আত্মজীবনী রচনার জনপ্রিয় অনেক হেতুই দেখা যায়: ইতিহাসে নিজের অবস্থানটি নির্ণয় করা, আপন জীবনধারার সঙ্গে যে সমষ্টির জীবনটিও অনুমিত বা কল্পিতভাবেই মিলেছে তার মানচিত্র আঁকা, আত্মপক্ষ সমর্থন করা, আত্মগৌরব বর্ধন করা। আমার মনে হয়, নানা খাতে প্রবাহিত একটি জীবন- যা কিনা একাধিক জীবনই বটে- শেষ পর্যন্ত কোন সাগর অভিমুখী এবং সেই সাগরের ব্যাপ্তি ও গভীরতাই বা কী, তার তরঙ্গমালা আছড়ে পড়ছে কোন মহাদেশের পদভুমিতে, এর প্রকাশটাই আত্মজীবনী রচনার সর্বোত্তম কারণ হয়ে থাকা উচিত। নদীর মিঠাপানি সাগরের লবণজলে পৌছােয়; আমাদের জীবনও শেষ পর্যন্ত সেই গতিশেষ পায়। কিন্তু ওই লবণাম্বু থেকেই যে জীবনের একদা উত্থান, এই তথ্য যে গূঢ় অর্থে মানবধারাতেও সত্য- এ কথা আমরা যেন ভুলে না যাই।
Syed Shamsul Haq was one of the most prolific Bangladeshi poets, lyricists, and writers, born in Kurigram on 27 December 1935 to Syed Siddique Husain, a homeopathic physician, and Halima Khatun. Married to Anwara Syed Haq, a member of the Royal College of Psychiatrists in London, he had a daughter, Bidita Sadiq, and a son, Ditio Syed Haq. Throughout his illustrious career, he was honored with the Bangla Academy Award in 1966, the Ekushey Padak in 1984, and the Independence Day Award in 2000 by the Government of Bangladesh. On 27 September 2016, he passed away from lung cancer at the age of 81.
Haq's extensive literary contributions span poetry, fiction, essays, music lyrics, and verse plays, resulting in a remarkable lifelong output of 39 novels, 7 books of poetry, 5 stories, 12 plays, and 4 translations. Reflecting his profound impact on the nation's culture, his literary works are integral to the curriculum of Bengali literature across school, secondary, higher secondary, and graduation levels in Bangladesh.
কী লিখব? কী বলতে চাই আমি প্রতিটা লেখায়? কখনো-সখনো বই পড়ে থমকে বসে ভাবতে হয় যে কী বলতে চেয়েছি আমি পড়তে পড়তে! কোন কোন লেখা আসে স্বত:স্ফূর্তভাবে, কোন কোনটা লেখকের জীবনের মতোই প্রণীত। এই আত্মকথনটা কতটা আত্মকথা আর কতটা নিজের জীবনকে লেখকের নিজেরই দেয়া একটা শ্রদ্ধার্ঘ্য তা অস্পষ্ট। কারণ এই বইতে যতটুকু ব্যক্তি লেখককে চেনা যায় তার চেয়েও বেশি চেনা যায় সিদ্দিককে, রইসউদ্দিনকে, হালিমাকে, হায়দারকে, করিমুন্নেসাকে। তাঁরা কারা? যথাক্রমে লেখকের বাবা, দাদা, মা, বড় বাবা আর দাদী। এছাড়াও খালাদের, ফুফুদের। লেখক বিস্তারিতভাবে পূর্বপুরুষ-পূর্বনারীদের বর্ণনা করেছেন। কারণ কোন জীবনই এককভাবে গড়ে ওঠে না। আমাদের জিনে ছাপ রয়ে যায় পূর্বমানবদের, রয়ে যায় বেড়ে ওঠার স্থানটির সংস্কৃতির। কুড়িগ্রামের নদী, মাঠ, ঘাট, পশু-পাখি, মানুষ মিলে লেখকের জলেশ্বরী তাই হয়ে ওঠে একটি প্রণীত কল্পরাজ্য। আত্মজৈবনিক রচনা- কথাটাকে আজকাল আমার খুব সর্বজনীন মনে হয়। দেখতে পাই, লেখকের সমস্ত রচনাতে নিজ জীবনটা অল্প করে হলেও গুঁজে দেয়া থাকে। নিজে যা দেখেন লেখক, যা অনুভব করেন বড় হয়ে উঠতে উঠতে, যেসব দর্শন তাঁকে প্রভাবিত করে তা-ই আসে বিন্দু বিন্দু হয়ে সমস্ত রচনায়। বালক, তুমি একদিন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় পাঠ কিংবা বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা কিংবা আমার শহর এর সমস্ত বসতি কি একজন সৈয়দ হকের আত্মজীবনী নয়? একজন লেখক-কবিকে চিনতে তাই তিন পয়সার জ্যোছনা, আমার স্কুল, হে বৃদ্ধ সময়, প্রণীত জীবনের পাশাপাশি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে উল্লিখিত কবিতাগুলোতেও। প্রণীত জীবন তার মধ্যেও সবচেয়ে আলাদা। জীবনের শেষ প্রান্তে রচিত বলেই বোধহয় ভাষ্যগুলো, লেখকের উপলব্ধিগুলো খুব স্পষ্ট। জীবনের পালনীয় বিশ্বাসগুলো, যাযাবর ভাবনাগুলো সুসংহত আর প্রাতিস্বিক শব্দচয়নে বিভূষিত। পীর বংশীয় সিদ্দিক পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইংরেজি শেখেন। হয়ে ওঠেন প্রসিদ্ধ হোমিও চিকিৎসক। হালিমার প্রতি প্রগাঢ় প্রেম থাকা সত্ত্বেও শারীরিক নিপীড়নটুকু হালিমা সহ্য করলেও লেখকের চোখে বিসদৃশই ঠেকত। সৈয়দ বংশের আরেক রমণী শরিফুন্নেসা যেমন বিয়ের দুই দিন পরেই সম্ভ্রম রক্ষার্থে জীবন দেন চুলার আগুনের হাতে! এই সমস্ত টুকরো টুকরো ছবি তৎকালীন নারীদের দেখায় লেখকের কলমে। অকপটতা সৈয়দ হকের একটি বৈশিষ্ট্য তা সে নিজের জীবনে যৌনতা নিয়েই হোক আর নিজের বিশ্বাস -সেটা ধর্ম-দর্শন যে প্রসঙ্গই হোক। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। রইসউদ্দিন, হায়দার বা সিদ্দিকের মাধ্যমেই বইটিতে রয়েছে লেখকের শৈশব আঁকা। রয়েছে বড় হওয়ার পথে তাঁদের প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্ন প্রভাবের কথা। কিন্তু গড়পড়তা আত্মকথায় যেমন ধাপে ধাপে নিজস্ব জীবন বর্ণিত হয়ে এসে বার্ধক্যে বা বর্তমানে পৌঁছায় সেই ধারাটি একেবারেই পরিলক্ষিত হয় না এই বইয়ে। তাই অন্যান্য সমস্ত আত্মজীবনী থেকে বইটি অনেকাংশেই ভিন্ন। জীবনের এক সফলতম প্রান্তে এসে বইটি তাই হয়ে দাঁড়ায় লেখকের সমস্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি, সমস্ত ভাবনার উৎস আর বেড়ে ওঠার অজানা অলিগলিগুলো আরো একটু রহস্যময় হয়েই ধরা দেয় পাঠকের চোখে। পাঠক এবার সেই অলিগলিগুলো ঢুঁড়ে আলোর রেখার উৎস সন্ধানে নামবেন। একাকী অবধারিতভাবে। কারণ পাঠকের পাঠযাত্রা সম্পূর্ণ একাই।
'আমি বিশ্বাস করি, পাপ ব্যক্তিগত এবং পাপ যে করে প্রথমত সে নিজেই তা জানে; অন্যদিকে, পুণ্য হচ্ছে সামাজিক ধারণা—চারপাশের মানুষদেরই তা জানবার এবং সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেবার কথা। যে-ব্যক্তি আপন পুণ্যের হিসাব করে, সে আমার চোখে পাপই করে বস্তৃত। অধিকার বহির্ভূত কিছু করাটাও তো এক পাপ। ' - সৈয়দ শামসুল হক
কবিদের গদ্যে সব সময় কাব্যের মধুমাখা থাকে। তাই পরম মোহনীয় হয়ে ওঠে সেই গদ্যের রস ও রূপ। প্রাণ জুড়িয়ে যায় পড়লে গেলে। সৈয়দ শামসুল হকের আত্মকথন 'প্রণীত জীবন' পড়তে গিয়ে আবারও সেই বিশ্বাসের সত্যতা পেলাম।
তিন পয়সায় জোছনা কিনে তাতে নিজের আত্মস্মৃতি লিখেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। সেখানে কবির সমগ্র জীবনের অনেক কথা, স্মৃতি ও ঘটনার সমাবেশে সত্যিকারের জোছনায় স্নিগ্ধ হয়েছিল পাঠকমন। এবারও ব্যত্যয় হয়নি।
কুড়িগ্রামের জলেশ্বরীর সন্তান সৈয়দ শামসুল হক এবার নিজের কথা শুধু লেখেননি ; লিখেছেন পিতা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইনের কথা। বলেছেন পির বংশে জন্ম হয়েও কেন পূর্বপুরুষের পেশা বেছে নেয়নি সৈয়দ হুসাইন। পূর্বপুরুষের সন্ধান করেছেন অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে আর তা লিপিবদ্ধ করেছেন কবির কোমল হৃদয় দিয়ে।
আত্মকথায় বাঙালি সততার পরিচয় দিতে চায় না। নিজেকে সে শুদ্ধতার প্রতীক ভাবতে ভালোবাসে। পিতৃপুরুষকে প্রায় ওলি-আউলিয়া সমান পুণ্যাত্মা হিসেবে দেখাতে চায়। এসবের কোনোটিই করেননি সৈয়দ হক। অনেকটাই সততার পরিচয় দিয়েছেন 'প্রণীত জীবন'কথা লিখতে গিয়ে।
এবার কবির গদ্য শুধু নয় ; বইয়ের বৈভব বৃদ্ধি করেছে বইয়ের শেষে কবির অসামান্য কিছু কবিতার সংযোজন।
জীবনকে শব্দ দিয়ে বাঁধা যায়। আবার সেই বাঁধা জীবন আওয়াজের মতো করে চিৎকার করে বেরিয়ে পড়ে বাঁধন থেকে, শব্দের আধশোয়া অর্থের আলস্যে লুকায় না আর, ভাঙন ঘটে চিন্তায়, তাও আবার মানুষের--টুক টুক করে চুইয়ে পড়ে জীবনের স্বাদ, আহ্লাদ, নিরবতা, অস্থিরতা। দেহের অস্থিমজ্জায় তারে পাইনা, এই জীবনরে। শরীর কেটেছিড়ে খানখান করে কোনো প্রস্তর বা প্রলেপ পাইনা তার। রক্তে প্রবাহমান, তবুও জলের মতো কল কল করে না, যদিও জীবন দেই তার নাম, জলের মিতা। নিজের জীবনকে ইতিহাস বানানোর কারখানা সব্বাই কমবেশি করে। জীবনের ঘটনাগুলা তথ্য উপাত্তের মতো খাঁজা খাঁজা সারিতে বসায়ে রাখে। তবুও তারে কেইবা পায় ছুঁতে? তাই, এবার কঠিন কঠোর তথ্য উপাত্তরে ছানখান করে কেটে একটা ফিকশনে যেতে চাই, এই বইয়ের করুণায়। চমৎকার শব্দবেষ্টিত কারসাজিতে জীবনের ঘটনাগুলোকে তথ্যের মোড়ক থেকে মোচন করে এনে যেভাবে কাল্পনিক সত্যের রস মেশানো যায় তা এই বই না পড়লে বুঝা দুষ্কর।
তাই বরাবরই বলে রাখি, জীবন প্রণীত হয়,ছন্দে মোহে উপমায় পরিবেষ্টিত হয়, কোনো তথ্যমেশানো নিরস আলাপে না। জীবনরে প্রণীত করে ধরতে না পারলেও শব্দ আর কল্পনাছবির ম্যাজিকে তার স্বাদ কিছুটা হইলেও জিহ্বায় আর বুকে পাওয়া যায়, আর সেই স্বাদই এই বইখানা আমাদের সাগ্রহে দান করতে পারে।
‘প্রণীত জীবন’-সাহিত্যে জীবনীতো এমনই, যা লেখকর কলমে যেভাবে উঠে আসে আর আমরা যা অনুভব করি। নামও তাই প্রণীত।
এই জীবনী একটু ভিন্ন, যেখানে তিনি নিজের চেয়ে বাবা সিদ্দিক, মা হালিমা, দাদা রইসউদ্দিনের গল্পেই নিজেকে বেশি পরিচিত করেছেন। কুড়িগ্রামের নদী-মাঠ-মানুষ আর পূর্বপুরুষের রক্তের ছাপ মিলে —‘ জলেশ্বরী’কে করেছেন এক জীবন্ত কল্পরাজ্য।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে লেখা জীব��ী’তে তাঁর বিদ্রোহ, প্রেম, যৌনতা আর দর্শন নিয়ে অকপট উপলব্ধিগুলো স্পষ্ট ভাষায় করেছেন প্রকাশ। শেষাংশে যুক্ত কাব্য গুলোও বইটিকে দিয়েছে নতুনত্ব ও স্বকীয়তা।