"এই দিকে আসুন বাবু, গরম ভাত তৈরি, মাছের ঝোল, ডাল; তরকারি, ভাত-হিন্দু-হোটেল বাবু-"
আমরা বাঙালি। বিদেশী খাবার কালেভদ্রে শখ করে খেলেও বাঙালি খাবারের মত শান্তি অ��্য কোনো খাবারে পাওয়া যায় না। বেশি দামি খাবারের চেয়ে কম দামী খাবারেই আমাদের উদর পূর্তি শান্তিময় হয়। ১০০ জন বাঙালিকে প্রশ্ন করে দেখুন, একটানা ১০০ বেলা বিদেশী দামী খাবার খেতে বললে ৯০ জনই রাজি হবে না। কিন্তু আলু ভর্তা, ঘি, গরম ভাত, ডাল, ইলিশ মাছের ঝোল, মুরগী অথবা গরু/খাসী কষা খাওয়ার সুযোগ দেবেন, দেখবেন বত্রিশ পাটি দাঁত বের হয়ে যাবে খুশীতে।
যাকগে, এসেছিলাম আদর্শ হিন্দু হোটেল বইয়ের রিভিউ দিতে। কেন অহেতুক বকবক করছি? জ্বী, আজ্ঞে আদর্শ হিন্দু হোটেলের রিভিউ, খাবার নিয়ে কচকচানি তো থাকবেই। তাই নয় কি? ইংরেজিতে যাকে বলে ইরেভেল্যান্ট, বাংলায় অপ্রাসঙ্গিক মনে হলে মার্ক না হয় দুটো কেটে রাখবেন, কিন্তু মনের ভাব আমার প্রকাশ করতেই হবে।
গল্প সংক্ষেপঃ
হাজারি দেবশর্মা। দুর্দান্ত রাধুনী। মধ্যবয়সী এই ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক অল্প মাইনের বিনিময়ে বেচু চক্কত্তির হোটেলে রাধুনীর কাজ করেন। তার রান্নার হাতের সুনার রাণাঘাট ছাড়িয়ে দূর দুরান্তে ছড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবুও বেচু চক্কত্তি তাকে প্রাপ্য মাইনে বা প্রাপ্য সম্মান কোনোটাই দেন না। তার মনের গোপন খায়েশ হলো এই রেলবাজারেই তার নিজের একটা হোটেল হবে। যার নাম হবে আদর্শ হিন্দু হোটেল। তার স্বপ্ন কি কখনো পূরণ হবে? হাজারি ঠাকুরসহ অন্যান্য কর্মচারীদের জীবন ওষ্ঠাগত করে দেয়ার জন্য হোটেলে রয়েছে আরেক কর্মচারী পদ্মঝি৷ পদ্মঝি যেন বাংলা সিনেমার কুচুটে বুড়ির বাস্তব সংস্করণ। তিনি নিজে কাজে হরদম ফাঁকি দেন, সুযোগ মত হাতটানেরও স্বভাব রয়েছে, কিন্তু বেচু চক্কত্তির পছন্দের মানুষ হওয়ায় তিনি সবার মাথার উপরে ছড়ি ঘোরান। কেউ কোন প্রতিবাদ করতে দেরী, পদ্মঝির মুখ ছুটতে দেরী নেই। এ জন্য সবাই পদ্মঝির থেকে যতটা পারে দূরে থাকার চেষ্টা করে৷ কিন্তু একই হোটেলে কাজ করে কতটাই বা এড়িয়ে থাকা যায়? হাজারি ঠাকুরের মনের ইচ্ছে কি কখনো পূরণ হবে? নাকি শেষ জীবন পর্যন্ত পদ্মঝির মুখের ঝামটা খেতে খেতে বেচু চক্কত্তির গোলামি করতে হবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
আদর্শ হিন্দু হোটেল। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি। আপনারা কেউ ইরফান খান, নাওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী, নিম্রিতা কউর অভিনীত দ্য লাঞ্চবক্স মুভি দেখেছেন?একেবারে খাসা একখানা মুভি। আমার যখন ক্ষুধা লাগে না কিন্তু খেতে হবে তখন দ্য লাঞ্চবক্স মুভি দেখতে বসি। নিম্রিতা কউরের রান্না এবং ইরফান খানের তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া দেখলে পেট অটোম্যাটিক্যালি চো চো করা শুরু করে। অবশ্য শুধু ভালো মন্দ খাওয়া দেখানোই এই মুভির উদ্দেশ্য নয়। প্রচুর শিক্ষণীয় মেসেজ রয়েছে, রয়েছে শান্তিময় মনোহর ডায়ালগের আদান প্রদান। হাজার বার দেখলে হাজার বারই মন ছুয়ে যাবে। বিভূতি বাবুর আদর্শ হিন্দু হোটেলও ঠিক তেমনই সৃষ্টি। বিভূতি বাবু কোথা থেকে এত শান্তিময় ভঙ্গিতে লেখা শিখেছেন জানা নেই, কিন্তু আরণ্যকের পর আদর্শ হিন্দু হোটেল পড়ে আমার আবারও অবাক হতে হয়েছে।
প্রথমেই বলতে হবে গল্পের কথা। সুন্দর, ছিমছাম, শান্তি উদ্রেককারী গল্প। খুবই সাধারণ একটা প্লট, কিন্তু এত অসাধারণভাবে উপস্থাপন করা বিভূতিবাবুর পক্ষেই সম্ভব। অল্পকিছু চরিত্র, সাধারণ একটা হোটেল, মনের ইচ্ছে মেটানোর তীব্র খায়েশের মিশেলে কতটা অসাধারণ গল্প তৈরি হতে পারে, আদর্শ হিন্দু হোটেল তার বাস্তব উদাহরণ। বইয়ের প্রথম পাতা থেকে যে আকর্ষণ আপনি অনুভব করবেন, বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত সেটা থাকবে। কখনো বইয়ের চরিত্রগুলোর সঙ্গে খুশীর জগতে হারাবেন, কখনো দুঃখে, কখনো ক্ষুধা অনুভব করবেন, কখনো প্রচন্ড রাগও লাগতে পারে, কখনো অবাক হয়ে ভাববেন বিভূতিবাবু গল্পে এত মিষ্টি চরিত্র কিভাবে কল্পনা করতে পারলেন? বেচু চক্কতির হোটেল থেকে শুরু হবে যে অভিযান, তা শেষ হোক সেটা আপনি নিজেই চাইবেন না। কারণ গল্প শেষ হয়ে গেলে তো আপনার আনন্দের উৎস ফুরিয়ে যাবে। চমৎকার ভাষাশৈলী, সহজ সাধারণ গল্প, আকর্ষণীয় বর্ণনার জন্য আদর্শ হিন্দু হোটেল কখনোই বিরক্তির উদ্রেক করবে না। এত সহজ সাধারণ প্লটে এত অসাধারণ গল্প সৃষ্টি করার জন্যেই বিভূতি বাবুর একরাশ সাধুবাদ প্রাপ্য।
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের বই গুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক যতসম্ভব বইয়ের চরিত্রায়ন।
তার প্রত্যেকটা বইয়েরই কিছু চরিত্র আপনার মনে দাগ কেটে যাবেই। প্রথমেই বলতে হয় হাজারি ঠাকুরের কথা। বই শুরু হওয়ার দুই চার পৃষ্টা এগোনোর পরেই পাঠক নিজের অজান্তেই হাজারি ঠাকুরের সুখে দুঃখে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করবে। সাত টাকা মাসিক মাইনে যার, দীর্ঘদিন চাকরি করার পরেও বেতন বাড়েনি, হাজারো অপমান, লাঞ্চনা মুখ ঝামটা সহ্য করেও যিনি নির্বিবাদে কাজ করে গিয়েছেন, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিমকহারামি করেননি, তবুও প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাননি হোটেল মালিকের থেকে। কিন্তু সম্মানী মানুষের সম্মান ঠিকই আদায় হয় কোথাও না কোথাও থেকে। হাজারি ঠাকুরের প্রশংসায় দূর দূরান্তের খদ্দেরও পঞ্চমুখ ছিল। তবুও মিথ্যা অভিযোগের বশবর্তী হয়ে চাকুরী খুইয়েছেন, হারিয়েছেন আশ্রয়স্থল। যাত্রাপথে পেয়েছেন বেশ কিছু দেব দেবীতূল্য মানুষের সান্নিধ্যে, যারা যেভাবে পেরেছে তার স্বপ্ন পূরণ করার পথে সাহায্য করেছে। এত দুর্দান্ত চরিত্রায়নের ফলেই গল্পের গভীরে প্রবেশ করার সময় মনে হবে আপনি নিজেই বইয়ের চরিত্র হয়ে সমস্ত ঘটনা অবলোকন করছেন।
পরবর্তী চরিত্রে নাম নিলে অবশ্যই পদ্মঝির নাম নিতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই দুই চারজন মানুষ থাকে যারা বিনাকারণে অন্যের হাড় মাংস জ্বালিয়ে খেতে ওস্তাদ। নিজের সুবিধার জন্য অন্য যে কাউকে কোরবানি দিয়ে দিতে পারে। নিজের উপকারের জন্য অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। তারা একইসঙ্গে ক্ষমতাশালীদের মন যুগিয়ে চলার ক্ষেত্রে শতভাগ পারঙ্গম। ক্ষমতাশালীদের আশ্রয়ে থেকে তাদের খুশী করার নিমিত্তে দুর্বলের উপরে অত্যাচার করতে তারা বড়ই উদগ্রীব থাকে। পদ্মঝি ঠিক তেমনি একজন মানুষ। বই পড়বেন কিন্তু পড়তে পড়তে তাকে গরম তেলে ভাজতে মন চাবে না, উহু তা হতেই পারে না। গরীব মানুষকে সাহায্য করার মত মানুষ কম হয়। সাধারণত মানুষ গরীবের কষ্ট দেখতেই ভালোবাসে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু জগতে কিছু ভালোমানুষ যে থাকে না তা তো নয়। ঠিক তেমনি দুটো চরিত্র কুসুম এবং অতসী। নিজেদের জমানো টাকা দিয়ে তারা হাজারি ঠাকুরের স্বপ্ন পূরন করতে চেয়েছে। ভাবেনি নিজেদের স্বার্থের কথা। সহজ সরল দুটো চরিত্র আপনার মনে দাগ কেটে যাবে নিশ্চিতভাবেই। বেচু চক্কত্তি, হোটেলের মালিক, তিনি চোখ থাকিতেও অন্ধ লোক। অপছন্দের চরিত্রে পরিণত হতে খুব দেরী হবে না। এছাড়াও চমৎকার ছোটবড় সব চরিত্র বইটিকে করেছে অনন্যসাধারণ।
বিভূতি বাবুর বই পড়ার বিপদ হচ্ছে আপনি তার বই নিয়ে বর্ণনা করার পূর্বে মনের গহীনে একগাদা কথা জমিয়ে ফেলবেন। কিন্তু যখনই লিখতে বা বলতে যাবেন, দেখবেন ভালো লাগা প্রকাশ করার মত সঠিক ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। আমার ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আদর্শ হিন্দু হোটেল বইয়ের প্রকাশকাল ১৯৪০ সালে। ইংরেজ শাসনামলের পটভূমিতেই এই গল্প রচিত। যদিও বইয়ে ইংরেজদের নিয়ে অহেতুক কচকচানী নেই। বাংলাদেশে বেশ কিছু প্রকাশনী এই বই বের করেছে। আমি সূর্যোদয় প্রকাশনীর বই কিনেছি। চমৎকার প্রডাকশন, বানান ভুল তেমন একটা পাইনি।
যারা বাংলা ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই বইটি এখনো পড়েননি তাদের অনুরোধ থাকবে দ্রুত বইটি পড়ে ফেলার জন্য। বই পড়তে পড়তে হারিয়ে যান হাজারি ঠাকুরের রান্নায়। হয়ত হাজারি ঠাকুরের রান্নার স্বাদ নেয়ার উদ্দেশ্য আপনিও আদর্শ হিন্দু হোটেলের অনুসন্ধানে রাণাঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেন। কে জানে?!
বইঃ আদর্শ হিন্দু হোটেল
লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়
প্রকাশনীঃ সূর্যোদয়
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা