরিবারিক উপাস্যকেও। আবার অনেক ক্ষেত্রে, বিখ্যাত বীরদেরকেও কামি বলা হয়...
সৃষ্টিতত্ত্ব... প্রত্যেক মিথলজিতে এই অংশটুকু ভিন্ন ভিন্নভাবে রচিত; তেমনি জাপানের মিথলজিতেও তাদের নিজস্ব সৃষ্টিতত্ত্ব রয়েছে এবং সেই সাথে বিভিন্ন মিথলজিতে বর্ণিত আমাদের চির পরিচিত পুরুষ কিংবা দেবরূপে পূজিত সূর্য (নর্স ব্যতীত); জাপানে দেবী তথা নারীরূপে পূজিত হন। ( এখানে ক্লীব লিঙ্গের কামিদের সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে।) সৃষ্টি শুরুর দেবতাদের বর্ণনা শেষ হবার পর জাপান পুরাণের মূল দেব-দেবী ইজানাগি ও ইজানামি এবং তাদের সন্তানদের জন্মসহ বিভিন্ন ভূমিকা বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে।
প্রধান দেব দেবীদের বর্ণনা শেষ; এরপর থেকে শুরু অন্যান্য জনপ্রিয় দেব-দেবীদের বর্ণনা যেমন: ইনারি, হাচিমান, বেনজাইতেন, কিচিজোতেনসহ আরো অনেকে... তাদের সাথে অন্যান্য পুরাণ কিংবা ধর্মীয় দেব দেবীর সাদৃশ্যতা তথা সামঞ্জস্য ও বর্ণিত ( ভারতীয় পুরাণ, চৈনিক পুরাণ, শিন্তো ও বৌদ্ধ ধর্মের সমন্বয়) মূলত এখানে জাপানের ধন-সম্পদ, প্রজ্ঞা, বজ্র, নদী, সৌভাগ্যের দেবতা বা কামিদের দেখা মিলবে...
কামি যুগ এবং সম্রাট যুগে আদি জাপানের ঘটনা, সংস্কৃতি, ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে কিছুটা ফিকশনের মতো করে গল্প করার স্টাইলে... যার জন্য একঘেয়েমিতা আসেনি, বরং একটানা পড়ার পরেও শেষ পর্যন্ত জানার জন্য কৌতূহলী ছিলাম...
এবং সর্বশেষে ইয়োকাই... ইয়োকাই উৎপত্তিগত ভাবে এসেছে দুটো শব্দ থেকে: ইয়ো অর্থ আকর্ষণীয়, দুর্যোগ, মনোমুগ্ধকর। আর কাই অর্থ-রহস্য, বিস্ময়। তবে মূল কথা হলো, ইয়োকাই এমন একটা শব্দ যার যেকোনো অনুবাদ মূল শব্দের নির্যাসের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ। জাপান-পুরাণে ইয়োকাইকে মোটাদাগে 'দানব' কিংবা 'পিশাচ' ইসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব না। কখনও তাদেরকে ডাকা হতো মোদোনোকে বলে, কখনও বা বাকেমোনো কিংবা ওবাকে অথবা ওনি। তবে আজকাল সবাইকে একসঙ্গে বলা হয় ইয়োকাই... উমম্! এই অংশটাকে অনেকটা রূপকথার সাথে মেলানো যায়। পুরো অংশটিতে গল্প আর কিংবদন্তি। তাদের শ্রেণিবিভাগ এবং সেই সাথে অনেক অনেক গল্প... ( এই অংশের ডিটেইলস দিতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে, কারণ বেশ কিছু খন্ডাংশে পৃথক পৃথক ভাবে গল্প ই বলা হয়েছে, আর সেইসব চরিত্রের পরিচয়, ব্যাখ্যা ফুটিয়ে তোলার জন্যই দুইশত পৃষ্ঠা।)
এনিমে ফ্যান হবার সাথে সাথে আমার পছন্দের জনরা মিথলজি হবার দরুন জাপানের পুরাণ এবং সংস্কৃতি নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ ছিলো। ( জাপানের মিথলজি অনেকগুলি মিথলজি কিংবা পুরাণের সমন্বয় ও বলা যেতে পারে, যেমন: শিন্তো, বৌদ্ধ এবং হিন্দু পুরাণের ও সংস্পর্শের দিকটি ফুটে ওঠেছে।) সেই হিসেবে বলা যেতে পারে, এই বইটার সাথে ভালো একটা সময় কেটেছে। শুধু মিথলজির অংশটুকু ই না, এদের সংস্কৃতি এবং কিংবদন্তির সাথেও বেশ ভালো করেই পরিচিত হওয়া গিয়েছে। সেই সাথে বিভিন্ন মন্দির এবং স্থাপনাগুলি সম্পর্কে ও বেশকিছু তথ্য জানা গিয়েছে... শুধু সমস্যার মধ্যে একটা জিনিস ই বারবার ঘটেছে আর সেটা হলো ওদের নামগুলি এতোবড়! প্রায় একটা বাক্যের সমান আর মনে রাখতেও বেশ বেগ পেতে হয়েছে!
বাইন্ডিং টা বেশ ভালো আর বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি বেশ শক্ত, পড়তে আরাম... প্রচ্ছদটা এভারেজ, খুব আহামরি কিছু না, তবে চোখের শান্তি....