রশীদ হায়দার ১৯৪১ সালের ১৫ জুলাই পাবনার দোহারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তখনকার জনপ্রিয় সিনে ম্যাগাজিন চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে চিত্রালীর পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড এর মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এক সময় চিত্রালীর কাজ ছেড়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দেন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন রশীদ হায়দার। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসরে যান। পরে নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে গ্রন্থ ‘স্মৃতি : ১৯৭১’, যাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘দালিলিক গ্রন্থ’ হিসেবে বিবেচনা করেন সমালোচকরা। ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’। ১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদে ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন নিজের প্রথম উপন্যাস ‘গন্তব্যে’। গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০ এর বেশি। রশীদ হায়দার মঞ্চে অভিনয়ও করেছেন। ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাটকের ‘কিংকর’ চরিত্রে।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য সরকার ২০১৪ সালে রশীদ হায়দারকে একুশে পদকে ভূষিত করে। তার আগে ১৯৮৪ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান।
নাম "আমার স্কুল" হলেও স্মৃতিকথাটি পুরোপুরি স্কুলনির্ভর নয়। রশীদ হায়দার ক্ষীণতনু এ লেখায় নিজের কালকে যথাসাধ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ছোটদের উদ্দেশে রচিত হলেও জীবনের কঠোর দিকগুলো লেখক এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেননি তাই গদ্যশৈলী তেমন আকর্ষণীয় না হলেও আগ্রহ নিয়ে বইটা পড়লাম। সামান্য ভুলের কারণে শিক্ষকের কাছে বেদম পিটুনি খাওয়া, দুরন্তপনা, বাহাদুরি দেখাতে পদ্মায় গোসল করতে যেয়ে বিপদে পড়া, "পথের পাঁচালী" পড়ে নতুন এক জগৎ উন্মোচিত হওয়া, ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করা, নিজের দাদীর কারণে বাবা- চাচাদের কাছে মা - চাচীদের মার খাওয়া প্রত্যক্ষ করা সহ অনেক বিষয় বইয়ের সীমাবদ্ধ কলেবরে উল্লেখ করেছেন রশীদ হায়দার। কিছু কিছু ঘটনা এতো মন খারাপ করিয়ে দ্যায়! তার এক হিন্দু শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেকে বাঁচাতে ধর্মান্তরিত হন। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। একাত্তরের অক্টোবর মাসে শিবাজী স্যার তথা সিরাজুল ইসলাম নৃশংসভাবে খুন হন পাক বাহিনীর হাতে। খুব ছোটবেলায় বাসে একদল মানুষকে দেখেছেন নিজ দেশ ছেড়ে যেতে। তারা নিঃশব্দে কাঁদছিলো। এক মহিলা সন্ধ্যার সময় আকুল স্বরে বলে ওঠে, "এই আঁদলের (বৃষ্টির) মধ্যে গরুটাকে কি গোয়ালে তুলেছে?" ছোট্ট ঘটনা অথচ বুকটা ধক করে ওঠে।