একজন ঘোড়াবিলাসী মানুষের বিচিত্র অভিযানের আখ্যান। যে অভিযানে সমাজের অভ্যন্তর খুঁড়ে ফেলেছে ঘোড়সওয়ার নাজিম। তার যাত্রায় জ্যোৎস্না, ফসলের খেত, বাজার, নানা কিসিম, নানা লোকজন ছিল।... আর এই ঘোড়াবিলাসী মানুষটির জীবনদর্শনই বদলে যেতে থাকে ঘটনার বিচিত্র অভিঘাতে। কিস্সার চরিত্ররা এই আখ্যান যেন নিজেরা গড়েছে, তারা তাদের ইচ্ছেডানা মেলে ধরেছে, কথোপকথনের অপ্রত্যাশিত চমক যেমন গড়ে দিয়েছে, তেমনি কাহিনিকে করেছে কল্পনাস্পর্শী, অভ্যন্তরে বাস্তবতার রং মুছে ফেলতে দেয়নি। সমাজের অভ্যন্তর কথায় এই আখ্যান হয়ে উঠেছে গভীর মননস্পর্শী।
আফসার আমেদের জন্ম হাওড়া জেলার কড়িয়া গ্রামে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রথমদিকে আফসার মূলত কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করলেও পরবর্তীকালে গদ্যরচনা শুরু করেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস ‘ঘর গেরস্তি’। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি ‘প্রতিক্ষণ’ শিরোনামের একটি সাহিত্য সাময়িকীতে কয়েক বছর কাজ করেছেন। এছাড়া কাজ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে।
আফসার আমেদ রচিত বই ‘বিবির মিথ্যা তালাক ও তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিসসা’ আসামের বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মৃণাল সেন পরিচালিত ‘আমার ভুবন’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল তাঁর ‘ধানজ্যোৎস্না’ উপন্যাস অবলম্বনে। ‘রাত কটা হলো?’ শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল তাঁর ‘হত্যার প্রমোদ জানি’ শিরোনামের উপন্যাস অবলম্বনে।
আফসার আমেদ অন্যান্য ভাষার বইও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। উর্দু উপন্যাস ‘দো গজ জমিন’ বাংলায় ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’ শিরোনামে অনুবাদ করেন। এছাড়া হরি মোতোয়ানি রচিত সিন্ধি ভাষার একটি গ্রন্থ ‘আশ্রয়’ শিরোনামে বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
১৯৯৮ সালে আফসার আমেদ সোমেন চন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। ‘দো গজ জমিন’ অনুবাদের জন্য বঙ্গানুবাদ শাখায় ২০০০ সালে পান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০৯ সালে পেয়েছিলেন বঙ্কিম পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।
কিসসা সিরিজের সবচেয়ে বাস্তবঘেষা কাহিনি এটাই। কিসসা এমন হয় যে তাতে বাস্তবের সাথে অনেক অলীক উপাদান মিশে থাকে। এসব অলীক উপাদান সহসা বিশ্বাস করা যায় না কিন্তু ঠিক "গাঁজাখুরি" বলে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। সদ্য বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া এক দম্পতির পারস্পরিক ঈর্ষা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, ক্ষোভ গল্পের বাস্তব উপাদান। আর এতে জোছনা রাতে দেখা দেওয়া ভূত ( যে কিনা স্ত্রীর প্রণয়ীদের খুন করে), নববিবাহিত দম্পতিকে নিজের বাসায় এনে ফুলশয্যার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে কিসসার উপাদান। মিলেমিশে তৈরি হয়েছে মানবিক ও দৃষ্টিউন্মোচনকারী এক গল্প,বরাবরের মতোই।
চরিত্রগুলোর উদ্ভট, ভাবালুতাপ্রবণ, আধা-বাস্তবঘেঁষা দীর্ঘ কথোপকথন আফসার আমেদের উপন্যাসগুলোর প্রাণ এবং সবচেয়ে মজার দিক। এই গল্পেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ঠিক যেন পাঠক নিজেই নিজের কল্পনার জগৎ তৈরি করে নেন। যেখানে বাস্তব-অবাস্তব একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলতে থাকে এক পরিণামহীন গন্তব্যের দিকে।
আফসার আমেদের কিস্সার জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা এক জগৎ। বিচিত্র সব ঘটনায় পরিপূর্ণ এই জগৎ। কিস্সার চরিত্রগুলোও অদ্ভুত সব। তাদের কর্মকাণ্ড খুব উদ্ভট। আর কিস্সা তো এমনই হয়, তাই না? কিস্সার অনেক কিছুই বাস্তরের সঙ্গে সংগতি রাখে না। তবু ভালো লাগে। বেশ মজে থাকা জুটে এসব কিস্সায়। পূর্ণিমা রাত, জ্যোৎস্না প্লাবিত চরাচর, ঘোড়া এবং এক ঘোড়সওয়ার—লেখক আশ্চর্য এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন এবং কিস্সা বলেন। ফলে পড়ার সময় বাস্তব আর অবাস্তবের চিন্তা মাথায় আসে না। আফসারের রসবোধ অন্য উচ্চতার। গুরুগম্ভীর বর্ণনা বা কথোপকথনের মধ্যে ফিক করে হেসে ফেলার মতো পরিস্থিতি এসেছে অনেকবার।
আমি নিজ থেকে কাউকে আফসার আমেদ পড়তে বলি না, বিশেষত কিস্সা সিরিজের বইগুলো (কেউ জিজ্ঞেস করলে নিজের ভালোলাগার কথা অবশ্য জানাই)। কারণ আমার ধারণা, যার ভালো লাগবে, তার এতই ভালো লাগবে যে সে একদম বশীভূত হয়ে যাবে, এবং এর দরুন আফসারের আরও বই পড়তে নিশ্চিত উদ্যোগী হবে। অন্যদিকে যার ভালো লাগবে না, তার ভালো না লাগার পরিমাণ এত বেশি হবে যে ‘ধুর ছাই’ অথবা ‘কী যা-তা’ বলে সে রেখে দেবে। এবং হয়তো আফসার পড়ার প্রথম প্রচেষ্টাই হয়ে থাকবে তার শেষ।