ফরাসি সাহিত্যে 'মাদাম বোভারি', ইংরেজি সাহিত্যে 'লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার' এবং বাংলা সাহিত্যে 'রাত ভ'রে বৃষ্টি' দাম্পত্য জীবনের প্রেমের একান্ত উল্লেখ্য কটি উপন্যাস। এমিলি জোলা, ডি. এইচ. লরেন্স ও বুদ্ধদেব বসু পর সময়ের স্রোত বয়ে গেছে অনেক।এই উপন্যাস কটির অশালীনতা নিয়ে প্রবল বির্তক ও আপত্তির আবর্ত আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে সেকালে।
কিন্তু সেটা সেকাল..... বর্তমান সময়ে এই উপজীব্য ধাক্কা দেবার মত আর কিছু নয়,জীবনেই তার স্বাক্ষর মিলছে প্রচুর....লেখাও হয়েছে, হচ্ছে। পরকীয়া বা দাম্পত্য জীবনে ভাঙনকেই 'রাহুগ্রাস' উপন্যাসে স্থান দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখিকা দিলারা হাশেম।কিন্তু মানুষের জটিল মনস্তত্ত্বই এতে তুলে ধরা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রকট প্রভেদ, অথবা স্বামীর পঙ্গুত্ব বা অহরহ ঘাত-প্রতিঘাতের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও... আপাতসুখী,পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার আড়ালে অন্তঃসলিলা যে অতৃপ্তি ঘুসঘুসে জ্বরের মত মানুষকে কুরে কুরে খায়...তারই পরিণতি 'রাহুগ্রাস'।
নিউইয়র্ক নিবাসী হাসান ও রিনা সেই ভবিতব্যের প্রতিভূ।ওদিকে স্বামীর চরিত্রহীনতা ও অনাচার সত্ত্বেও লুবনা মরিয়ম বৈবাহিক সম্পর্ক ছেদনে নারাজ ও বিপর্যস্ত। হাসান ও রিনার জবানীতে মানুষের এই জটিল মনস্তত্ত্বের জট ছাড়ানো হয়েছে 'রাহুগ্রাস' উপন্যাসে।
দিলারা হাশেমের জন্ম ২৫ আগস্ট ১৯৩৬ সালে, যশোরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে ইংরেজী সাহিত্যে বি. এ. অনার্স ও ১৯৫৭ সালে এম. এ. সম্পন্ন করার আগে থেকেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছোট গল্প লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্য জীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঘর মন জানালা’, যা পাঠক ও সমালোচক মহলে বিপুল সমাদর পায়। পরবর্তীতে এই গ্রন্থটি রুশ ও চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ‘ঘর মন জানালা’ ১৯৭৩ সালে চলচ্চিত্র হয়েও মুক্তি পায়। উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্যে ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭২ সাল থেকে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেন। প্রবাসী হয়েও লেখিকা বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর শেকড়ের টান অক্ষুন্ন রেখে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলা সাহিত্য চর্চ্চা করে গেছেন। ইতালি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানী, চেকোস্লোভাকিয়াসহ ইউরোপের বহু দেশ এবং চীন, জাপান ও কমিউনিস্ট শাসনামলে সোভিয়েট ইউনিয়ন সফরকারী লেখিকার সাহিত্যে চরিত্র ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য পাঠককে আকৃষ্ট করে; তবে তিনি মূলত নগর জীবন ও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশার ছবিটিই তুলে আনেন। ১৯৮২ সালে ভয়েস অব আমেরিকায় যোগ দেন। অবসরে যান ২০১১ সালে। ২০ মার্চ ২০২২ সালে ৮৬ বছর বয়সে ওয়াশিংটনের নিজ বাসায় মৃত্যু হয় দিলারা হাশেমের।