"জলসা ফুরিয়ে আসে শূন্যতার সারগাম শুরু হোক শাস্ত্রীয় ব্লোজব"
অভিধান "মকারি"র অর্থ জানাচ্ছে অনেকগুলো- ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ,উপহাস। বর্তমান পৃথিবীতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জয়জয়কারের যুগে, বেঁচে থাকাটাই এক ধরনের মকারি হয়ে উঠেছে। আমরা বেঁচে থাকছি (বা বেঁচে থাকার অভিনয় করছি) প্রাণপণ।ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, চেক ইন, সংসার, চাকরি,ঘোরাঘুরি, প্রেম, যৌনতা - সবকিছুর মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে প্রদর্শনপ্রিয়তা। অন্যদের দেখাতে হবে, অন্যদের বাহবা পেতে হবে। আমাদের রুচিও হয়ে উঠছে বিচিত্র। আমি কয়দিন আগে খুব আবেগের সাথে "তোমারও অসীমে" গাচ্ছিলাম। একটু পর নিজের অজান্তে যে গানটা গাওয়া শুরু করেছি সেটা হচ্ছে "মুশকিল মে হ্যায় জিনা।" একটা আইটেম সং! কী মুশকিল। স্নিগ্ধ সুকুমারবৃত্তিতেও আছি, আবার আছি উৎকট রসেও।ধর্মে আছি, আছি জিরাফেও। তালগোল পাকানো, প্রচারসর্বস্ব এই যুগ আমাদের মধ্যে কেমন যেন দিশেহারা ভাব সৃষ্টি করেছে,সৃষ্টি করেছে তুমুল মানসিক দ্বন্দ্ব। আমাদের কথাসাহিত্যে বা কবিতায় এর ছাপ কিন্তু খুব কমই পড়েছে। এই সময়ে পিয়াস মজিদ লিখেছেন "এইসব মকারি" যেখানে কবি অবলীলায় বলছেন,
"কবিতা মানেই অশ্লীল আত্মকেলী নাজুক নিজেই নিজের হার্ডলি সাকার।"
সংশয় প্রকাশ করছেন, "ডেথ রেফারেন্স থেকে কয় কিলো দূরত্ব বার্থডে নোটিফিকেশন"
কবি "কবিতাজীবী কালের ক্যানভাসে ফুটনোট হয়ে ঝুলে" আছেন। কবিতা তাই তার কাছে "ধ্বংসের সৌষ্ঠবের সামনে নির্বিকার গায়কী ; সংগম সংগীত।" হিমবেহালা, মৃত্যুকুসুম, প্রয়াত বসন্ত, নিঝুম মল্লার, বিভক্ত জলভাষা,নাচপ্রতিমার রেশমি লাশ,হিমার্ত জীবন ক্যাফের জগৎ থেকে কবির এই প্রত্যক্ষ সমকালে নির্বিকার উড়ান বিস্ময়কর।
প্রচুর পপ কালচারাল রেফারেন্স সমৃদ্ধ, নাগরিক জীবনের গাঁথা "এইসব মকারি"তে ঠিক কতজন পাঠক মুগ্ধ হবেন বলা মুশকিল। কারণ পিয়াস মজিদ আমাদের প্রথাগত কাব্যভাবনায় বড় একটা আঘাত হেনেছেন। পুরো কবিতাই বেশ raw। আমাদের যাপিত জীবনের ভাষা, আচরণ, গালি, চিন্তাভাবনা সবই অক্লেশে ব্যবহার করেছেন কবি।এভাবে ব্যবহার তো অনেকেই করে বা করতে চায়। ব্যবহৃত গালি বা অপভাষা বা চিন্তাভাবনা তাদের শাব্দিক অর্থের সীমা ডিঙিয়ে শিল্প হয়ে উঠতে পারলো কি না, কবির কলমে যথাযথ সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠতে পারলো কি না সেটাই বিবেচ্য আর এক্ষেত্রে পিয়াস মজিদ কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। কবিতাটি হয়ে উঠেছে সময়ের অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বের এক নান্দনিক সমন্বয়। পিয়াস মজিদ কতটুকু সফল হয়েছেন তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত মকারিতে মুগ্ধ হয়ে পড়ি,
"রেডি হয়ে নাও ডিনার আওয়ার আজ বুফে খাবার বেছে নিক যে যেমন বিচিত্র উপায়ে ভোজ্য হবার আমারও নিশ্চয়ই আছে অধিকার।"
কবিতা মানেই অশ্লীল আত্মকেলি, নাজুক নিজেই নিজের হার্ডলি সাকার।
কিংবা,
ডেথ রেফারেন্স থেকে কয় কিলো দূরত্ব বার্থডে নোটিফকেশন? .
ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ,উপহাস-পরিহাস - নিয়ে 'এইসব মকারি'। ধ্রুব এষের দারুণ অলংকরণ আর প্রচ্ছদ এই কাব্যগ্রন্থের মতোই মনোমুগ্ধকর; যা নিয়ে কিছু বললে কম হয়ে যাবে। তাই চুপ থাকাই বাঞ্ছনীয়। সব মিলিয়ে 'এইসব মকারি' মেইড মাই ডে ডিলিশিয়াস। .
দু'বছর আগে বিচে গিয়ে যে ট্যাটুটা এঁকেছি তা দেখার জন্যে তোমার চোখ এখনও কি যথেষ্ট নগ্ন, হ্যাশট্যাগ?
কিংবা,
শ্বাসে ভাটা পড়লে জমে স্মৃতির পলি তাই মুমূর্ষু সূর্য, চোরা চাঁদের চাউনি সংকলন করে আপ করছে মর্যাদাকর অনলাইনে
কিংবা,
গুগল ড্রাইভে তোমাকে দিলাম, আমার ভেরিফাইড জিন্দা লাশের লোকাল গার্জিয়ান।
কিংবা,
পেট ভরে কবিতা খাই হাংরি, অ্যাংরি, কনফেশনাল তারপর জলে ভাসা পদ্মে ঝিলিক দেয়া পোস্ট আর মেটামডার্নিটি।
' এইসব মকারি' নামক দীর্ঘকবিতাটি কিংবা মোহমদী'য় সাইকেডেলিক জার্নিটি পিয়াস মজিদ লিখেছেন এক অদ্ভুত অস্থিরতাময় স্থির সময়ে, কোভিডের কয়েকদফা ঝাকি খেয়ে পৃথিবী যখন টলছে অর্থাৎ ২০২১ সালে । সেই বিহ্বল সময়ের প্রতিঘাতেই ' এইসব মকারি'র সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে বলে আমার পাঠকসত্তার আন্দাজ, ভুলও হতে পারি। তবে কবিতাটি তে যেভাবে শ্লেষ, ক্লেদাক্ত অনুৃভূতি, ক্লান্তি, বিতৃষ্ণা আর যৌন-উন্মাদনার মিশেলে যে তীব্র অভিঘাতী ককটেলের সৃষ্টি হয়েছে, তা স্পষ্ট সমকালীন দুর্বিষহ পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবজাত বলে মনে হয়। পিয়াস মজিদ যেভাবেই ' এইসব মকারি ' লিখে থাকুন না ক্যান, তিনি যে প্রবল অভিঘাতী শব্দ-ছন্দময় এক ঘোরের সৃষ্টি করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। সেই ঘোর আমাকে আঘাত করেছে ছুটন্ত ট্রেনের মতো সবেগে।
পিয়াস মজিদ শুরু করেছেন -' ছন্দের ঘাটতি পুষিয়ে দেব / আসন্ন বসন্তের লাভলি লিরিকে' এই কথা বলে। পিয়াস মজিদের দুটো কাব্যগ্রন্থ আগে পড়া আছে আমার। সেই সুবাদে বলতে পারছি কবিতায় তাঁর নিজস্ব এক ট্রেডমার্ক তিনি তৈরী করতে পেরেছেন। শব্দের বিচিত্র ব্যবহারে ইউনিক উপমা সৃষ্টির ক্ষমতা পিয়াস মজিদের রয়েছে। এই বইতে তার অনেক নজির মিলবে। একবার পড়লেই মনে গেঁথে যাবে এমনসব পঙক্তি সৃষ্টিতে তিনি দক্ষ। 'এইসব মকারি 'তে এমন অনেক আছে। তাছাড়া স্ল্যাংয়ের চমৎকার উপযুক্ত ব্যবহার তিনি করতে পেরেছেন। কাজটা বেশ রিস্কি তবে তিনি উতরে গেছেন দারুণভাবে। ' এইসব মকারি' আমাদের যাপিত জীবনের নানান অনুষঙ্গ ডার্ক এসপেক্টে সাইকেডেলিক ফর্মে উঠে এসেছে অভিনব রূপে। যা আমাদের আস্বাদন করায় ভিন্ন এক স্বাদ কিংবা তিক্ততার যেখানে আমাদের মনে হতে পারে "স্বপ্নজৈবনিক আমার আত্মমরণনামা জোনাকির অন্ধকার ছাওয়া।"
বইয়ের অলংকরণ করেছেন ধ্রুব এষ যা দুর্দান্ত হয়েছে। এতিহ্য থেকে প্রকাশিত বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি টক নচ।
' এইসব মকারি' থেকে আরো-
"সমতলে দাঁড়ালে যা কিছু ত্যক্ত করে তাই মূলত স্মৃতির পাহাড় চূড়ামণি, তোমার মেঘলা জুলুস থেকে বিক্ষত বাস্তবকে ছেঁকে তুলি ছাউনি গড়ি তবু হাইফেন ও ড্যাশের পার্থক্য অধরা"
"হে রুমি-রাত হে কনফারেন্স অফ বার্ডস তোমাকে বুঝতে হবে ফেলে আসা ও ঘনিয়ে আসা জতুগৃহের জিওপলিটিক্স ক্ষুধিত শতাব্দীর মিসিং যত কিসিং হিস্ট্রি ঘামের পরিসর থেকে অরুণ অশ্রুর অপভ্রংশ গুগল ড্রাইভে তোমাকে দিলাম আমার ভেরিফাইইড জিন্দা লাশের লোকাল গার্জিয়ান"
এইসব মকারি। কবি নিরন্তর মক করে চলেছেন জীবনকে, প্রেমকে, পরিশেষে নিজেকে। ‘জগতের সকল প্রাণির/ প্রেম ব্যর্থ হোক/ নিশ্চয়ই দীর্ঘজীবী হবে/ রেভ্যুলেশনারী স্পিরিট।’ বিগ�� সোনালি দিনের পাঁচিল টপকে কবি পান জীবনের দাওয়াই: ‘শেখো পিয়াস/ ধ্বংসের সৌষ্ঠবের সামনে/ নির্বিকার গায়কি/ সঙ্গম-সংগীত।’ ‘বাজুবন্ধ খুলে খুলে যায়...’ প্রেমের সঙ্গীতের আবহে কবি মুহুর্তেই বাকবদল করেছেন চিত্রকল্পের, স্ল্যাংময় মক করেছেন দাওয়াইকে, ’তাপ্পি মারা সময়ের/ আবছা পাছা মারা খেয়ে/ দুধের শরীরে/ পচা পুষ্টি পেয়ে/ ঘুরে বেড়ায় আত্মার তরল।’ মক করেছেন নাগরিকদের, নিজের ব্যক্তিজীবনের মাঝে উঁকি দিতে চাওয়া অন্যের মর্মকে, ‘দু’বছর আগে বালির বিচে গিয়ে/ যে ট্যাটুটা এঁকেছি/ তা দেখার জন্য / তোমার চোখ এখনও কি/ যথেষ্ট নগ্ন, হ্যাশট্যাগ।’ মক করেছেন মানুষের জীবনকে, ‘মানুষ তুমি মৃত্তিকাসুন্দর/ আয়ুর আস্তানায় আর কতকাল বন্দি!/ মৃত্যুর মেহফিলে অভ্যাগতরা এসে গেছে/ জিন্দেগি যদিও এক মওতের মহল্লা।’ জীবনের গ্যারান্টি কোথায়? যেখানে ‘ডেথ রেফারেন্স থেকে/ কয় কিলো দূরত্ব/ বার্থডে নোটিফিকেশন।’ প্রেমকে মক করলেও জিএফ বিভার সাথে চকোলেট কেক শেয়ার করতে করতে ভেবে চলেন, ’সম্ভাব্য স্টাইল মিশনারি না ডগি।’ প্রেমের অজুহাতে আসলে ‘সব শ্যালকের ছেলের গন্তব্যপুরাণ ফাকিং বিউটি৷’ তাই এ যুগের রাধার শূন্য থাকে না তার মন্দির। ‘ই ভাদর মাহ ভাদর/ পূর্ণ মন্দির তোর।’ রতিখেলার পরে পোস্ট সেক্স ব্লুজে আক্রান্ত মন ভেবে চলে সেইসব বেইমান, খানকির ছাওয়ালকে, যারা ভান করে নদীর নীড়ে বসে করে আগুনের সওদাপাতি, আর হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় রুমির মসনভি। রুমির শ্বাশত প্রেমকে ফেলে রেখে তাকে শিখতে বলেন এই যুগের জতুগৃহের জিওপলিটিক্স। রুমির ফর্টি রুলস অব লাভ তাই ঘোরে কখনো হয়ে যায় সিক্সটি রুলস অব সেক্স। অনন্ত অসীম কাকে গুরুত্ব দেবে? ঝরাপাতার ক্বাসিদা, না কি প্রস্ফুটনের মহিমা! কবির মনের মরা বিকেল বেয়ে লতিয়ে উঠে নিহিলিজম। রক্তের তোড়ায় মোড়া তাজিয়া তখন কারবালাকুসুম হয়ে ওঠে। লা রাশফুকো বলেন, ‘True love is like ghost, which everyone talks about, but few have seen.’ তাই কবি মক করেছেন প্রেম নামের ভূতকে। ‘প্রেম একটা ভূত/ প্রেমের উইন্ডমিল সঙ্গে নিয়ে/ ভূতের গলির মুখে দাঁড়িয়ে/ সাইত্রিশ বছর দেখেছি/ প্রেমের হাওয়া খেয়ে / পাহাড় গড়ে ওঠে/ ভুতের বেগার খেটে/ সশ্রম প্রেমে জগতের যাবৎ ভূতবৃন্দ/ সে পাহাড় কেটে নাছোড় প্রেমেরই পতাকা উড়ায়।’ কবি স্মৃতিকাতর হয়ে আওড়ে চলেন সন্ধ্যানদীর পাড়ে, জীবনানন্দের পায়ে হাঁটার পথ বুড়ো বেলস পার্ক, বিপ্লবীদের আশ্রম শঙ্কর মঠের কথা। আসলে মানুষ মোহের মেহমান, গাছের ঝরাপাতার পরে যেমন সবুজ পাতা বাড়ায় মহিমা। কবি গালিবের মুহাব্বত কি শায়েরিতে মুগ্ধ হয়ে ঝরাপাতার মতো ঝরে পড়তে চান তার নির্দিষ্ট সময়সৌন্দর্যে। ‘পৃথিবীর প্রতিটি উইপিং উইলোর পাশেই থাকে চিরহাসির স্নানাগার।’ তাই কবি নিজেই নিজের ‘হার্ডলি সাকার’। ‘তবু আশা রাখি, সামনের শরতে বাঁচলে / বেহেশতি বসন্তে দেখা পাব তোমারই।’ এইসব স্মৃতির অসুর বধ করে কবি অংশ নিতে চান তার যাপিত জীবনে, ‘রেডি হয়ে নাও/ ডিনার আওয়ার/ আজ বুফে খাবার/ বেছে নিক যে যেমন/ বিচিত্র উপায়ে ভোজ্য হবার/ আমারও নিশ্চয়ই আছে অধিকার!/ ডিনার শেষে কোল্ড কফি মাস্ট / ওরা কফিটা ভালোই বানায় কিন্তু।’
পাঠ অনুভূতিঃ
কবিতায় উপমা আর উৎপ্রেক্ষার অভিনবত্ব, কবিতার চিত্রকল্পের দ্রুত পরিবর্তন আর চমক, বহুভাষার শব্দের (উর্দু, ফার্সি, হিন্দি, ইটালিয়ান) ব্যবহার ও স্ল্যাং এর ব্যবহার কবি পিয়াস মজিদ এর অনন্য কবিতার ভাষা তৈরি হয়েছে। কবিতায় আছে অসংখ্য টেক্সটের রেফারেন্স - রুমি, লালন, লা রাশফুকো যিনি ছিলেন ফ্রেঞ্চ চিন্তক, লেখক, ছিলেন নীটশের প্রেরণা। জার্মান ক্লাসিক ম্যাজিক মাউন্টেন।
পুরো কাব্যগ্রন্থজুড়ে জীবনকে মক করার এমন দুঃসাহস হয়তো তারই আছে তাই।
সম্প্রতি পাঠ করলাম কবি পিয়াস মজিদের কাব্যগ্রন্থ "এই সব মকারি"। একটা কবিতা। দীর্ঘ কবিতার বই। পঁচিশ পৃষ্ঠার একটি বই। আমার আধা ঘন্টা সময় লেগেছে পড়তে। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই কাব্যপাঠ নয় এটি একটি দীর্ঘ রোদ দৌড়। অনেক কাল শীত শেষে আলোক উজ্জল শাব্দিক ঘোড়ার পিঠে চলে বেরিয়েছি ভ্রমনে।
"নাচ ময়ূরী নাচ সোহাগ চাঁদ বদনি পিয়া নাচোতো দেখি আমি মীরার অক্ষম অনুবাদক ভজন- ভস্মের সুবাস শুষে যত বেইমান৷ খানকির ছাওয়াল পিছলা পুকুর ঘাট থেকে পড়ে গিয়ে নদীর নীড়ে বসে করে আগুনের সওদাপাতি তাঁবেদার সবার হাতে দেখি ঝলমলে মসনভি।" দীর্ঘ কবিতার বই আমি আগেও পড়েছি। কবি আশরাফ শিশিরের দুধধান। দীর্ঘ কবিতার ক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জ থাকে পাঠক যেন বিরক্ত না হয়। অর্থাৎ কবিতার ভাঁজে ভাঁজে সে যেন হাত বুলাতে পারে। শৈল্পিক সেই খাঁজের অবয়ব মসৃণ হলে আবার চলে না। তাই কবিকে চলতে হয় থেমে থেমে মিহি চালে। চক্রাকারে ঘুরাতে থাকে শব্দের চাকা তৈরি হয় শব্দের গহ্বর যেখানে মোহন মায়া শৈশব কৈশর অসমাপ্ত প্রেম সব চলে যেতে থাকে।
"চলে যায় বিফল শরতের দিন, অনন্তের শেফালী বলো বেশি কাকে ভালবাসি ঝরাপাতার কাসিদা নাকি প্রস্ফুটনের মহিমা! কুসুমের লাভায় ঝাঁপ দিয়ে আগুনে উজ্জ্বল জল সুশীতল খল..."
অভিকর্ষজ ত্বরণ। নিউটনের সূত্র। রবীন্দ্রনাথের সাথে বসে হুইস্কির খাওয়ার মাজেজা আছে কিছু সময়ে। যেটা চঞ্চল। অবদমিত বসন্তে ফুলের মধ্যে এবং মৌমাছির চোখের গভীরে অন্তঃরনিহিত। এই সব মকারী এমন একটা ভ্রমণ। আধুনিক চিন্তা কোলাজ। কোন বিষয়ে আবর্তিত হয়নি কিন্তু এই সব মকারি যদি মলাট হয় তাহলে এর মধ্যে অনেক গুলো বিক্ষিপ্ত চিন্তা ঢুকে হয়ে গেছে দীর্ঘ শব্দ মালা। এই বই পাঠ করার জন্য অবশ্যই পাঠকের প্রস্তুতি দরকার রয়েছে।
" লতিয়ে উঠা নিহিলিজম প্রাক- চল্লিশের রাতে এসে হামা খাচ্ছে, তাকে ভুলভাল কি সব শিখিয়ে দিল ফরেস্ট অফিসারের মেয়ে! বনের বিভায় বসে বসে চৌচির সঙ্গমের সেঁদো গন্ধে পুরোটা না হারিয়ে তোমাকে কিছু থাকুক উল্লাস"
এইসব মকারির দীর্ঘ কবিতাটি পড়লে আপনার মনে পরে যেতে পারে, আপনার ভেতর থেকে হারিয়ে যাওয়া সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রুপাত্মক সেই সত্ত্বার কথা। যেই মানুষটা অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে প্যান্টটা ঢোলা হয়ে গেল নাকি আমিই সরু -এমন চিন্তা করতো। আবার সেই অফিস ফেরত মানুষটাই লোকাল বাসের জং ধরা রডে হাত রেখে উপর থেকে নিজেকে দেখত মহাকাশের চান্দ্রেয়চারণ। সে কি আমি! পিয়াস মজিদের দীর্ঘ কবিতার বই ‘এইসব মকারি’। বড় একটি কবিতা একটানা পড়ার জন্য যেই প্রস্তুতির দরকার হয়, এই কবিতার ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন নেই। হাতে আঁকা ট্যাটুর মত যেন পুরো কবিতা এক নজরে দেখা যায়। এছাড়াও মনে হয় কবিতাটা যেন খুবই ব্যক্তিগত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কবির পক্ষ থেকে সমাজের জন্য বার্তা দেয়ার বাহুল্যতা কবিতা এটা নয়। ব্যক্তিগত কবিতা কেমন হয়? ব্যক্তিগত শব্দটার মধ্যে আছে কিছুটা অশ্লীলতা। কিছুটা আরামপ্রিয়তা আর কিছুটা স্বাধীনতা। তবে ব্যক্তির অশ্লীলতা যখন ব্যক্তিগত, তখন তা আর অশ্লীলতা নয়; বরং এক ধরণের তামাশা। এ যেন নিজের আপত্তিকর মুহুর্ত ফাঁস হবার পর নিজের সঙ্গে নিজের প্রলাপ। ফাঁস হওয়া ভিডিওতে যাকে দেখা গেল আমি ছাড়া কে হতে পারে সে গ্রুপে করেছিলে না ভেরি পারসোনাল! কতদূর সেই মারাস্বর্গের/মর্গের ইউরিনাল আপাতত জানটা লুকিয়ে রাখি জেনেভা কনভেনশনের পরিশিষ্ট পাতায়।
‘এইসব মকারি’ বইয়ের কবিতা হয়তোবা ব্যক্তিগত আলাপের জায়গা। কবিতা প্রচলিত কবি ও পাঠকের মুখোমুখি ধারণা ভেঙে ব্যক্তিগত কবিতা হয়ে ওঠার এই নকশা পিয়াস মজিদের চুরি করতে হয়েছে বিমূর্ত কোন ধারণা থেকে। আমাদের নিজের সঙ্গে নিজের কথার যে বিমূর্ত ছবি আমরা দেখি, তা তো লেখা যায় না। কারও সামনে হুট করে ভাবনান পতিত হলে যখন জিজ্ঞাসা আসে, ‘কী ভাবছো?’ আমরা উত্তর দেই, ‘বাদ দাও। প্রসঙ্গটা ব্যক্তিগত’। আদতে উত্তর আমরা দিতে পারি না। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ শব্দদ্বয় শুধুই ব্যক্তিকে আড়াল করার রূপ মাত্র। আদতে সামনের নারীকে দেখে কামুক চিন্তার ঝড় ওঠার বিমূর্ত ধারণা সাহিত্যে আসে না, আনা যায় না। যারাই বা এই ব্যক্তিগত ধারণার বিমূর্ত ছবিগুলো লেখার বা আঁকার চেষ্টা করেন, তাদের নীরিক্ষা করতে হয় বিভিন্ন ভাবে। পিয়াস মজিদ ‘এইসব মকারি’ বইতে এই নীরিক্ষা করেছেন দীর্ঘ কবিতায়। যেখানে আঁকাবাঁকা রেলপথের মত কবিতায় সামনে এগিয়ে যায় বৈ কি; কিন্তু এই যাত্রায় বিভিন্ন ষ্টেশনের মানুষের মত দেখা হতে থাকে বিভিন্ন ভাবনার। কিছু ভাবনা মুক্তো দেখার মত বিরল, কিছু ভাবনা লুকিয়ে ফেলার মত অশ্লীল। এক লাইনে এই হলো- এইসব মকারি’র সংজ্ঞা।
২ আগের গীতিকবিতাগুলোতে একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করতাম। তা হলো- গীতিকবিতার লেখকেরা নিজের লেখায় নিজের নাম উল্লেখ করতো। যেমন, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানে খেয়াল করলে দেখি- “করি যে ভাবনা সেই দিন আর পাব নাহ ছিল বাসনা সুখি হইতাম দিন হইতে দিন আসে যে কঠিন করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”
এখানে ‘করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম’ লাইনের করিম যে মুলত লেখক শাহ আবদুল করিম, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়াও শামসুল হক চিশতির লেখা বিখ্যাত গান ‘যদি থাকে নসিবে, আপনা আপনি আসিবে’ গানের শেষের দিকেও দেখি একই প্রবনতা। “বেহায়ামনা শামসেল হকে, আশার মশাল জেলে বুকে, অন্ত্রে যন্ত্রে করে সাধনা রে মন মিলে না”
লেখায় নিজের নাম রাখার প্রবনতা, আমাদের অঞ্চলের প্রাচীন সাহিত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে এই বিষয়টি নিছক প্রবনতা নয়; বরং এর সঙ্গে গভীর দর্শনও লুকিয়ে আছে। লেখক-কবিরা আদতে সমাজের মানুষের জন্য কিছু শেখাতে আসেন না; বরং জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতকে প্রকাশ করার ভাষা হিসেবে তারা সাহিত্যকে বেছে নিয়েছে। এই দর্শনে বিশ্বাসী বলেই তারা নিজেরাই নিজেদের ‘বেহায়ামনা শাসেল হকে, আশার মশাল জেলে বুকে’ বলে বার্তা দেন। তবে পপ কালচারের যুগে ‘এইসব মকারি’ বইতে দেখলাম সেই হারিয়ে যাওয়া আমাদের সাহিত্যের ছায়া। এখানেও কবি তার নিজের নাম উল্লেখ করছেন জীবন থেকে শেখার প্রাসঙ্গিকতায়। “আমাদের সোনাঝরা দিন বেদানার মর্মদানা একমুখী লাল থেকে আরও বহু রঙিলা কান্নার কারিগরি শেখায়। শেখো পিয়াস, ধ্বংসের সৌষ্ঠবের সামনে নির্বিকার গায়কি”
বেদনা ফলের দানার লাল রঙের উপস্থিতিকে এখানে বলা হচ্ছে ‘একমুখী লাল’। আর ঠিক সেখানে পিয়াস মজিদ নিজের নামে লিখছেন ধ্বংসের সৌন্দর্য্যের সামনে একজনের নির্বিকার ভঙ্গিতে গান গাওয়া। সেই নির্বিকার গায়কি বা শিল্পীর মত একজন নির্বিকার কবি হওয়ার জন্য নিজেকে শিখতে বলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একই সঙ্গে আমাদের অঞ্চলের সাহিত্যের কথা। আর এও মনে করায় যে, নিজের সঙ্গে নিজের তামাশা করার মত এক মকারি ও নিবিড় আলাপনের বিমূর্ত ছবির কথা।