‘হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা। রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে, আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা।' 'খতিয়ান' শীর্ষক কবিতায় রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লাহ এই যে লাইনগুলো লিখে গেছেন— এরা কি শুধুই চলে যাওয়া সঙ্গীর কথা বলে? নাকি সময়ের গ্রাসে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমিও এদের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে আমাদের স্মৃতিতে? বাংলা কোনো স্থবির ভূমিখণ্ড নয়। মানুষের রং-রূপ পরিবর্তনের মতো করেই বদলে গেছে তার সমাজ, পরিবেশ, ভাষা। কালের সেই অমোঘ রথচক্রে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে গেছে অজস্র পুরোনো রীতি, সংস্কার, অভ্যাস... মায় জনজীবন। তবে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আগে তেমন বেশ কিছু বস্তু ও প্রাণীর সঙ্গে যুক্ত অভ্যাসকে ডকুমেন্টেশন করে রাখা বড্ড জরুরি ছিল। এই নাতিস্থূল বইয়ে সেই চেষ্টাই করেছেন লেখক ও প্রকাশক। বইটিতে এই ক'টি অংশ আছে~ (ক) "এই বাংলার মাটিতে মা গো...": 'চুবড়ি মেলা', 'রেডিও', 'সিঁধ', 'আচার ও বড়ি', 'জাঁতা'— এমন মোটি ত্রিশটি ছোট্ট-ছোট্ট অংশে লেখক গ্রামীণ সমাজ, এমনকি মফস্বলেও নিত্যকার জীবনের অঙ্গ কিছু শব্দ ও ঘটনার সঙ্গে আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। (খ) "বিস্মৃত ধূসর ঈশ্বরেরা...": মোট ষোলোটি ছোট্ট লেখার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে 'বাস্তু(মকর) পূজা', 'চাঁচোড়', 'ভৈরব', 'চৌদ্দশাক কথা'— এমন নানা বিশ্বাস ও সংস্কারের সঙ্গে জুড়ে থাকা কাহিনি তথা তার ভিত্তি। (গ) "গোঁসাইকথা...": শীতের ভোরে পাড়াগাঁয়ে যে-সব সহজিয়া সাধকদের দেখা মিলত সে-কালে, তাঁদেরই একজন ছিলেন গোঁসাইঠাকুর। তাঁরই বলা গল্প আর দর্শন ঠাঁই পেয়েছে সাতটি অধ্যায়ে। (ঘ) "বাবা ঠাকুরের মাতৃকথন...": পুজোর আগে গ্রামের আটচালায় বসত গল্পের আসর। শাস্ত্র আর পুরাণের গভীর দার্শনিক অর্থসমৃদ্ধ কাহিনিরা সেখানে নিতান্ত সহজ, মানবিক, আর আটপৌরে চেহারায় ছড়িয়ে পড়ত শ্রোতাদের মনে-প্রাণে। তেমনই ন'টি আখ্যান রয়েছে এই অংশে। বহু লেখার সঙ্গে রয়েছে লেখকের নিজের করা অলংকরণ— যাদের দেখামাত্র মনের কপাট খুলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে স্মৃতিরা। সহসা বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়; কারণ তখন মনে পড়ে, আজকের এই আলোর কালোয় চিরতরে হারিয়ে গেছে কত কিছু! ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, অহমিকায় ভরপুর প্রচার তো নয়ই। বরং এই বই হল খাঁটি স্মৃতিচিত্রণ— যা কালের স্রোতে কুটোটুকুর মতো ভেসে যাওয়া একটা সময়, একটা আস্ত জীবনকে ধরে রাখতে চেয়েছে বর্ণনা ও ছবির ফ্রেমে। এমন একটি অনন্য বই প্রকাশ করে জয়ঢাক প্রকাশন আমাদের সবার কাছে ধন্যবাদার্হ হলেন। আশা রাখি যে বঙ্গজীবনের হারিয়ে যেতে বসা আরও নানা অংশ ও রীতিকে গল্পের মধ্য দিয়ে সংরক্ষণ করায় তাঁরা এভাবেই অন্যদের পথ দেখাবেন।
দেখি বাংলার মুখ: তমোঘ্নর বই নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া
(একটি পাঠ-যাপন, একাধিক মুখে লেখা এক মুখ)
১) ভূমিকা:
“People say you're born innocent, but it's not true. You inherit all kinds of things that you can do nothing about. You inherit your identity, your history, like a birthmark that you can't wash off. ... We are born with our heads turned back, but my mother says we have to face into the future now. You have to earn your own innocence, she says. You have to grow up and become innocent.” ― Hugo Hamilton, The Sailor in the Wardrobe
এমনই এক আত্মার খিদে, এক সংস্কৃতির খোঁজ এই বই। টানটা শুধুই ভাষার নয়, গন্ধের; স্মৃতির নয়, মাটিরও। এই বইটা পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল—আমি যেন নিজে হাঁটছি কোনো বিস্মৃত অলিন্দে, যে গলিপথে এখনও ভেসে আসে ধান ভানার মিহি শব্দ, পাতার ফাঁকে পুরোনো কাঁথা, পুকুরে ভাসে একালের স্মৃতি।
“দেখি বাংলার মুখ” শুধুই বাংলাকে দেখায় না—সে শোনায়, ছোঁয়ায়, খেতে দেয়, সুগন্ধ ছড়ায়, ছুঁয়ে যায় বেঁচে থাকাটাকে।
গতকাল দুপুরে টেবিলে নেমে আসা মেঘভেজা মিঠে রোদ্দুরে বসে যখন বইটা পড়ছিলাম, তখন চারপাশে যেন শুধু শব্দ নয়, স্মৃতি নেমে এসেছিল।
বিশদে:
২) অধ্যায় বিন্যাস ও ভাবনা-তরঙ্গ:
ক) এই বাংলার মাটিতে মা গো…
গোলপাতার নিচে গড়িয়ে পড়া দুপুরের রোদ্দুর যেমন নিঃশব্দে মাটি ছোঁয়, তেমনি এই অধ্যায়ের প্রতিটি খণ্ড বাংলার গ্রামীণ জীবনের গেরস্থালি গাথা হয়ে উঠে আসে—কখনও গন্ধ হয়ে, কখনও সুর হয়ে, কখনও কিংবা শুধুই স্পর্শের মতো আবছা অভিজ্ঞতা।
নকশীকাঁথার বাইশা, পাটালি-ঘেরা চৈত্র সংক্রান্তি, পান্তাভাতের পাশে কাঁচা লঙ্কা আর তেলচপচপে শুকনো চিংড়ির ঝাল… আর ফাঁকে ফাঁকে জাঁতার মৃদু শব্দ যেন কোনো পৌরাণিক মন্ত্রের পুনরুচ্চারণ।
বাঁকুড়ার বুক ছুঁয়ে চলা লেখকের নিজের শৈশব এই অধ্যায়কে দিয়েছে এক অনাড়ম্বর অলৌকিকতা—যেখানে ঈশ্বর নেই মন্দিরে, ঈশ্বর বসে আছেন আচার বড়ির কড়াইয়ে, ভিজে ধান শুকোনোর উঠোনে, বা কোনো মেলাজন্মা বাঁশি আওয়াজে। এখানে ঈশ্বর মানে যাপন, খাদ্য, উৎসব, মাটির গন্ধ। ঈশ্বর মানে "এই বাংলার মাটি, এই বাংলার মুখ।"
খ) বিস্মৃত ধূসর ঈশ্বরেরা
এই আখ্যান সেই ঈশ্বরদের, যাঁরা কোনও কৈলাস বা বৈকুণ্ঠ থেকে অবতীর্ণ হননি—তাঁদের আবির্ভাব ঘটেছে খেতের আলপথে হেঁটে আসা ধুলোয়, পাকা ধানের মাদলে, কুয়াশা-ঢাকা ভোরের শীতশ্বাসে, আর রন্ধনঘরের কড়াই থেকে উঠতে থাকা শুকনো লঙ্কার ধোঁয়ার নীল কুণ্ডলীতে।
মা বিষহরি, কাঁদুনে মা, মাদানা মা, ঘেঁটু ঠাকুর, পাঁচু ঠাকুর, ক্ষেত্রপাল—তাঁরা কেবল “লোকদেবতা” নন, তাঁরা বাঙালির প্রাণতন্তুর ঈষৎ কাঁপুনি, আত্মরক্ষার এক গোপন মন্ত্র। এই সব দেবতা কোনও “উর্ধ্বলোক”-এর অধিবাসী নন, তাঁরা এই মৃত্তিকা, এই জল, এই দুঃখে জন্মানো—এঁরা হলেন মানসিক সহনশীলতার আদিম সংস্করণ, অস্তিত্বের খড়কুটো আঁকড়ে ধরা বাংলার চেতনাশক্তি।
তাঁদের অস্তিত্ব পুরাণের বেদী থেকে নয়, বরং এসেছে মানুষের দুঃখ-ভয়-অভাব আর সেই অভাব জয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে। এঁরা নিঃশব্দে থেকে যাওয়া সেই ঈশ্বর, যাঁদের ভক্তি কোনও মন্ত্রে নয়—প্রকাশ পায় রান্নাঘরের গন্ধে, নবান্নের শস্যে, কিংবা শিশুর জ্বর কাটবার প্রতীক্ষায় কোনও মা'য়ের ঘরোয়া ডাকে।
এই অধ্যায়ে পুরাণ আর লৌকিকতা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত স্মৃতির অভিধান। এখানে "ধর্ম" মানে প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়—বরং প্রজন্মান্তরে বয়ে-চলা অভিজ্ঞতা, গ্রামীণ বাঁচনের উত্তরাধিকার।
লেখকের বয়ানে প্রতিটি ঈশ্বর যেন কেবল পূজিত নয়, বরং জাগ্রত—তাঁদের উৎসব, রীতি, কাহিনি সব কিছুই যেন আদিগন্ত বেঁচে থাকার কাব্য।
বই পড়ার ঠিক ক’দিন আগে লেখকের পঞ্চকোটে সফরের অভিজ্ঞতা এই অধ্যায়ে গভীর এক ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে অনুরণিত হয়েছে—যেন ভাদু উৎসবের সুর, প্রাচীন রাজবাড়ির ছায়া, আর গানের মাদল এই পাঠের আড়ালে কানে বাজতে থাকে। এই স্মৃতিপট যেন পাঠককে শুধুই বই পড়াতে চায় না—চায় তাকে স্মৃতি ও চেতনার উত্তরাধিকারী করে তুলতে।
গ) গোঁসাইকথা
সবচেয়ে মেটাফিজিকাল, অথচ সবচেয়ে সাদামাটা অধ্যায়। এ যেন “গীতা”র লোকায়ত সংস্করণ—যেখানে শাস্ত্র নয়, সংখ্যা বলে কথা; প্রজ্ঞা বলে শূন্য, এক, দুই। গোঁসাইঠাকুরের গাণিতিক দর্শনে “ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে”-র গূঢ়তা এসে মিশে যায় আলপথে হাঁটা এক সহজ সাধকের হাঁকডাকে।
“তুমি শূন্য দিয়ে আসিবে, সেই শূন্যেই ফি���িবে”—এই কথাটি কেবল শূন্য-পরিক্রমা নয়, এ এক সন্ন্যাসী তত্ত্ব, যেখানে জীবন-মৃত্যু সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘নির’, রয়েছে ‘নষ্ট না হওয়া’। এই Zero-centric ভাবনা ঈশ্বর-দর্শনের চেয়ে কম গভীর নয়, বরং আরও মাটির কাছাকাছি, আরও অন্তর্লীন।
এখানে ধর্ম নেই, দেবতা নেই, ভয় নেই—আছে শুধুই এক অলক্ষ্য তুচ্ছতার মহিমা। যেন গোঁসাইঠাকুরের চোখে দেখা যায় জন্ম, সংসার, মৃত্যু—সব এক ‘অদ্ভুত আচাল’ যেখানে শূন্যতা নিজেই পূর্ণতার প্রতিশ্রুতি।
ঘ) বাবা ঠাকুরের মাতৃকথন
এই অধ্যায় যেন এক লৌকিক শাস্ত্র, যেখানে পুরাণ আর পারিবারিক ইতিহাস একাত্ম হয়ে ওঠে। মা বিপত্তারিণী, দুর্গা, নবরাত্রি, মহালয়া, ফলহারিণী কিংবা কৌশিকী অমাবস্যা—এরা এখানে শুধুই তত্ত্বের দেবী নন, এঁরা রান্নাঘরের গন্ধে, মায়ের ঘামেভেজা শাড়ির কোঁচড়ে, আটচালার গল্পের আসরে ছড়িয়ে থাকা মাতৃত্বের প্রতিরূপ।
এই অংশ পড়তে পড়তে মনে হয়—পুরাণ মানে এখানে পুনর্পাঠ, পুনর্গঠন, পুনর্বিন্যাস। ধর্ম নয়, মানবিকতা এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র।
লেখকের ভাষা এ অধ্যায়ে অসাধারণভাবে সহজ, অথচ তার ভেতরে লুকানো আছে বহুস্তরীয় সাংস্কৃতিক তরঙ্গ। একদিকে আছে আদিবাসী রীতি, যেখানে ফল আর ফুলে পুজো হয় মাতৃঋণের; অন্যদিকে আছে ব্রাহ্মণ্য ধর্মভাবনার গম্ভীরতা—এই দুইয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে বলেই এটা নিছক ধর্মীয় অনুধ্যান নয়, বরং এক সামাজিক-আত্মিক সংগীত।
এ যেন রক্তে লেখা শাস্ত্র, যা মন্ত্র নয়—সংসার বলে। এখানে প্রতিটি পূজা মানে একবার করে নিজেকে ছুঁয়ে দেখা।
ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে, উড়াও নীরবে নিভৃত রুমালখানা পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা– টোকা দিলে ঝরে পড়বে পুরনো ধুলো চোখের কোণায় জমা একফোঁটা জল। কার্পাস ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল
"Reach out, and your fists fill with debt / Though my fields are full of harvest."
এই কণ্ঠ শুধুই হারানো সঙ্গীর জন্য হাহাকার নয়, বরং এক মাতৃভূমির জন্য অবদমিত অভাববোধ—এক প্রকার existential dispossession। গ্রাম, গৃহ, গেরস্থালি—সব কিছু থাকা সত্ত্বেও কিছু নেই, কিছু হারানো, যা ছুঁয়ে আছে আত্মার মণিকোঠায়।
ওলেগ কোরাবেলনিকভের উদ্ধৃতি—“তোমার শিকড় এখানেই পোঁতা”—হৃদয়বিদারক এক শিকড়-স্মরণ, যা বইটির নামের সাথেও গোপনে যুক্ত। “দেখি বাংলার মুখ”—দেখা মানে শুধু চাক্ষুষ উপলব্ধি নয়, আত্মার পরিচয়পত্রে সই দেওয়া।
এই বইয়ে বারবার ফিরে আসে রবীন্দ্র-চেতনার অনুরণন। “আপনি কেটেছে আপনার মূল; না জানে সাঁতার, নাহি পায় কুল”—এই লাইন যেন প্রতিটি অধ্যায়ে পাঠকের মনে হঠাৎ ঝলসে ওঠে। মনে পড়ে যায়, সংস্কৃতিকে লালন না করলে, তার উৎসকে না জানলে, আধুনিকতাও দিকহীন হয়ে পড়ে।
এই তিনটি কণ্ঠস্বর—রুদ্রের sense of dispossession, অভাব, ওলেগের উত্তরাধিকার, রবীন্দ্রের অনুশোচনা—তিনটি চোখ, যাদের মিলিত দৃষ্টিতে এই বই পাঠ এক ধরণের শেকড়ের মুদ্রাদর্শনে পরিণত হয়। প্রতিটি পাঠক এই দৃষ্টির ভিতর দিয়ে একবার না একবার নিজের মুখ, নিজের মাটি, নিজের গন্ধ চেনার চেষ্টা করে।
৪) ভাষা, অলঙ্কার ও কাঠামো বিশ্লেষণ:
তুলনামূলকভাবে ভাষা এখানে সহজিয়া ও মেঠো — কিন্তু এই সারল্যের মধ্যে গদ্যের অলঙ্কারিক জোগান একেবারে সূক্ষ্ম। রূপক, উপমা, অনুপ্রাস — সবই আছে, তবে তারা জাঁকজমক করে আসে না; আসে নিঃশব্দে, যেন রুক্ষ পাটকাঠির গায়ে জমে ওঠা শিশিরবিন্দু।
উদাহরণস্বরূপ, “সজনে গাছটা গর্ভপাতের যন্ত্রণার থেকে নিজেকে মুক্তি দিল”— এই একটিমাত্র বাক্যে প্রকৃতিকে দেওয়া হয়েছে ব্যক্তিসত্তার বেদনার ভাষা। এখানে গাছ শুধু বৃক্ষ নয়, এক পরিণত নারীর মতো, সময়ের ভারে ক্লান্ত, গোপন ব্যথায় ক্ষীণ। এটি কেবল উপমা নয়—এ এক empathic metaphor, যা সাহিত্যকে প্রাণ দেয়।
আবার, “রামায়ণ-মহাভারতের ছন্দ বসানো”— এই বাক্যে কিশোর কল্পনার এক চঞ্চল ছায়া ফুটে ওঠে। ধ্বনি ও ছন্দ এখানে কেবল শব্দের নয়—এ সময়ের, খেলনার, ভূতের গল্পের, ঘর-বাহিরে বিস্তৃত শৈশবের।
বইটির কাঠামোগত গঠন বেশ নিরবচ্ছিন্ন—প্রতিটি প্রবন্ধের নিজস্ব আবেগচূড়ায় (emotional crescendo) পৌঁছনোর চেষ্টা আছে, যেখানে পাঠক অনায়াসেই ঢেউয়ের মতো উঠতে-নামতে পারেন।
কিন্তু কখনও কখনও সেই একই আবেগিক গতি ও সুর পুনরাবৃত্ত হয়ে পড়ে—ফলে একটানা পাঠে মৃদু monotony অনুভব হয়। কিছু কিছু স্থানে, লেখক যেন একই বিষাদকে বারবার আলাদা মুখোশে হাজির করেন—যা অনুভূতির শুদ্ধতা বজায় রাখলেও, পাঠপ্রবাহে সামান্য ছন্দপতনের জন্ম দেয়।
তবু, শেষমেশ বলা যায়—এই ভাষা যেন ছেলেবেলার রঙিন ওয়ার পরানো পুরোনো লেপের মতো, নস্টালজিয়ার গন্ধে ভরা। মাঝে মাঝে সেলাই ছেঁড়ে, তুলো উঁকি দেয়; কিন্তু সেই তুলোর মধ্যেই আয়েশের ওম থাকে, মায়ের গায়ের গন্ধ থাকে, আত্মীয়তা থাকে।
৫) কিছু প্রশ্ন ও সমালোচনার রেখা:
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় অলিখিত চরিত্র—“হারিয়ে যাওয়া”—একপ্রকার motif হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রবন্ধে প্রবন্ধে। কখনও তা আবেগঘন, কখনও তা হাহাকারময়, আবার কখনও যেন অভিমানী ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু পাঠক হিসেবে প্রশ্ন জাগে—আসলে কি সবই হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি, পুরাতন রীতির আধারে নতুন অভিব্যক্তি জন্ম নিচ্ছে? কালের নিয়মেই সংস্কৃতির রূপ বদলায়, ভাষা বদলায়, আচার বদলায়। অতএব—“সব পাল্টে গেছে” বলাটা কি খানিক অতিরঞ্জিত?
ভারতীয় দর্শনের মূল যে “अनित्यं हि संसारे”—সংসার অনিত্য, এই অনিত্যবোধের প্রেক্ষিতে লেখকের অতীতকেন্দ্রিকতা কখনও কখনও একপ্রকার nostalgia loop-এর জন্ম দেয়। এক ধরণের আবর্তনে আমরা বারবার ঘুরে তাকাই সেই শৈশব, সেই আচার, সেই মুখগুলোর দিকে—যেন হারিয়ে যাওয়াটাই একমাত্র সত্য। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—ফিরে তাকানো মানেই কি চূড়ান্ত হাহাকার? না কি তা আসলে রূপান্তরিত চেতনার এক স্বরূপ অনুসন্ধান?
শ্রীকৃষ্ণ বলেন— “अनित्यं असुखं लोकं इमं प्राप्य भजस्व माम्।” (এই সংসার অনিত্য ও অসুখময়—তাই আমার স্মরণে থেকো।) — ভগবদ্গীতা ৯.৩৩
এখানে ‘অনিত্য’ কেবল ক্ষণস্থায়ীত্ব নয়, বরং স্থায়িত্বের অভাবই যেন প্রকৃত ধ্রুবতা। পরিবর্তনই শাশ্বত।
ছান্দোগ্য উপনিষদ আবার জানিয়ে দেয়— “सर्वं खल्विदं ब्रह्म” (এই জগতের সব কিছুই ব্রহ্মতত্ত্ব।) — ছান্দোগ্য উপনিষদ ৩.১৪.১
এই কথায় ফুটে ওঠে, যা ক্ষণিক তার মধ্যেই রয়েছে অপরিবর্তনীয় এক চেতনা—যাকে চিনলে বুঝি পরিবর্তন আর হারিয়ে যাওয়া এক নয়।
ঋগ্বেদ বলে— “जन्मन्यन्यं, मृत्युन्यन्यं, तदन्यत् परम्परं।” (জন্ম এক জায়গায়, মৃত্যু আরেক জায়গায়—এই ধারাবাহিকতার পেছনে আছে এক সূক্ষ্ম, পরম সত্য।) — ঋগ্বেদ ১০.১৬.৫
অর্থাৎ, আমাদের ইতিহাস বা শিকড় কেবলই একটি বিন্দু নয়, বরং একটি প্রবাহ, একটি আত্মীয় ধারাবাহিকতা, যা প্রতিনিয়ত রূপ বদলায়।
এমনকি গীতা-র আরেকটি শ্লোকে কৃষ্ণ বলেন— “यदा यदा हि धर्मस्य ग्लानिर्भवति भारत...” (যখনই ধর্মের অবক্ষয় ঘটে, আমি অবতার গ্রহণ করি।) — ভগবদ্গীতা ৪.৭
এখানে ধর্ম মানে কেবল আচরণগত বিধি নয়, বরং সাংস্কৃতিক চেতনার বহমান উত্তরাধিকার, যা যুগে যুগে পুনর্জন্ম লাভ করে।
সুতরাং, “সব পাল্টে গেছে”—এই কথাটিতে যেমন এক বাস্তব অভিজ্ঞতার সত্যতা আছে, তেমনই রয়েছে কিছু মনঃক্লান্তির আবছা আবরণও। ভারতীয় দর্শনের চোখে দেখলে, “সব পাল্টে গেছে” মানে “সব মুছে গেছে” নয়—বরং সবকিছু নতুন রূপে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে। আমাদের ভাষা, আচরণ, উৎসব—সব কিছুতেই ছায়া পড়ে সেই পরিবর্তনের, কিন্তু মূল চেতনা—“ऋतं सत्यं”—চিরকালীন।
অতীতের দিকে ফিরে তাকানো যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই জরুরি তার উদ্দেশ্যটিও। যদি তা হয় শুধুই আক্ষেপের পুনরাবৃত্তি, তবে তা নস্টালজিয়ার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। কিন্তু যদি তা হয় স্মৃতির বীজ থেকে নতুন চেতনার অঙ্কুরোদ্গম, তবে তা হয়ে ওঠে এক জাগরণের অভিপ্রায়। অতীত তখন আর মৃত কাঠ নয়, বরং জলসিঞ্চিত, জীবন্ত, অভিযোজিত এক সাংস্কৃতিক প্রাণরস। অত���ব, ফিরে তাকানো হোক আলোকস্মৃতি ধারণের জন্য—আহত হাহাকারের জন্য নয়।
এখানে একটা টানাপোড়েনও রয়েছে—লেখক একদিকে বাংলা সংস্কৃতির গভীরে গিয়ে মাটি ছুঁতে চান, অপরদিকে শব্দ ও ধারণার অনুব্যাখ্যা না দেওয়ায় সেই মাটি অনেক পাঠকের পায়ের তলা থেকে সরে যায়। “মেজলা”, “উলুটি”, “খসলা”—এই শব্দগুলো কি সবার চেনা? লেখক হয়ত ইচ্ছাকৃতভাবেই ফুটনোট বা গ্লসারি এড়িয়ে গেছেন, যেন পাঠক নিজের পথ নিজে খোঁজে; কিন্তু এই রচনাশৈলী যদি ভাষা-ভ্রমণ হয়, তবে পথচিহ্ন কিছুটা দরকার।
সম্পাদনার খুঁতগুলোও চোখে পড়ে—বিচ্ছিন্ন বাক্যগঠন, কিছু শব্দ ও আবেগের পুনরাবৃত্তি, কিছু অলংকারের আত্ম-অত্যাশা। হয়তো এ সবই প্রথম প্রকাশের অস্থিরতার ফল, কিন্তু এমন একটি বিষয়ের উপস্থাপনে আরেকটু মেদহীন পরিমার্জনা আশানুরূপ ছিল।
তবু, সব খুঁটিনাটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে যে জিনিসটা অটুট থাকে—তা হল লেখকের অন্তর থেকে নিঃসৃত সেই হৃদয়জ উৎসার। ঠিক এই উৎসার থেকেই তো জন্ম নেয় এত আলো, এত স্মৃতি, এত প্রশ্ন। পাঠক হিসেবে সেই প্রশ্ন তোলা মানে বিরোধিতা নয়—বরং বইটির সঙ্গে এক গভীর, আন্তরিক সংলাপে জড়িয়ে পড়া। বইটি তখন আর শুধু পাঠ্য থাকে না, হয়ে ওঠে এক চেতনার সাথী, এক সম্মিলিত স্মৃতির দর্পণ—যার সামনে দাঁড়িয়ে পাঠক নিজেও নিজের মুখ দেখেন, নিজের ফেলে আসা মাটি, ঘর, রসনা, রীতি ও আত্মাকে খুঁজে নেন।
এই বই এক কথায়, রন্ধন-ঘরের ধোঁয়ার মতন—যে ধোঁয়া শুধু চোখে জল আনে না, জিভে জলও এনে দেয়।
৬) শেষের কথা: লৌকিক স্মৃতিচিহ্নের এক রক্ষাকাব্য
এই বই পড়া শুধু অতীতে ডুবে যাওয়া নয়—এ এক আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার, এক নিঃশব্দ নীড়সন্ধান। যেন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ কেউ কাঁপা হাতে তুলে ধরে রোদ্দুর-জ্বলা একটা পুরোনো পুতুল বা বাতিল প্রেমের গন্ধমাখা চিঠি। তমোঘ্ন যেন চেনা মুখগুলোর ভাঁজে-ভাঁজে খুঁজেছেন সেই হারিয়ে-যেতে-চলা বাংলার মুখ—যা আমাদের একান্ত, অথচ প্রায় বিস্মৃত।
এই অনুসন্ধান যেন জীবনানন্দের প্রতিধ্বনি:
"আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে— এই বাংলায়, হয়তো মানুষ নয়— হয়তো শঙ্খচিল, শালিকের বেশে…"
‘দেখি বাংলার মুখ’ আসলে একটি লোকস্মৃতির সেঁজুতিকাব্য—যেখানে শিলা-ঝরে পড়া ছেলেবেলার রামায়ণ, কাঁদুনে মায়ের কান্না, ঠাকুমার লাউপাতা-রন্ধন, কিংবা গোঁসাইঠাকুরের শূন্যদর্শন—সব মিলে গড়ে তোলে একটি সাংস্কৃতিক আত্মজীবনী। এই গ্রন্থ একাধারে সংরক্ষণ, উৎসার, আর আবেগের আধার।
জয়ঢাক প্রকাশন ও লেখক—এই ভাষা ও ভূখণ্ডের রক্ষাকর্মে তাঁদের যে সাহস, তার প্রতি প্রণাম। তাঁরা কেবল বই লেখেননি—তাঁরা মাটি বেঁধে রেখেছেন বাক্যে, ঘ্রাণ বেঁধে রেখেছেন গদ্যে, আকাশকে নামিয়েছেন অলংকরণে।
আর পাঠকের প্রতি একটিই বার্তা—
"যতদিন আপনার স্মৃতি বাঁচে, ততদিনই আপনার ভাষা বাঁচে। আর ভাষা বাঁচলে, একটা পুরো জনপদের, একটা গোটা জাতির আত্মা বাঁচে।"
এই বই—একটি সংবেদনার ক্ষেত, যেখানে প্রতিটি শব্দ একেকটি বীজ। শুধু পড়বেন না—তুলে নিন। রোপণ করুন মনে।
“যে গাথারা চিরপ্রভ নক্ষত্রনদীর মত আদিগন্ত, আদি–অন্তহীন বহে যায়.... শুধু বহে যায়...”
বাংলার প্রান্তর, তার বিধৃত মেঠোপথ ও নদী, আজও অমলিন সেই চিত্রপট। “দেখি বাংলার মুখ” বইটি বাংলা সংস্কৃতির প্রতি এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা পাঠকদের নষ্টালজিয়ার রঙে রাঙানো স্মৃতির দেশে নিয়ে যায়। লেখক তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং উপলব্ধির মাধ্যমে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং লোকায়ত রীতির একটি নিখুঁত চিত্র অঙ্কন করেছেন।
বাংলাকে বলা হয় পরিবর্তনের চিত্রণ, যেখানে বিপুল সমাজ ও পরিবেশের এক অতি বৈচিত্র্যময় রূপ দেখা যায়। কালক্রমে বাংলার সমাজ, রীতি এবং সংস্কার অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। কিছু পুরাতন রীতিনীতি ও অভ্যাস হারিয়ে গেছে, এবং এই পরিবর্তনের কালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, স্থান এবং মূল্যবোধের সংকট দেখা দিয়েছে। কিন্তু “দেখি বাংলার মুখ” বইটি সেই হারানো রীতিগুলোর সামাজিক নথিভুক্তি করার জন্য একটি জরুরি প্রয়াস। লেখক ও প্রকাশক এটিকে একটি সঠিক নথি হিসেবে নির্মাণ করেছেন যা অক্ষুণ্ণ রাখবে বাংলার শব্দ ও ঘটনা।
বইটির বিভিন্ন অংশের মধ্যে “এই বাংলার মাটিতে মা গো…”, অংশটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে লেখক চুবড়ি মেলা, পান্তা, রেডিও, সিঁধ এবং আচার ও বড়ির মতো শব্দ ও ঘটনার মাধ্যমে গ্রামের জীবনের এক অমলিন চিত্র তুলে ধরেছেন। পাঠক এখানে পেয়ে যাবে গ্রামীণ জীবনের স্বাদ, সেই সময়ের স্নিগ্ধতা এবং পরম্পরার সৌন্দর্য।
অন্যদিকে, “বিস্মৃত ধূসর ঈশ্বরেরা…” পর্বে লিখিত বিশ্বাস ও সংস্কারের মাধ্যমে লেখক বাংলার আধ্যাত্মিকতার গভীরতা উপলব্ধি করিয়েছেন। বাস্তু পূজা, চাঁচোড় এবং ভারব — এই সবই একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছে বাংলার সুপ্রাচীন রীতি। এই বিশ্বাসসমূহ কেবল আধ্যাত্মিকতারই না, বরং সামাজিক জীবনবোধেরও একটি অপরিহার্য অংশ। লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে এই প্রথাগুলো মানুষের হৃদয়কে এক করে এবং বৃহত্তর সংস্কৃতির স্রোতে তাদের অস্তিত্বকে সুসংহত করে রাখে।
“গোঁসাইকথা” ও “বাবা ঠাকুরের মাতৃকথন” এক অদ্ভুত যাত্রায় নিয়ে যায়, যেখানে ব্যক্তি এবং সমাজ একসঙ্গে উঠে আসছে। এই দুই অধ্যায় আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন টেকসই নয়, বরং একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে শূন্যতা ও পূর্ণতা একে অন্যের পরিপূরক। অতএব, গোঁসাইকথা সম্বোধন করে আমাদের আত্মিক সূক্ষ্মতাকে, এবং বাবা ঠাকুরের মাতৃকথন আমাদের সমাজের ভিত্তিকে।
অতএব, লেখকের এ গ্রন্থ সমগ্র বাংলার মাটিতে রচিত আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং সামাজিক মেলবন্ধনের একটি অনবদ্য উদাহরণ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটিই আমাদের ধারণার পরিসরকে বিস্তৃত করে এবং আমাদের সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের বাতায়ন উন্মুক্ত করে। আশা রাখি, বাংলার সংস্কৃতি ও প্রান্তরের গল্পগুলো যেন কখনো পিছু হঠে না যায়, বরং মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে চিরকাল।
“দেখি বাংলার মুখ” বইটিকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ও লোকায়ত রীতির দর্পণ বলা যেতে পারে । লেখক তাঁর নিজের প্রত্যক্ষ তথা পরোক্ষ অভিজ্ঞতার স্মৃতি রোমন্থনের সরণি বেয়ে পাঠককে নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন কখনও তাঁর শৈশবের স্বর্ণালি স্মৃতির মাঝে, কখনও বা বিজন প্রকৃতির অভ্যন্তরে, আবার কখনও বা কোনো লৌকিক উৎসবের মধ্যে । পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বাংলার নানা লৌকিক দেব-দেবীর সাথে, যারা মূলত বেদ-পুরাণের দেব-দেবী হলেও বাংলার মানুষের লৌকিক আচারের মধ্যে দিয়ে তাঁদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহকের প্রতীক হয়ে গিয়েছেন ।
বইটি পড়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র । একদিকে লেখকের এই প্রয়াসকে আমি সাধুবাদ জানাই যে তিনি অতীতবিলাসী বাঙালির জন্য এক হারিয়ে যাওয়া তথা হারিয়ে-যেতে-বসা সংস্কৃতির অমূল্য মণিমাণিক্য তুলে এনেছেন তাঁর লেখনীতে । “দেখি বাংলার মুখ”এ এমন অনেক কিছুর সাথে পরিচিত হলাম যা সম্পর্কে আমার বিশেষ বা কোন ধারণাই ছিল না- যেমন নক্সীকাঁথার বাইশা, সন্ধ্যা হাঁড়ি, উলুটি নকশা, খসলা, কুড়নো ছাতু, কাঁদুনে মা, মাদানা মা, পাঁচু ঠাকুরের পার্বণ, ঘেঁটু পুজো, ভাদু উৎসব, ইত্যাদি । এর জন্য লেখকের একটি আন্তরিক ধন্যবাদ যে অবশ্যপ্রাপ্য তা অনস্বীকার্য । এছাড়া কিছু বিশেষ উদ্ধৃতি/উক্তিও মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো | যেমন “বিস্মৃত ধূসর ঈশ্বরেরা” প্রবন্ধের শুরুতে ওলেগ কোরাবেলনিকভের “পক্ষীমিনার”এর উদ্ধৃতি-
“নিজেদের শেকড় খুঁজতে তুই ইদানিং পুবপশ্চিম-ঈশান-নৈঋত তোলপাড় চালাচ্ছিস বলে খবর পাই । খোঁজ না কিন্তু কোত্থাও পাবি না এই বলে দিলাম | কেন জানিস? তোদের শেকড় পোঁতা আছে এইখানে ।”
হয়তো সমগ্র বাঙালির জন্য কথাটা প্রযোজ্য নয়, কিন্তু আমি নিশ্চিত অনেক বাঙালিই আজ তাঁদের শেকড়বিস্মৃত । বিশ্বায়ন মানুষে-মানুষে বৈশ্বিক বিভেদ হয়তো ঘুচিয়ে দিয়েছে কিন্তু মাঝে-মধ্যে আশঙ্কা হয়, নিজের সংস্কৃতির মূলকে ভুলে গেলে বাঙালির অবস্থা কবিগুরুর ভাষায় “আপনি কেটেছে আ���নার মূল; না জানে সাঁতার, নাহি পায় কুল”এর মতো সঙ্গীন হয়ে উঠবে না তো? কেউ কী তাঁর নিজের সত্তাকে ভুলে সত্যিই ভাল থাকতে পারে? কে জানে !
আবার “জাঁতা” প্রবন্ধের পুরুত ঠাকুরের বলা কথাগুলো ভারী সুন্দর- “মা, তোমার কাছে সমর্পণ হোক বৃন্তচ্যুত জবাটির মতো । তোমার দারুণ পদাঘাতে ভেঙে দাও আমার বক্ষস্থল । কামনা, বাসনা, দর্প, অহংকার, গ্লানি সব গুড়িয়ে দাও । বদলে এঁকে দিয়ে যাও পদচিহ্ন । তাকে লালন করতে পারি যেন আজীবন ।”
একমাত্র নিখাদ প্রেমেই কি মানুষ এমনভাবে আত্মসমর্পণ করে না?
কিন্তু অন্যদিকে লেখকের লেখনী নিয়ে আমি যে কিছুটা হতাশ সেটাও স্বীকার করা সমীচীন । “দেখি বাংলার মুখ” বইটি লেখা হয়েছে ছোট ছোট প্রবন্ধের সংকলন হিসেবে । এক-একটি প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে বাংলার রীতি-সংস্কৃতি-প্রকৃতির এক-একটি দিক । কিন্তু সবকটি প্রবন্ধ সমান যত্ন নিয়ে লেখা নয় । কিছু জায়গায় লেখনী এত সুন্দর যে কল্পনায় মানসচক্ষে সবকিছু যেন আপন স্মৃতির মতই ফুটে উঠে । লেখকের নস্টালজিয়ার পরশ লাগে নিজের মনেও । কিন্তু কিছু-কিছু জায়গায় গিয়ে আবার সব যেন কেমন শুকনো বর্ণনায় পরিণত হয় । পড়তে একঘেয়ে লাগে । সেইসাথে জায়গায়-জায়গায় বিসদৃশ বাক্য গঠন ও পুনরাবৃত্তি সম্পাদনায় যত্নের অভাবের ইঙ্গিত দেয় । অনেক জায়গায় কিছু অপ্রচলিত শব্দের অর্থ আরেকটু স্পষ্ট করে বলার প্রয়োজন মনে হয়েছে কিন্তু তার পরিবর্তে পাঠকের উপরেই আন্দাজ করে নেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছে (যেমন “মেজলা” শব্দটি)। শব্দের অর্থ না বুঝলে যে পাঠকের কল্পনা বাধাপ্রাপ্ত হয় আর কল্পনা বাধা পেলে যে লেখার রসাস্বাদনও বাধা পায় এইটুকু সম্পর্কে লেখকের একটু সচেতন হওয়া উচিত ছিল হয়তো ।
এছাড়া বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের শেষে লেখকের নস্টালজিক দীর্ঘশ্বাসও একটা সময়ের পর একটু গতে বাঁধা মনে হয়েছে । হয়তো স্বতন্ত্র প্রবন্ধ বলেই একই আবেগের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে । কিন্তু এতে করে কেমন একটা ধারণা হয় বাংলার সংস্কৃতি-রীতি-প্রকৃতি সবই যেন অতীতের বস্তু, হয় হারিয়ে গিয়েছে নয়তো হারিয়ে যেতে বসেছে । মনে প্রশ্ন জাগে-কিছুই কী তবে আর নেই বাকি? এটা সম্ভবত সত্যি নয় । বা কবিগুরুর ভাষায় বললে “রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে” ।
তার চেয়েও বড় কথা, লেখক শেষের দিকে একাধিক প্রবন্ধে দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন অথচ ভারতীয় দর্শনের মূল শিক্ষা যেটা-পরিবর্তনই জগতের নিয়ম-সেটাই অনুধাবন করলেন না? শুধুমাত্র পুরোনোকে আঁকড়ে বাঁচার নামই কী “বাংলার সংস্কৃতি”? সংস্কৃতির বিবর্তন নেই?
যাই হোক, সম্পাদনার কিছু ত্রুটিকে ক্ষমা করলে আর লেখকের অতীতবিলাসিতার আতিশায্যকে ধর্তব্যের মধ্যে না আনলে “দেখি বাংলার মুখ” একটি ভাল বই-ই বলব । আমার তরফ থেকে পড়ে দেখার পরামর্শ অবশ্যই রইল ।